ঢাকা ২ শ্রাবণ ১৪৩৩, শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬

সর্বশেষ
কঙ্গোয় মরদেহ পরিবহনে ইবোলা ছড়ানোর নতুন ঝুঁকি: জাতিসংঘ শেখ হাসিনাকে ফেরানোর অনুরোধ খতিয়ে দেখছে ভারত: জয়সওয়াল মেক্সিকো উপকূলে ৭.৪ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প ২ মাসের শিশুর পা মুচড়ে দেওয়ার ঘটনায় অভিযুক্ত চাচি গ্রেপ্তার না ফেরার দেশে ক্রিকেট কিংবদন্তি স্যার গ্যারি সোবার্স সেই মেটলাইফেই শিরোপার লড়াইয়ে মেসি জাতিসংঘে গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী: জলবায়ু-সহনশীল নগর উন্নয়নে বাংলাদেশের অঙ্গীকার সংকট কাটিয়ে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে: মির্জা ফখরুল ফরিদপুরে কলেজছাত্র হত্যা, প্রতিপক্ষের বাড়িতে তাণ্ডব স্কুলের জমি দখল করে রাস্তা নির্মাণের অভিযোগ এনসিপি নেতা কাফির বিরুদ্ধে হিলিতে কৃষি প্রণোদনা ও পুনর্বাসন কর্মসূচির উদ্বোধন কাশিমপুর কারাগার থেকে নারী বন্দী উধাও! সিরিজে সমতা আনল বাংলাদেশ হাতিয়ায় বেড়িবাঁধ ভেঙে তিন ওয়ার্ড প্লাবিত, চরম দুর্ভোগে হাজারো মানুষ বেলুচিস্তানে রক্তক্ষয়ী হামলা, ৪৫ সেনা হত্যার দাবি প্রশাসনের ব্যাখ্যা নেই, ভাঙা হচ্ছে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাস্কর্য বর্ষার রঙে মাতল ঢাকা, আয় বন্যার্তদের জন্য কক্সবাজার সৈকতে টর্নেডো, আতঙ্কে ছোটাছুটি সাতকানিয়ায় বন্যাকবলিত সহস্রাধিক মানুষকে বিনামূল্যে চিকিৎসা ও ওষুধ প্রদান ডিজিটাল তথ্যভাণ্ডারে যুক্ত হচ্ছেন ৪৩ লাখ কৃষক: কৃষিমন্ত্রী কাপ্তাই হ্রদের পানি বৃদ্ধি, শনিবার খোলা হবে ১৬ জলকপাট সাগরে বৈরী আবহাওয়া, ৩ নম্বর সতর্ক সংকেত জারি কাবাডি মাঠে জাইমা রহমান, বাংলাদেশের দুর্দান্ত জয় মনপুরায় মেঘনার পানি বিপৎসীমার ওপরে, পানিবন্দি ১০ হাজার মানুষ হামের উপসর্গে মৃত্যু বাড়ছে, মোট প্রাণহানি ৭৮০ প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে সাংবাদিকদের দক্ষতা বাড়াতে হবে: ফারুক ওয়াসিফ টোপো গিগিও সেলিব্রেশনের ইতিহাস কি? চট্টগ্রামে ত্রাণ বিতরণে মঞ্চ ভেঙে পদদলিত, আহত ৩ স্মার্ট পেশা সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট বন্যার্তদের সহায়তায় গাইবেন রুনা লায়লা

মিঠাই

প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬, ০৪:১১ পিএম
মিঠাই
এঁকেছেন মাসুম

