মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ হবে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, যে রাষ্ট্রে মানুষের সব মৌলিক অধিকার নিশ্চত হবে। শ্রেণিবৈষম্য দূর হবে। ধনী-দরিদ্রের মধ্যকার ব্যবধান তিরোহিত হবে। বাংলাদেশ হবে একটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র। ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সব মানুষ সমঅধিকার ভোগ করবে। এভাবে বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত হবে নির্যাতন, নিপীড়ন, শোষণ, বঞ্চনাহীন একটি সমাজব্যবস্থা।…
আজ ১৬ ডিসেম্বর। দেশব্যাপী যথাযোগ্য মর্যদার সঙ্গে ৫৪তম বিজয় দিবস উদ্যাপিত হচ্ছে। প্রতি বছরই বিজয় দিবস আসে আনন্দের বার্তা নিয়ে। আমরা ১৯৭১ সালে বহু রক্তের বিনিময়ে অর্জিত বিজয়ের কথা স্মরণ করে আপ্লুত হই। নতুন করে শপথ গ্রহণ করি স্বাধীনতার চেতনা ও লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য। যেকোনো জাতির জীবনে তার স্বাধীনতা এবং বিজয় দিবস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পৃথিবীতে এমন অনেক দেশ আছে যারা স্বাধীনতা অর্জন করেছে কিন্তু বিজয় দিবস পায়নি। কারণ তারা স্বাধীনতা অর্জন করেছে পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে, যুদ্ধ করে নয়। যেমন, ১৯৪৭ সালে উপমহাদেশ বিভক্ত হয়ে পাকিস্তান ও ভারত নামক দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু তাদের কারও বিজয় দিবস নেই। কারণ তারা যুদ্ধের মাধ্যমে জয় লাভ করে স্বাধীনতা অর্জন করেনি। বাংলাদেশ সেদিক থেকে অত্যন্ত ভাগ্যবান যে, আমরা পাকিস্তানি বর্বর হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধে জয়লাভ করে স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছি। যারা ১৯৭১ সালে দেশমাতৃকার স্বাধীনতার জন্য পাকিস্তানি বর্বর বাহিনীর বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ করেছেন অথবা যুদ্ধে সহায়তা করেছেন তারা নিশ্চিতভাবে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান এবং সৌভাগ্যবান। কারণ দেশমাতৃকার স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার সুযোগ সবার হয় না।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। হঠাৎ করেই বাংলাদেশ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে স্বাধীনতা অর্জন করেনি। অতীতে বাংলাদেশ ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে সমৃদ্ধ একটি জনপদ। বিদেশি সাম্রাজ্যবাদী শক্তি বাংলার স্বাধীনতা হরণের জন্য অনেকবারই চেষ্টা করেছে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল এ দেশের সম্পদ লুটে নেওয়া। এরই ধারাবাকিতায় স্থানীয় ষড়যন্ত্রকারীদের সঙ্গে যোগ দিয়ে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৭৫৭ সালে পলাশীতে অনুষ্ঠিত প্রহসনমূলক যুদ্ধের মাধ্যমে এ দেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হওয়ার পথ উন্মুক্ত করে। তার পর ১৭৭৬ সালে বাংলা, বিহার ও ওড়িশার দেওয়ানি লাভ করার মাধ্যমে ইংরেজরা আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের শাসনক্ষমতা কুক্ষিগত করার পথে ধাবিত হয়। এক সময় তারা বাংলা, বিহার, ওড়িশা এবং পরবর্তীতে পুরো উপমহাদেশের ইংরেজরা আধিপত্য বিস্তার করে এবং ১৯০ বছর পর্যন্ত এ দেশ শাসন করে। বাংলাদেশের মানুষ বিনাবাক্যে ইংরেজ শাসন বা আধিপত্যকে মেনে নেয়নি। তারা স্থানীয়ভাবে আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে ইংরেজদের অতিষ্ঠ করে তোলে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এ দেশের মানুষ স্বাধীনতার প্রশ্নে একতাবদ্ধ হয়। তারা যেকোনো মূল্যেই