স্বাধীনতার পরপরই বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে জনস্বাস্থ্যের নীতি অনুযায়ী ঢেলে সাজানোর জন্য উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। চিকিৎসাভিভিত্তিক স্বাস্থ্যব্যস্থার সমর্থক নীতিনির্ধারকদের হাতে পড়ে তা কতগুলো হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার দিকেই সীমিত হয়ে পড়ে। দু-একটি জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের কাজ শুরু হলেও তা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে আজ অবধি। ব্যতিক্রম ইপিআই। ১৯৭৯ সালের ৭ এপ্রিল থেকে এ কর্মসূচি সুনামের সঙ্গেই কাজ করে যাচ্ছে। আর অতি সম্প্রতি কোভিড-১৯ মহামারি মোকাবিলার মধ্যদিয়ে রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) সবার নজরে পড়ে। সরকার একে গুরুত্ব দেওয়া শুরু করে। যদিও এ প্রতিষ্ঠানটি ম্যালেরিয়া ইনস্টিটিউট থেকে আইইডিসসিআর-এ রূপান্তরিত হয় ১৯৭৬ সালে। এতদিন এ প্রতিষ্ঠানটি ছিল অবহেলার চাদরে ঢাকা।
চিকিৎসাকেন্দ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে উঠলেও তা হয়েছে অতি মাত্রায় কেন্দ্রীভূত। প্রাথমিক, মাধ্যমিক, তৃতীয় পর্যায়ের, চতুর্থ পর্যায়ের চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানগুলো পিরামিডের মতো স্তরভিত্তিক না হয়ে তৃতীয় ও চতুর্থ পর্যায়ের হাসপাতালে সব স্তরের চিকিৎসাব্যবস্থা একসঙ্গে জড়াজড়ি করে রয়েছে। মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোয় প্রচণ্ড ভিড় লেগে থাকে। অন্যদিকে প্রাথমিক (কমিউনিটি ক্লিনিক, ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র) ও মাধ্যমিক চিকিৎসাকেন্দ্র (উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, জেলা হাসপাতাল) প্রায়শই খালি পড়ে থাকে। অথচ চিকিৎসাসেবার বিকেন্দ্রীকরণ ও জনস্বাস্থ্যভিত্তিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে না উঠলে আমরা স্বাস্থ্যবান জাতি গঠনে এগোতে পারব না।
বিভিন্ন কমিশনের সুপারিশ ও উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতের সংস্কারের উদ্যোগ শুরু হয় ১৯৯৭ থেকে। সেগুলোও মূলত হাসপাতাল ব্যবস্থাকেন্দ্রিক ছিল। পাশাপাশি জনস্বাস্থ্যকেন্দ্রিক কিছু নতুন ব্যবস্থা চালু হয়। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিল কমিউনিটি ক্লিনিক প্রবর্তন। এ নামের মধ্যদিয়ে চিকিৎসা ও ওষুধকেই এর মূল কাজ বলে তুলে ধরা হয়।
প্রথমেই দরকার স্বাস্থ্যকে শুধু চিকিৎসানীতি হিসেবে বিবেচনা করার দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন। এটা যেমন নীতির্ধিারকদের বেলায় দরকার, তেমনি জনসাধারণের দিক থেকেও দরকার। জনস্বাস্থ্যের নীতি অনুযায়ী স্বাস্থ্যব্যবস্থার কাজ হচ্ছে মানুষের সুস্থ থাকাটা নিশ্চিত করা। চিকিৎসা হচ্ছে এর একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এর পাশাপাশি রয়েছে রোগ/অসুস্থতা প্রতিরোধ, স্বাস্থ্য ভালো রাখা, সুস্থ হয়ে ওঠার পরে স্বাস্থ্য পুনর্বাসন ও রোগ দ্রুত না সারলেও কষ্ট কমানোর উপশম। এসব উপাদান নিশ্চিত করা স্বাস্থ্যব্যবস্থার লক্ষ্য হওয়া উচিত।…
পরবর্তী সময়ে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান এবং ব্যবস্থাপনায় সমন্বয় আনার জন্য সেক্টর ওয়াইড অ্যাপ্রোচ চালু হয়, যা ২০০০ সালের দিকে কার্যকর করা হয়। ২০১১ সালে জাতীয় সংসদে গৃহীত স্বাস্থ্যনীতিতেও কতকগুলো মৌলিক প্রস্তাব করা হয়েছিল। জনস্বাস্থ্যভিত্তিক স্বাস্থ্য কর্মসূচির বড় উদাহরণ হচ্ছে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি বা ইপিআই।
প্রথমেই দরকার স্বাস্থ্যকে শুধু চিকিৎসানীতি হিসেবে বিবেচনা করার দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন। এটা যেমন নীতির্ধিারকদের বেলায় দরকার, তেমনি জনসাধারণের দিক থেকেও দরকার। জনস্বাস্থ্যের নীতি অনুযায়ী স্বাস্থ্যব্যবস্থার কাজ হচ্ছে মানুষের সুস্থ থাকাটা নিশ্চিত করা। চিকিৎসা হচ্ছে এর একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এর পাশাপাশি রয়েছে রোগ/অসুস্থতা প্রতিরোধ, স্বাস্থ্য ভালো রাখা, সুস্থ হয়ে ওঠার পরে স্বাস্থ্য পুনর্বাসন ও রোগ দ্রুত না সারলেও কষ্ট কমানোর উপশম। এসব উপাদান নিশ্চিত করা স্বাস্থ্যব্যবস্থার লক্ষ্য হওয়া উচিত।
