বনে নতুন বছর উদযাপনের তোড়জোড় চলছে। প্রাণীরা সবাই উৎসবের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত। কেউ মঞ্চ সাজাচ্ছে, কেউ গান রেকর্ড করছে, আবার কেউ আতিথ্য সামলানোর দায়িত্বে। বাঘ মামা, যিনি সব সময় নিজের রাজকীয় ভাব বজায় রাখেন, এবার নতুন কিছু করার ঘোষণা দিলেন।
‘আমি আতশবাজি ফোটাব!’ বাঘ মামা গর্জন করে বললেন।
সবাই থমকে গেল। বাঘ মামা কখনো এর আগে আতশবাজি ফোটাননি। তবু কেউ কিছু বলার সাহস পেল না। রাজা যখন ঘোষণা দিয়েছেন, তখন তো মানতেই হবে।
শেয়াল মামাকে শহর থেকে নানা ধরনের আতশবাজি আনার দায়িত্ব দেওয়া হলো। হাতি মামা সাহায্য করল টিলার ওপরে একটা বড় জায়গা ঠিক করতে, যেখান থেকে পুরো বন আতশবাজি দেখতে পাবে। তবে একটা সমস্যা থেকেই গেল। বাঘ মামার আতশবাজি ফোটানো নিয়ে অভিজ্ঞতা ছিল না। কিন্তু তিনি কারও কাছ থেকে শেখার প্রয়োজনও অনুভব করলেন না। তার মতে, ‘রাজারা সব পারে!’
৩১ ডিসেম্বরের রাত। বন সাজানো হয়েছে নানা রঙের আলো দিয়ে। প্রাণীরা একে অপরকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছে, খাওয়া-দাওয়ার ধুম চলছে। পাখিরা গান গাইছে, ময়ূর নাচ দেখাচ্ছে, আর বানর কাকু নিজের মজার মজার কাণ্ড দেখিয়ে সবাইকে মাতিয়ে তুলছে।
সবাই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে আতশবাজির জন্য। রাত ১২টা বাজলেই বাঘ মামার আতশবাজি শুরু হবে। টিলার ওপর বাঘ মামা রাজকীয় ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছেন। হাতে জ্বলন্ত কাঠি নিয়ে তিনি আতশবাজির দিকে এগোলেন।
সমস্যাটা হলো, আতশবাজি খুব সাবধানে ধরাতে হয় ধীরে ধীরে। অথচ বাঘ মামা হুট করে কাঠি আতশবাজির খুব কাছে নিয়ে গেলেন। মুহূর্তেই আতশবাজি জ্বলে উঠল।
আতশবাজি বিকট শব্দে ফেটে গেল। বাঘ মামা ভয় পেয়ে লাফিয়ে পেছনে সরে গেলেন। আতশবাজির কিছু অংশ তার লেজে পড়ে আগুন ধরিয়ে দিল। বাঘ মামা চিৎকার করতে করতে এদিক-ওদিক ছুটতে লাগলেন।
‘আগুন! আগুন! আমার লেজে আগুন!’
তার এই চিৎকার শুনে সবাই হতবাক হয়ে গেল। কিন্তু যখন দেখল বাঘ মামা দৌড়াচ্ছেন, তখন কেউ হাসি থামাতে পারল না।
বানর কাকু দ্রুত একটা কলার পাতায় পানি ভরে ছুটে এল। চিৎকার করে বলল, এদিকে আসুন, রাজা মহারাজ।
অনেক কষ্টে বাঘ মামা থামলেন। বানর কাকু তার লেজে পানি ঢেলে আগুন নিভিয়ে দিল।
দুর্ঘটনার পর বাঘ মামা লজ্জায় মাথা নিচু করে বসে পড়লেন। ‘আমি ভুল করেছি,’ তিনি ধীরে ধীরে বললেন। ‘ভেবেছিলাম, রাজা হওয়ার কারণে আমি সবকিছু জানি। কিন্তু শেখার কোনো বিকল্প নেই।’
শেয়াল মামা বললেন, ‘এটাই আমাদের সবার জন্য শিক্ষা। কাজ করার আগে তা শেখা জরুরি। রাজা হোন বা প্রজা, শেখার প্রয়োজন সবার।’
সবাই মাথা নাড়ল। বনের প্রাণীরা প্রতিজ্ঞা করল, নতুন বছরে তারা আরও সাবধানি হবে এবং যা জানে না, তা শেখার চেষ্টা করবে।
সেই রাতেই নতুন বছরের উদযাপন আবার শুরু হলো। যদিও বাঘ মামার দুর্ঘটনা সবাইকে একটা শিক্ষণীয় বার্তা দিয়ে গেল, তা নিয়ে হাসাহাসিও কম হলো না। বাঘ মামা নিজে হাসতে হাসতে বললেন, ‘আমার লেজ বাঁচাতে গিয়ে আমি শিখলাম, অহংকার সত্যিই পতনের কারণ।’