পাঠকসংকটে ভুগছে দেশের অধিকাংশ পাঠাগার। এর কারণ হিসেবে দায়ী করা হচ্ছে শিক্ষার্থীসহ সর্বস্তরের পাঠকদের ইন্টারনেটমুখী প্রবণতাকে। পাঠকদের বইমুখী করতে সারা দেশে ছড়িয়ে থাকা ছোট-বড় পাঠাগারগুলোকে যে সরকারি প্রতিষ্ঠানটি পৃষ্ঠপোষকতা করে, সেটি হলো ‘জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র’। অথচ অর্ধশতাব্দীকাল আগে যাত্রা শুরু করা এই প্রতিষ্ঠান পাঠকসংকটে এখনো ম্রিয়মাণ।
রাজধানীর সবচেয়ে ব্যস্ততম ও জনবহুল এলাকা গুলিস্তানের গোলাপ শাহ মাজার মোড় এলাকায় অবস্থান এই গ্রন্থকেন্দ্রের। পাঠকদের অভিযোগ, সুন্দর পরিবেশ ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধার অভাব এবং চাহিদা অনুযায়ী বইয়ের সংকট রয়েছে এখানে। এ ছাড়া পাঠাগারটিতে বিভিন্ন ধরনের প্রায় ১৫ হাজার বই থাকার পরও প্রতি মাসে এক হাজার পাঠকও টানতে পারছে না প্রতিষ্ঠানটি। জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক আফসানা বেগম জানিয়েছেন, এই প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘদিনের সংকট অল্প সময়ে দূর করা সম্ভব নয়। এ পর্যায়ে গ্রন্থকেন্দ্রের ভেতরকার পরিবেশ উন্নয়ন ও অনিয়ম দূর করার উদ্যোগ তিনি নিয়েছেন।
জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস উপলক্ষে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের অবস্থা কী তা জানার চেষ্টা করেছে খবরের কাগজ। গত সোমবার সকাল ১০টার দিকে গুলিস্তানে গিয়ে দেখা যায়, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পাঁচতলা ভবনটিকে ঘিরে পুরোনো জঞ্জালের চিত্র। আগের মতোই ভবনটির চারপাশে গিজগিজ করছে হকারদের অস্থায়ী ও ভাসমান অসংখ্য দোকান। দূর থেকে বোঝার উপায় নেই মূল ফটক বা প্রবেশ গেট কোনদিকে। এখনো স্থানীয়দের অনেকে জানেনই না সেখানে পাঠাগার রয়েছে। হকারদের দোকানের ভিড় ঠেলে ভবনের ভেতর গিয়ে দেখা যায় সব ফ্লোরেই চলছে সংস্কার ও উন্নয়নকাজ। এমন পরিস্থিতিতে পাঠকের উপস্থিতি বুঝতে পাঁচতলার মহানগর পাঠাগারে গিয়ে দেখা যায় প্রায় পাঠকশূন্য অবস্থা। সংস্কার চলায় সেখানকার বেশির ভাগ বুকশেলফ ও বই এলোমেলো, ধুলোবালি মাখা। খবরের কাগজ পড়ার একটি টেবিলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা দৈনিক পত্রিকা পড়ছেন মাত্র একজন পাঠক। অদূরে আর দুটি টেবিলে রয়েছেন দুজন পাঠক।

পাঠাগারের নিবন্ধন শাখার তথ্য অনুযায়ী, সেখানে প্রতিদিন ১৫টির মতো জাতীয় দৈনিক পত্রিকা রাখা হয়। গত বছরের অক্টোবর থেকে জানুয়ারি মাস পর্যন্ত কোনো মাসেই পাঠক হাজারের ঘর তো দূরের কথা ৭০০-তে পৌঁছাতে পারেনি। তার মধ্যে অক্টোবরে ছিল ৬৩১ জন, নভেম্বরে ৫৮৯ ও ডিসেম্বরে ৬৩৫ জন। আর চলতি বছরের জানুয়ারিতে সংস্কারকাজের জন্য এক সপ্তাহ পাঠকসেবা বন্ধ রাখা হয়। বাকি দিনগুলোতে পাঠক উপস্থিতির সংখ্যা ছিল ৪৫৫।
কী বলছেন পাঠকরা?