বিকেলের আকাশটা যখন কয়লার মতো কালো হয়ে আসছিল, তখন পঞ্চম শ্রেণির সামি বারান্দার খুঁটি ধরে মেঘ দেখছিল। আজ হাটের দিন। হাট থেকে ফেরার সময় আব্বু কত কী নিয়ে আসেন। থাকে লাল মিঠাই। সেই মিঠাই একা খাওয়ার নিয়ম নেই সামিদের ঘরে। চার বছরের ছোট ভাই রাফিকে একদম মেপে মেপে সমান দুই ভাগে ভাগ করে দিতে হয়। আধখানা মিঠাই মুখে পুরে রাফির গালে যে টোল-পড়া হাসি ফুটে ওঠে, সেটার জন্যই তো সামির যত অপেক্ষা।
কিন্তু আজকের রুপালি বিকেলটা মুহূর্তেই কেমন যেন হিংস্র হয়ে উঠল। শুরু হলো মুষলধারে বৃষ্টি। দেখতে দেখতে নদীর উপচে পড়া ঘোলা পানি এসে ঢুকল ওদের উঠানে।
সামি ব্যাকুল হয়ে মাকে জিজ্ঞেস করল, ‘আম্মু, আব্বু কখন আসবে?’
মা আকাশের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস চেপে বললেন, ‘এই তো রে বাপ, বৃষ্টিটা একটু কমলেই তর আব্বু চলে আসবে।’
ঠাণ্ডা হাওয়া সইতে না পেরে নরম সুতির পাতলা কাঁথাটা গায়ে জড়িয়ে ঘরের খাটে পাশাপাশি শুয়ে পড়ল সামি আর রাফি। পাশে বসে মা ওদের কপালে হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। বাইরে বৃষ্টির একটানা ঝমঝম শব্দ আর ঘরের ভেতরে মায়ের চাদরের ওম–দুই ভাই কথা বলতে বলতে কখন যে ঘুমের দেশে তলিয়ে গেল, টের পেল না। তখন ঘড়িতে রাত ৯টা। বৃষ্টি থামার কোনো লক্ষণই নেই, বরং পানির গর্জন বাড়ছে।
ছেলেরা ঘুমিয়ে পড়তেই সামির মা দুশ্চিন্তা নিয়ে বাইরে বের হলেন। টর্চের আলো ফেলতেই তার বুকটা কেঁপে উঠল। বানের তোড়ে হাঁস-মুরগির খোপটা ভেসে যাচ্ছে! মা আর এক মুহূর্তও দেরি না করে গোয়ালঘরের দিকে ছুটলেন। কোনো রকমে ছাগল দুটিকে টেনে-হিঁচড়ে এনে বড় ঘরে তুললেন। কিন্তু পানি এত দ্রুত বাড়ছিল যে, চোখের পলকে তা কোমরসমান হয়ে গেল। মা আবার গোয়ালের দিকে ছুটলেন বড় গাভীটাকে বাঁচাতে, কিন্তু গিয়ে দেখলেন সর্বনাশা স্রোত ততক্ষণে ওটাকে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে অন্ধকারের দিকে।
‘হায়রে! আমার কী হবে!’ বলতে বলতে মা যখন ঘরের দিকে দৌড়ে এলেন, তখন ঘরের ভেতর লণ্ডভণ্ড দশা। খাটখানা ভাসছে, সাধের কাঠের আলমারিটা স্রোতের টানে দরজার বাইরে চলে যাচ্ছে।
কিন্তু খাটের ওপর তো কেউ নেই!
‘সামি! রাফি! কোথায় তোরা?’
মায়ের কণ্ঠ চিরে এক আর্তনাদ বেরিয়ে এল। অন্ধকার রাতে, বুকসমান পানির তোড়ের সঙ্গে যুদ্ধ করে মা পাগলের মতো খুঁজে বেড়াতে লাগলেন তার কলিজার টুকরো দুটিকে।