স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশন কতগুলো মৌলিক সংস্কারের প্রস্তাব করেছে। সবকিছু এই মুহূর্তে বাস্তবায়ন সম্ভব নাও হতে পারে। সংস্কার বাস্তবায়নের জন্য বিদ্যমান কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি কতগুলো নতুন কর্তৃপক্ষ তৈরির প্রস্তাব করা হয়েছে। সেগুলো তৈরির ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। পুরাতন কর্তৃপক্ষ দিয়ে যদি স্বাস্থ্যের গোটা সংস্কার বাস্তবায়ন করা যেত, তাহলে তো আর নতুন করে স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশনের দরকার হতো না। এর আগেও একই অবস্থা হয়েছে। ২০১১ সালে সর্বশেষ জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি জাতীয় সংসদে অনুমোদিত হয়। তখনো কতগুলো ভালো লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় এবং তা দেখভাল করার জন্য নতুন একটি পরামর্শমূলক কাঠামো গঠনের কথা বলা হয়। ১৪ বছর পার হলেও সেটা এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। একই ধরনের কয়েকটি কাঠামো এবারও প্রস্তাবিত হয়েছে। কাজ এগোয়নি।
সংস্কারের নতুন কাঠামো
বাংলাদেশ স্বাস্থ্য কমিশন
সংস্কারকে এগিয়ে নিতে হলে একটি স্বাধীন ও স্থায়ী বাংলাদেশ স্বাস্থ্য কমিশন গঠন করতে হবে। এ কমিশন সরকার ও জাতীয় সংসদকে কৌশলগত পরামর্শ প্রদান করবে। এ ছাড়া এটি জাতীয় স্বাস্থ্যনীতির মানদণ্ড ও নির্দেশিকা প্রণয়ন করবে। কমিশন স্বাস্থ্যব্যবস্থার কার্যকারিতা, গুণগত মান ও ব্যয়-সাশ্রয়ী পর্যালোচনা করে উন্নয়নমূলক সুপারিশ দেবে। জবাবদিহি হিসেবে প্রধানমন্ত্রী সরকারের পক্ষ থেকে জাতীয় সংসদে বার্ষিক প্রতিবেদন পেশ করবেন। স্বাস্থ্য কমিশনের থাকবে ১৭টি বিভাগ: (১) জনস্বাস্থ্য, (২) চিকিৎসা শিক্ষা, (৩) ক্লিনিক্যাল মান তদারকি প্রতিষ্ঠান, (৪) ক্লিনিক্যাল নির্দেশিকা উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান, (৫) স্বাস্থ্যসেবা মানোন্নয়ন প্রতিষ্ঠান, (৬) নিয়ন্ত্রক সংস্থা পর্যবেক্ষণ, (৭) ল্যাবরেটরি ও ডায়াগনস্টিক, (৮) ওষুধ ও খাদ্য নিরাপদতা, (৯) বেসরকারি হাসপাতাল তদারকি, (১০) বিশেষায়িত সেবার উন্নয়ন কেন্দ্র, (১১) সহযোগী স্বাস্থ্য পেশাজীবীদের উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান, (১২) ঐতিহ্যগত চিকিৎসা (হোমিও, ইউনানি, আয়ুর্বেদি প্রভৃতি), (১৩) আন্তমন্ত্রণালয় সমন্বয়, (১৪) স্বাস্থ্যপ্রযুক্তি মূল্যায়ন, (১৫) দুর্নীতিবিরোধী তদারকি, (১৬) সেবাগ্রহীতার অভিযোগ নিষ্পত্তি ও (১৭) স্বাস্থ্য আইন সংস্কার।
উল্লেখ্য, ২০১১ সাালে গৃহীত জাতীয় স্বাস্থ্যনীতিতেও অনুরূপ- জাতীয় স্বাস্থ্য কাউন্সিল গঠনকে এক নম্বর কর্মকৌশল হিসেবে নির্ধারিত হয়েছিল। সেটি আর আলোর মুখ দেখেনি। বাংলাদেশ স্বাস্থ্য কমিশন গঠন রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশের মাধ্যমে স্বল্পমেয়াদেই বাস্তবায়ন সম্ভব।
বাংলাদেশ স্বাস্থ্য সার্ভিস
বাংলাদেশ স্বাস্থ্য সার্ভিস হবে প্রশাসনিকভাবে স্বায়ত্তশাসিত সিভিল সার্ভিস। এটি বর্তমান বিসিএস (স্বাস্থ্য)-সহ সংশ্লিষ্ট সব ইউনিট (যেমন: স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, মেডিকেল শিক্ষা অধিদপ্তর, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর, নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিট, জলবায়ু পরিবর্তন ইউনিট, তামাক নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি প্রভৃতি) একত্র করে গঠিত হবে। পৃথক সচিবালয় তথা নতুন প্রশাসনিক কাঠামো স্বাস্থ্য সার্ভিসকে পরিচালনা করবে। এর অধীনে ১১টি আঞ্চলিক স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ থাকবে- আটটি বিভাগীয় ও তিনটি মেট্রোপলিটান। একজন