শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর রাজনীতির বাঁক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে দেশের প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র সচিবালয়েও পরিবর্তন ঘটতে শুরু করে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তৈরি হয় অস্থিরতাও। প্রশাসনের প্রায় সর্বস্তরে ভয় ও আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হয়। একে একে বদলি ও চাকরিচ্যুত হতে থাকেন আওয়ামী লীগপন্থি বলে চিহ্নিত কর্মকর্তারা। অন্যদিকে গত প্রায় ১৬ বছরে বঞ্চিত, অসময়ে চাকরিচ্যুত এবং ওএসডি থাকা কর্মকর্তারা আবার নানা পদে নিয়োগ পেয়ে ফিরে আসতে শুরু করেন।
এভাবেই গত এক বছরে (৮ আগস্ট থেকে চলতি বছরের গত ৪ আগস্ট পর্যন্ত) প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে মোট ৭৮৫ জন কর্মকর্তাকে পদোন্নতি ও পদায়ন করা হয়েছে। পাশাপাশি গত সরকারের আমলে পদোন্নতিবঞ্চিত মোট ৭৬৪ জন কর্মকর্তাকে ভূতাপেক্ষভাবে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। বিগত সরকারের আমলে দলীয় বিবেচনায় পদোন্নতি পাওয়া ও পদায়ন হওয়া মোট ২৯ জন কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসর দিয়েছে সরকার। এ ছাড়া মোট ১৬৪ জন কর্মকর্তাকে কর্মকাল শেষে স্বাভাবিক অবসরে পাঠানো হয়েছে।
এদিকে ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশে একধরনের রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়। ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার শপথ গ্রহণ করে। তবে দলীয় সরকারের মতো কঠোর নিয়ন্ত্রণ না থাকায় এই সরকারের শুরুর দিকে নানা দাবি নিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও পেশাজীবী সংগঠন আন্দোলনে নামে। ওই আন্দোলনের প্রভাব পড়ে সচিবালয়েও। এমনকি সচিবালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী সংগঠনগুলোও আন্দোলনে নেমে পড়ে। অটোপাসের দাবিতে শিক্ষার্থীরা এবং চাকরি নিয়মিতকরণের দাবিতে আনসার বাহিনীর সদস্যরা সচিবালয়ে পর্যন্ত ঢুকে পড়েন। এমন পরিস্থিতিতে সচিবালয়ে ভয় ও আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হয়। প্রশাসনের দৈনন্দিন কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটে।
এ ছাড়া অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক মাসের মধ্যে জনপ্রশাসনে প্রশাসন ক্যাডার ও অন্যান্য ২৫ ক্যাডারের কর্মকর্তাদের মাঝে বৈষম্য সৃষ্টির অভিযোগে অস্থিরতা তৈরি হয়, যা এখনো অব্যাহত আছে। অন্য ২৫ ক্যাডারের কর্মকর্তাদের অভিযোগ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখালেখি করার একই অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও প্রশাসন ক্যাডার কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে না জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। ২৫ ক্যাডার কর্মকর্তারা বলছেন, একটি নির্দিষ্ট ক্যাডারের গোষ্ঠী-স্বার্থে উদ্দেশ্যমূলকভাবে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পরিসংখ্যান, ডাক, পরিবার-পরিকল্পনা, কাস্টমস ও ট্যাক্স ক্যাডারের ক্ষেত্রে বিভিন্ন জটিলতা সৃষ্টি করা হয়েছে। তা ছাড়া পদোন্নতিতে ও পদায়নে প্রশাসন ক্যাডার কর্মকর্তাদের বিশেষ সুবিধা দিলেও অন্য ২৫ ক্যাডারের কর্মকর্তাদের সঙ্গে করছে বৈষম্যমূলক আচরণ। প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের প্রতি পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ করে আন্দোলন করছে অন্যান্য ২৫ ক্যাডার কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত ‘আন্তক্যাডার বৈষম্য নিরসন পরিষদ’।
অপরদিকে কালাকানুন ও নিবর্তনমূলক আখ্যা দিয়ে ‘সরকারি চাকরি (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’ বাতিলের দাবিতে গত ২৪ মে থেকে আন্দোলন শুরু করেন সচিবালয়ের কর্মচারীরা। কর্মচারীদের আন্দোলনের মধ্যেই ২৫ মে রাতে এই অধ্যাদেশ জারির ফলে পরবর্তী সময়ে উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যদের কাছে স্মারকলিপি জমা দেওয়াসহ লাগাতার কর্মসূচি পালন করেন তারা। এতেও প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু সচিবালয়ের স্বাভাবিক কাজকর্মে প্রভাব পড়ে।
তবে গত এক বছরে দেশের আন্যান্য ক্ষেত্রের মতো প্রশাসনেও আস্তে আস্তে স্থিতিশীলতা ফিরে আসে। বিশেষ করে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য তৈরি হলে তার ইতিবাচক প্রভাব পড়ে সচিবালয়ে। সভা-সমাবেশসহ বিভিন্ন ইস্যুতে সরকার আস্তে আস্তে কিছুটা কঠোর হতে শুরু করে। প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ে অনেকের নামে হত্যা মামলা ও দুর্নীতির অভিযোগে মামলা করা হয়। গ্রেপ্তার করে অনেককে কারাগারে পাঠানো হয়। তবে সরকারের প্রথম ছয় মাসের তুলনায় প্রশাসন এখন অনেকটাই স্থিতিশীল হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। অনেকের মতে, জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হলে পরিস্থিতির আরও উন্নতি হবে।
প্রশাসন কোন পথে, জানতে চাইলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রশাসনে গতি ফিরিয়ে আনতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে সরকার। এটা কন্টিনিউয়াস প্রসেস। তবে সবকিছু যে স্মুদলি চলছে, তা এখনি বলা যাবে না। কারণ আগের সরকার বিভিন্ন স্তরে তাদের কর্মকর্তাদের পদায়ন করে গেছে। এখন সব যদি বাদ দেওয়া হয় বা বদলি করে দেওয়া হয়, তবে তো প্রশাসন চলবে না। কারণ এই সরকার তো এখনো কোনো নিয়োগ দিতে পারেনি। তবে সরকারের এক বছরের শেষ সময়ে প্রশাসনে যে স্থবিরতা ছিল তা অনেকটাই কেটে গেছে। ফলে কাজের গতি বেড়েছে।
তিনি আরও বলেন, আগে যেসব অনিয়ম বা অন্যায় হয়েছে তা যেন ভবিষ্যতে আর না হয়, সে বিষয়ে কাজ করছে বর্তমান প্রশাসন। আগের বঞ্চিত বা বৈষম্যের শিকার যেসব কর্মকর্তা বা এখন যারাই আছেন, তারা যেন চাকরিক্ষেত্রে তাদের ন্যায্য অধিকার পায় সে বিষয়ে প্রশাসন যথাযথ ব্যবস্থা নিচ্ছে। এতে চাইলেই একজন কর্মকর্তাকে বঞ্চিত বা তার বিরুদ্ধে অন্যায় কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন না সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতনরা।