ঢাকা ১৯ আষাঢ় ১৪৩৩, শুক্রবার, ০৩ জুলাই ২০২৬

সর্বশেষ
শেষ ষোলোতে স্পেনের প্রতিপক্ষ কারা? আর্জেন্টিনাকে কেপ ভার্দে কোচের হুঁশিয়ারি অস্ট্রিয়াকে উড়িয়ে শেষ ষোলোতে স্পেন পর্তুগাল-ক্রোয়েশিয়া ম্যাচ কে জিতবে, সুপারকম্পিউটারের ভবিষ্যদ্বাণী কেন বাতিল হলো কুকুরেয়ার গোল? ওয়ারজাবালের গোলে এগিয়ে বিরতিতে স্পেন স্পেন-অস্ট্রিয়া ম্যাচে কে জিতবে, জানাল সুপারকম্পিউটার অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে স্পেনের একাদশে ২ পরিবর্তন আলিয়ঁস ফ্রঁসেজে জাকিয়া খান চন্দনার পরাবাস্তববাদী চিত্রপ্রদর্শনী নজরুল বর্ষের উদ্বোধনী আয়োজনে দর্শক সংকট বঙ্গোপসাগরে লঘুচাপ, চার সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর সতর্ক সংকেত কালকিনিতে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করায় ৫ ড্রেজার জব্দ ভেনিজুয়েলায় ভূমিকম্পের ৮ দিন পর ধ্বংসস্তূপ থেকে একজনকে জীবিত উদ্ধার সহকারী সচিব হলেন ৩৪ কর্মকর্তা জাবিতে কালেমা খচিত পতাকা টানানোর ঘটনায় তদন্ত কমিটি, চার শিক্ষার্থীকে শোকজ নৌবহরে যুক্ত হলো জাপানের পাঁচটি পেট্রোল বোট সাদাপাথর পর্যটনকেন্দ্রে গোসলে নেমে নিখোঁজ চিকিৎসক টঙ্গীতে চাঁদা দাবি করায় যুবদল নেতাসহ ১৯ জনের নামে মামলা, গ্রেপ্তার ১১ ঈশ্বরগঞ্জে অজ্ঞাত যুবকের রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার সিরিয়ায় বোমা বিস্ফোরণে নিহত ৫, আহত অন্তত ১৬ জুন মাসে রপ্তানি আয় বেড়েছে প্রায় ২৬ শতাংশ ‘বীর রাষ্ট্রনায়ক জিয়াউর রহমান’ গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন করলেন প্রধানমন্ত্রী অবশেষে ইরানকে ১২ বিলিয়ন ডলার ছাড়তে বাধ্য হলো যুক্তরাষ্ট্র কাতারে আটকে থাকা অর্থে প্রয়োজনীয় পণ্য কিনবে ইরান এইচএসসির আগেই থেমে যাচ্ছে শিক্ষা সোনারগাঁয় ফুটপাত দখল করে পার্কিং করায় ১৪ জনকে কারাদণ্ড মুক্তির আগেই বাজিমাত চট্টগ্রাম-৪ আসনের প্রার্থীর বিষয়ে আদালতের রায় দেখে সিদ্ধান্ত নেবে কমিশন আত্মিক প্রশান্তি লাভের দারুণ উপায় ৫৪ বছরে প্রথমবার জাতীয় স্বার্থে ঐকমত্যে সরকার-বিরোধী দল: চিফ হুইপ

অন্তর্বর্তী সরকারের খামখেয়ালিতে হামের প্রাদুর্ভাব, ৩৫২ শিশুর মৃত্যু

প্রকাশ: ০৯ মে ২০২৬, ১১:৫১ পিএম
আপডেট: ০৯ মে ২০২৬, ১১:৫৭ পিএম
অন্তর্বর্তী সরকারের খামখেয়ালিতে হামের প্রাদুর্ভাব, ৩৫২ শিশুর মৃত্যু
ছবি: সংগৃহীত

রাজধানীর মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল ১০ মাস বয়সী শিশু মাহাজাবি। গত সপ্তাহে তার অবস্থার অবনতি হওয়ায় নেওয়া হয়েছিল আইসিইউতে। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি।

শনিবার (৯ মে) সকাল ১০টার দিকে মাহজাবি ঢলে পড়ে মৃত্যুর কোলে। মা শিউলি আক্তারের গগনবিদারী চিৎকারে ভারী হয়ে ওঠে হাসপাতালের পরিবেশ। 

শিশু মাহজাবিকে নিয়ে শুক্রবার সকাল থেকে শনিবার সকাল পর্যন্ত ৯ শিশুর মৃত্যুর তথ্য দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

এ বছরের ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হামে আক্রান্ত হয়ে, হামের উপসর্গ নিয়ে ৩৫২টি শিশুর মৃত্যু হলো।

হামের এমন প্রাদুর্ভাবে আতঙ্ক ছড়িয়েছে দিকে দিকে। হামের উপসর্গ নিয়ে শিশুর শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় আতঙ্কিত অভিভাবক ছুটে বেড়াচ্ছেন এ হাসপাতাল থেকে ওই হাসপাতালে। আর্থিক সংগতি থাকলেও এনআইসিউয়ের অভাবে আক্রান্ত শিশুরা মারা যাচ্ছে। দেশের টিকাদান কর্মসূচির বর্তমান অবস্থা ও হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলেছেন, হাম অত্যন্ত সংক্রামক। যদি ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনা না যায়, তবে এই ভাইরাসের সংক্রমণ রোধ করা কঠিন।

হামে শিশু মৃত্যুর জন্য স্বাস্থ্য খাতে অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকাকে সরাসরি দায়ী করেছেন ইউনিসেফ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, গ্যাভি, বিশ্বব্যাংকের বিশেষজ্ঞ ও প্রতিনিধিরা। 

শনিবার বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাস্থ্যসেবা বিটের রিপোর্টারদের সংগঠন বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরাম আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব কামরুজ্জামান চৌধুরী বলেছেন, কেন শিশুরা আক্রান্ত হচ্ছে এবং কোথাও কোনো ব্যবস্থাপনায় ত্রুটি ছিল কি না, তা তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে টিকা সম্প্রসারণ কর্মসূচির তথ্য পায়নি দাতা সংস্থা ইউনিসেফ। এ ঘটনা খতিয়ে দেখতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় একটি ‘আফটার অ্যাকশন রিভিউ’ করবে। ইউনিসেফ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই প্রক্রিয়ায় সহায়তা করবে।

হাসপাতালে কাতরাচ্ছে ৩ হাজার ৮৮৫ জন শিশু
সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত দেশে মোট ৪৭ হাজার ৬৫৬ শিশুর মধ্যে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে ল্যাব পরীক্ষায় ৬ হাজার ৯৭৯ জনের শরীরে সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৩৩ হাজার ৬৩১টি শিশু। তাদের মধ্যে ২৯ হাজার ৭৪৬ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেও ৩ হাজার ৮৮৫ জন শিশু বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে, শনিবার পর্যন্ত মারা গেছে ৩৫২ জন।

হামের টিকায় গাফিলতি: তদন্তের ঘোষণা স্বাস্থ্য সচিবের
দেশে হামের সংক্রমণ বৃদ্ধি এবং টিকাদান কার্যক্রমে কোনো ধরনের গাফিলতি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে তদন্তের ঘোষণা দিয়েছেন স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব কামরুজ্জামান চৌধুরী। তিনি জানিয়েছেন, কেন শিশুরা আক্রান্ত হচ্ছে এবং কোথাও কোনো ব্যবস্থাপনায় ত্রুটি ছিল কি না, তা তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। গোলটেবিল বৈঠকে তিনি জানান, ইতোমধ্যে তদন্ত শুরু হয়েছে এবং এর প্রতিবেদন জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে।

বক্তব্যে সচিব জানান, দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই তিনি টিকার সংস্থান নিয়ে কাজ শুরু করেন। তিনি বলেন, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অব্যবহৃত ৬০৪ কোটি টাকা দিয়ে ইউনিসেফের মাধ্যমে জরুরি ভিত্তিতে টিকা কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মার্চের শেষে আমরা বিশেষজ্ঞ কমিটির পরামর্শ নিয়েছি এবং ৫ এপ্রিল থেকে দেশের অতি ঝুঁকিপূর্ণ ১৮টি জেলার ৩১টি উপজেলায় বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু করার কথাও জানান তিনি।

সচিব আরও বলেন, ইতোমধ্যে দেশে পর্যাপ্ত টিকা চলে এসেছে। প্রায় পৌনে দুই কোটি টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কাজ চলছে। তবে বরিশাল ও সিলেট বিভাগে টিকাদানের হার তুলনামূলক কম হওয়ায় সেখানে বিশেষ নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

