রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলার পূর্ব মৌকুড়ি গ্রামের কৃষক নূর হোসেন মিঞা। সম্প্রতি তিনি বালিয়াকান্দি উপজেলা কৃষি অফিস থেকে বিনামূল্যে পেঁয়াজের বীজ পেয়েছিলেন। তা ছিল ‘বাড়ি-৪’ জাতের পেঁয়াজ বীজ। এটি কৃষি অফিসের পক্ষ থেকে প্রণোদনা হিসেবে দেওয়া হয়েছিল। প্রায় ২০ দিন আগে ওই বীজের চারা তিনি মাঠে বপন করেছিলেন। কিন্তু ১৮ দিন পার হয়ে গেলেও বীজ থেকে কোনো অঙ্কুরোদগম হয়নি। এই ঘটনায় হতাশ নূর হোসেন বলছেন, ‘আমি যদি ৫ হাজার টাকা দিয়ে বীজ কিনতাম, তাও ভালো ছিল। তবে সরকার আমার যে ক্ষতি করেছে, তার বিচার আমি কোথায় পাব? এখন বীজ কিনে তা বপন করেও পেঁয়াজ আবাদ হবে না।’
নূর হোসেনের মতো একই অবস্থা বালিয়াকান্দি উপজেলার আরও কয়েকজন কৃষকের। তাদের মধ্যে আছেন আবুল কালাম, বিল্লাল হোসেন ও রফিক মোল্লা। তারা সবাই কৃষি অফিসের প্রণোদনা হিসেবে এক কেজি করে পেঁয়াজের বীজ পেয়েছিলেন। তারা জানাচ্ছেন, ওই বীজ থেকে কোনো চারা গজায়নি। পেঁয়াজ আবাদের জন্য প্রায় ৫০ শতাংশ জমি তারা রেখেছিলেন। কিন্তু এখন তারা চিন্তায় আছেন, ওই জমিতে কি আবাদ করা সম্ভব হবে?
পেঁয়াজ বীজ বিতরণ কর্মসূচি
২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে রাজবাড়ী শীতের পেঁয়াজের প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় বিএডিসি থেকে ৪ হাজার কেজি পেঁয়াজের বীজ পাঁচ উপজেলার কৃষকদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। এর মধ্যে বালিয়াকান্দি উপজেলায় ১ হাজার কেজি, পাংশা উপজেলায় ১ হাজার কেজি, কালুখালী উপজেলায় ৮০০ কেজি, সদর উপজেলায় ৮০০ কেজি ও গোয়ালন্দ উপজেলায় ৪০০ কেজি বীজ বিতরণ করা হয়। বিতরণ করা বীজের মধ্যে ২ হাজার ৫০০ কেজি ছিল তাহেরপুড়ি জাতের, ১ হাজার ১০০ কেজি ছিল বাড়ি-৪ জাতের ও ৪০০ কেজি ছিল বাড়ি-১ জাতের। প্রতি কেজি বীজের সঙ্গে ১০ কেজি ডিএপি ও ১০ কেজি এওপি সারও দেওয়া হয়েছিল।
বীজ থেকে চারা গজাচ্ছে না
পেঁয়াজ বীজ প্রথমে চারা উৎপাদনের জন্য বীজতলায় ফেলতে হয়। এর পর ৪০ থেকে ৪৫ দিনের মধ্যে চারা গজানোর পর সেগুলো মূল জমিতে রোপণ করা হয়। চাষিরা অভিযোগ করছেন, প্রণোদনায় পাওয়া এসব বীজের থেকে কোনো চারা গজায়নি। ২০ দিন ধরে বীজতলায় রাখা বীজ থেকে কিছুই হয়নি। কৃষির সঙ্গে যুক্ত বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, এটি একটি অস্বাভাবিক ঘটনা। এটি স্থানীয় কৃষকদের জন্য বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হতে পারে।
বালিয়াকান্দি উপজেলার জামালপুর ইউনিয়নের ভাটি খালকুলা গ্রামের কৃষক রফিক মোল্লা বলেন, ‘কৃষি কর্মকর্তারা বলেছিলেন, এই এক কেজি বীজে ৫০ শতাংশ জমি আবাদ করা যাবে। ওই আশায় চারা দিয়েছি। কিন্তু এখন ২০ দিন পার হয়ে গেলেও কোনো চারা গজায়নি। আমার বছরের একটা খেত নষ্ট হয়ে গেল।’ রফিক মোল্লা আরও বলেন, ‘সরকারি বীজ ভালো হবে মনে করে পরীক্ষা না করেই মাঠে চারা দিয়েছি। ভবিষ্যতে আর কোনো দিন সরকারি প্রণোদনা নেব না, এবারই শিক্ষা হয়ে গেছে।’
কৃষি অফিসের তদন্ত
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা উপজেলা কৃষি অফিসে অভিযোগ করেছেন এবং মাঠপর্যায়ের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের কাছে বিষয়টি জানিয়েছেন। তবে তারা কোনো স্পষ্ট উত্তর দিতে পারেননি। এর পরিপ্রেক্ষিতে রাজবাড়ী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. মো. শহিদুল ইসলাম গত ২৭ নভেম্বর চার সদস্যের একটি তদন্ত টিম গঠন করেন। ৩০ নভেম্বর শনিবার তদন্ত টিম মাঠে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে।
তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন
তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক, রাজবাড়ী জেলা বীজ প্রত্যায়নকারী অফিসার মো. মাসুদুর রহমান বলেন, ‘আমরা ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের বীজতলা পরিদর্শন করেছি। সব উপজেলায় দেখা গেছে তাহেরপুড়ি ও বাড়ি-৪ জাতের বীজ থেকে কোনো চারা গজায়নি। তবে কিছু জমিতে বাড়ি-১ জাতের বীজে কিছুটা চারা গজিয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘সব মিলিয়ে কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। আমাদের সুপারিশ থাকবে, ওই ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া।’
তদন্ত কমিটির সদস্য, বিএডিসি ফরিদপুরের উপপরিচালক (বীজ বিপণন) নিপুন কুমার নন্দী বলেন, ‘বীজের সমস্যা না পারিপার্শ্বিক অন্য কোনো কারণে এমনটা হয়েছে। তা তদন্ত করে বলা যাবে। বিএডিসি শুধু বীজ সরবরাহ করে। বীজ সংগ্রহ এবং মান নিয়ন্ত্রণ অন্য বিভাগ করে।’
রাজবাড়ী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক (শস্য) হোসেন শহীদ সরোয়ার্দী বলেন, ‘রাজবাড়ী পেঁয়াজ উৎপাদনে প্রসিদ্ধ। এই বীজের কারণে চাষিরা ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। আমাদের সুপারিশ থাকবে, চাষিরা যেন এই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারেন, ওই দিকে নজর দেওয়া হোক।’