হোক মাতৃভূমির স্বাধীনতা অর্জনে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়। ইংরেজরা বুঝতে পারে এ দেশে আর বেশি দিন তাদের শাসন চলবে না। তাই সমঝোতার মাধ্যমে ১৯৪৭ সালের মধ্য আগস্টে পাকিস্তান ও ভারত নামক দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন করে এ দেশ থেকে বিদায় গ্রহণ করে। কিন্তু এখানেও তাদের সেই চিরাচরিত ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ নীতির প্রতিফলন লক্ষ্য করা যায়। পাকিস্তান এবং ভারত ভাগ করা হয় ধর্মের ভিত্তিতে। সিদ্ধান্ত হয় মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ সন্নিহিত অঞ্চল নিয়ে পাকিস্তান গঠিত হবে এবং হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল নিয়ে হিন্দুদের জন্য একটি পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্র গঠিত হবে। ধর্মীয় সামঞ্জস্যের কারণে বাংলাদেশের মানুষ পাকিস্তানের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে।
বাংলার মানুষ মনে করেছিল পাকিস্তানের সঙ্গে তারা শান্তিতে বসবাস করতে পারবে। কিন্তু স্বাধীনতা অর্জনের অল্প কিছুদিনের মধ্যে প্রতীয়মান হয় যে, তাদের চাওয়া কোনোভাবেই পূরণ হওয়ার নয়। বাংলার মানুষের মাতৃভাষার ওপর আক্রমণ করা হয়। তাদের রাজনৈতিক স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হয়। পাকিস্তানি শাসনের অধীনে বাংলাদেশের মানুষের স্বার্থ সংরক্ষিত হবে না, এটা বাংলাদেশের মানুষ বুঝতে পারে। এ দেশের মানুষ স্বাধিকার আদায়ের প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ হয়। ১৯৭০ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বাংলাদেশের মানুষ আওয়ামী লীগের অনুকূলে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করে। কিন্তু পাকিস্তানি শাসকচক্র বাংলাদেশের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে ষড়যন্ত্র করতে থাকে কীভাবে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকা যায়। ফলে মুক্তিযুদ্ধ অনিবার্য হয়ে ওঠে। পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়ে যখন ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি বর্বর সেনাবাহিনীর সদস্যরা নিরীহ বাঙালিদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ শিক্ষক। আন্দোলনের কারণে ক্লাস বন্ধ থাকায় আমি নিজ শহর ফেনিতে চলে যাই। ২৫ মার্চ ঢাকায় সংঘটিত পাকিস্তানি বাহিনীর হত্যাযজ্ঞের কথা ফেনিতে বসেই শুনতে পাই। ২৮ তারিখ সকালে রেডিওতে মেজর জিয়া বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। প্রথমে নিজ নামে এবং পরে শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষ থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়া হয়। মেজর জিয়াকে আমি চিনতাম না। তার নামও আগে কখনো শুনিনি। কিন্তু সেদিনের মেজর জিয়ার সেই স্বাধীনতার ঘোষণা আমার মনে যে কী আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল তা এখন ব্যাখ্যা করে বোঝানো যাবে না। আমি তাৎক্ষণিকভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেব। এর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ক্লাস শুরুর ঘোষণা দেন এবং সবাইকে নির্দিষ্ট দিনের মধ্যে কর্মস্থলে যোগদানের নির্দেশ দেন। আত্মীয়-স্বজন এবং শুভাকাঙ্ক্ষীদের পরামর্শে আমি ৩১ মে ঢাকায় চলে আসি এবং কাজে যোগদান করি।