সিটি করপোরেশন এলাকার প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ইস্যুতে সচিব বলেন, স্থানীয় সরকার বিভাগের অধীনে থাকা কেন্দ্রগুলোকে প্রাথমিক স্বাস্থ্য ইউনিটে রূপান্তরের প্রক্রিয়া চলছে। এতে বড় হাসপাতালগুলোর ওপর প্রায় ৪০ শতাংশ চাপ কমবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে এখনই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের কোনো সিদ্ধান্ত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নেই বলে তিনি পরিষ্কার জানান।

টিকাদান কার্যক্রমে যুক্ত কর্মীদের বেতন-ভাতাসংক্রান্ত জটিলতা দ্রুত নিরসনের আশ্বাস দিয়ে সচিব বলেন, ‘আমরা কর্মীদের ডেকে কথা বলেছি। তাদের বকেয়া পাওনা ও অন্যান্য ভাতা পরিশোধের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া নতুন করে ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের জন্য একটি কমিটি কাজ করছে।’

বৈঠকে সচিব নিজস্ব ল্যাবে আন্তর্জাতিক মানের ভ্যাকসিন উৎপাদনের (লেভেল-৩ সক্ষমতা অর্জন) লক্ষ্যে মুন্সীগঞ্জে একটি বিশেষ প্রকল্প হাতে নেওয়ার কথাও জানান।

আক্রান্তদের ৬৫ শতাংশই কোনো টিকা পায়নি: স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক 

দেশে গত কয়েক বছরে বিশালসংখ্যক শিশু নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির বাইরে থেকে যাওয়ায় বর্তমানে হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস। ইউনিসেফ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিসংখ্যান তুলে ধরে গোলটেবিল আলোচনার বিশেষ অতিথি প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, আক্রান্ত শিশুদের প্রায় ৮৫ শতাংশের বয়স পাঁচ বছরের কম। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, আক্রান্তদের ৬৫ শতাংশই কোনো টিকা পায়নি এবং ২১ শতাংশ পেয়েছে মাত্র এক ডোজ।

অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, ২০২০ সালের পর বড় ধরনের কোনো জাতীয় ক্যাম্পেইন না হওয়ায় টিকার বাইরে থাকা শিশুর সংখ্যা প্রতিবছর বেড়েছে। যখন এই সংখ্যা এক বছরে জন্ম নেওয়া শিশুর সংখ্যার কাছাকাছি পৌঁছে যায়, তখনই হামের মতো সংক্রামক ব্যাধি মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ে।

রাজধানীর মহাখালীর ডিএনসিসি হাসপাতালেও হামের রোগীদের জন্য বিশেষায়িত শয্যা প্রস্তুত রাখা হয়েছে জানিয়ে মহাপরিচালক বলেন, ‘আমরা আইইডিসিআরকে ভাইরাসের জিনোম সিকোয়েন্সিং করার অনুরোধ জানিয়েছি। গবেষণার মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী সামনের দিনগুলোতে গাইডলাইন আরও উন্নত করা হবে।’

মাঠপর্যায়ে টিকা কর্মসূচি ‘কার্যত অচল’

দেশে পর্যাপ্ত টিকার মজুত থাকা সত্ত্বেও পরিবহন ব্যয় ও অব্যবস্থাপনার কারণে তা মাঠপর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. আব্দুস সবুর। বিশ্বব্যাংকের সাবেক এই পরামর্শক বলেন, ‘২০২৫ সালে আমরা জানতে পারি যে মাঠপর্যায়ে টিকা কর্মসূচি কার্যত অচল। সদর দপ্তরে টিকা থাকলেও জেলা বা উপজেলা পর্যায়ে মানুষ টিকা পাচ্ছে না। এর মূল কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে দেখা গেছে, সেক্টর প্রোগ্রাম ডিসকন্টিনিউ (বন্ধ) করার ফলে অপারেশনাল প্ল্যান (ওপি) থেকে তেলের টাকা আসা বন্ধ হয়ে গেছে।’

তিনি আরও জানান, কোভিড মহামারির সময় ইউএসএআইডির দেওয়া ফ্রিজিং ভ্যানগুলো মহাখালীতে অলস বসে আছে। বাজেট বরাদ্দের জটিলতায় জ্বালানি খরচ মেটানো যাচ্ছে না বলে সেগুলো জেলা অভিমুখে যাচ্ছে না।

টিকা বিতরণের ক্ষেত্রে মাঠ পর্যায়ের ‘পোর্টার’ বা নিম্ন আয়ের কর্মীদের অবদানের কথা উল্লেখ করে ডা. আব্দুস সবুর বলেন, ‘যারা একেবারে দুর্গম এলাকায় টিকা পৌঁছে দেয়, তারা দীর্ঘ ২০-২৫ বছর ধরে কাজ করলেও তাদের চাকরি স্থায়ী করা হচ্ছে না। সেক্টর প্রোগ্রাম বন্ধ হওয়ায় তাদের বেতন-ভাতাও বন্ধ। এসব কর্মীর গলার স্বর উঁচুতে পৌঁছায় না বলে তারা অবহেলার শিকার হচ্ছেন।’

সরকার ঘোষিত এক লাখ নতুন কর্মী নিয়োগের পরিকল্পনায় মাঠ পর্যায়ের অভিজ্ঞ পোর্টারদের অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি জানান অধ্যাপক সবুর। তিনি মনে করেন, এদের স্থায়ী করা হলে টিকাদান কর্মসূচির দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা নিশ্চিত হবে।

১ কোটি ৭৬ লাখ শিশু টিকার আওতায়, শহরে বাদ পড়ার হার বেশি: ইউনিসেফ

দেশের চলমান হাম-রুবেলা ক্যাম্পেইন ও রুটিন টিকাদান পরিস্থিতি নিয়ে আয়োজিত গোলটেবিল আলোচনায় ইউনিসেফ প্রতিনিধি সংস্থাটির হেলথ ম্যানেজার রিয়াদ মাহমুদ দেন ভয়াবহ তথ্য। তিনি জানান, চলমান বিশেষ টিকাদান কর্মসূচিতে এ পর্যন্ত ১ কোটি ৭৬ লাখের বেশি শিশুকে টিকার আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে বলে জানিয়েছে ইউনিসেফ। সংস্থাটি বলছে, লক্ষ্যমাত্রার ৯৮ শতাংশ অর্জিত হলেও শহর এলাকায় এখনো ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ শিশু টিকার বাইরে থেকে গেছে।

রিয়াদ মাহমুদ জানান, এবারের ক্যাম্পেইনে ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এর মধ্যে ১ কোটি ৭৬ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে, যা একটি বড় অর্জন। তবে মাঠপর্যায়ের মনিটরিং ডেটা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘শহর এলাকায় বিশেষ করে বস্তি ও ভাসমান জনগোষ্ঠীর ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ শিশু এখনো টিকা পায়নি। অন্যদিকে গ্রামে এই বাদ পড়ার হার প্রায় ১৫ শতাংশ।’ 

ক্যাম্পেইনে সাফল্য এলেও রুটিন টিকাদানে ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ইউনিসেফ। প্রতিষ্ঠানটি অভিযোগ করেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে টিকাদান কর্মসূচির বিস্তারিত তথ্য তাদের দেওয়া হয়নি। সংস্থাটির তথ্যমতে, রুটিন টিকাদানে হামের প্রথম ডোজের কাভারেজ ৮৬ শতাংশ এবং দ্বিতীয় ডোজে তা ৮১ শতাংশে নেমে আসে। রিয়াদ মাহমুদ বলেন, ‘রুটিন টিকার এই ১৯ শতাংশ গ্যাপ পূরণ না হলে বারবার ক্যাম্পেইন করেও শিশুদের মৃত্যু ঠেকানো যাবে না।’

রিয়াদ মাহমুদ সতর্ক করে বলেন, হামের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে অন্তত ৯৫ শতাংশ হার্ড ইমিউনিটি নিশ্চিত করতে হবে। যারা এখনো টিকা নেয়নি, তাদের আগামী ২০ মের মধ্যে টিকা কেন্দ্রে আনার অনুরোধ জানান তিনি। আগে টিকা দেওয়া থাকলেও ক্যাম্পেইনের এই বাড়তি ডোজ নেওয়া জরুরি।

বাংলাদেশ থেকে হাম কখনো নির্মূল হয়নি: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা 

