বিকেলের আকাশটা যখন কয়লার মতো কালো হয়ে আসছিল, তখন পঞ্চম শ্রেণির সামি বারান্দার খুঁটি ধরে মেঘ দেখছিল। আজ হাটের দিন। হাট থেকে ফেরার সময় আব্বু কত কী নিয়ে আসেন। থাকে লাল মিঠাই। সেই মিঠাই একা খাওয়ার নিয়ম নেই সামিদের ঘরে। চার বছরের ছোট ভাই রাফিকে একদম মেপে মেপে সমান দুই ভাগে ভাগ করে দিতে হয়। আধখানা মিঠাই মুখে পুরে রাফির গালে যে টোল-পড়া হাসি ফুটে ওঠে, সেটার জন্যই তো সামির যত অপেক্ষা।
কিন্তু আজকের রুপালি বিকেলটা মুহূর্তেই কেমন যেন হিংস্র হয়ে উঠল। শুরু হলো মুষলধারে বৃষ্টি। দেখতে দেখতে নদীর উপচে পড়া ঘোলা পানি এসে ঢুকল ওদের উঠানে।
সামি ব্যাকুল হয়ে মাকে জিজ্ঞেস করল, ‘আম্মু, আব্বু কখন আসবে?’
মা আকাশের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস চেপে বললেন, ‘এই তো রে বাপ, বৃষ্টিটা একটু কমলেই তর আব্বু চলে আসবে।’
ঠাণ্ডা হাওয়া সইতে না পেরে নরম সুতির পাতলা কাঁথাটা গায়ে জড়িয়ে ঘরের খাটে পাশাপাশি শুয়ে পড়ল সামি আর রাফি। পাশে বসে মা ওদের কপালে হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। বাইরে বৃষ্টির একটানা ঝমঝম শব্দ আর ঘরের ভেতরে মায়ের চাদরের ওম–দুই ভাই কথা বলতে বলতে কখন যে ঘুমের দেশে তলিয়ে গেল, টের পেল না। তখন ঘড়িতে রাত ৯টা। বৃষ্টি থামার কোনো লক্ষণই নেই, বরং পানির গর্জন বাড়ছে।
ছেলেরা ঘুমিয়ে পড়তেই সামির মা দুশ্চিন্তা নিয়ে বাইরে বের হলেন। টর্চের আলো ফেলতেই তার বুকটা কেঁপে উঠল। বানের তোড়ে হাঁস-মুরগির খোপটা ভেসে যাচ্ছে! মা আর এক মুহূর্তও দেরি না করে গোয়ালঘরের দিকে ছুটলেন। কোনো রকমে ছাগল দুটিকে টেনে-হিঁচড়ে এনে বড় ঘরে তুললেন। কিন্তু পানি এত দ্রুত বাড়ছিল যে, চোখের পলকে তা কোমরসমান হয়ে গেল। মা আবার গোয়ালের দিকে ছুটলেন বড় গাভীটাকে বাঁচাতে, কিন্তু গিয়ে দেখলেন সর্বনাশা স্রোত ততক্ষণে ওটাকে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে অন্ধকারের দিকে।
‘হায়রে! আমার কী হবে!’ বলতে বলতে মা যখন ঘরের দিকে দৌড়ে এলেন, তখন ঘরের ভেতর লণ্ডভণ্ড দশা। খাটখানা ভাসছে, সাধের কাঠের আলমারিটা স্রোতের টানে দরজার বাইরে চলে যাচ্ছে।
কিন্তু খাটের ওপর তো কেউ নেই!
‘সামি! রাফি! কোথায় তোরা?’