ঢাকায় আসার পর জুলাই মাসের শেষের দিকে যমদূত বাহিনী ডাকযোগে আমাকে একটি চিঠি পাঠিয়ে হত্যার হুমকি দেয়। এ অবস্থায় আমি বাড়িতে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। বাড়িতে পৌঁছার পরপরই রাজাকার বাহিনী আমাদের বাড়ি আক্রমণ করে। তারা নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করতে থাকে। আমি বুঝতে পারি ফেনিতে অবস্থান করা আমার জন্য নিরাপদ নয়। তাই শেষ পর্যন্ত সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। আগস্টের প্রথম সপ্তাহে আমি সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে প্রবেশ করি। পরে সেখান থেকে কলকাতা গমন করি এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করতে থাকি।
ভারতে অবস্থানকালে ডিসেম্বরের প্রথম দিকেই বুঝতে পারি আমাদের বিজয় শুধু সময়ের ব্যাপার মাত্র। ১৬ ডিসেম্বর ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী রেডিওতে ভাষণ দেন। তিনি বলেন, ঢাকা এখন মুক্ত এবং স্বাধীন দেশের রাজধানী। রেডিওতে মুক্তিযোদ্ধাদের চূড়ান্ত বিজয় এবং পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের সংবাদ শুনে সেদিন কী যে খুশি হয়েছিলাম তা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। আনন্দে আত্মহারা হয়ে পাশের মিষ্টির দোকানে গিয়ে কয়েক প্যাকেট মিষ্টি কিনে আস্তানায় বিতরণ করতে থাকি। প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে ১৯৭২ সালের ৫ জানুয়ারি কলকাতা থেকে বিমানে আগরতলা পৌঁছি। একই দিন আগরতলা থেকে একটি বাসযোগে বিলোনিয়া সীমান্তে এসে উপস্থিত হই এবং ওইদিন রাতেই ফেনিতে প্রবেশ করি।
১৯৭২ সালের ১৪ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়। ওইদিনই একটি শোকসভার মধ্যদিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রম শুরু হয়। আমরা সবাই শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়ি। যেসব সহকর্মীকে দেশ ত্যাগের আগে জীবিত রেখে গিয়েছিলাম, ফিরে এসে তাদের অনেককেই আর পাইনি। দেশমাতৃকার স্বাধীনতার জন্য তারা জীবন উৎসর্গ করেছেন। আমাদের বহু ছাত্র, বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক কর্মকর্তা ও কর্মচারী এ স্বাধীনতা সংগ্রামে শহিদ হয়েছেন। তাদের আত্মদান বৃথা যেতে পারে না, বৃথা যায়নি।
‘মায়ের এই অশ্রুধারা, বীরের এই রক্তশ্রোত’- বৃথা যাবে না বলে আমরা সেদিন আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলাম। আজ বিজয় দিবসে তাদের স্মরণ করি। তাদের আত্মদান কতটা সফল হয়েছে সেই হিসাব করার সময় এসেছে।
মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ হবে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, যে রাষ্ট্রে মানুষের সব মৌলিক অধিকার নিশ্চত হবে। শ্রেণিবৈষম্য দূর হবে। ধনী-দরিদ্রের মধ্যকার ব্যবধান তিরোহিত হবে। বাংলাদেশ হবে একটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র। ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সব মানুষ সমঅধিকার ভোগ করবে। এভাবে বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত হবে নির্যাতন, নিপীড়ন, শোষণ, বঞ্চনাহীন একটি সমাজব্যবস্থা।
কিন্তু দীর্ঘ ৫৪ বছরেও সে লক্ষ্য অর্জন এবং বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। এজন্য দায়ী লুটেরা শাসক ও শোষকগোষ্ঠী। সীমাহীন নির্যাতন, নিপীড়ন, শোষণ, লুণ্ঠন দেশেকে, দেশের জনগণকে সর্বশান্ত করে দিয়েছে। এ কারণে দেশের জনগণ তরুণ ছাত্রসমাজের নেতৃত্বে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে বিদ্রোহ করেছে। এ গণ-অভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে জনমানুষ আবারও স্বপ্ন দেখছে মুক্তিযুদ্ধ ও বিজয় দিবসের লক্ষ্য ও চেতনা বাস্তবায়িত হবে। কামনা করি, জনগণের এ স্বপ্ন সফল হোক।
লেখক: সাবেক উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বাহরাইনে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত