রাজবাড়ীর বিভিন্ন পেঁয়াজের হাটে মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে মণপ্রতি দাম কমেছে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা। হঠাৎ এই দরপতনে লোকসানের মুখে পড়েছেন কৃষকরা। তাদের দাবি, এই সময়ে মণপ্রতি পেঁয়াজ ৩ হাজার টাকার নিচে বিক্রি মানেই সরাসরি ক্ষতি। তার ওপর পেঁয়াজ আমদানির ঘোষণা যেন কৃষকদের জন্য নতুন এক ভয়াবহ সংকেত।
গত রবিবার (৩ আগস্ট) জেলার সবচেয়ে বড় পেঁয়াজের মোকাম সোনাপুর হাটে মণপ্রতি দাম ছিল ৩ হাজার থেকে ৩ হাজার ২০০ টাকা। কিন্তু মাত্র চার দিনের ব্যবধানে গত বৃহস্পতিবার হাটে এসে দর নেমে আসে ২ হাজার ৬০০ থেকে ২ হাজার ৮০০ টাকায়। এমনকি দিনশেষে অনেকেই ২ হাজার ৬০০ টাকার ওপরে পেঁয়াজ বিক্রি করতে পারেননি। বাজার ঘুরে দেখা যায়, ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ের মধ্যেই ছিল হতাশা।
রাজবাড়ীর কালুখালী ও বালিয়াকান্দি উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় অবস্থিত সোনাপুর হাটে প্রতি রবিবার ও বৃহস্পতিবার বেচাকেনা হয়। দুই উপজেলার কৃষকরা এখানেই পেঁয়াজ বিক্রি করতে আসেন। প্রতি হাটে ৪৫ থেকে ৫০ ট্রাক পেঁয়াজ কেনাবেচা হয়। জেলার পাইকারি দর নির্ধারণেও এ হাটের প্রভাব অনেক বেশি।
পেঁয়াজচাষি মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘মার্চে জমি থেকে পেঁয়াজ তুলে ঘরের মাচায় রেখে দিই। চার মাসে সংরক্ষণে অনেক পেঁয়াজ শুকিয়ে যায়, কিছু পচেও যায়। এতে এক মণে ৭ থেকে ১০ কেজি পর্যন্ত ঘাটতি পড়ে। এ বছর প্রতি মণে উৎপাদন খরচ হয়েছে ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার টাকা। মৌসুমে দাম ছিল ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৩০০ টাকা, তখন বিক্রি করলে লোকসান হতো না। এখন ২ হাজার ৬০০ হলেও লাভ হচ্ছে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা পেঁয়াজ ধরে রাখি ধান রোপণ, পাট কাটার খরচ তোলার জন্য। সার, কীটনাশক, শ্রমিক— সবকিছুতেই এখন টাকার দরকার। অথচ বাজারে এসে দেখি, গত হাটের চেয়ে মণপ্রতি ৪০০ টাকা কম। তাহলে আমরা চলব কীভাবে?’
আরেক কৃষক রফিক মণ্ডল বলেন, ‘আষাঢ়ে বৃষ্টি শুরু হলে পেঁয়াজে পচন ধরে এখন যদি দাম না পাই, পরের ফসল উৎপাদনেও প্রভাব পড়বে। আগের দুই হাটে দর ভালো ছিল, হঠাৎ আবার ধস নামল। এটা আমাদের জন্য বড় ধাক্কা।’
ব্যবসায়ী ইসমাইল হোসেন বলেন, ‘গত দুই হাটে ঢাকায় পাঠানোর জন্য ৩ হাজার থেকে ৩ হাজার ১০০ টাকা দরে পেঁয়াজ কিনেছি। কিন্তু এবার ঢাকার বাজারেই দাম পড়ে গেছে। তাই ২ হাজার ৬০০ থেকে ২ হাজার ৭০০ টাকায় কিনছি। সামনে আরও কমতে পারে, কারণ, কৃষকের হাতে এখন পেঁয়াজ আছে, কিন্তু টাকার খুব অভাব। তারা যেভাবেই হোক বিক্রি করবে।’
তিনি অভিযোগ করেন, ‘দাম একটু বাড়লেই সরকার আমদানির ঘোষণা দেয়। অথচ এখনো দেশের গ্রামে কৃষকের ঘরে প্রচুর পেঁয়াজ আছে। এখন আমদানি করে বাজার ভরিয়ে দিলে কৃষক পথে বসবে।’
পেঁয়াজচাষিদের দাবি, বাজারে সামান্য ঊর্ধ্বগতির অজুহাতে আমদানির সিদ্ধান্ত কৃষকের প্রতি চরম অবিচার। তাদের ভাষায়, দেশে পর্যাপ্ত পেঁয়াজ মজুত রয়েছে, তাই এই সময়ে আমদানির দরকার নেই। তারা সরকারের কাছে আহ্বান জানিয়েছেন— কৃষকের স্বার্থ বিবেচনা করে আমদানির সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের রাজবাড়ীর সহকারী পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘দাম ওঠানামার সঙ্গে কিছুটা সিন্ডিকেট জড়িত। এ ছাড়া কৃষক এখন প্রয়োজনমতো পেঁয়াজ বিক্রি করছে। এ কারণেও দামের ওঠানামা হচ্ছে।’