ঠিক কিছুক্ষণ আগে, যখন প্রথম পানির বড় একটা ঢেউ ঘরের দেয়াল ভেঙে ভেতরে ঢুকেছিল, ঘুমে থাকা দুই ভাই আঁতকে উঠেছিল।
‘মা! মা! বাঁচাও!’ বলে চিৎকার করেছিল ওরা। কিন্তু মা তখন গোয়ালঘরে, বৃষ্টির প্রচণ্ড শব্দে সেই আকুল ডাক মায়ের কান পর্যন্ত পৌঁছায়নি।
পানির নিষ্ঠুর স্রোত দুই ভাইকে একটুও সময় দিল না। খাট থেকে নামিয়ে ভাসিয়ে নিয়ে চলল উঠান পেরিয়ে। চার বছরের রাফি ভয়ে বড় ভাই সামিকে আঠার মতো জড়িয়ে ধরে রাখল। ১০ বছরের সামি বুঝতে পারছিল, রাফিকে হাতছাড়া করলে এই কুচকুচে অন্ধকার রাতে ও চিরতরে হারিয়ে যাবে। ও ছোট ভাইকে এক হাতে জাপটে ধরে অন্য হাতে পানির ওপর মরিয়া হয়ে আশ্রয়ের কিছু একটা খুঁজতে লাগল।
ঠিক তখনই স্রোতের টানে ভেসে যাওয়ার সময় সামির হাত ঠেকল একটা বড় আম গাছের ডালে। সামি তার শরীরের সবটুকু শক্তি এক করে ডালটা আঁকড়ে ধরল। তারপর নিজে উঠে, টেনে তুলল ছোট্ট রাফিকে। দুই ভাই একদম গাছের মগডালে গিয়ে বসল।
নিচে তখন কালো পানির গর্জন। রাফি ঠাণ্ডায় আর আতঙ্কে থরথর করে কাঁপছে। সামির কাঁধ ভিজিয়ে দিয়ে ও ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে, ‘ভাইয়া, মা... ও মা... আব্বু আসেনি?’
গাছের মাথায় কাটতে লাগল এক অবর্ণনীয় করুণ রাত। বৃষ্টিতে ভিজছে দুই ভাই, বাতাসে কাঁপছে পাতার মতো। হঠাৎ টর্চের আলোর মতো একজোড়া চোখ জ্বলজ্বল করে উঠল ঠিক পাশের ডালটায়। সামি ভালো করে তাকিয়ে দেখল–একটা মস্ত বড় গোখরা সাপ!
ভয়ে সামির জিভ শুকিয়ে গেল। ও রাফিকে আরও শক্ত করে বুকে চেপে ধরল, যাতে রাফি ওদিকে তাকিয়ে চিৎকার না করে। কিন্তু প্রকৃতির এই মহাবিপদে সাপটাও আজ তার হিংস্রতা ভুলে গেছে। সেও নিজের প্রাণ বাঁচাতে ওই ডালে কুণ্ডলি পাকিয়ে অবশ হয়ে বসে আছে। সাপ আর মানুষ–দুটি ভিন্ন প্রাণ আজ একই নিয়তির সুতায় বাঁধা। সাপটি ওদের দিকে তাকিয়েও কোনো ক্ষতি করল না। সেও যেন বৃষ্টির পানিতে ভিজতে ভিজতে কাঁপছে আর ভোরের আলো খুঁজছে।
নিচে মা এখনো বুকসমান পানিতে ভেসে ভেসে ডাকছেন, ‘সামি... রাফি...’। হাট থেকে ফিরতে না পারা বাবা হয়তো নদীর ওপাড়ে দাঁড়িয়ে ভেজা পকেটে হাত দিয়ে কাঁদছেন। যে মিঠাইয়ের টুকরো দুটি আজ দুই ভাইয়ের মুখে হাসির জোয়ার ফোটানোর কথা ছিল, সেই সাধের মিঠাই হয়তো এতক্ষণে বানের জলে গলে মিশে গেছে।
বুকের ভেতর কালসাপের ভয় আর চোখে এক নদী আশা নিয়ে, দুই ভাই অন্ধকার আকাশের দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করতে লাগল–কখন হবে সকালের আকাশ, কখন থামবে এই অভিশপ্ত বানের রাত!