চিকিৎসক মুখ্য সচিব বাংলাদেশ স্বাস্থ্য সার্ভিসের প্রধান হবেন, তিনজন হবেন উপপ্রধান। প্রতিটি খাতের (জনস্বাস্থ্য, ক্লিনিক্যাল সেবা, শিক্ষা) শীর্ষপদে একজন সচিব পদমর্যাদার মহাপরিচালক থাকবেন। এ সার্ভিসের জন্য আলাদা চাকরি বিধি ও বেতন কাঠামো প্রণয়ন করতে হবে। যোগ্য ও ইচ্ছুক বিসিএস ক্যাডারদের স্বায়ত্তশাসিত স্বাস্থ্য সিভিল সার্ভিসে যোগদানের বিকল্প ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে। রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশের মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকার বাংলাদেশ স্বাস্থ্য সার্ভিসকে একটি পেশাভিত্তিক, দক্ষ, জবাবদিহিমূলক ও স্বায়ত্তশাসিত সিভিল সার্ভিস প্রতিষ্ঠার আইনি ভিত্তি দিতে পারে। এটি স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপ।
নতুন জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তরে যা অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে: (১) প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যা, (২) রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, (৩) জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, (৪) জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠান, (৫) মাতৃ-নবজাতক-শিশু-কিশোর স্বাস্থ্য কর্মসূচি, (৬) সংক্রামক রোগনিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি, (৭) অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি, (৮) জাতীয় পুষ্টিসেবা কর্মসূচি, (৯) উপজেলা স্বাস্থ্যসেবা, (১০) কমিউনিটি ভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা, (১১) কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্যসহায়তা ট্রাস্ট, (১২) যক্ষ্মা-কুষ্ঠ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি, (১৩) জাতীয় এইডস এসটিডি নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি, (১৪) স্বাস্থ্য শিক্ষা ব্যুরো ও স্বাস্থ্যশিক্ষা কর্মসূচি, (১৫) আইইসি (পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর), (১৬) মাতৃ-শিশু স্বাস্থ্য (পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর), (১৭) মাতৃ শিশু কৈশোর ও প্রজনন স্বাস্থ্য কর্মসূচি (এমসিআরএইচ, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর), (১৮) পরিবার পরিকল্পনা- মাঠপর্যাযের সেবা প্রদান কর্মসূচি (এফপি-এফএসডি), (১৯) দুর্যোগব্যবস্থাপনা প্রভৃতি।
স্বতন্ত্র পাবলিক সার্ভিস কমিশন (স্বাস্থ্য)
স্বাস্থ্য খাতের নিয়োগ ও পদোন্নতি প্রক্রিয়া নিয়মিতকরণ ও স্বচ্ছতা আনয়নের লক্ষ্যে একটি স্বতন্ত্র পাবলিক সার্ভিস কমিশন (স্বাস্থ্য) গঠন করতে হবে। এটি স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি কর্মসূচি।
গুরুত্বপূর্ণ কিছু পদের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা বজায় রেখে যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগের সুপারিশ করার জন্য উচ্চপর্যায়ের সার্চ কমিটি গঠন করতে হবে। এ সার্চ কমিটি ওই পদসমূহে নিয়োগপ্রাপ্তদের যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা সম্পর্কে জাতীয় সংসদকে অবহিত করবে। উল্লিখিত পদগুলোর উদাহরণ: বাংলাদেশ স্বাস্থ্য সার্ভিসের (বিএইচএস) প্রধান (মুখ্য সচিব), বিএইচএসের উপপ্রধান (সিনিয়র সচিব), মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, উপউপাচার্য, কোষাধ্যক্ষ, মহাপরিচালক (সচিব), মেডিকেল কলেজেরে অধ্যক্ষ, বিএমডিসি, বিএমআরসি চেয়ারপরসন প্রভৃতি।
আইনের সংস্কার
পুরাতন আইনগুলোকে পর্যালোচনা করে হালনাগাদ করা দরকার। যেসব পুরাতন আইন পর্যালোচনা দরকার: (১) বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল আইন, (২) মেডিকেল শিক্ষা অ্যাক্রেডিটেশন আইন, (৩) নার্সিং অ্যান্ড মিডওয়াইফারি কাউন্সিল আইন, (৪) বাংলাদেশ ফার্মেসি কাউন্সিল আইন, (৫) তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন, (৬) পৌর ও সিটি করপোরেশন আইন প্রভৃতি।