এবারের হামের প্রাদুর্ভাবের আগে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা একাধিকবার দেশ থেকে হাম নির্মূলের দাবি তোলেন। কিন্তু সেই দাবি নাকচ করে দিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ন্যাশনাল প্রফেশনাল অফিসার (ইমিউনাইজেশন) ডা. চিরঞ্জিত দাস আলোচনার টেবিলে জানান, বাংলাদেশে হাম কখনোই পুরোপুরি নির্মূল হয়নি। তিনি বলেন, “আমাদের ভাইরোলজিস্টদের তথ্য অনুযায়ী এই ভাইরাসটি আমাদের দেশের মধ্যেই সার্কুলেশনে ছিল। কোনো নির্দিষ্ট এলাকা বা ক্যাম্প থেকে এটি নতুন করে ছড়িয়েছে–এমন ধারণা সঠিক নয়। বরং রোগ প্রতিরোধক্ষমতার ঘাটতি বা ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’ থাকার কারণে এটি দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ পেয়েছে।”

সঠিক সময়ে টিকা দেওয়ার গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, টিকা দেওয়া এবং সঠিক সময়ে টিকা দেওয়ার মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে। শিশুর রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়াতে সময়মতো টিকা পাওয়া খুবই জরুরি। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে আগ্রহী করতে হবে যাতে তারা সচেতনভাবে শিশুদের টিকা নিশ্চিত করে।

চলমান ক্যাম্পেইনগুলোতে ৬ মাস থেকে ৫ বছরের নিচের কোনো শিশু যেন বাদ না পড়ে, তা নিশ্চিত করতে দায়িত্বপ্রাপ্তদের অনুরোধ জানান তিনি।

টিকাদানের কার্যকারিতা যাচাই করতে পরামর্শ 

দেশের টিকাদান কর্মসূচির বর্তমান অবস্থা ও হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন আইসিডিডিআরবির সাবেক গবেষক ও টিকা বিশেষজ্ঞ ডা. তাজুল ইসলাম এ বারি। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, বিশেষ ক্যাম্পেইন সাময়িক সুরক্ষা দিলেও টিকাদানের ‘মেরুদণ্ড’ বা রুটিন ইমিউনাইজেশন শক্তিশালী করা না গেলে শিশুদের দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

টিকার কার্যকারিতা নিয়ে ডা. বারি একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা তুলে ধরেন। তিনি জানান, টিকা দেওয়ার বয়সের ওপর এর কার্যকারিতা অনেকাংশেই নির্ভর করে। তিনি বলেন, ৬ থেকে ৯ মাস বয়সে টিকা দিলে মাত্র ৫০ শতাংশ শিশুর শরীরে প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হয়। ৯ মাস বয়সে টিকা দিলে কার্যকারিতা বেড়ে হয় ৮৫ শতাংশ। ১২ মাস বয়সে টিকা দিলে কার্যকারিতা বেড়ে দাঁড়ায় ৯০ শতাংশে। ১৫ মাস বয়সে টিকা দিলে তা প্রায় ৯৩ শতাংশ কার্যকর হয়। উন্নত বিশ্বে ৪ থেকে ৬ বছর বয়সে দেওয়া টিকার কার্যকারিতা ৯৭ শতাংশ পর্যন্ত হয়।

টিকাদানের মাধ্যমে ‘হার্ড ইমিউনিটি’ বা সামষ্টিক রোগ প্রতিরোধক্ষমতা অর্জনের কথা বলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজীর আহমেদ।

তিনি বলেন, কাগজে-কলমে টিকাদানের হার ১০০ বা ১৫০ শতাংশ দেখানো হলেও বাস্তবে এর কার্যকারিতা যাচাই করতে ‘কাভারেজ সার্ভে’ করা প্রয়োজন। বিশেষ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে এই হার অন্তত ৯৫ শতাংশে উন্নীত করার পরামর্শ দেন তিনি।

পদ্মার চরে রক্তাক্ত আধিপত্যের লড়াই: আট মাসে ৮ খুন, আতঙ্কে চরবাসী

প্রকাশ: ০২ জুলাই ২০২৬, ১০:৫২ এএম
আপডেট: ০২ জুলাই ২০২৬, ১১:৪৭ এএম
পদ্মার চরে রক্তাক্ত আধিপত্যের লড়াই: আট মাসে ৮ খুন, আতঙ্কে চরবাসী
ছবি: খবরের কাগজ

দেশের উত্তর-পশ্চিমে পদ্মার চরাঞ্চলে রক্তাক্ত আধিপত্যের লড়াই কোনো ভাবেই থামছেই না। বহু আগেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিশেষ অভিযান চালিয়ে এসব চরাঞ্চলকে সন্ত্রাসমুক্ত ঘোষণা করে। তবে বর্তমান চিত্র ভিন্ন। গত আট মাসে রাজশাহী, নাটোর, পাবনা ও কুষ্টিয়ার সীমান্তঘেঁষা বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলে অন্তত আটজন নিহত হয়েছেন। এসব হত্যাকাণ্ডের মূলে রয়েছে বালুমহাল, চরের জমি, ফসল কাটা ও নদীপথে চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর লড়াই। সহিংসতা না থামায় প্রতিনিয়ত চরম নিরাপত্তাহীনতা আর আতঙ্কে দিন কাটছে চরবাসীর।

গত শুক্রবার পাবনা সদর উপজেলার চরতারাপুর ও ভাঁড়ারা ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী জোতকাকুরিয়া কলাবাগান চরে অবৈধ বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন মঞ্জু শেখ। তিনি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। স্থানীয়রা জানান, দীর্ঘদিন ধরে ওই এলাকায় বালু উত্তোলনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ চলছিল। শুক্রবার দুপুরে উভয় পক্ষ নদীতে অবস্থান নিলে সংঘর্ষ বাধে। একপর্যায়ে গোলাগুলিতে ঘটনাস্থলেই নিহত হন মঞ্জু শেখ।

এর আগে ১৬ জুন নাটোরের লালপুর উপজেলার রাইটার চরের কাছে যাত্রীবাহী নৌকায় সশস্ত্র হামলায় সাহাবুল ইসলাম নিহত হন। আহত হন আরও একজন। ৯ জুন রাজশাহীর বাঘা উপজেলার চর জজিরায় বালুমহালের ব্যবস্থাপক আজিজুল হাকিমকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ১৮ মে বাঘা উপজেলার চকরাজাপুর ইউনিয়নের কালিদাসখালী চরে সশস্ত্র হামলায় নিহত হন স্বপন ব্যাপারী। হামলাকারীরা তার মরদেহও ট্রলারে তুলে নিয়ে যায়।

এরও আগে ৩ জানুয়ারি বাঘার পলাশী-ফতেপুর করালি নওশারার চরে নিজ বাড়িতে ঢুকে সোহেল রানাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। গত বছরের ২৭ অক্টোবর কুষ্টিয়ার দৌলতপুর সীমান্তের চৌদ্দহাজার চরে খড় কাটাকে কেন্দ্র করে গোলাগুলিতে নিহত হন আমান মণ্ডল ও নাজমুল হোসেন। পরদিন একই ঘটনার জেরে হবিরচর থেকে লিটন হোসেনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এসব হত্যাকাণ্ড বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা আধিপত্যের সংঘাতের ধারাবাহিকতা।

রাজশাহী রেঞ্জের উপমহাপুলিশ পরিদর্শক (ডিআইজি) মো. শাহজাহান বলেন, পদ্মার চরাঞ্চলের সহিংসতার প্রধান কারণ বালু উত্তোলন, চরের জমির নিয়ন্ত্রণ ও নদীপথে চাঁদাবাজি। তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে লিজ নেওয়া বালুমহালের নির্ধারিত সীমানা মানা হয় না। আবার প্রশাসন সীমানা নির্ধারণ করে দিলেও প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষ তা মেনে নিতে চায় না। এসব বিরোধই শেষ পর্যন্ত সশস্ত্র সংঘর্ষে রূপ নেয়।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, অপরাধ চক্রগুলো পদ্মার দুই পাড়েই সক্রিয়। একদিকে রাজশাহী, নাটোর ও পাবনা; অন্যদিকে কুষ্টিয়াকে কেন্দ্র করে তারা কার্যক্রম পরিচালনা করে।

চরের কয়েকটি ইউনিয়নের জনপ্রতিনিধি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ২০২৪ সালের আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর এলাকায় পুলিশি নজরদারি দুর্বল হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ভেঙে যাওয়ায় নতুন নতুন সশস্ত্র গ্রুপ সক্রিয় হয়ে ওঠে। গ্রামবাসীর অভিযোগ, এখন দিনের বেলাতেই অস্ত্রধারীরা স্পিডবোটে নদীপথে টহল দেয়। সন্ধ্যার পর সাধারণ মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ঘর থেকে বের হতে ভয় পান। পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি চরের বাসিন্দা বলেন, ‘প্রায়ই গুলির শব্দ শুনি। কারও বিরুদ্ধে মুখ খোলার সাহস নেই।’

