পাবনার একমাত্র রেশম বীজাগারটি অবস্থিত ঈশ্বরদীতে। একসময় এখানে বছরজুড়ে চলত কর্মচাঞ্চল্য। তুঁতপাতা কাটা, পলুপোকা পালন, রেশমগুটি তৈরি আর সুতা উৎপাদনে ব্যস্ত থাকতেন শ্রমিক-কর্মচারীরা। এখন সেই ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানটি পরিণত হয়েছে নীরব জনপদে। দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকায় বীজাগারের বিশাল জায়গাজুড়ে এখন শুধু ঝোপঝাড় আর জঙ্গল। প্রশাসনিক ভবনগুলোও পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও সংস্কারের অভাবে ভবনগুলো গাছপালায় আচ্ছাদিত হয়ে গেছে।
রেশম বীজাগার সূত্রে জানা যায়, ১৯৬২ সালে ঈশ্বরদী-পাবনা মহাসড়কের পাশে অরণকোলা মৌজায় ১০৮ বিঘা জমিতে রেশম বীজাগারটি স্থাপন করা হয়। এর মধ্যে ৫৯ বিঘা জমিতে তুঁতগাছের আবাদ ছিল। বাকি ৩৯ বিঘা জমিতে নির্মিত হয় প্রশাসনিক কার্যালয়, আবাসিক ভবন, পলুপোকা পালন ঘর, তাঁতঘরসহ মোট ১৯টি ভবন ও চারটি পুকুর। বর্তমানে পলু পালন, রেশমগুটি ও রেশমডিম উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। সীমিত পরিসরে এখন শুধু তুঁতচারা উৎপাদন হচ্ছে।
প্রতিষ্ঠানটির ১৭টি অনুমোদিত পদের মধ্যে বর্তমানে কর্মরত আছেন শুধু একজন- বীজাগারের ম্যানেজার। বাকি সব পদ খালি। একসময় যেখানে শতাধিক শ্রমিকের কর্মসংস্থান ছিল, সেখানে এখন দৈনিক হাজিরাভিত্তিক শ্রমিক রয়েছেন মাত্র ২২ জন। সঙ্গে আছেন দুজন নৈশপ্রহরী এবং চুক্তিভিত্তিক এক কম্পিউটার অপারেটর।
২০১৯ সালের জুন মাসে পাঁচ শ্রমিক অবসর গ্রহণের পর তাদের বকেয়া বেতন নিয়ে বিরোধ দেখা দেয়। শ্রমিকরা তখন আন্দোলনে নামেন। দীর্ঘদিন অচলাবস্থার পর কর্তৃপক্ষ বীজাগারের সব কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করে। এরপর ২০২১ সালের ১৮ অক্টোবর রেশম উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় সীমিত আকারে তুঁতচারা উৎপাদনের অনুমোদন দেওয়া হয়। সেই থেকে কেবল ওই কাজটিই চলছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, বিশাল জমিতে তুঁতগাছের জমি এখন আগাছা ও ঝোপে ঢাকা। একতলা চারটি ও দোতলা দুটি ভবনের মধ্যে চারটি ভবন সম্পূর্ণ ব্যবহার অযোগ্য। ছাদের পলেস্তারা খসে পড়েছে, জানালা-দরজা ভাঙা, দেয়ালে লতাপাতা ছেয়ে গেছে। মানুষবিহীন ভবনগুলো এখন যেন ভুতুড়ে পরিবেশের সৃষ্টি করেছে।
দুই-তিনজন শ্রমিকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একসময় এই বীজাগারে তুঁতের চারা উৎপাদনের পাশাপাশি পলুপোকা পালন, রেশমডিম ও রেশমগুটি উৎপাদন হতো। এখানকার রেশমসুতা যেত রাজশাহী সিল্ক কারখানায়। সেই সুতায় তৈরি হতো বিখ্যাত সিল্কের শাড়ি ও নানা পোশাক। শ্রমিকদের ভাষায়, ‘ছয় বছর ধরে এসব কার্যক্রম বন্ধ। এখন শুধু তুঁতের চারা উৎপাদন হচ্ছে।’
রেশম বীজাগারের ব্যবস্থাপক খোকন আলী জানান, ‘এখানে মোট ১৭টি পদ রয়েছে। কিন্তু কার্যক্রম বন্ধ থাকায় আমি ছাড়া আর কেউ কর্মরত নেই।’ তিনি বলেন, ‘ছয় বছর ধরে পলুপোকা পালন, রেশমডিম ও রেশমগুটি উৎপাদন বন্ধ। পুরো এলাকা এখন জঙ্গলে ভরা। অর্থের অভাবে পরিষ্কার করা যাচ্ছে না।’