আমার জন্মদিন কী, মৃত্যু দিবসই-বা কী? আমার জীবনই-বা কী? মৃত্যুদিন আর জন্মদিন অতি গৌণভাবে এখানে অতিবাহিত হয়। আমার জনগণই আমার জীবন।’ জীবনের শেষদিন পর্যন্ত জনগণের সঙ্গে তার এই আত্মিক সম্পর্ক অটুট ছিল। আর তাই আজ তিনি নীরবে শুয়ে আছেন তারই প্রিয় জন্মভূমির প্রিয় গ্রামে। তাকে শারীরিকভাবে হারিয়ে কিছুকাল স্বপ্নহীন বেপথু হয়েছিল বাংলাদেশ। তবে তিনি ঠিকই ছিলেন আমাদের মননে…
আমাদের রাজনীতি, সমাজ, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির পরতে পরতে বঙ্গবন্ধু জড়িয়ে আছেন নিবিড়ভাবে। আধুনিক ও উদার বাংলাদেশ নির্মাণে তার ভূমিকা যে কতটা দৃঢ় ছিল, তা আমরা জানতে পারি বাংলাদেশের বরেণ্যজনদের কাছ থেকে। তাদের অনেকেই আজ আমাদের মাঝে বেঁচে নেই। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর শৈল্পিক চরিত্রের নানা দিক নিয়ে তারা যেসব কথা লিখে ও বলে গেছেন তা আমাদের চিরদিনের সাংস্কৃতিক সম্পদ হিসেবে রয়ে গেছে। বঙ্গবন্ধুর এবারের জন্মদিনে তার নান্দনিক নেতৃত্ব ও চরিত্রের নানা দিক নিয়ে গুণিজনরা যেসব অমূল্য কথা বলেছেন, সেগুলো লিপিবদ্ধ করার চেষ্টা করেছি এই নিবন্ধে।
এ দেশের গবেষক, কবি, শিল্পী, সাহিত্যিকদের প্রতি বঙ্গবন্ধুর ছিল অকৃত্রিম ভালোবাসা এবং শ্রদ্ধা। স্বাধীন বাংলাদেশের উন্নয়নে এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তাই তাদের যুক্ত করতে তিনি প্রাণপণ চেষ্টা করেছেন। আবার রবীন্দ্রনাথের পাশাপাশি নজরুলের আদর্শেও তিনি ছিলেন অনুপ্রাণিত ও বিমোহিত। বেগম মুজিব তার এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “কবিগুরুর আসন বঙ্গবন্ধুর অন্তরের অন্তস্তলে। রাজনৈতিক জীবনের উত্থান-পতন, দুঃখ-দৈন্য সর্বমুহূর্তে তাকে দেখতাম বিশ্বকবির বাণী আবৃত্তি করতে। ‘বিপদে মোরে রক্ষা কর এ নহে মোর প্রার্থনা, বিপদে আমি না যেন করি ভয়’ অথবা ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে’ প্রভৃতি অসংখ্য গানের টুকরো তিনি আবৃত্তি করে যেতেন দুঃখ-দৈন্য-হাতাশায় ভরা অতীতের সেই দিনগুলোয়।” বঙ্গবন্ধুর রবীন্দ্রপ্রীতির পরিচয় পাই সেই সময় বাংলা একাডেমি আয়োজিত রবীন্দ্র জন্মোৎসব পালন অনুষ্ঠানে তার প্রদত্ত ভাষণে। সেখানে তিনি বলেছিলেন, “নতুন পরিবেশ ও নতুন চেতনায় এবার স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম রবীন্দ্র-জন্মোৎসব পালিত হচ্ছে। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে লক্ষ লক্ষ প্রাণ ও অপরিমেয় ত্যাগের বিনিময়ে। কিন্তু সত্য, শ্রেয়, ন্যায় ও স্বাজাত্যের যে- চেতনা বাঙালি কবিগুরুর কাছ থেকে লাভ করেছে, আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রামে তার অবদানও অনেকখানি। বাঙালির সংগ্রাম আজ সার্থক হয়েছে।”
