বাঙালির মুক্তি সংগ্রামের মহানায়ক ও বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমার নেতা, আমার আদর্শ। তার আমৃত্যু সংগ্রাম, অমিত সাহস, অতুলনীয় অর্জন ও উদাহরণযোগ্য ত্যাগের কথা আমাকে সর্বদা ভাবায়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এমন একজন নেতা, যার সঙ্গে বাংলাদেশের ইতিহাসের সম্পর্ক গভীর। বঙ্গবন্ধু বিশ্ব ইতিহাসের অন্যতম মহানায়ক। সেরা মুক্তি সংগ্রামী, সেরা রাষ্ট্রনায়ক। বাঙালি জাতি, বাংলাদেশ এবং বঙ্গবন্ধু সমার্থক শব্দে পরিণত।…
হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, স্বাধীন বাংলাদেশের মহান স্থপতি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিন আজ। ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ বৃহত্তর ফরিদপুর জেলার তৎকালীন গোপালগঞ্জ মহকুমার টুঙ্গিপাড়ায় সম্ভ্রান্ত শেখ পরিবারে বঙ্গবন্ধুর জন্ম। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন অত্যন্ত সাহসী। অন্যায় কোনোভাবেই তিনি মেনে নিতেন না। সেজন্য স্কুলের ছাত্ররা তার কথা মেনে চলত এবং তাকে বিশ্বাস করত। ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে দেশবাসীর আন্দোলন ও বিক্ষোভ কিশোর বয়সেই শেখ মুজিবকে উদ্বুদ্ধ করে সংগ্রামী চেতনায়।
১৯৩৯ সালে গোপালগঞ্জ মিশন হাইস্কুলের তিনি অষ্টম শ্রেণির ছাত্র। এক চক্রান্তের ফাঁদে পড়ে সাত দিনের হাজতবাসের মধ্য দিয়ে ইংরেজ আমলেই রাজনৈতিক জীবন শুরু হয় শেখ মুজিবের। তিনি রাজনীতির প্রথম দীক্ষা গ্রহণ করেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর কাছ থেকে। সে সময় তিনি ছিলেন ওই মিশন স্কুলেরই ছাত্র।
স্কুলজীবনে দরিদ্র ছাত্রদের সাহায্যার্থে তিনি গঠন করেছিলেন, ‘মুসলিম সেবক সমিতি’ নামে একটি কল্যাণ সমিতি। দলীয় কর্মীদের নিয়ে তিনি মুষ্টিভিক্ষা সংগ্রহ করতেন এবং এই অর্থ দিয়ে দরিদ্র ছেলেদের জ্ঞানলাভের পথ সুগম করে তুলতেন। নিজের কাঁধে মুষ্টির চাল বহন করে বাড়িতে বাড়িতে যেতেন এবং সংগৃহীত মুষ্টির চাল গরিব-দুঃখীর মধ্যে দান করতেন অথবা গ্রামের স্কুলের উন্নতি সাধনের জন্য মুষ্টিভিক্ষা করতেন।
১৯৪০ সালে নিখিল ভারত মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগদানের মধ্য দিয়ে সূচনা ঘটে শেখ মুজিবের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের। ১৯৪০ সালেই তিনি গোপালগঞ্জ মহকুমা মুসলিম লীগের ডিফেন্স কমিটির সেক্রেটারি নির্বাচিত হন।
১৯৪২ সালে গোপালগঞ্জ মিশন স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য যুবক শেখ মুজিব কলকাতায় গমন করেন। সেখানে তিনি ইসলামিয়া কলেজের ইন্টারমিডিয়েট কলা বিভাগে ভর্তি হন। ইসলামিয়া কলেজের ছাত্র থাকাকালীন ছাত্রসমাজে তিনি অত্যন্ত সুপরিচিত ও জনপ্রিয় ছিলেন। ১৯৪৬ সালে উক্ত ছাত্র সংসদ নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তিনি সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন।
ইসলামিয়া কলেজে ছাত্রাবস্থায় তিনি নিজস্ব উদ্যোগে গড়ে তোলেন ‘মুসলিম সেবক সমিতি।’ ১৯৪৪ সালে কুষ্টিয়ায় অনুষ্ঠিত নিখিল বঙ্গ মুসলিম ছাত্রলীগ সম্মেলনে তিনি যোগদান করেন এবং এই সম্মেলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এই বছরেই ফরিদপুর ডিস্ট্রিক্ট অ্যাসোসিয়েশনের তিনি সেক্রেটারি নির্বাচিত হন।
১৯৪৩ সালের মন্বন্তরের সময় খাদ্যের সন্ধানে কলকাতায় ছুটে গিয়েছিল হাজার হাজার অনাহারী মানুষ। তখন ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমান দিন-রাত রিলিফ নিয়ে গেছেন দুর্গত মানুষের কাছে। ছাত্র বন্ধুদের নিয়ে তিনি দ্বারে দ্বারে ঘুরে ত্রাণসামগ্রী সংগ্রহ করে বিতরণ করতেন দুর্ভিক্ষপীড়িতদের মধ্যে। নিজের মহকুমা শহর গোপালগঞ্জেও ছুটে আসতেন রিলিফ নিয়ে দুর্গতদের সেবায়।