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গত বছরের ২৮ নভেম্বর নাটোর ও পাবনায় ‘অপারেশন ফার্স্ট লাইট’ নামে যৌথ অভিযান পরিচালনা করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ওই অভিযানে অন্তত ৭২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তবে এরপরও অপরাধ কমেনি। সম্প্রতি পাবনার ঈশ্বরদীর লক্ষীকুণ্ডা নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির ওসিসহ পাঁচ পুলিশ সদস্য চরে অভিযান চালাতে গিয়ে সন্ত্রাসীদের গুলিতে আহত হন বলে জানান ডিআইজি মোহাম্মদ শাহজাহান।

তিনি বলেন, ‘শীর্ষ সন্ত্রাসীদের অনেকেই চরে অবস্থান করেন না। তারা দূরের শহরে বসেই স্থানীয় সহযোগীদের মাধ্যমে পুরো নেটওয়ার্ক পরিচালনা করেন। তা ছাড়া বহু জেলার সীমান্তজুড়ে বিস্তৃত দুর্গম চরাঞ্চলের ভৌগোলিক অবস্থানও অপরাধীদের বড় সুবিধা দিচ্ছে। পুলিশ পৌঁছানোর আগেই তারা অন্য জেলায় পালিয়ে যায়।’

ডিআইজি মোহাম্মদ শাহজাহান জানান, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বাঘা উপজেলার চরাঞ্চলে একটি স্থায়ী পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। শিগগিরই আরেকটি সমন্বিত যৌথ অভিযানও পরিচালনা করা হবে।

বাজেট পাস: চূড়ান্ত বাজেটে কী বদলাল, কী বদলাল না?

প্রকাশ: ০২ জুলাই ২০২৬, ০৯:১১ এএম
আপডেট: ০২ জুলাই ২০২৬, ০৮:০৯ পিএম
বাজেট পাস: চূড়ান্ত বাজেটে কী বদলাল, কী বদলাল না?
খবরের কাগজ ইনফোগ্রাফিক

জাতীয় সংসদে গত ৩০ জুন বাজেট অনুমোদন হয়েছে। আলোচনা, বিরোধী দলের আপত্তি এবং জনমতের প্রতিফলনে অর্থ বিলের বিতর্কিত কয়েকটি প্রস্তাবে গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনী আনা হয়েছে। ফলে এবারের বাজেট একদিকে নীতিগত ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে, অন্যদিকে জনমতের প্রতি সংবেদনশীলতারও বার্তা দিয়েছে। ফলে এটি অর্থনীতির পাশাপাশি রাজনীতির বার্তাও বহন করছে।

> বাজেটের আকার: ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা (দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ)

> বাজেট ঘাটতি: ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা (জিডিপির ৩.৬%)

> উল্লেখযোগ্য দিক: ব্যয়ের কাঠামোতে স্থিতিশীলতা, করনীতি ও প্রশাসনিক বিধানে নমনীয়তা

> টিআইএন বাধ্যতামূলক, অপ্রদর্শিত বিনিয়োগ ও নামজারির বিতর্কিত বিধান প্রত্যাহার

> করদাতাদের স্বস্তি: করমুক্ত আয়ের সীমা ৩.৭৫ লাখ থেকে বেড়ে ৪ লাখ টাকা 

> সর্বোচ্চ বরাদ্দ: অর্থ বিভাগ, ইআরডি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও প্রাথমিক শিক্ষা

> মূল চ্যালেঞ্জ: ৭.৫% মূল্যস্ফীতি অর্জন ও ৬.৯৫ লাখ কোটি টাকার রাজস্ব আদায় 

কী বদলাল, কী বদলাল না

সংসদে বাজেট পাসের পর সাধারণভাবে ধারণা তৈরি হয় যে, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দে কাটছাঁট হয়েছে। কিন্তু সরকারি নথি ও সংসদীয় কার্যবিবরণী পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এবারের বাজেটে সেই অর্থে তেমন কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। প্রস্তাবিত বাজেটে যে মন্ত্রণালয়গুলোর জন্য যে বরাদ্দ নির্ধারণ করা হয়েছিল, তা-ই বহাল রয়েছে।

বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আকারও অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। সংসদে ৫৯টি মঞ্জুরি দাবির বিপরীতে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে ৪৩ জন সদস্য মোট ১ হাজার ৩৪৩টি ছাঁটাই প্রস্তাবের নোটিশ দিলেও শেষ পর্যন্ত সেগুলো প্যাকেজ আকারে প্রত্যাহার করা হয়। ফলে মন্ত্রণালয়ভিত্তিক বরাদ্দে কোনো সংশোধন আনার প্রয়োজন পড়েনি।

বাজেট বিশ্লেষকদের মতে, এবারের বাজেটে ব্যয় কাঠামোর চেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে নীতিগত সংশোধন। অর্থাৎ, বাজেটের ব্যয় কাঠামো অপরিবর্তিত থাকলেও পরিবর্তন এসেছে অর্থ বিলের বিভিন্ন কর ও প্রশাসনিক প্রস্তাবে। অর্থ বিল পাসের আগে ৬৪টি সংশোধনী সংসদে গ্রহণ করা হয়। 

জনমতের প্রতি সাড়া

সংসদে পাস হওয়া অর্থ বিলে চারটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রথমত, জমি বা সম্পদে অপ্রদর্শিত/কালো টাকা বিনিয়োগের বিশেষ সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব প্রত্যাহার করা হয়েছে। সরকার জানিয়েছে, এ নিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি ও ব্যাপক সমালোচনা সৃষ্টি হওয়ায় জনমতের প্রতি সম্মান জানিয়ে প্রস্তাবটি বাদ দেওয়া হয়েছে।

দ্বিতীয়ত, ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে টিআইএন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব প্রত্যাহার করা হয়েছে। সংসদীয় আলোচনায় সাধারণ মানুষের ভোগান্তির আশঙ্কা তুলে ধরা হলে সরকার অবস্থান পরিবর্তন করে।

তৃতীয়ত, জমির বণ্টননামা দলিল নিবন্ধন ও নামজারির ক্ষেত্রে টিআইএন বাধ্যতামূলক করার বিধানও বাতিল করা হয়েছে। একই যুক্তিতে এটিকেও জনবান্ধব সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

চতুর্থত, ব্যক্তিশ্রেণির করমুক্ত আয়ের সীমা ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪ লাখ টাকা করা হয়েছে। সংসদীয় আলোচনার পর গৃহীত এই সিদ্ধান্ত মধ্যবিত্ত করদাতাদের জন্য কিছুটা স্বস্তির বার্তা বহন করছে।

এসব পরিবর্তন থেকে স্পষ্ট যে, সরকার করনীতি ও প্রশাসনিক বিধানে নমনীয়তা দেখালেও ব্যয় পরিকল্পনায় স্থিতিশীল অবস্থান বজায় রেখেছে।

বহাল থাকল মন্ত্রণালয়ভিত্তিক বরাদ্দ

এবারের বাজেটে সরকার উন্নয়ন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। সংশোধিত বাজেটের তুলনায় উন্নয়ন ব্যয় প্রায় ৪৭ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। একই সঙ্গে পরিচালন ব্যয়ের অনুপাত কমিয়ে উন্নয়ন ব্যয়ের অংশ বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এই বাস্তবতায় বাজেট অনুমোদনের শেষ মুহূর্তে কোনো মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ কমানো হলে পুরো ব্যয় পরিকল্পনা, উন্নয়ন কর্মসূচি ও অর্থায়নের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা ছিল। ফলে সরকার ব্যয় কাঠামো অপরিবর্তিত রেখেই কেবল নীতিগত সংশোধনের পথ বেছে নিয়েছে।

যে খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ

বাজেট বরাদ্দ বিশ্লেষণে দেখা যায়, অর্থ বিভাগই সর্বোচ্চ বরাদ্দ পেয়েছে। এরপর রয়েছে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার বিভাগ, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ, পরিকল্পনা বিভাগ, খাদ্য মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং কৃষি মন্ত্রণালয়। এ থেকে স্পষ্ট, সরকার আগামী অর্থবছরে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা, অবকাঠামো ও কৃষিকে প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করছে। 

বাজেটে কম গুরুত্বপূর্ণ খাত

তুলনামূলকভাবে বিদ্যুৎ বিভাগ এবং বিশেষ করে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের বরাদ্দ অন্যান্য বড় মন্ত্রণালয়ের তুলনায় অনেক কম। যদিও শুধু বরাদ্দের পরিমাণ দিয়ে সরকারের অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা যায় না, তবুও বরাদ্দের আকার বিবেচনায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক খাতের তুলনায় জ্বালানি খাত অপেক্ষাকৃত সীমিত অবস্থানে রয়েছে।