কথা হয় পশ্চিম ধোলাইপাড় এলাকার বাসিন্দা ব্যবসায়ী মো. শহিদুল্লাহ মিয়ার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘গুলিস্তান এলাকায় আমি ১৬ বছর ধরে জুতার ব্যবসা করি। আগে আসলে জানতামই না যে এখানে পাঠাগার আছে। জানার পর চার বছর ধরে সকালে দোকান খোলার আগে এই পাঠাগারে এসে পেপার পড়ি। বই পড়ার ইচ্ছা থাকলেও সময় পাই না।’
ঢাকা রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আরিফুল ইসলাম। থাকে বনশ্রী এলাকায়। অবসর সময়ে সে গুলিস্তানের জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রে যায় বই পড়তে। সে কোনো ডিভাইস ব্যবহার করে না। তাই সময় পেলেই লাইব্রেরিতে গিয়ে একাডেমিক বইয়ের পাশাপাশি অন্যান্য বইও পড়ে।
পুরান ঢাকার শিক্ষার্থী বদরউদ্দিন বলেন, ‘আমার ধারণা ঢাকার সবচেয়ে ব্যস্ততম এলাকা গুলিস্তানে যে এমন একটা পাঠাগার আছে অনেকেই জানেনই না। ভবনটির আশপাশের ফুটপাতে ব্যবসায়ীদের হাঁকডাক লেগেই থাকে। এ ছাড়া থাকে যানবাহন চলার শব্দ। তারপরও আমি প্রায় চার বছর ধরে আসছি। বাসায় ভালো পরিবেশ থাকার পরও সময় পেলেই আসি। কারণ আমার ভালো লাগে। বর্তমানে এই লাইব্রেরিতে উন্নয়নকাজ চলায় পরিবেশগত কিছুটা সমস্যা চলছে, তারপরও অভ্যাসের কারণে আসি। আগে এখানে প্রতিদিন ৩০ থেকে ৪০ জনকে দেখতে পেতাম। তবে এখন ধুলাবালির কারণে অনেকেই কম আসছেন।’
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আলিফ হোসেন জানান, তিনি যাত্রাবাড়ী থেকে প্রায় নিয়মিত লাইব্রেরিতে আসেন। বাইরে থেকে আসা শব্দদূষণ ছাড়া ভেতরের পড়ার পরিবেশ তার ভালো লাগে। আর এখানে যারা আসেন তারা এসব মেনেই পড়তে আসেন। চলমান সংস্কারকাজ শেষ হলে পরিবেশের কিছুটা উন্নত হবে বলে আশা তার।
জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের গ্রন্থাগারিক মো. ফরিদউদ্দিন সরকার বলেন, ‘এখনকার তরুণ প্রজন্ম ইন্টারনেট, ফেসবুক নিয়ে বেশি ব্যস্ত। কেউ লাইব্রেরিমুখী হতে চায় না। তাই আগের মতো পাঠকও নেই। একুশে বইমেলা নিয়ে উৎসাহ দেখা গেলেও বাস্তবে বইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক কমেছে। চেষ্টা করেও বইয়ের দিকে ফেরানো যাচ্ছে না। তবে প্রকৃত জ্ঞান অন্বেষণে বইয়ের দিকেই আসতে হবে। মানুষকে বইমুখী করতে গ্রন্থাগারগুলোতে প্রযুক্তির সংযোগ ঘটানো, ডিজিটালাইজড করা, পরিবেশ উন্নত করা ও সময়োপযোগী নতুন বই বাড়ানো জরুরি।’