১৯৪৩ সালে তিনি বাংলার মুসলিম লীগের একজন উপদেষ্টা (কাউন্সিলর) হিসেবে নির্বাচিত হন। এভাবে তিনি জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন।
১৯৪৬ সালের সাধারণ নির্বাচনে ফরিদপুর জেলায় নির্বাচনের দায়িত্ব মুজিবের ওপরই বহুলাংশে ছেড়ে দেওয়া হয়। সে সময় তিনি জেলার গ্রাম-গ্রামান্তরে ছুটে বেড়িয়েছেন।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে ছাত্রনেতা হিসেবে সক্রিয় অংশগ্রহণের ফলে ওই বছর তিনি বিএ পরীক্ষা দিতে পারেননি। ১৯৪৭ সালে ইসলামিয়া কলেজ থেকেই তিনি বিএ ডিগ্রি লাভ করেন।
১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হন। কিন্তু আইন পরীক্ষা আর তার দেওয়া হয়নি।
১৯৪৭ সাল। ইতিহাসের এক অনন্য বছর। দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ইংরেজশাসিত ভারতবর্ষ খণ্ডিত হয়ে গঠিত হলো ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্র।
১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলের অ্যাসেম্বলি হলে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠা করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। প্রতিষ্ঠাকালীন এর নাম ছিল পূর্বপাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ।
১৯৪৯ সালের ২৩-২৪ জুনে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ সরকারের প্রবল বিরোধিতার মুখে অগণতান্ত্রিক নীতির প্রতিবাদে ঢাকার রোজ গার্ডেনে মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত হয় মুসলিম লীগবিরোধী প্রথম রাজনৈতিক কর্মী সম্মেলন। এই সম্মেলনের মধ্য দিয়ে মওলানা ভাসানীকে সভাপতি, আতাউর রহমান খানকে সহসভাপতি, শামসুল হককে সম্পাদক, শেখ মুজিবুর রহমানকে যুগ্ম সম্পাদক করে গঠিত হয় প্রথমবারের মতো প্রধান রাজনৈতিক বিরোধীদল পূর্বপাকিস্তান আওয়ামী লীগ মুসলিম লীগ। সে সময় শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন জেলে। তার বিপ্লবী নেতৃত্ব ও মহান ত্যাগের কথা বিবেচনা করে তার অনুপস্থিতিতেই নবগঠিত দলের যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়।
১৯৪৯ সালের ১১ অক্টোবর আওয়ামী মুসলিম লীগের উদ্যোগে ঢাকার আরমানিটোলা ময়দানে অনুষ্ঠিত জনসভায় মওলানা ভাসানী, শামসুল হক ও শেখ মুজিবুর রহমান বক্তৃতা করেন। এ জনসভায় সরকারবিরোধী বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগে ৩১ ডিসেম্বর শেখ মুজিবকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং টানা ২৬ মাস তাকে রাজনৈতিক (নিরাপত্তা) বন্দি হিসেবে জেলে আটক রাখা হয়।
১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের বিস্ফোরণ পর্বে শেখ মুজিবুর রহমান জেলে ছিলেন। ব্যক্তিগতভাবে রাজনৈতিক ময়দানে অনুপস্থিত থাকলেও জেলে বসেও নিয়মিত আন্দোলনকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিতেন।
১৯৫৩ সালের ৯ জুলাই ঢাকার মুকুল সিনেমা (বর্তমানে আজাদ) হলে আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রথম পূর্ণাঙ্গ সম্মেলনের অধিবেশন বসে। এই অধিবেশনেই গৃহীত হয় প্রথম গঠনতন্ত্র। এই সম্মেলনে মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীকে সভাপতি এবং শেখ মুজিবুর রহমানকে সাধারণ সম্পাদক করে গঠিত হয় নতুন কার্যনির্বাহী কমিটি।