ঘাটতি ও বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ

বাজেটে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি রাখা হয়েছে, যা জিডিপির ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। এই ঘাটতি পূরণে দেশীয় ও বৈদেশিক ঋণের ওপর সরকারকে নির্ভর করতে হবে। অন্যদিকে শুধু ঋণের সুদ পরিশোধেই ব্যয় হবে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা।

একই সঙ্গে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আহরণ করতে হবে, যার মধ্যে এনবিআরকে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা আদায়ের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য অর্জন করতে হবে। বিশেষ করে ভ্যাট ও আয়কর থেকে রাজস্ব বৃদ্ধির ওপর সরকারের প্রত্যাশা অনেক বেশি। অন্যদিকে সরকারি ঋণের সুদ পরিশোধেই ব্যয় হবে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা।

বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছানো এবং মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের বেশি থেকে ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা সরকারের জন্য সহজ হবে না। ফলে উন্নয়ন ব্যয় বৃদ্ধি এবং রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন–এই দুই ক্ষেত্রেই আগামী অর্থবছরে বিএনপি সরকারকে সবচেয়ে বড় পরীক্ষায় মুখোমুখি হতে হবে।

এলিস/এএফ

লোকোমোটিভ, ক্যারেজসংকট: ২৬৭৮১ কোটির মহাক্রয় প্রকল্প নিচ্ছে রেলওয়ে

প্রকাশ: ০২ জুলাই ২০২৬, ০৯:০০ এএম
আপডেট: ০২ জুলাই ২০২৬, ০৯:১৪ এএম
লোকোমোটিভ, ক্যারেজসংকট: ২৬৭৮১ কোটির মহাক্রয় প্রকল্প নিচ্ছে রেলওয়ে
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলে প্রতিদিন দেড় শতাধিক ট্রেন চলাচলের সূচি থাকলেও দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, তীব্র জনবলসংকট এবং যান্ত্রিক অচলাবস্থার কারণে পরিষেবাব্যবস্থা এক ভয়াবহ সংকটের মুখে পড়েছে। প্রয়োজনীয় লোকোমোটিভ (ইঞ্জিন) ও ট্রেন ক্রু–চালক, সহকারী চালক ও গার্ডের অভাবে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৬০০ ট্রেন বাতিল বা আংশিক চলাচল বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এতে কেবল যাত্রী ভোগান্তিই বাড়ছে না, রাজস্ব আয়েও পড়েছে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব। এই পরিস্থিতিতে কারখানা আধুনিকায়নের মাধ্যমে রেলব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে ২৬ হাজার ৭৮১ কোটি টাকা ব্যয়ে বেশ কয়েকটি প্রকল্প শুরু করতে যাচ্ছে রেলওয়ে।

রেলওয়ের তথ্য বলছে, লোকোমোটিভ ও ক্যারেজ (বগি) সংকটে প্রায়ই বিভিন্ন রুটের ট্রেনের যাত্রা বাতিল করা হয়। জানা গেছে, ২০২০ সাল থেকে লোকোমোটিভ ও জনবল সংকটের অজুহাতে ধারাবাহিকভাবে ১৬টি মেইল ও কমিউটার এবং ছয়টি লোকাল ট্রেন স্থায়ী বা অস্থায়ীভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এসব ট্রেন বন্ধ থাকায় সাধারণ যাত্রী ও নিম্ন আয়ের মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। বাধ্য হয়ে তারা সড়কপথে যাতায়াত করছেন। যার ফলে সড়কপথের ওপর চাপ বেড়েছে এবং দুর্ঘটনা ও যানজটের ঝুঁকিও বহু গুণ বেড়েছে।

রেলওয়ে কর্মকর্তাদের অভিযোগ, ট্রেন সংকটের কারণে আন্তনগর ট্রেনগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। এ ছাড়া দ্বিতীয় শ্রেণির ট্রেন বন্ধের ফলে স্থানীয়দের আন্দোলন ও জনপ্রতিনিধিদের চাপে আন্তনগর ট্রেনগুলোকে নিয়মবহির্ভূতভাবে বিভিন্ন স্টেশনে যাত্রাবিরতি দিতে বাধ্য হতে হচ্ছে। এতে দীর্ঘপথের যাত্রীরা সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছেন না এবং আন্তনগর ট্রেনের সেবার মান সাধারণ লোকাল ট্রেনের পর্যায়ে নেমে আসছে।
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ১৬২টি মিটারগেজ লোকোমোটিভের মধ্যে ৬৯ শতাংশেরই অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল পেরিয়ে গেছে। ১ হাজার ২৬৭টি মিটারগেজ যাত্রীবাহী কোচের মধ্যে ৪৩ শতাংশের অবস্থাও একই। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে অদূরদর্শিতার কারণেই এই সংকট দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

রেলের আধুনিকায়নে লোকোমোটিভ ও ক্যারেজ সংগ্রহে মহাপরিকল্পনা

এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ রেলওয়ের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং যাত্রীসেবার মানোন্নয়নে একযোগে একাধিক মেগা প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। চীন, দক্ষিণ কোরিয়ার ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন ফান্ড (ইডিসিএফ), এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের (এআইআইবি) মতো দাতা সংস্থার অর্থায়নে আধুনিক লোকোমোটিভ, ক্যারেজ সংগ্রহ এবং কারখানা আধুনিকায়নের মাধ্যমে রেলব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রেলের এসব রোলিং স্টক কেনাকাটায় ২৬ হাজার ৭৮১ কোটি টাকার প্রাক্কলন ব্যয়ে বেশ কয়েকটি প্রকল্পও শুরু করতে যাচ্ছে রেলওয়ে। 

চীনের অনুদানে রেলওয়ের জন্য ২০টি মিটারগেজ ডিজেল ইলেকট্রিক লোকোমোটিভ সংগ্রহ করা হবে। এ প্রকল্পে প্রাক্কলন ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৬৩৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারের তহবিল থেকে ৪৪ কোটি টাকা এবং প্রকল্প সহায়তার জন্য বরাদ্দ রয়েছে ১ হাজার ৫৯১ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। চীনের সরাসরি অনুদানে এই লোকোমোটিভগুলো শিগগিরই এসে পৌঁছাবে। জানা গেছে, এই লোকোমোটিভগুলোর ক্ষমতা কেমন হবে তার ওপর নির্ভর করবে চীনা প্রকল্প থেকে আরও কোনো রোলিং স্টক কেনা হবে কি না। কারণ চীনা লোকো ও ক্যারেজের নির্ধারিত অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল ফুরানোর আগে অকার্যকর হয়ে পড়ে। এর আগে চীনা লোকো ও ক্যারেজ নিয়ে অসন্তুষ্টি রয়েছে রেলের প্রকৌশল বিভাগে। তাই রেলওয়ে এবার সতর্ক। 

অন্য এক প্রকল্পের আওতায় ২০০টি মিটারগেজ ক্যারেজ, ২টি ব্রডগেজ ও ২টি মিটারগেজ রিলিফ ক্রেন, ৪টি আন্ডারফ্লোর হুইল লেদ কেনা হবে। আন্ডারফ্লোর হুইল লেদ হলো একটি বিশেষায়িত যন্ত্র, যা দিয়ে চাকাগুলোকে ট্রেন থেকে আলাদা না করেই নিখুঁত ও মসৃণ আকারে মেরামত করা যায়। এ কেনাকাটায় ৪ হাজার ৯০০ কোটি টাকা প্রাক্কলন ব্যয় ধরা হয়েছে। এর মধ্যে ২ হাজার ২৪২ কোটি টাকা আসবে সরকারের তহবিল থেকে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) এই প্রকল্পে ২ হাজার ৬৫৭ কোটি টাকা ঋণসহায়তা দেবে বলে জানা গেছে। 

আরেকটি প্রকল্পে ৩ হাজার ৯৭০ কোটি ৫৯ লাখ টাকা ব্যয়ে ২৬০টি ব্রডগেজ প্যাসেঞ্জার ক্যারেজ সংগ্রহ করার পরিকল্পনা নিয়েছে রেলওয়ে। উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবের (ডিপিপি) খসড়ায় বলা হয়েছে, ১৫৯ কোটি ৩১ লাখ টাকা সরকারি তহবিল থেকে এবং বাকি ২ হাজার ৭৩৭ কোটি টাকা দক্ষিণ কোরিয়ার ইডিসিএফ ফান্ড থেকে ঋণসহায়তা পাওয়া যাবে। 