মায়ের কণ্ঠ চিরে এক আর্তনাদ বেরিয়ে এল। অন্ধকার রাতে, বুকসমান পানির তোড়ের সঙ্গে যুদ্ধ করে মা পাগলের মতো খুঁজে বেড়াতে লাগলেন তার কলিজার টুকরো দুটিকে।
ঠিক কিছুক্ষণ আগে, যখন প্রথম পানির বড় একটা ঢেউ ঘরের দেয়াল ভেঙে ভেতরে ঢুকেছিল, ঘুমে থাকা দুই ভাই আঁতকে উঠেছিল।
‘মা! মা! বাঁচাও!’ বলে চিৎকার করেছিল ওরা। কিন্তু মা তখন গোয়ালঘরে, বৃষ্টির প্রচণ্ড শব্দে সেই আকুল ডাক মায়ের কান পর্যন্ত পৌঁছায়নি।
পানির নিষ্ঠুর স্রোত দুই ভাইকে একটুও সময় দিল না। খাট থেকে নামিয়ে ভাসিয়ে নিয়ে চলল উঠান পেরিয়ে। চার বছরের রাফি ভয়ে বড় ভাই সামিকে আঠার মতো জড়িয়ে ধরে রাখল। ১০ বছরের সামি বুঝতে পারছিল, রাফিকে হাতছাড়া করলে এই কুচকুচে অন্ধকার রাতে ও চিরতরে হারিয়ে যাবে। ও ছোট ভাইকে এক হাতে জাপটে ধরে অন্য হাতে পানির ওপর মরিয়া হয়ে আশ্রয়ের কিছু একটা খুঁজতে লাগল।
ঠিক তখনই স্রোতের টানে ভেসে যাওয়ার সময় সামির হাত ঠেকল একটা বড় আম গাছের ডালে। সামি তার শরীরের সবটুকু শক্তি এক করে ডালটা আঁকড়ে ধরল। তারপর নিজে উঠে, টেনে তুলল ছোট্ট রাফিকে। দুই ভাই একদম গাছের মগডালে গিয়ে বসল।
নিচে তখন কালো পানির গর্জন। রাফি ঠাণ্ডায় আর আতঙ্কে থরথর করে কাঁপছে। সামির কাঁধ ভিজিয়ে দিয়ে ও ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে, ‘ভাইয়া, মা... ও মা... আব্বু আসেনি?’
গাছের মাথায় কাটতে লাগল এক অবর্ণনীয় করুণ রাত। বৃষ্টিতে ভিজছে দুই ভাই, বাতাসে কাঁপছে পাতার মতো। হঠাৎ টর্চের আলোর মতো একজোড়া চোখ জ্বলজ্বল করে উঠল ঠিক পাশের ডালটায়। সামি ভালো করে তাকিয়ে দেখল–একটা মস্ত বড় গোখরা সাপ!
ভয়ে সামির জিভ শুকিয়ে গেল। ও রাফিকে আরও শক্ত করে বুকে চেপে ধরল, যাতে রাফি ওদিকে তাকিয়ে চিৎকার না করে। কিন্তু প্রকৃতির এই মহাবিপদে সাপটাও আজ তার হিংস্রতা ভুলে গেছে। সেও নিজের প্রাণ বাঁচাতে ওই ডালে কুণ্ডলি পাকিয়ে অবশ হয়ে বসে আছে। সাপ আর মানুষ–দুটি ভিন্ন প্রাণ আজ একই নিয়তির সুতায় বাঁধা। সাপটি ওদের দিকে তাকিয়েও কোনো ক্ষতি করল না। সেও যেন বৃষ্টির পানিতে ভিজতে ভিজতে কাঁপছে আর ভোরের আলো খুঁজছে।
নিচে মা এখনো বুকসমান পানিতে ভেসে ভেসে ডাকছেন, ‘সামি... রাফি...’। হাট থেকে ফিরতে না পারা বাবা হয়তো নদীর ওপাড়ে দাঁড়িয়ে ভেজা পকেটে হাত দিয়ে কাঁদছেন। যে মিঠাইয়ের টুকরো দুটি আজ দুই ভাইয়ের মুখে হাসির জোয়ার ফোটানোর কথা ছিল, সেই সাধের মিঠাই হয়তো এতক্ষণে বানের জলে গলে মিশে গেছে।
বুকের ভেতর কালসাপের ভয় আর চোখে এক নদী আশা নিয়ে, দুই ভাই অন্ধকার আকাশের দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করতে লাগল–কখন হবে সকালের আকাশ, কখন থামবে এই অভিশপ্ত বানের রাত!