বুদ্ধির জোর

প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬, ০৪:৪৭ পিএম
বুদ্ধির জোর
এঁকেছেন মাসুম

পাহাড়ের কোলঘেঁষা ছোট্ট এক বন। বনের পূর্বদিকটা অসংখ্য ঝোপ-জংলায় ঠাসা। চারপাশ ঘুটঘুটে অন্ধকার। রাতের বেলা ভূতুড়ে লাগে। তা হবে না কেন? 
সেই বনে বাস করত একদল মাকড়সা। প্রতিটি মাকড়সা প্রতিদিন পাঁচটি করে জাল বুনত। তাদের রাজা ঝনঝার সব কাজ তদারকি করত। জালের সংখ্যা বেশি হওয়ায় নিত্যনতুন ছোট ছোট পোকামাকড় আটকে যেত। বিশেষ করে জোনাকির সংখ্যা ছিল অগণিত। ঝনঝার ও তার দল এসব জোনাকি ধরে দিব্যি ভূরিভোজ করত।
এদিকে জোনাকিদের রাজা টমটম বেশ চিন্তিত হয়ে পড়ল। প্রতিদিন জোনাকির সংখ্যা কমে যাচ্ছিল। কারণ কী? সে কিছুটা হতভম্ব হলো। 
বিষয়টি খতিয়ে দেখতে জোনাকির কয়েকজন দলীয় নেতাকে দায়িত্ব দিল। তারা এক সপ্তাহ ধরে বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করল। অবশেষে জানাল, ‘মহারাজ! সবই লোভী মাকড়সার জালের কারসাজি!’
জরুরি মিটিং ডাকা হলো। টমটম গম্ভীর গলায় বলল, ‘সাবধান! কেউ ভুলেও লোভী মাকড়সার ফাঁদে পা দেবে না। দিলেই বিপদ!’
কিন্তু কে শোনে কার কথা? রোজই অনেক জোনাকি অজান্তে জালে আটকে পড়ছিল। জোনাকিদের মধ্যে ভয় আর আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল। কীভাবে এই বিপদ থেকে মুক্তি পাবে? টমটমের চিন্তা ক্রমাগত বাড়তে লাগল।
শেষ পর্যন্ত সে ঝনঝারের কাছে গিয়ে অনুরোধ করল, ‘আমরা বনে স্বাধীনভাবে বাঁচতে চাই। তোমাদের চারদিকে ছড়িয়ে থাকা জাল আমাদের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদি জালগুলো এক জায়গায় রাখতে, তাহলে আমাদের এত ক্ষতি হতো না।’
ঝনঝার কোনো কথাই গ্রাহ্য করল না। উল্টো টমটমকে বকাবকি করল। রাগে-অভিমানে টমটমের চোখে জল এল। ডুকরে কাঁদতে ইচ্ছা হলো। তবু নিজেকে সান্ত্বনা দিল। কী আর করবে? মনে এক ফন্দি আঁটল। শক্তি দিয়ে নয়, এর জন্য দরকার বুদ্ধির জোর! মরার আগে মাকড়সাদের শায়েস্তা করতে হবে।
তখন কিছু সাহসী জোনাকি বন পেরিয়ে কৃষকের সবুজ মাঠে পৌঁছাল। কীটনাশক ছড়ানো একটি খেত খুঁজে বের করল। সামান্য কীটনাশক গায়ে মেখে তারা ইচ্ছা করেই মাকড়সার জালে গিয়ে আটকা পড়ল। 
এদিকে মাকড়সারা সাধারণ জোনাকি ভেবে কীটনাশক মাখা জোনাকিগুলো খেল। খাওয়ার কিছুক্ষণ পরই...ওরে বাবা! সবার মাথা ঘুরছে! পেটে মোচড় দিচ্ছে! প্রাণভয়ে তারা জাল ছেড়ে পালিয়ে গেল।
লোভী মাকড়সাদের পালিয়ে যাওয়া দৃশ্য দেখে জোনাকিরা বেশ খুশি হলো। আনন্দে গান ধরল। ‘জয়! জয়! বুদ্ধির জয়!’ সেই গানে গোটা বন মুখরিত হয়ে উঠল। 
কয়েক দিনের মধ্যেই পরিত্যক্ত জালগুলো ধুলা-ময়লায় ঢেকে একসময় ছিঁড়ে গেল। সেদিন থেকে বনবাসীরা বুঝল, শক্তির চেয়ে বুদ্ধির জোরই বড়। আর লোভের পরিণতি কখনোই ভালো হয় না।