এই প্রকল্পের আওতায় শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ৪০টি ব্রডগেজ স্লিপার কার, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ৭০টি ব্রডগেজ চেয়ার কার, ১১০টি ব্রডগেজ শোভন চেয়ার কার, প্রার্থনা কক্ষ ও খাবার গাড়িসহ ২০টি ব্রডগেজ শোভন চেয়ার কার, লাগেজ ভ্যান ও গার্ড ব্রেকসহ ২০টি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ব্রডগেজ পাওয়ার কার কেনাকাটার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। 

৩০টি মিটারগেজ ডিজেল ইলেকট্রিক লোকোমোটিভের কর্মদক্ষতা বাড়ানোর প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এই প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৭৭০ টাকা। এ প্রকল্পে এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি) ১ হাজার ৯৫৮ কোটি টাকা ঋণসহায়তা দেবে। 

সৈয়দপুর রেলওয়ে ওয়ার্কশপের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য সংযোজন সুবিধাসহ আধুনিকীকরণ ও সম্প্রসারণ করার আরও একটি প্রকল্প রয়েছে রেলওয়ের পাইপলাইনে। এ প্রকল্পের প্রাক্কলন ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ হাজার ৯৪ কোটি টাকা। এ প্রকল্পে আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা থেকে ৩ হাজার ২৬৪ কোটি ঋণসহায়তা চাইবে রেল। এই প্রকল্পের আওতায় সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানার বিদ্যমান অবকাঠামো আধুনিকায়নের পাশাপাশি ২৫টি ক্যারেজ অ্যাসেম্বলির সংস্থান, লোকোশেডের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ কেনার পরিকল্পনা রয়েছে রেলওয়ের। এ প্রকল্পেও আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলোর ঋণসহায়তা চাইবে রেলওয়ে। 

দিনাজপুরের পার্বতীপুরের কেন্দ্রীয় লোকোমোটিভ কারখানা বা কেলোকায় জেনারেল ওভারহোলিং (জিওএইচ) স্টেশন স্থাপন করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ প্রকল্পের প্রাক্কলন ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৪৩৮ কোটি টাকা। প্রকল্পে ২ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা ঋণসহায়তার জন্য আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলোর কাছে ঋণসহায়তা পায়। 

এ বছর ২০টি মিটারগেজ লোকোমোটিভ কেনার পরিকল্পনা রয়েছে রেলওয়ের। ৬৪০ কোটি টাকার এই প্রকল্পে বিশ্বব্যাংক ৫১২ কোটি টাকা অনুদান দেবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। 

৩ হাজার ৯৭ কোটি টাকা ব্যয়ে ৪৬টি ব্রডগেজ লোকোমোটিভ কেনার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এ প্রকল্পে চীন বা দক্ষিণ কোরিয়ার ২ হাজার ৪৭৭ কোটি টাকা ঋণসহায়তা থেকে পাওয়ার প্রত্যাশা করছে সরকার। 

আরেকটি প্রকল্পে ২৬০টি ব্রডগেজ ক্যারেজ কেনার পরিকল্পনা করেছে সরকার। এতে প্রাক্কলন ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ২৩৭ কোটি টাকা। দক্ষিণ কোরিয়ার ইডিসিএফ ফান্ড থেকে ১ হাজার ৭৫১ কোটি ঋণসহায়তা পাওয়া যাবে বলে আশ্বাস মিলেছে। ইডিসিএফ অর্থায়নে আরও ৩০০ মিটারগেজ ক্যারেজ আনার পরিকল্পনা করছে রেলওয়ে। 

রেলের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (রোলিং স্টক) ফকির মো. মহিউদ্দিন জানান, এ বছর এডিবির অর্থায়নে ৩০টি মিটারগেজ লোকোমোটিভ কেনার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। এআইআইবির অর্থায়নে ২০০টি ব্রডগেজ ক্যারেজ কেনার পরিকল্পনা সম্পন্ন হয়েছে। চলতি মাসে ২০টি ক্যারেজ চলে আসবে বলে প্রত্যাশা করছে রেল।

রেলের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানান, রেলওয়ের মিটারগেজ থেকে ব্রডগেজে রূপান্তরের প্রক্রিয়াটি দীর্ঘমেয়াদি। তাই ২০৫০ সালের আগে পুরো রেল নেটওয়ার্ক রূপান্তর করা সম্ভব নয়। তাই মিটারগেজ ট্রেন সচল রাখতে নতুন লোকোমোটিভ বা ইঞ্জিনের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। ফকির মো. মহিউদ্দিন খবরের কাগজকে বলেন, ‘ঢাকা-চট্টগ্রামসহ প্রধান করিডরগুলোর অনেক অংশ এখনো মিটারগেজে রয়েছে। টঙ্গী থেকে আখাউড়াসহ বিভিন্ন রুটের ডুয়েল বা ব্রডগেজ রূপান্তর করতে আগামী অন্তত ১০ বছর সময় প্রয়োজন। সব মিলিয়ে ২০৫০ সালের আগে পুরোপুরি মিটারগেজ রূপান্তর সম্ভব নয়। তাই ততক্ষণ পর্যন্ত আমাদের মিটারগেজ লোকোমোটিভ প্রয়োজন।’

রেলওয়ে বর্তমানে তীব্র লোকোমোটিভ সংকটে রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রতিদিন ১১০টি লোকোমোটিভ প্রয়োজন হলেও আছে মাত্র ৭০টির মতো। এর মধ্যে অনেকটিই পুরোনো। এই সংকট মোকাবিলায় সরকার দ্রুত লোকোমোটিভ সংগ্রহের ওপর জোর দিয়েছে।’
চীনের কাছ থেকে ২০টি লোকোমোটিভ অনুদান হিসেবে পাওয়ার বিষয়ে রেলওয়ের আগ্রহের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘চীনের কাছ থেকে এই অনুদান পাওয়া গেলে আমাদের লোকোমোটিভ সংকট দ্রুত কাটবে। তারা এটি বিনা পয়সায় দিয়ে যদি পাঁচ বছর রক্ষণাবেক্ষণ করে, তবে তা আমাদের জন্য সুবিধাজনক।’

ভবিষ্যতে লোকোমোটিভ কেনার ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট দেশের ওপর রেলওয়ে নির্ভরশীল নয় বলে উল্লেখ করেন তিনি। উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে যারা যোগ্য এবং সাশ্রয়ী হবে, তাদের কাছ থেকেই রোলিং স্টক বা ইঞ্জিন সংগ্রহ করা হবে বলে জানান তিনি।

বর্ষার আগেই ডেঙ্গুর অশনিসংকেত: বাড়ছে রোগী, ভয়াবহতার আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের

প্রকাশ: ০১ জুলাই ২০২৬, ১০:৩৮ পিএম
আপডেট: ০২ জুলাই ২০২৬, ০৯:২২ এএম
বর্ষার আগেই ডেঙ্গুর অশনিসংকেত: বাড়ছে রোগী, ভয়াবহতার আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের
ছবি: সংগৃহীত

বর্ষা পুরোপুরি শুরু হওয়ার আগেই দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ উদ্বেগজনকভাবে বাড়তে শুরু করেছে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় এডিস মশার ঘনত্ব আশঙ্কাজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিনই বাড়ছে ডেঙ্গু উপসর্গ নিয়ে আসা রোগীর সংখ্যা। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এখনই কার্যকর ও সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে আগস্ট-সেপ্টেম্বরে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।

সিটি করপোরেশনের দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, চলতি বছর ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছেন। বিশেষ করে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনকে ডেঙ্গু ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সমন্বিতভাবে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে এ লক্ষ্যে একটি বিশেষ টাস্কফোর্সও গঠন করা হয়েছে।

মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমকে প্রধান সমন্বয়ক করে এক বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। এর নাম দেওয়া হয়েছে ‘সারা দেশে ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত অন্যান্য রোগ প্রতিরোধে টাস্কফোর্স কমিটি’। এই কমিটির সদস্যরা রাজধানীর বাড়ি বাড়ি গিয়ে এডিস মশার লার্ভা শনাক্ত ও ধ্বংসে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করছে।

 ইতোমধ্যে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন এলাকায় এ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। গতকাল বুধবার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের নিয়ে বৈঠক হয়েছে। সেখানে ডেঙ্গু মোকাবিলায় একাধিক নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