১৯৫৩ সালের ১৪ নভেম্বর সাধারণ নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য অন্যান্য দল নিয়ে যুক্তফ্রন্ট গঠনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ১৯৫৪ সালের ১০ মার্চ সাধারণ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট ২৩৭টি আসনের মধ্যে ২২৩টিতে বিজয় অর্জন করে, যার মধ্যে ১৪৩টি আসন পায় আওয়ামী মুসলিম লীগ। শেখ মুজিব গোপালগঞ্জ আসনে বিজয় লাভ করেন। ১৫ মে তাকে কৃষি ও বন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়। ২৯ মে কেন্দ্রীয় সরকার যুক্তফ্রন্ট ভেঙে দেয়। ৩০ মে করাচি থেকে ঢাকা ফেরার পর বিমান বন্দর থেকেই তাকে আটক করা হয়। ওই বছরের ২৩ ডিসেম্বর মুক্তি লাভ করেন তিনি। ১৯৫৫ সালের ৫ জুন শেখ মুজিব আইন পরিষদের সদস্য মনোনীত হন।
১৯৫৫ সালের ২১-২৩ অক্টোবর আওয়ামী মুসলিম লীগের বিশেষ অধিবেশনে দলের নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দেওয়া হয়। শেখ মুজিব পুনরায় দলের সেক্রেটারি নির্বাচিত হন। ১৬ সেপ্টেম্বর শেখ মুজিব কোয়ালিশন সরকারে যোগ দিয়ে একযোগে শিল্প, বাণিজ্য, শ্রম, দুর্নীতিরোধ এবং গ্রামীণ সহায়তা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি দলের জন্য সম্পূর্ণ সময় ব্যয় করার তাগিদে ১৯৫৭ সালে ৩০ মে মন্ত্রিপরিষদ থেকে পদত্যাগ করেন। ওই বছরের ১১ অক্টোবর বঙ্গবন্ধুকে আবারও আটক করা হয়। তিনি ১৯৬১ সালে জেল থেকে ছাড়া পান। এবার তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা আদায়ের লক্ষ্যে কাজ শুরু করেন। ১৯৬২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি জননিরাপত্তা আইনে তাকে আবারও আটক করা হয়। ২ জুনের চার বছরব্যাপী মার্শাল ল’ অপসারণের পর একই মাসের ১৮ তারিখে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়। ২৫ জুন তিনি অন্য রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে মিলে আইয়ুব খান আরোপিত বিভিন্ন রাজনৈতিক ইস্যুর বিরুদ্ধে সংগ্রামে নেমে পড়েন। ২৪ সেপ্টেম্বর তিনি লাহোরে গিয়ে শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে মিলে জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট গড়ে তোলেন। অক্টোবরজুড়ে শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে মিলে যুক্তফ্রন্টের সমর্থন আদায়ে তিনি বাংলার বিভিন্ন স্থান সফর করেন।
সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুর পর ১৯৬৪ সালের ২৫ জানুয়ারি এক বৈঠকের প্রস্তাবের ভিত্তিতে শেখ মুজিব আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও মাওলানা আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশকে দলের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। ওই বছরের ১১ মার্চ একটি সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের সামরিক শাসন, রাজনীতির নামে মৌলিক গণতন্ত্র প্রচলন (বেসিক ডেমোক্রেসি) এবং পাকিস্তানের কাঠামোতে এক ইউনিট পদ্ধতির বিরোধী নেতাদের মধ্যে অগ্রগামী ছিলেন শেখ মুজিব। অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে মুজিব আইয়ুববিরোধী সর্বদলীয় প্রার্থী ফাতিমা জিন্নাহকে সমর্থন করেন।
১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি লাহোরে বিরোধী দলগুলোর সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এ সম্মেলনেই শেখ মুজিব ঐতিহাসিক ছয় দফা দাবি পেশ করেন, যা ছিল কার্যত পূর্বপাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের পরিপূর্ণ রূপরেখা। ১৯৬৬ সালে মার্চ মাসের ১ তারিখে শেখ মুজিব আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। এরপর তিনি ছয় দফার পক্ষে সমর্থন আদায়ে দেশব্যাপী প্রচার কার্য পরিচালনা করেন। এই সময় তিনি বেশ কয়েকবার কারাবন্দি হন।