বেশ কিছু ক্ষেত্রে নতুন আইন প্রণয়ন করা জরুরি। যেসব নতুন আইন প্রয়োজন: (১) বাংলাদেশ স্বাস্থ্য কমিশন আইন, (২) বাংলাদেশ স্বাস্থ্য সার্ভিস আইন, (২) প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা আইন, (৩) ওষুধের মূল্য নির্ধারণ ও প্রবেশাধিকার আইন, (৪) স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী ও রোগী সুরক্ষা আইন, (৫) এলাইড স্বাস্থ্য পেশাজীবী কাউন্সিল আইন, (৬) হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক অ্যাক্রেডিটেশন আইন, (৭) স্বাস্থ্য সুরক্ষা আইন, (৮) ক্যানসার নিয়ন্ত্রণ আইন, (৯) নারী স্বাস্থ্য আইন, (১০) শিশু বিকাশকেন্দ্র আইন, (১১) বাংলাদেশ খাদ্য-ওষুধ ও আইভিডি-মেডিকেল ডিভাইস আইন, (১২) বাংলাদেশ মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিল আইন প্রভৃতি।
প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা
প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে সাংবিধানিকভাবে একটি মৌলিক অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা ও আইনের দ্বারা বাস্তবায়নযোগ্য করে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে আগামী জাতীয় সংসদে। একটি পৃথক প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা আইন রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ আকারে জারি করা যেতে পারে; যা দ্বারা মানুষের বিনামূল্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা এখন থেকেই নিশ্চিত হবে।
প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সর্বজনীন প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে সরকারকে এ সেবা বিনামূল্যে প্রদান করতে হবে, যেন কোনো মানুষ আর্থিক সক্ষমতায় ঘাটতির কারণে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত না হয়। গ্রামে ইউনিয়ন উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণকেন্দ্রসমূহকে একত্রিত করে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রে রূপান্তর করতে হবে। শহরাঞ্চলে ওয়ার্ডভিত্তিক প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এজন্য সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সরকারি ও বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করা যেতে পারে। প্রাথমিকসেবা চিকিৎসকদের নেটওয়ার্ক গঠন করে শূন্যপদে প্রাথমিক স্বাস্থ্য চিকিৎসক/ জেনারেল প্র্যাকটিশনার/ পারিবারিক চিকিৎসকদের নিয়োগ করতে হবে। তাহলে ইউনিয়ন থেকে উপজেলা পর্যন্ত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবার প্রথম স্তর শক্তিশালী হবে। বিদ্যালয়, অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান, জনসাধারণের মাঝে স্বাস্থ্যবিষয়ক তথ্য অবহিতকরণ, স্বাস্থ্য কার্যক্রমে জনগণকে সম্পৃক্তকরণ ও সৃজনশীল কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। এটি স্বল্পমেয়াদে ও মধ্যমেয়াদে বাস্তবায়নযোগ্য।
স্বাস্থ্যের সঙ্গে জাতীয় উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি সরাসরি সম্পর্কিত। এর জন্য প্রয়োজনীয় তহবিল জোগানো একটি জনকল্যাণধর্মী রাষ্ট্রের জন্য অবশ্য কর্তব্য। বাংলাদেশ আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এর সঙ্গে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষমাত্রা অর্জনেও আমরা অঙ্গীকারাবদ্ধ। জনস্বাস্থ্যের নীতি অনুযায়ী গোটা স্বাস্থ্যব্যবস্থার সংস্কারের চাকা ঘুরতে শুরু না করলে আমাদের পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা, সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা তথা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অধরাই রয়ে যাবে। আর এজন্য সর্বাগ্রে দরকার সংস্কার এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব প্রদানের জন্য কাঠামো গঠন।
লেখক: জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ
[email protected]