ব্যাঙের শিক্ষা

প্রকাশ: ১০ জুলাই ২০২৬, ০২:০০ পিএম
ব্যাঙের শিক্ষা
এঁকেছেন মাসুম

এক বনে ছিল ছোট্ট এক কুনোব্যাঙের ছানা, নাম তার টুপ্পু। টুপ্পু দেখতে যেমন গোলগাল আদুরে, তেমনি তার স্বভাব ছিল ভীষণ চঞ্চল। সারা দিন সে টুপটাপ করে এখানে-সেখানে লাফিয়ে বেড়াত। কিন্তু তার একটা মস্ত বড় দোষ ছিল–সে কারও কথা শুনত না, বড়দের দেওয়া কোনো নিয়মকানুন বা শিক্ষা একদম পাত্তা দিত না। সে মনে মনে ভাবত, ‘আমি তো এত সুন্দর লাফাতে পারি, পোকা ধরতে পারি, আমার আবার নতুন করে শিক্ষার কী দরকার?’
বর্ষাকাল শুরু হতেই বনের চারপাশ পানিতে থই থই করতে লাগল। টুপ্পুর বাবা-মা তাকে ডেকে বললেন, ‘টুপ্পু, বর্ষার সময় বনের বড় দীঘিটায় কিন্তু একদম যাবে না। ওখানে একটা মস্ত বড় বোয়াল মাছ আর একটা ধূর্ত বক ওঁৎ পেতে থাকে। বড়দের কাছ থেকে আগে শেখ, কীভাবে বিপদে নিজেকে রক্ষা করতে হয়।’
টুপ্পু তার স্বভাবসুলভ কায়দায় ঠোঁট উল্টে বলল, ‘ধুর! আমি সব জানি। আমার চেয়ে ভালো কে লাফাতে পারে? আমার কোনো শিক্ষার দরকার নেই।’
এই বলে সে নিজের খেয়ালে গান গাইতে গাইতে দীঘির দিকে রওনা দিল।
দীঘির পাড়ে এসে টুপ্পু মনের সুখে লাফালাফি শুরু করল। ঠিক তখনই পাশের একটা কচুরিপানার আড়ালে বসে থাকা এক মস্ত বুড়ো কচ্ছপ তাকে দেখে বলল, ‘খোকন ব্যাঙ, এভাবে খোলা জায়গায় থেকো না। আকাশের দিকে তাকিয়েছ? ওই দেখো, বকপাখি উড়ছে। বিপদ চেনার শিক্ষাটা অন্তত নাও!’
টুপ্পু কচ্ছপ দাদুর কথা হেসেই উড়িয়ে দিল। সে বলল, ‘আরে দাদু, বক তো সাদা ধবধবে, দেখতে কত সুন্দর! ও কেন আমার ক্ষতি করবে? তোমরা বড্ড বেশি ভয় পাও।’
কিছুক্ষণ পর টুপ্পুর খুব খিদে পেল। সে দেখল দীঘির জলের ওপর সুন্দর একটা লালচে রঙের ফড়িং ভাসছে। ফড়িংটা অদ্ভুতভাবে নড়াচড়া করছে। টুপ্পু তো ভারি খুশি! সে ভাবল, ‘বাহ্! আজ তো চমৎকার শিকার পেয়েছি।’
এক লাফে ফড়িংটা ধরতে যাবে, এমন সময় দীঘির অভিজ্ঞ এক বুড়ো কোলাব্যাঙ দূর থেকে চিৎকার করে বলল, ‘টুপ্পু, থামো! ওটা আসল ফড়িং নয়। ভালো করে লক্ষ করো, ওটা বোয়াল মাছের জিভের ডগা! শিকারি মাছেরা ওভাবে শিকার ভোলায়। বড়দের কাছ থেকে এই শিক্ষাটা নাও!’
কিন্তু টুপ্পু তো কারও বারণ শোনার পাত্র নয়। সে মনে মনে বলল, ‘সবাই আমাকে শুধু জ্ঞান দিতে আসে!’ সে কথা না শুনেই দিল এক মস্ত লাফ।
যেমন লাফ দেওয়া, অমনি জলের নিচ থেকে হা করে বেরিয়ে এল বোয়াল মাছের মস্ত বড় মুখ! টুপ্পু তো ভয়ে হিম হয়ে গেল। একদম শেষ মুহূর্তে সে বুঝতে পারল বড়দের কথা না শোনার পরিণতি কী। বোয়াল মাছটি কামড় দেওয়ার ঠিক এক সেকেন্ড আগে টুপ্পু তার সর্বশক্তি দিয়ে উল্টো দিকে একটা আছাড় খেয়ে লাফ দিল। কোনোমতে বোয়াল মাছের ধারাল দাঁত থেকে বেঁচে সে ডাঙায় এসে আছাড় খেয়ে পড়ল।
কিন্তু বিপদ সেখানেই শেষ হলো না। ডাঙায় পড়তেই তার মাথার ওপর এসে পড়ল একটা মস্ত বড় ছায়া। ওপর থেকে ধপাস করে নেমে এল বকপাখির দীর্ঘ ঠোঁট! বকের ঠোঁট টুপ্পুর পিঠ ছুঁইছুঁই, ঠিক তখনই তার মাথায় খেলে গেল মায়ের একটা কথা, ‘বিপদে পড়লে কখনো সোজা পালাবি না টুপ্পু, সব সময় আঁকাবাঁকা হয়ে লাফাবি।’
টুপ্পু আর এক মুহূর্তও নষ্ট না করে আঁকাবাঁকা হয়ে লাফাতে শুরু করল। বকপাখিটা বারবার ঠোঁট চালাল, কিন্তু টুপ্পুর আঁকাবাঁকা লাফের কৌশলের কাছে প্রতিবারই লক্ষ্যভ্রষ্ট হলো। শেষমেশ টুপ্পু একটা ঘন কাঁটাঝোপের নিচে গিয়ে আশ্রয় নিল, যেখানে বকের ঠোঁট পৌঁছাতে পারল না।
কাঁটাঝোপের ভেতর বসে টুপ্পু ভয়ে ঠকঠক করে কাঁপতে লাগল। সে আজ হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারল, বড়দের দেওয়া শিক্ষার কত দাম। যদি সে বোয়াল মাছের কৌশলটা আগে থেকে শিখে রাখত, তবে আজ তার এই অবস্থা হতো না। আর যদি মায়ের দেওয়া ওই ছোট্ট শিক্ষাটা মাথায় না রাখত, তবে এতক্ষণে সে বকের পেটে চলে যেত।
বিকেলের দিকে বিপদ কেটে গেলে টুপ্পু গুটিগুটি পায়ে বাড়ি ফিরে এল। তার চোখে তখন অনুশোচনার জল। সে তার বাবা-মাকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘আমি বড় ভুল করেছি। শিক্ষা ছাড়া জীবনে কখনো নিরাপদ থাকা যায় না। আজ থেকে তোমরা আমাকে যা শেখাবে, আমি মন দিয়ে তা শিখব।’
সেই থেকে টুপ্পু বনের সবচেয়ে লক্ষ্মী আর বুদ্ধিমান ব্যাঙ হয়ে উঠল। এখন সে আর অহংকার করে না, বরং বড়দের প্রতিটি কথা ও শিক্ষা পরম আদরে মেনে চলে।