১৯৬৮ সালের প্রথমদিকে পাকিস্তান সরকার শেখ মুজিব এবং আরও ৩৪ জনের বিরুদ্ধে একটি মামলা করে, যা আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা নামে পরিচিত।
১৯৬৯ সালের ৫ জানুয়ারি কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ তাদের ১১ দফা দাবি পেশ করে, যার মধ্যে শেখ মুজিবের ছয় দফা অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই পরিষদের সিদ্ধান্তক্রমে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে গণ-আন্দোলন শুরু হয়। এই আন্দোলনই উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান নামে পরিচিত। এ আন্দোলনের পর মামলা প্রত্যাহার করে শেখ মুজিবসহ অভিযুক্ত সবাইকে মুক্তি দেওয়া হয়। এই বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের এক সভায় শেখ মুজিবকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি দেওয়া হয়।
১৯৬৯ সালে আইয়ুব খানের আহ্বানে একটি সর্বদলীয় সম্মেলনে শেখ মুজিব ছয় দফাসহ অন্য রাজনৈতিক দলের চাহিদাগুলো মেনে নেওয়ার আহ্বান জানান এবং তা প্রত্যাখ্যাত হলে সম্মেলন থেকে বের হয়ে আসেন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে শেখ মুজিবের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ প্রাদেশিক আইনসভায় নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। আওয়ামী লীগ তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানে জাতীয় পরিষদের ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসন এবং প্রাদেশিক পরিষদের ৩০০টি আসনের মধ্যে ২৮৮টি আসন লাভ করে। জাতীয় পরিষদ সদস্যদের এক বৈঠকে বঙ্গবন্ধু পার্লামেন্টারি দলের নেতা নির্বাচিত হন। ২৮ জানুয়ারি জুলফিকার আলী ভুট্টো বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলোচনার জন্য ঢাকায় আসেন। তিন দিন বৈঠকের পর আলোচনা ব্যর্থ হয়ে যায়। ১৩ ফেব্রুয়ারি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ৩ মার্চ ঢাকায় জাতীয় পরিষদের বৈঠক আহ্বান করেন। ১৫ ফেব্রুয়ারি ভুট্টো ঢাকায় জাতীয় পরিষদের বৈঠক বয়কটের ঘোষণা দিয়ে দুই প্রদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ দুই দলের প্রতি ক্ষমতা হস্তান্তর করার দাবি জানান।
১৬ ফেব্রয়ারি বঙ্গবন্ধু এক বিবৃতিতে ভুট্টোর দাবির তীব্র সমালোচনা করে বলেন, ‘ভুট্টো সাহেবের দাবি সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। ক্ষমতা একমাত্র সংখ্যাগরিষ্ঠ দল আওয়ামী লীগের কাছে হস্তান্তর করতে হবে। ক্ষমতার মালিক এখন পূর্ব বাংলার জনগণ।’ ১ মার্চ ইয়াহিয়া খান অনির্দিষ্টকালের জন্য জাতীয় পরিষদের বৈঠক স্থগিতের ঘোষণা দিলে সারা বাংলায় প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। বঙ্গবন্ধুর সভাপতিত্বে আওয়ামী লীগ কার্যকরী পরিষদের জরুরি বৈঠকে ৩ মার্চ দেশব্যাপী হরতাল আহ্বান করা হয়। ৩ মার্চ সারা বাংলায় হরতালি পালিত হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু অবিলম্বে ক্ষমতা হস্তান্তর করার জন্য প্রেসিডেন্টের প্রতি দাবি জানান।
১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে এক জনসভায় শেখ মুজিব স্বাধীনতার ডাক দেন এবং জনগণকে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের জন্য প্রস্তুত করেন। এদিকে ইয়াহিয়া খান সামরিক আইন জারি করেন। আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে শেখ মুজিবসহ আওয়ামী লীগের অন্য নেতাদের গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেন। পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী রাজনৈতিক ও জনসাধারণের অসন্তোষ দমনে ২৫ মার্চ অপারেশন সার্চলাইট শুরু করে। এ অভিযান শুরু হলে শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়ি থেকে ওয়্যারলেসের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। এদিন তাকে গ্রেপ্তার করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয় এবং ফয়সালাবাদের একটি জেলে কড়া নিরাপত্তায় রাখা হয়।
