একের পর এক ধারবাহিকভাবে সফলতা উপহার দিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দলের মেয়েরা। বিশ্বের কাছে বাংলাদেশকে নতুন করে পরিচিত করছে তারা। তাদের সফলতার পথটা কেমন ছিল? অধিনায়ক নিগার সুলতানা জ্যোতির সঙ্গে কথা বলেছেন পার্থ রায়
আমি যখন ক্রিকেট খেলা শুরু করি তখন মেয়েরাও যে ক্রিকেট খেলে বিষয়টা খুব অল্পসংখ্যক মানুষ জানত। বিশেষ করে মফস্বল শহরে থাকায় আমার পরিবারের জন্য বিষয়টি আরও বেশি কঠিন ছিল। জার্সি-ট্রাউজার পরে বাসা থেকে বের হয়ে অনুশীলনে যাওয়া ব্যাপারটি আমি ও আমার পরিবার উভয়ের জন্য কঠিন ছিল। মেয়ে হয়েও ছেলেদের মতো মাঠে খেলার অনুশীলন করছি এটা আশেপাশের কেউ ভালোভাবে নেয়নি। কারণ, বাইরে খেলা মানেই ছেলেদের বিষয়। বিশেষ করে ক্রিকেট কখনো মেয়েদের খেলা হতে পারে না। নিয়মিতই নানা কটু কথা শুনতাম। আমার পরিবারকেও সুযোগ পেলে লোকে কথা শোনাত। তবে এটাও সত্যি বাধা পেরিয়ে যেতে পারলে সাফল্য ধরা দেয়। ২০১৫ সালে যখন আমি জাতীয় দলে ডাক পাই তখন এই সমালোচনা করা মানুষগুলোর ব্যবহার আমূল বদলে যেতে দেখেছি। যখন প্রতিষ্ঠিত হওয়া শুরু করলাম তখন কিন্তু সবাই আমাকে সমর্থন করা শুরু করেছে। আসলে এটাই স্বাভাবিক। মানুষের সহজাত প্রবৃত্তিই এমন যে, সাফল্য পছন্দ করে। গত ১০ বছরের প্রেক্ষাপট হিসেবে বলতে গেলে বিগত দুই বছরে মেয়েদের খেলার বিষয়টি মানুষের কাছে স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। এখন ছেলেদের ক্রিকেট যেমন সমর্থন পায় আমরাও ঠিক তেমনই পাচ্ছি। সুযোগ-সুবিধাও পাচ্ছি। তবুও অর্থনৈতিকভাবে এখনো আমরা ছেলেদের সমান নই। আশা করি এই বৈষম্যটুকুও বেশিদিন থাকবে না।
আমরা যারা খেলার জগতে প্রতিষ্ঠিত হতে পেরেছি তাদের পথ চলার গল্পগুলো কম-বেশি একই রকম। ফুটবল বা ক্রিকেটের মতো অন্য খেলায় এখনো মেয়েদের জন্য পরিবেশ এত মানসম্পন্ন হয়ে ওঠেনি। কারণ এই খেলা দুটির প্রচার এবং জনপ্রিয়তা বেশি। পাশাপাশি আর্থিক সুবিধাও তুলনামূলক বেশি। ক্রিকেটের সঙ্গে তুলনা করলে অন্যান্য খেলার চেয়ে অনেক ভালো অবস্থায় আছি আমরা। আমাদের বোর্ডের সিস্টেম ভালো, ঘরোয়া লিগ ভালো। যেটা অন্যান্য খেলায় দেখা যায় না। তাই অন্যান্য খেলার মেয়েদের চাওয়াও খুব বেশি নয়। তারা নিজেদের আগ্রহ আর ভালোবাসা থেকে খেলার জগতে আসে। তাই কিছুটা ভালো পরিবেশ আর ভালো বেতন পেলেই তারা খুশি। সেকারণে প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও অনেক মেয়ে খেলাধুলাকে পেশা হিসেবে বেছে নিতে পারছেন না। কারণ একটাই, সম-সুযোগ ও অধিকারের জায়গাটা আমরা তৈরি করতে পারছি না। প্রতিবেশী দেশ ভারতের চিত্রটা ভিন্ন। সেখানে ছেলে বা মেয়েতে কোনো পার্থক্য নেই। তাদের দুই দলই সমানতালে এগোচ্ছে। নারীদের আইপিএল হচ্ছে সেখানে। সেখান থেকে বোর্ড অনেক আয় করছে। কারণ সেটাকে তারা ব্যবসাসফল করতে পেরেছে। খেলোয়াড়দের যত ভালো পরিবেশ আর সুযোগ দেওয়া সম্ভব হবে তত ভালোভাবে তারা নিজেদের মেলে ধরতে পারবে।
মাত্রই আমরা খুব ধুমধাম করে নারী দিবস পালন করলাম। অথচ এই দিনের রেশ কাটতে না কাটতে মেয়েদের নিয়ে মাতামাতি থেমে যায়। অথচ আমরা যদি মেয়েদের সমস্যা নিয়ে নিয়মিত সচেতন হতাম, তাদের কাজ যথাযথভাবে প্রচার করতে পারতাম তাহলে তারা ছেলেদের মতোই নিজেদের মেলে ধরতে পারত। পরিশেষে বলতে চাই সব সেক্টরের মেয়েদের নিয়ে সব সময় সবদিন কথা হোক, আলোচনা হোক। শুধুমাত্র নারী দিবসে মেয়েদের অধিকার বা কর্মপরিবেশ নিয়ে কথা বলে লাভ কিছু হবে না। মেয়েদের সমস্যা ও সুযোগ নিয়ে সারা বছর কথা হোক, এটাই চাওয়া।
জাহ্নবী