ইশপের গল্প শিয়াল ও ছাগল

প্রকাশ: ০৩ জুলাই ২০২৬, ০৪:৪৭ পিএম
শিয়াল ও ছাগল
এঁকেছেন মাসুম

একদা এক চালাক শিয়াল ছিল। একদিন পানি খেতে গিয়ে সে এক কুয়ার মধ্যে পড়ে গেল। অনেক চেষ্টা করেও সে কিছুতেই উপরে উঠতে পারল না। 
ইতোমধ্যে এক বোকা ছাগল কুয়ার কাছে এসে শিয়ালকে জিজ্ঞাসা করল, ‘ভাই, এই কুয়ার জলটা কেমন?’ 
শিয়াল বলল, ‘ভাই, সত্যি কথা বলতে আমি তো এর চেয়ে মিঠে জল আজ পর্যন্ত খাইনি। এসো, তুমিও খেয়ে দেখো একবার।’
পানি খেতে বোকা ছাগলও কুয়াতে নামল। তখন ছাগলও একই সমস্যায় পড়ল। 
শিয়াল বলল, আমার মাথায় একটা বুদ্ধি এসেছে, যাতে আমরা দুজনেই এই কুয়া থেকে বেরোতে পারব। তুমি তোমার পেছনের পায়ে ওপর দাঁড়াও। আমি তোমার গা বেয়ে উঠে আর তোমার শিং ধরে এক লাফে কুয়া থেকে উপরে উঠে যাব।’
‘কিন্তু আমার কী হবে?’ ছাগল বলল, ‘আমি বেরোব কীভাবে?’ 
‘ঠিক একই ভাবে। তুমি আমার পিঠে উঠে বাইরে বেরিয়ে যাবে।’ 
বোকা ছাগল কিছুই বুঝল না কিন্তু শিয়ালের কথায় রাজি হয়ে গেল। তখনই চালাক শিয়াল তার পিঠে পা রেখে কুয়া থেকে বেরিয়ে গেল। তারপর চলে যেতে লাগল।
ছাগল চিৎকার করল। শিয়াল বলল, ‘বোকা ছাগল বয়স বেড়েছে। বুদ্ধি বাড়েনি। এবার বসে থাকো কুয়ার মধ্যে।’