১৯৭১ সালে ১৭ এপ্রিল মুজিবনগরে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ সরকারের রাষ্ট্রপ্রধান ও সশস্ত্র বাহিনীগুলোর সর্বাধিনায়ক ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। তার অনুপস্থিতিতে উপরাষ্ট্রপ্রধান সৈয়দ নজরুল ইসলাম অস্থায়ী রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
৯ মাস যুদ্ধের পর ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণ করে এবং আওয়ামী লীগ নেতারা ঢাকায় ফিরে সরকার গঠন করেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি মুক্তি দেয় পাকিস্তান সরকার। এরপর তিনি লন্ডন হয়ে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বাংলাদেশে ফিরে আসেন।
শেখ মুজিবুর রহমান অল্প দিনের জন্য অন্তর্বর্তীকালীন রাষ্ট্রপতি ছিলেন এবং পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর থেকে নতুন সংবিধান কার্যকর করা হয়। ১৯৭৩ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে এবং তিনি সরকার গঠন করেন।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট একদল বিপথগামী সেনা কর্মকর্তা ট্যাংক দিয়ে ধানমন্ডি বাসভবনে নারকীয় হত্যাযজ্ঞে লিপ্ত হয়। এ সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তার পরিবারের সদস্য এবং তার ব্যক্তিগত কর্মচারীদের হত্যা করা হয়।
বাঙালির মুক্তি সংগ্রামের মহানায়ক ও বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমার নেতা, আমার আদর্শ। তার আমৃত্যু সংগ্রাম, অমিত সাহস, অতুলনীয় অর্জন ও উদাহরণযোগ্য ত্যাগের কথা আমাকে সর্বদা ভাবায়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এমন একজন নেতা, যার সঙ্গে বাংলাদেশের ইতিহাসের সম্পর্ক গভীর। বঙ্গবন্ধু বিশ্ব ইতিহাসের অন্যতম মহানায়ক। সেরা মুক্তি সংগ্রামী, সেরা রাষ্ট্রনায়ক। বাঙালি জাতি, বাংলাদেশ এবং বঙ্গবন্ধু সমার্থক শব্দে পরিণত।
আজীবন সংগ্রামী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে শিক্ষা আন্দোলন, ঐতিহাসিক ছয় দফা আন্দোলন, সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন, সর্বোপরি সত্তরের নির্বাচনে বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন। স্বাধীনতার মহানায়ক জাতির জনক বঙ্গবন্ধু তার বলিষ্ঠ সুযোগ্য সুদৃঢ় অনমনীয় অকুতোভয়, সর্বোপরি দূরদর্শী নেতৃত্বের মাধ্যমে বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতিকে পৌঁছে দিয়েছেন স্বাধীনতার সুবর্ণ তোরণে।
বঙ্গবন্ধুর জীবনদর্শন চিরকাল বাঙালি জাতিকে অনুপ্রাণিত করবে, পথ দেখাবে। বাঙালি জাতি শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসায় বাংলাদেশের ইতিহাস বিনির্মাণের কালজয়ী এই মহাপুরুষকে চিরকাল স্মরণ করবে। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ওই ভাষণ বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ। কালজয়ী এ ভাষণ ছিল বাঙালি জাতির মুক্তির নির্দেশিকা।
লেখক: সংসদ সদস্য ঢাকা-১৮, সদস্য, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। শিল্প ও বাণিজ্যবিষয়ক সম্পাদক, ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগ