স্বরলিপি থেমে যাবে। এই স্বরলিপি গানের সুরের নয়। এই স্বরলিপি ফুটবলের সবুজ গালিচার। এবারের বিশ্বকাপের শুরু থেকে একের পর এক চমকপ্রদ স্বরলিপি তথা মনোমুগ্ধকর নৈপুণ্য দেখিয়ে দর্শক হৃদয় জয় করে নিয়েছে ফ্রান্স ও স্পেন। কিন্তু এই দুই দলের আর টিকে থাকার উপায় নেই। ফাইনালের ভিসা পেতে লড়বে দুই দল। যেকোনো এক দলের বিদায় ঘটবে। বিদায়ের মঞ্চ সেমিফাইনাল। কিন্তু দুই দলের এই লড়াইকে ফুটবল বোদ্ধারা ‘ফাইনালের আগে ফাইনাল’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।
সাধারণ দৃষ্টিতে যেকোনো টুর্নামেন্টের সেমিফাইনালে উঠে আসে সেরা চারটি দলই। সেই চার দলের জয়ী দুই দল খেলে ফাইনালে। কাজেই সেমিতে আসা চারটি দলকে শক্তির বিভাজনে আলাদা করার কোনো উপায় নেই। সবাই সেরা। সবাই শিরোপার দাবিদার। তারপরও ফ্রান্স-স্পেনের সেমিফাইনাল ফুটবল বিশ্বে আলাদাভাবে নজর কেড়ে নিয়েছে। এই কেড়ে নেওয়ার কারণও আছে। দুটি দলই ফিফা র্যাংঙ্কিয়ে একেবারে ওপরের দিকে। ফ্রান্স এক নম্বর, স্পেন তিন নম্বর। এই দুই দলের মাঝে আছে আবার আর্জেন্টিনা।
ফ্রান্স-স্পেন শুধু ফিফা র্যাংঙ্কিয়ের কারণেই যে মুখোমুখি হওয়ার আগে আলোচনায় এসেছে তা কিন্তু নয়। এবারের আসরে দুই দলের খেলোয়াড়দের সুরের ঝঙ্কার তোলা নৈপুণ্য দর্শক হৃদয় কেড়ে নিয়েছে। ফ্রান্সের এমবাপ্পে যেন ফুটবলের শিল্পী হয়ে উঠেছেন। তার গোল করার পারদর্শিতা আর দুরন্ত গতি ফুটবলপ্রেমীরা অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখেছেন। কী গ্রুপ পর্ব, কী নকআউট পর্ব? এমবাপ্পের গোল করার নেশা যেন কমছেই না। ৭ ম্যাচে ৮ গোল করে তিনি এখন মেসির সঙ্গে যৌথভাবে গোন্ডে বুটের লড়াইয়ে। দেম্বেলের চুপিচারে গোল করাও অনেককেই মুগ্ধ করেছে। আছে তার একটি হ্যাটট্রিকও। এ ছাড়াও মাইকেল অলিসে, ব্রাডলি বারকোলা, দুয়ে, উইলিয়াম সালিবা, কুন্দে, হার্নান্দেজ, রাবিওট, চুয়ামেনিরা দর্শকদের হৃদয় জয় করে নিয়েছেন। প্রতিপক্ষের বিপক্ষে ফ্রান্স যখন আক্রমণে যায়, দেখে মনে এক ঝাঁক বক ডানা মেলে উড়ে বেড়াচ্ছে। তাদের বাধা দেওয়ার কেউ নেই। এবারের আসরে ফ্রান্স এখন পর্যন্ত ১৬ গোল করেছে। হজম করেছে ২টি। এ পর্যায়ে আসতে তাদের সামনে কোনো দলই বাধার প্রাচীর হয়ে উঠতে পারেনি। গ্রুপ পর্বে অপ্রতিরোধ্য ফ্রান্স ৩-১ গোলে সেনেগালকে, ৩-০ গোলে ইরাককে, ৪-১ গোলে নরওয়েকে পরাস্ত করে গ্রুপ সেরা হয়ে উঠে আসে নকআউট পর্বে। এখানে তারা যেন আরও দুর্দান্ত। টানা তিন ম্যাচ খেলে কোনো গোল হজম করেনি। সুইডেনকে ৩-০, প্যারাগুয়েকে ১-০ এবং মরক্কোকে ২-০ গোলে হারিয়ে টানা তৃতীয়বার সেমিতে পা রেখে স্পেনকে মোকাবিলা করার অপেক্ষায় দেশমের শিষ্যরা। জিতলে টানা তৃতীয়বারের মতো খেলবে ফাইনাল।
ফ্রান্সের মতো রাজকীয় শুরু হয়নি স্পেনের। হোঁচট খেয়ে শুরু করতে হয়েছিল। নবাগত কেপ ভার্দে স্পেনের নান্দনিক ফুটবল শৈলী রুখে দিয়ে কোনো গোল করতে দেয়নি। এই কেপ ভার্দে পরে অবশ্য একের পর এক চমক দেখিয়েছিল। শুরুর ধাক্কা সামলে ঘুরে দাঁড়ায় ইউরো চ্যাম্পিয়নরা। সৌদি আরবকে ৪-০ ও উরুগুয়েকে ১-০ গোলে হারিয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়েই তারা নকআউট পর্বে সুযোগ করে নেয়। নকআউট পর্বে স্পেনকে অবশ্য কঠিন প্রতিপক্ষ মোকাবিলা করতে হয়েছে। শেষ বত্রিশে তারা অস্ট্রিয়াকে ৩-০ গোলে হারানোর পর শেষ ষোলোতে পায় রোনালদোর পর্তুগালকে। জয়ী হয় ১-০ গোলে। পরে কোয়ার্টার ফাইনালে পায় বেলজিয়ামকে। বাধা অতিক্রম করে ২-১ গোলে জয়ী হয়।