গল্পের শিক্ষা: শত্রুকে বিশ্বাস করা উচিত নয়।

বিশ্বকাপের তারকা ট্রিওন্ডা

প্রকাশ: ০৩ জুলাই ২০২৬, ০৪:৪৪ পিএম
বিশ্বকাপের তারকা ট্রিওন্ডা
ট্রিওন্ডা

ফুটবল বিশ্বকাপ মানেই নতুন চমক। আর এবারের ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে সেই চমকের নাম ট্রিওন্ডা। এটি তৈরি করেছে বিখ্যাত ক্রীড়াসামগ্রী নির্মাতা প্রতিষ্ঠান অ্যাডিডাস। বিশ্বকাপের প্রতিটি ম্যাচে এই বলই ব্যবহার করা হচ্ছে।
ট্রিওন্ডা নামের অর্থ হলো ‘তিনটি ঢেউ’। এই নামটি রাখা হয়েছে কারণ এবারের বিশ্বকাপ যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো–এই তিনটি দেশ মিলে আয়োজন করছে। বলটির লাল, সবুজ ও নীল রংও তিন স্বাগতিক দেশের প্রতি সম্মান জানায়।
ট্রিওন্ডার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর নতুন চার-প্যানেলের নকশা। সাধারণ ফুটবলের তুলনায় এতে কম অংশ জোড়া লাগানো হয়েছে। ফলে বাতাসে বলটি আরও স্থিরভাবে উড়ে এবং খেলোয়াড়দের পাস, শট ও নিয়ন্ত্রণে সুবিধা হয়। বলের গভীর সেলাই ও বিশেষ বাইরের আবরণ ভেজা আবহাওয়াতেও ভালো গ্রিপ দেয়।
এই বলের ভেতরে রয়েছে একটি অত্যাধুনিক ৫০০ হার্টজ মোশন সেন্সর। এটি প্রতি সেকেন্ডে শত শত তথ্য সংগ্রহ করে। সেই তথ্য ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর) ব্যবস্থায় পাঠানো হয়। ফলে অফসাইড, বলে স্পর্শ হয়েছে কি না বা বিতর্কিত মুহূর্তের সিদ্ধান্ত আরও দ্রুত ও নির্ভুলভাবে নেওয়া সম্ভব হয়।
বলটির গায়ে তিনটি স্বাগতিক দেশের প্রতীকও রয়েছে। কানাডার ম্যাপল পাতা, মেক্সিকোর ঈগল এবং যুক্তরাষ্ট্রের তারকা বলটিকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে। এছাড়া সোনালি রঙের নকশা বিশ্বকাপ ট্রফির স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়।
শুধু একটি ফুটবল নয়, ট্রিওন্ডা আধুনিক প্রযুক্তি, সুন্দর নকশা এবং খেলাধুলার আনন্দকে একসঙ্গে তুলে ধরেছে। তাই এবারের বিশ্বকাপে খেলোয়াড়দের পায়ের সঙ্গে সঙ্গে কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর নজরও রয়েছে এই বিশেষ বলটির দিকে।