কীটতত্ত্ববিদ কবিরুল বাশার সাংবাদিকদের জানান, ঢাকাসহ দেশের অনেক জেলায় এডিস মশার ঘনত্বের সূচক এখন ২০-এর বেশি। বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা, আর্দ্রতা এবং রোগীর সংখ্যা বিশ্লেষণ করে তৈরি পূর্বাভাস অনুযায়ী আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে দেশের বেশ কয়েকটি জেলায় ডেঙ্গুর সংক্রমণ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়তে পারে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্যমতে, গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে একজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে ১৬৩ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। আক্রান্তদের মধ্যে বরিশালে ৪৬ জন, চট্টগ্রামে ২৭, ঢাকা বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) ২৩, ঢাকা উত্তর সিটিতে ৮, দক্ষিণ সিটিতে ১৭, খুলনায় ২৪, ময়মনসিংহে ১৪ এবং রাজশাহীতে ৪ জন রয়েছেন। এ নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৯ জনে এবং আক্রান্তের সংখ্যা ছয় হাজার ছাড়িয়েছে।

গত দুই বছরের অভিজ্ঞতাও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। ২০২৫ সালে দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছিলেন ১ লাখ ২ হাজার ৮৬১ জন, মৃত্যু হয়েছিল ৪১৩ জনের। ২০২৪ সালে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ১ হাজার ২১৪ এবং প্রাণ হারান ৫৭৫ জন। সেই অভিজ্ঞতায় এবার বর্ষার শুরুতেই সতর্ক হওয়ার তাগিদ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

তাদের মতে, এবার ডেঙ্গুর ঝুঁকি আগেভাগে বেড়ে যাওয়ার প্রধান কারণ হলো রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় বর্ষার আগেই এডিস মশার লার্ভার ঘনত্ব অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়া। বৃষ্টির পানি জমে থাকা, অপরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনা এবং মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের দুর্বলতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

রাজধানীর সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিনই জ্বর, মাথাব্যথা, শরীর ব্যথা, বমি ও দুর্বলতা নিয়ে রোগীরা চিকিৎসা নিতে আসছেন। চিকিৎসকদের ভাষ্য, অনেকেই প্রথমদিকে সাধারণ জ্বর ভেবে চিকিৎসা নিতে দেরি করেন। এতে জটিলতা বাড়ছে। তারা উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত পরীক্ষা করানো এবং চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ধরনের ব্যথানাশক ওষুধ সেবন না করার পরামর্শ দিয়েছেন।

ডেঙ্গু প্রতিরোধে দুই সিটি করপোরেশনের প্রস্তুতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। যদিও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন প্রথমবারের মতো নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ৭৫টি ওয়ার্ডে ২ হাজার ২৫০টি বাড়িতে প্রাক-বর্ষা এডিস লার্ভা জরিপ পরিচালনা করছে। জরিপের প্রাথমিক ফলাফলই উদ্বেগ বাড়িয়েছে। দক্ষিণ সিটির ৭৫টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৬৩টিতেই এডিস মশার ঘনত্ব নির্ধারিত নিরাপদ মাত্রার চেয়ে বেশি পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ২৭টি ওয়ার্ডকে চরম ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। উত্তর সিটি করপোরেশনেরও অন্তত ২৪টি ওয়ার্ড উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে।

মাঠপর্যায়ের কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস, জনপ্রতিনিধিদের অনুপস্থিতি এবং বিভিন্ন পদে দীর্ঘদিন শূন্যতা থাকায় মশকনিধন কার্যক্রমে ধারাবাহিকতা ব্যাহত হয়েছে। তদারকির দুর্বলতার কারণে অনেক এলাকায় নিয়মিত লার্ভা ধ্বংস ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালিত হয়নি। নির্বাচনের পরও স্থানীয় পর্যায়ে জনপ্রতিনিধি (কাউন্সিলর) না থাকায় অনেক ওয়ার্ডে কাঙ্ক্ষিত গতি ফিরে আসেনি।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসকের একান্ত সচিব (উপসচিব) মোহাম্মদ আবদুল্লাহ খবরের কাগজকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে বিশেষ টিম গঠন করা হয়েছে। রাজধানীজুড়ে বিশেষ অভিযান পরিচালিত হচ্ছে এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী সরাসরি এসব কার্যক্রম তদারকি করছেন। প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি রয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. জাহানে ফেরদৌস বিনতে রহমান বলেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে ডেঙ্গু প্রতিরোধে বিশেষ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। পরিস্থিতিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।

তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র ভিন্ন। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, কয়েক দিনের বৃষ্টিতে খাল, নালা, ড্রেন ও পরিত্যক্ত স্থানে পানি জমে রয়েছে। অনেক জায়গায় গিয়ে দেখা গেছে, আবর্জনায় ভরা স্থির পানি এডিস মশার প্রজননক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ–নিয়মিত ফগিং হলেও লার্ভা ধ্বংস ও জমে থাকা পানি অপসারণে কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে।

চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, বর্ষা মৌসুম শুরুর আগেই বৃষ্টিপাত শুরু হওয়ায় এবার ডেঙ্গুর প্রকোপও আগেভাগেই দেখা দিয়েছে। কার্যকর প্রতিরোধব্যবস্থার অভাবে ডেঙ্গু এখন আর রাজধানীকেন্দ্রিক নয়, দেশের বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে। তার মতে, ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন মশাবাহিত রোগের বিস্তার জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারি সংস্থাগুলোকে নিয়মিত মশকনিধন কার্যক্রম পরিচালনা, লার্ভা ধ্বংস এবং কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে জনসচেতনতা বাড়িয়ে ব্যক্তি ও সামাজিক পর্যায়ে প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ জোরদার করা জরুরি। সময়মতো এসব ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে সামনের মাসগুলোতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।

পরিকল্পনাবিদ ও ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, শুধু কাগজে-কলমে প্রস্তুতি নয়, মাঠপর্যায়ে লার্ভিসাইডিং, নিয়মিত ফগিং, খাল-নালা পরিষ্কার এবং আবর্জনা অপসারণে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে সিটি করপোরেশনসহ দায়িত্বপ্রাপ্তদের কার্যক্রমে জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়বে। 

জলাবদ্ধতার দুষ্টচক্রে রাজধানী

প্রকাশ: ০১ জুলাই ২০২৬, ০৮:২৫ এএম
জলাবদ্ধতার দুষ্টচক্রে রাজধানী
ছবি: খবরের কাগজ

বর্ষা মৌসুম পুরোপুরি শুরু হয়নি। এ পর্যন্ত যে বৃষ্টিপাত হয়েছে, তাকে সেই অর্থে মুষলধারে বলা যাবে না। তবে রাজধানী ঢাকার জলাবদ্ধতা নিয়ে নগরবাসীর মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। গত কয়েক সপ্তাহের মাঝারি বৃষ্টিপাতেই আবারও স্পষ্ট হয়েছে সমস্যার বাস্তব চিত্র। বৃষ্টি থামার ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক ও অলিগলিতে পানি জমে থাকতে দেখা যাচ্ছে। জলজটে কোথাও যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে, কোথাও হাঁটুসমান পানিতে চলাচল করতে বাধ্য হচ্ছেন নগরবাসী। এতে পুরোদমে বর্ষা শুরুর আগে নতুন করে ভোগান্তির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

  • হাজার কোটি টাকার প্রকল্প, তবু পানির নিচে ঢাকা!
  • বৃষ্টি নামলেই থমকে যায় শহর, জলাবদ্ধতার পুরোনো আতঙ্কে নগরবাসী

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য গত দেড় দশকে একের পর এক প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। খাল পুনরুদ্ধার, ড্রেনেজব্যবস্থার উন্নয়ন, পাম্পিং স্টেশন নির্মাণ, বক্স কালভার্ট সংস্কার এবং পানি নিষ্কাশনব্যবস্থার আধুনিকায়নে ব্যয় হয়েছে হাজার হাজার কোটি টাকা। এমনকি রাজধানীর খাল ও নালা ব্যবস্থাপনার দায়িত্বও বিভিন্ন সময়ে এক সংস্থা থেকে অন্য সংস্থার কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। কিন্তু এত সব উদ্যোগ ও বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও বাস্তব চিত্র খুব একটা বদলায়নি। সামান্য বৃষ্টিতেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা এখনো পানির নিচে তলিয়ে যায়। 

নগর পরিকল্পনাবিদ ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমস্যার কারণ কেবল অবকাঠামোগত দুর্বলতা নয়, বরং দীর্ঘদিনের অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং সমন্বয়হীন ব্যবস্থাপনা। একসময় ঢাকার চারপাশে বিস্তৃত খাল, জলাধার ও নিম্নাঞ্চল বৃষ্টির পানি ধারণ এবং দ্রুত নিষ্কাশনের প্রাকৃতিক পথ হিসেবে কাজ করত। কিন্তু নগর সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে এসব খালের বড় একটি অংশ দখল, ভরাট কিংবা সংকুচিত হয়ে গেছে। ফলে শহর তার স্বাভাবিক পানি ধারণ ও নিষ্কাশন ক্ষমতার উল্লেখযোগ্য অংশ হারিয়েছে। যে পানি একসময় খাল ও জলাধার হয়ে সহজেই নদীতে চলে যেত, এখন সেই পানিই সড়ক ও জনবসতিতে জমে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করছে।

সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। রাজধানীতে প্রতিদিন প্রায় সাত হাজার টন বর্জ্য উৎপন্ন হয়, যার প্রায় ১৫ শতাংশই প্লাস্টিকজাত। এসব প্লাস্টিক, পলিথিন ও অন্য বর্জ্যের বড় অংশ শেষ পর্যন্ত গিয়ে জমা হয় ড্রেন, নালা ও খালে। ফলে পানি চলাচলের পথ বাধাগ্রস্ত হয় এবং সামান্য বৃষ্টিতেই ড্রেন উপচে পানি রাস্তায় উঠে আসে। অনেক স্থানে ড্রেনের অস্তিত্ব থাকলেও পলি ও ময়লার স্তূপে সেগুলো কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে।

কয়েক সপ্তাহ ধরে থেমে থেমে বৃষ্টির পর রাজধানীর নিউ মার্কেট, আজিমপুর, মালিবাগ, শান্তিনগর, সায়েদাবাদ, যাত্রাবাড়ী, ধানমন্ডি, মিরপুর, শেওড়াপাড়া, মতিঝিল, খিলক্ষেত, বাড্ডা, পুরান ঢাকা ও উত্তরার বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা গেছে। কোথাও সড়কে যানবাহন বিকল হয়ে পড়েছে, কোথাও দীর্ঘ সময় ধরে যানজট স্থায়ী হয়েছে। বিশেষ করে কর্মজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী এবং রোগীদের দুর্ভোগ ছিল সবচেয়ে বেশি।
দুই সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর অন্তত ১৪১টি এলাকা বর্তমানে জলাবদ্ধতার ঝুঁকিতে রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আওতায় রয়েছে ১০৮টি এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতায় রয়েছে ৩৩টি এলাকা। ঝুঁকিপূর্ণ এসব এলাকা চিহ্নিত করা হয়েছে আগেই। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই স্থায়ী সমাধানের কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি এখনো চোখে পড়ছে না।

এদিকে জলাবদ্ধতা নিরসনে নতুন করে বড় অঙ্কের বিনিয়োগের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। ‘খাল পুনরুদ্ধার, সংস্কার ও নান্দনিক পরিবেশ সৃষ্টি’ প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৮৯৮ কোটি ৩৯ লাখ টাকা ব্যয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০২২ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত চলমান এই প্রকল্পের আওতায় কালুনগর, জিরানী, মান্ডা ও শ্যামপুর খালের প্রায় ২০ দশমিক ৫৯ কিলোমিটার অংশ খনন ও স্লাজ (বর্জ্য জল, শিল্পকারখানা বা প্রাকৃতিকভাবে জমে থাকা ঘন, আঠালো কাদা বা কর্দমাক্ত মিশ্রণ) অপসারণ করা হবে। পাশাপাশি নির্মাণ করা হবে রিটেইনিং ওয়াল, সুরক্ষা বেষ্টনী, ওয়াকওয়ে, পাম্প স্টেশন এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণে একাধিক ইটিপি।

তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু খাল খনন বা ড্রেন পরিষ্কার করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। কারণ হিসেবে তারা জানিয়েছেন, ঢাকার পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার পুরো শৃঙ্খলই বিভিন্ন স্থানে বাধাগ্রস্ত। সড়কের ক্যাচপিট থেকে শুরু করে ড্রেন, খাল, স্লুইসগেট, পাম্প স্টেশন এবং নদীতে পানিপ্রবাহের প্রতিটি ধাপেই রয়েছে নানা প্রতিবন্ধকতা। কোথাও অবৈধ দখল, কোথাও বর্জ্যের স্তূপ, আবার কোথাও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা পুরো ব্যবস্থাকে অকার্যকর করে তুলছে। ফলে একটি অংশ সংস্কার করা হলেও অন্য অংশের সমস্যার কারণে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাচ্ছে না।

তবে বরাবরের মতো এবারও আশ্বাসের কথাই শোনালেন সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা। জলাবদ্ধতা নিরসনের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, রাজধানীতে প্রায় ১০০টি হটস্পট চিহ্নিত করা হয়েছে এবং সেগুলো বিশেষ নজরদারিতে রাখা হচ্ছে।

তিনি বলেন, এক জায়গার পানি দ্রুত সরিয়ে অন্য জায়গায় ফেললে সেখানে আবার জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। এটি স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনায় সমাধান সম্ভব নয়। চলতি বছর হয়তো কাঙ্ক্ষিতভাবে জলাবদ্ধতা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। তবে আগামী বছরের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। 

প্রয়োজনীয় বাজেট পাওয়া গেলে আগামী বছর জলাবদ্ধতা নিয়ন্ত্রণে দৃশ্যমান অগ্রগতি আনা সম্ভব হবে বলে জানিয়েছেন এই কর্মকর্তা। জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘বর্তমানে অনেক ছোট ড্রেন আমাদের ব্যবহৃত পলিথিন ও বর্জ্যে আটকে যায়। ফলে পানি চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়ে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। এ ছাড়া আমাদের চারটি ড্রেনেজ পাম্প থাকলেও সেগুলো প্রয়োজনের তুলনায় পর্যাপ্ত নয় এবং সব কটি পূর্ণ সক্ষমতায় কাজ করছে না।’

এ বিষয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসকের একান্ত সচিব (উপসচিব) ও অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবদুল্লাহ খবরের কাগজকে বলেন, রাজধানীর উত্তর অংশে কয়েকটি জলাবদ্ধপ্রবণ এলাকা রয়েছে, যেখানে বৃষ্টির সময় বিশেষ নজরদারি রাখা হয়। তিনি বলেন, ‘সাধারণ মানুষের কাছ থেকে কোনো অভিযোগ বা তথ্য পেলেই আমাদের টিম দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে ব্যবস্থা নেয়।’ 

এই কর্মকর্তা আরও বলেন, জলাবদ্ধতার অন্যতম প্রধান কারণ হলো ড্রেনেজব্যবস্থায় পলিথিন, ময়লা ও বর্জ্য জমে পানি চলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়া। বিশেষ করে মিরপুর ও উত্তরখান এলাকায় এ সমস্যা বেশি দেখা যায়। তবে এটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া স্থায়ীভাবে সমাধান সম্ভব নয়। বর্তমানে বিভিন্ন উন্নয়নকাজ চলমান থাকায় অনেক ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিকভাবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

এদিকে শত শত প্রকল্পের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা কোথায় এবং কাদের পকেটে যাচ্ছে তার হিসাব করা প্রয়োজন। পরিকল্পনাবিদ ও ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক ড. আদিল মুহাম্মদ খান খবরের কাগজকে বলেন, ‘ঢাকায় সম্প্রতি মাত্র ৫৪ মিলিমিটার বৃষ্টিতেই ভয়াবহ জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। অথচ বর্ষা মৌসুমে ৫০ থেকে ১০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত আমাদের দেশের জন্য স্বাভাবিক। সাধারণ বৃষ্টিতেই নগরজীবন অচল হয়ে পড়া প্রমাণ করে, দীর্ঘদিন ধরে জলাবদ্ধতা নিরসনে কোনো সমন্বিত ও কার্যকর পরিকল্পনা নেওয়া হয়নি।’

তিনি আরও বলেন, ওয়াসার প্রণীত মাস্টারপ্ল্যান সিটি করপোরেশনের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তরের পর আর হালনাগাদ করা হয়নি। ফলে বিভিন্ন সংস্থার কার্যক্রম সমন্বয়হীনভাবে পরিচালিত হচ্ছে এবং জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রত্যাশিত ফল মিলছে না। টেকসই সমাধানের জন্য আধুনিক মাস্টারপ্ল্যানের ভিত্তিতে খাল সংস্কার, ড্রেনেজব্যবস্থার উন্নয়ন ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে।

এই পরিকল্পনাবিদ অভিযোগ করে বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনের নামে হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হলেও সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কমেনি। তাই এসব প্রকল্পের অর্থ কোথায় ব্যয় হয়েছে, কারা দায়ী–সেসব বিষয়ে সুষ্ঠু তদন্ত করে জবাবদিহি ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিশ্চিত করা উচিত। তা না হলে জনগণের অর্থের অপচয়ই চলতে থাকবে, কিন্তু কাঙ্ক্ষিত সুফল মিলবে না।