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর কবি নজরুলকে তার ৭৩তম জন্মবার্ষিকীতে ঢাকায় নিয়ে আসার সব ব্যবস্থা করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। তিনি কবি নজরুলকে পত্র লিখেছিলেন এভাবে, ‘মুক্ত, স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের জনগণ ও আমার পক্ষে আমি আপনাকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। আপনার জন্মবার্ষিকীতে আপনার আদর্শে বাংলাদেশকে সিক্ত হতে দিন। আমরা সাগ্রহে আপনার আগমনের প্রতীক্ষা করছি।’ বঙ্গবন্ধুর অনুরোধে কবি ঢাকায় এলেন। অবিরাম পুষ্পবর্ষণের মাঝে কবি বাংলাদেশে পদার্পণ করলেন। কবি ও বঙ্গবন্ধুর মাঝে এক হৃদয়স্পর্শী দৃশ্যের অবতারণা হলো। বাঙালির এই দুই বিদ্রোহীর মিলনক্ষণটি ইতিহাসের স্বর্ণোজ্জ্বল এক অধ্যায় হিসেবে ইতোমধ্যে স্থান করে নিয়েছে।
‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’ গানটির প্রতি ছিল তার আলাদা আবেগ। এই গানটিকেই যে তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত করবেন, সেটি বহু আগেই মনে মনে ঠিক করে রেখেছিলেন। গানটিকে সারা বাংলায় ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য তিনি আগ্রহী ছিলেন। ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ছয় দফা প্রণয়নের পর থেকেই বাঙালির জাতীয়তাবাদী আন্দোলন দানা বাঁধতে থাকে। বাঙালি ছয় দফাকে মুক্তির সনদ হিসেবে গ্রহণ করে। এই সময় ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’ গানটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। সন্জীদা খাতুনকে দিয়ে কার্জন হলে বিদেশি অতিথিদের সামনে এই গান তিনি গাইয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে জাহিদুর রহিম তার উপস্থিতিতে গেয়েছেন এই গান অসংখ্যবার। আর তাই এই গানই হতে পেরেছে আমাদের জাতীয় সংগীত।
গবেষক, কবি, শিল্পী, সাহিত্যিকদের সব সময়ই তিনি জাতীয় উন্নয়নে সম্পৃক্ত করতে চেয়েছেন। আর তাই ’৭২-এর ১০ জানুয়ারি দেশে ফিরে আসার পর তিনি পরিকল্পনা কমিশনে ড. নুরুল ইসলাম, প্রফেসর রেহমান সোবহান, প্রফেসর আনিসুর রহমান, ড. মুশাররফ হোসেনসহ অসংখ্য শিক্ষক, প্রকৌশলী ও পেশাজীবীকে জড়ো করেছিলেন। প্রফেসর কবীর চৌধুরীকে শিক্ষাসচিব নিযুক্ত করেছিলেন। প্রফেসর আনিসুজ্জামানকে সংবিধান রচনায় যুক্ত করেছিলেন। প্রফেসর মোজাফ্ফর আহমদ চৌধুরী ও ডক্টর এ আর মল্লিককে মন্ত্রিসভায় নিয়েছিলেন। সাহিত্যিক আবুল ফজলকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য করেছিলেন। জয়নুল আবেদিনসহ সব শিল্পী ও শিক্ষাবিদকে তিনি শিক্ষকতুল্য সম্মান করতেন এবং তাদের উপদেশ শুনতেন। বিশেষ করে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের সঙ্গে ছিল এক গভীর সম্পর্ক। নিজেও প্রচুর পড়াশোনা করতেন।
তার সংস্কৃতি-ভাবনার জমিনজুড়েই ছিল এ দেশের দুঃখী মানুষ। তিনি শিল্পী কামরুল হাসানের কাছ থেকে জানতে চেয়েছিলেন, শাশ্বত বাংলার আর্ট ফর্ম কী করে উঠে আসে তার ক্যানভাসে? জয়নুল আবেদিনের পরামর্শমতো সারা বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য স্থাপনের পরিকল্পনা তার ছিল। সময়ের অভাবে তিনি তা করতে পারেননি। সুযোগ পেলেই শিল্পাচার্যের সঙ্গে এ দেশের শিল্পকলা নিয়ে কথা বলতেন। বাংলাদেশের