প্রজাপতির অভিমান

প্রকাশ: ০৩ জুলাই ২০২৬, ০৪:৩৮ পিএম
প্রজাপতির অভিমান
এঁকেছেন মাসুম

হৃদির আঁকাআঁকি করতে ভীষণ ভালো লাগে। কিন্তু একটা সমস্যা আছে। প্রজাপতি ছাড়া অন্য কিছু সে তেমন ভালো আঁকতে পারে না। গরু আঁকতে গেলে ঘোড়ার মতো হয়ে যায়, পাখি দেখতে লাগে মুরগির মতো, আর আপেল আঁকলে মনে হয় আতাফল। তাই তার ড্রয়িং খাতার প্রায় সব পাতাই ভরা প্রজাপতির ছবিতে। নানা রঙের, নানা ঢঙের প্রজাপতি। কোনোটা দেখতে যেন ফুলপরী, কোনোটা আবার রংধনুর টুকরো। হৃদির আঁকা প্রজাপতিগুলো এত সুন্দর হয় যে, এই বুঝি খাতার পাতা ছেড়ে উড়ে যাবে। এক ফুল থেকে আরেক ফুলে গিয়ে বসবে। এতটাই জীবন্ত সেগুলো।
একদিন স্কুল থেকে ফিরে হৃদি ড্রয়িং খাতা নিয়ে আঁকতে বসল। কিন্তু সেদিন তার মন খুব খারাপ। ক্লাসের রিতু তার একটা ছবি ছিঁড়ে ফেলেছিল। হৃদি ম্যাডামের কাছে বিচার দিয়েছিল। কিন্তু ম্যাডাম উল্টো বলেছিলেন–পড়তে এসে এত আঁকাআঁকি কীসের? কথাটা হৃদির খুব খারাপ লেগেছিল। তার মনে হয়েছিল, আঁকাআঁকি বুঝি কোনো অপরাধ।
মন খারাপ থাকলে যেমন হাত ঠিকমতো কাজ করে না, সেদিনও তেমনই হলো। সে একটা প্রজাপতি আঁকল বটে, কিন্তু পাখাগুলো কেমন ছেঁড়া-ছেঁড়া হয়ে গেল। রংগুলোও মলিন আর এলোমেলো দেখাচ্ছিল। এমন সময় মা ডাকলেন, হৃদি, নাশতা করে যাও। ড্রয়িং খাতা খোলা রেখেই সে চলে গেল।
নাশতা খেয়ে ফিরে এসে হৃদি অবাক হয়ে গেল। যে পাতায় একটু আগে প্রজাপতিটা এঁকেছিল, সেই পাতাটা একেবারে সাদা! সে বিস্ময়ে খাতার দিকে তাকিয়ে আছে, এমন সময় একটা ক্ষীণ কণ্ঠস্বর শোনা গেল।
– তুমি আমাকে একটুও ভালোবাসোনি।
হৃদি চমকে উঠল। তাকিয়ে দেখল, একটু আগে আঁকা সেই প্রজাপতিটাই কথা বলছে।
– আমার পাখাগুলো দেখো। কত ছেঁড়া! রংগুলোও কেমন বিশ্রী! তোমার অন্য প্রজাপতিগুলো আমাকে খেলায় নেয়নি। বলেছে আমি নাকি দেখতে সুন্দর না। ওরা সবাই বাগানে খেলছে। আর আমি একা।
জানালার বাইরে তাকিয়ে হৃদি আরও অবাক হলো–তার খাতার সব প্রজাপতি বাগানে উড়ছে! কেউ ফুলে বসছে, কেউ রোদে নাচছে, কেউ আবার একে অপরকে তাড়া করে খেলছে।
শুধু এই প্রজাপতিটাই একা দাঁড়িয়ে আছে। হৃদির খুব মায়া হলো। সে আস্তে করে বলল,
– আমি দুঃখিত। আসলে আমার মন খুব খারাপ ছিল। তাই তোমাকে ঠিকমতো আঁকতে পারিনি। তুমি যদি আবার খাতায় ফিরে আসো, আমি তোমাকে সবচেয়ে সুন্দর করে আঁকব।
প্রজাপতিটা একটু হাসল। তারপর বলল,
– তাহলে চোখ বন্ধ করো।
হৃদি চোখ বন্ধ করল। কয়েক সেকেন্ড পর চোখ খুলে দেখে প্রজাপতিটা আবার খাতার পাতায় ফিরে এসেছে। সে এবার খুব মন দিয়ে আঁকতে শুরু করল। পাখাগুলো সুন্দর করে গড়ল। তারপর লাল, নীল, হলুদ, বেগুনি, কমলা, সবুজ আর গোলাপি রঙে রাঙিয়ে দিল। এত যত্ন করে সে আগে কখনো কোনো ছবি আঁকেনি। আঁকা শেষ হলে প্রজাপতিটা যেন খুশিতে ঝলমল করে উঠল।
হৃদি এবার নিজেই চোখ বন্ধ করল, কারণ সে বুঝতে পেরেছে–মানুষের চোখের আড়ালেই কেবল এরা জীবন্ত হয়, আর জীবন্ত থেকে খাতায় ছবি হয়ে ফিরে আসে।
কিছুক্ষণ পর চোখ খুলে দেখে জানালার ধারে একটি সুন্দর প্রজাপতি এসে বসেছে। সে উড়ে এসে একটু আগে হৃদির আঁকা প্রজাপতিটার পাশে দাঁড়াল। তারপর দুজনে একসঙ্গে ডানা মেলে আকাশের দিকে উড়ে গেল। যাওয়ার আগে প্রজাপতিটা একবার পেছন ফিরে তাকাল। তার ছোট্ট মুখে ছিল মিষ্টি একটা হাসি। হৃদি বুঝতে পারল, ওটা শুধু বিদায়ের হাসি নয়। ওটা ছিল 
ধন্যবাদের হাসি।
আর সেই দিন থেকে সে আর কখনো মন খারাপ করে কোনো ছবি আঁকেনি। কারণ সে জানে, প্রতিটি ছবিরও হয়তো একটা ছোট্ট মন আছে। আর সেই মনটাকেও যত্ন করতে হয়।