বিশ্বের অন্যতম সেরা লা-লিগার একাধিকবারের চ্যাম্পিয়ন বার্সেলোনার ৮ জন, অ্যাথলেতিকো মাদ্রিদের ৩ জন, অ্যাথলিটিক বিলবাওয়ের ৩ জন, অন্যান ক্লাবেরও আছে একজন করে। সঙ্গে বিশ্বের অন্যান্য লিগে খেলা সেরা খেলোয়াড়দের নিয়ে গড়া ২০১০ সালের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা এবার নতুন করে আবার শিরোপার জাল বুনন করেছে। কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের শিষ্যদের মাঝে তরুণ ইয়ামালে, সঙ্গে কুকুরেয়া, রদ্রি, গাভি, পেদ্রি, রুইস, মেরিনো, গার্সিয়া, ওলমো, ওয়ারজাবাল, সিমনের মতো ক্লাব ফুটবল মাতানোরা বিশ্বকাপেও দর্শকদের মণিকোঠায় স্থান করে নিয়েছেন। এমবাপ্পে-দেম্বেলের মতো স্পেনের খেলোয়াড়রা গোলের পর গোল করে যেতে পারেননি। কিন্তু প্রয়োজনের সময় তাদের যে কেউ গোল করে দলকে জয়ী করে আনছেন। স্পেনের ১১ গোল করেছেন ৬ জন খেলোয়াড়। ওয়ারজাবাল একাই করেছেন ৪ গোল। মেরিনো করেছেন ২ গোল। বাকি গোলগুলো এসেছে একেকজনের কাছ থেকে। স্পেনের সবচেয়ে সেরা খেলোয়াড় ইয়ামালে করেছেন মাত্র এক গোল। কিন্তু তিনি এক গোল করলেও সারাক্ষণ প্রতিপক্ষকে ব্যতিব্যস্ত করে রাখেন। আসরে আলোচিত ফুটবলারদের মাঝে তিনিও একজন।
এমনই তারকায় ভরপুর দল দুটির সেমিতে উঠার লড়াই সবার কাছে হয়ে উঠেছে তাই ফাইনালের আগে আরেক ফাইনাল। আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি বলেন, ‘ফাইনালের আগেই এটি একটি ফাইনাল। স্পেন ও ফ্রান্স দুই দলই খুবই অসাধারণ খেলছে। টুর্নামেন্টের অন্যতম শিরোপার দাবিদার। তবে দুর্ভাগ্যজনকভাবে হলেও সত্য যে, এই ম্যাচ থেকে একটি দল ফাইনালে উঠতে পারবে।’ বেলজিয়ামের গোলরক্ষক কর্তোয়া মনে করেন ফ্রান্স-স্পেনের জয়ী দলই চ্যাম্পিয়ন হবে। তিনি বলেন, ‘ফ্রান্স ও স্পেনের সেমিফাইনালে যে দল জয়ী হবে, তারাই হবে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন।’
বিশ্বকাপের মঞ্চে ফ্রান্স-স্পেন সেমিতে এবারই প্রথম মুখোমুখি হতে যাচ্ছে। কিন্তু প্রতিযোগিতামূলক ফুটবলে এটিই তাদের সেমিতে প্রথম সাক্ষাৎ নয়। এর আগে দুইবার সেমিতে মুখোমুখি হয়েছে। দুইবারই জিতেছে স্পেন। দুই দলের সর্বশেষ সাক্ষাৎ হয়েছিল উয়েফা নেশনস লীগের সেমিফাইনালে। স্পেন জয়ী হয়েছিল ৫-৪ গোলে। ফলাফল দেখে মনে হবে টাইব্রেকারে নির্ধারিত হয়েছিল। কিন্তু নির্ধারিত ৯০ মিনিটেই এই রকম গোল বন্যার ম্যাচ হয়েছিল। এর আগে ২০২৪ সালের ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপের সেমিতে স্পেন ২-১ গোলে হারিয়েছিল ফ্রান্সকে। বিশ্বকাপে দুই দলের প্রথম দেখা হয়েছিল ২০০৬ সালে। কোয়ার্টার ফাইনালে স্পেনকে ৩-১ গোলে হারিয়ে সেমিতে উঠেছিল ফ্রান্স। প্রীতি ও প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ মিলিয়ে স্পেনের জয়ের পাল্লা ভারী। ৩৮ বারের লড়াইয়ে স্পেনের জয় ১৮টি, ফ্রান্সের ১৩টি। বাকি ৭টি ম্যাচ ড্র হয়।
১৪ জুলাই ডালাসে ফরাসি সৌরভে সুভাষিত হবে, না স্প্যানিশ সৌন্দর্যে ডানা মেলবে–ফাইনালের আগে আরেকটি ফাইনালে তার ফয়সালা হবে।