গত বছরের সেপ্টেম্বরে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক হিসেবে কথাসাহিত্যিক ও অনুবাদক আফসানা বেগমকে নিয়োগ দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। গ্রন্থকেন্দ্রের সার্বিক পরিস্থিতি ও পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাই তার কাছে। তিনি বলেন, ‘ব্যস্ততম এলাকায় অবস্থানকারী এই ভবনে পরিবেশসংকটসহ পাঠকের চাহিদা অনুযায়ী বই না থাকাসহ নানা সংকট রয়েছে। এসব অনেক পুরোনো। শুধু পাঠকরা নন, এখানে যারা কাজ করেন তারা সবাই এর ভুক্তভোগী। আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর জেনেছি, এখানকার লাইব্রেরি শাহবাগের গণগ্রন্থাগারের পাশে চলে যাচ্ছে। সেই প্রক্রিয়া চলমান। যেটা জানতে পেরেছি ২০২৬ সালের মাঝামাঝিতে হয়তো সেটা সম্ভব হবে। এ পর্যায়ে এই ভবনের ভেতরকার পরিবেশ (নষ্ট ছাদ ও দেওয়াল, দরজা-জানালা, টয়লেট, অডিটোরিয়াম) উন্নয়নে উদ্যোগ নিয়েছি। অতি প্রয়োজনীয় এসব কাজ করা হচ্ছে খুব অল্প বাজেটে (প্রায় ৯০ লাখ টাকা) আমাদের নিজস্ব অর্থায়নেই। আগামী মার্চের মধ্যেই এই উন্নয়ন কাজ শেষ হবে আশা করছি।’
তিনি বলেন, ‘বাইরের পরিবেশ সংকটের সমাধান আমাদের হাতে নেই। এ ছাড়া এই গ্রন্থকেন্দ্রের জনবল কাঠামোর উন্নয়ন এবং বেসরকারি গ্রন্থাগারে অনুদান বরাদ্দে নানা ধরনের অনিয়ম বন্ধে এ-সংক্রান্ত নীতিমালাসহ আইনি কিছু সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জনবলেরও সংকট রয়েছে। অবকাঠামোগত উন্নয়নের পর চেষ্টা থাকবে ধীরে ধীরে বাকি কাজগুলো করার।’
জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী ইউনেসকোর ঘোষণা ও জাতীয় শিক্ষা কমিশনের সুপারিশে ১৯৬২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ন্যাশনাল বুক সেন্টার ফর পাকিস্তান। ঢাকায় খোলা হয় এর একটি শাখা কার্যালয়। স্বাধীনতার পর এর নামকরণ হয় ‘জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র বাংলাদেশ’। ১৯৯৫ সালে পাস হয় এ-বিষয়ক আইন। আর প্রবিধানমালা হয় আরও ১০ বছর পর ২০০৫ সালে। গুলিস্তানে নিজস্ব ভবনে এর কার্যক্রম চলছে ১৯৭৮ সাল থেকে। একসময় জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র নিজেই বিভিন্ন ধরনের বই প্রকাশ করত এবং কখনো কখনো বইয়ের পরিবেশকও হতো। ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত তারা নিজেদের বাইরের প্রকাশনার বইও বিক্রি করত। শিল্পসম্মত ও উন্নতমানের বই মুদ্রণকে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে শ্রেষ্ঠ মুদ্রাকর ও প্রচ্ছদ শিল্পীকে পুরস্কৃত করা হতো ২০০৫ সাল পর্যন্ত। তারপর এগুলো একেবারে বন্ধ হয়ে যায়। মাসিক ‘বই’ নামে একটি পত্রিকা নিয়মিত প্রকাশ হয় ২০১৬ সাল পর্যন্ত। তবে ২০১৭ সালের ১৭ অক্টোবর কেন্দ্রের ৮০তম সভায় ‘বই’ পত্রিকাকে মাসিক থেকে ত্রৈমাসিক করা হয়। এরপর থেকে বই পত্রিকাটি ত্রৈমাসিক হিসেবে চালু ছিলো। তবে গত বছরের (২০২৪ সাল) জুলাইয়ের পর ‘বই’ পত্রিকাটি সংস্কার পরিকল্পনায় যুক্ত হওয়ায় প্রকাশ আপাতত বন্ধ রেখেছে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র।