লোকজ-সংস্কৃতিকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরার মানসে বঙ্গবন্ধুর অনুপ্রেরণা ও সহযোগিতায় শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন সোনারগাঁয়ে ‘বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন’ গঠন করেন। স্বদেশের শিল্প ও সংস্কৃতির বিকাশে ও প্রচারে বঙ্গবন্ধু উদগ্রীব ছিলেন। নানা কাজে ব্যস্ত থাকা সত্ত্বেও আমাদের ঐতিহ্যবাহী শিল্প-সংস্কৃতির জন্যে বরাদ্দ ছিল তার বিশেষ সময়। তাই গণভবনকে তিনি বাঙালির গর্বের ভবন করার মানসে শিল্পী রশীদ চৌধুরীকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন। পছন্দের কেউ গেলে তিনি তাকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে তা দেখাতেন। বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালের ১-৫ মার্চ বন্ধুরাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়ন সফরকালে সেখানকার নেতাদের জন্য উপহার হিসেবে নিয়ে যান ‘কচি-কাঁচার মেলা’র শিশুদের আঁকা চিত্রকর্ম। তার নান্দনিক চিন্তা শুধু গানে, কবিতায় বা শিল্পকলায় সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি এ দেশের মানুষকে নিয়ে যেসব স্বপ্ন দেখতেন, সেসবও তার নান্দনিক ভাবনারই অংশ। এ দেশের মাটি ও মানুষের কাছ থেকে কোনোদিন তাকে বিচ্ছিন্ন করা যাবে না। কেননা কবি মোহাম্মদ রফিকের ভাষায়- ‘বাঙালির শুদ্ধনাম শেখ মুজিবুর রহমান।’ সে কারণেই করোনা সংকট সত্ত্বেও পরম মমতা ও আগ্রহে আমরা পালন করেছি বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী। এখনকার তরুণ প্রজন্ম সহজেই অনুভব করতে পারে যে ‘বঙ্গবন্ধুই বাংলাদেশ’।
তবে নিজের জন্মদিন নিয়ে খুব একটা উচ্ছ্বাস ছিল না বঙ্গবন্ধুর। তিনি ভাবতেন জীবনটা কেবলই জনগণের জন্য নিবেদিত, আর কিছুতেই নয়। ১৭ মার্চ ১৯৭১ সেই অসহযোগ আন্দোলনের কালে বঙ্গবন্ধুর ৫২তম জন্মদিনে বিদেশি সাংবাদিকদের জন্মদিনের শুভেচ্ছা বিনিময়ের উত্তরে তিনি বললেন, ‘আমি জীবনে কখনো আমার জন্মদিন পালন করিনি। আপনারা আমার দেশের মানুষের অবস্থা জানেন, তাদের জীবনের কোনো নিরাপত্তা নেই। যখন কেউ ভাবতে পারে না মরার কথা, তখনো তারা মরে।... আমার জন্মদিন কী, মৃত্যু দিবসই-বা কী? আমার জীবনই-বা কী? মৃত্যুদিন আর জন্মদিন অতি গৌণভাবে এখানে অতিবাহিত হয়। আমার জনগণই আমার জীবন।’ জীবনের শেষদিন পর্যন্ত জনগণের সঙ্গে তার এই আত্মিক সম্পর্ক অটুট ছিল। আর তাই আজ তিনি নীরবে শুয়ে আছেন তারই প্রিয় জন্মভূমির প্রিয় গ্রামে। তাকে শারীরিকভাবে হারিয়ে কিছুকাল স্বপ্নহীন বেপথু হয়েছিল বাংলাদেশ। তবে তিনি ঠিকই ছিলেন আমাদের মননে। তাই ফিরে এসেছেন প্রবলভাবে। কবি বাবলু জোয়ার্দারের ভাষায়-
‘সেদিন মানুষের স্বপ্ন খুন হয়েছিল
স্বপ্নের লাশ পড়েছিল উদোম আকাশের নিচে
...................................................
অবশেষে হৃদয়ের ভাঁজ খুলে মানুষেরা
শবযাত্রার পাতাল ছায়া থেকে বের হয়ে
আজ মানুষ হয়ে উঠেছে
বাঙালিরা আজ মানুষ হয়ে উঠেছে’
লেখক: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর