করোনাকালীন সময় দেশের পোশাকশিল্প সংকটে পড়েছে। সরকারি প্রণোদনাসহ অন্যান্য সুবিধা দেওয়ায় সেই সংকট থেকে ঘুরে দাঁড়িয়েছে এ খাত। কিন্তু ইউক্রেন -রাশিয়া যুদ্ধ ও ডলারসংকটের কারণে পোশাক খাতে আবার চাপ বাড়ছে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ন্যূনতম মজুরি নিয়ে শ্রমিকদের আন্দোলন। পোশাক খাতের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে খবরের কাগজ কথা বলেছে স্টাইলিশ গার্মেন্টের চেয়ারম্যান সালাউদ্দিন চৌধুরীর সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন গাজীপুর প্রতিনিধি পলাশ প্রধান
খবরের কাগজ: গাজীপুরের অবকাঠামো কতটুকু বিনিয়োগবান্ধব?
সালাউদ্দিন চৌধুরী: গাজীপুরের মধ্য দিয়ে বাস র্যাপিড ট্রানজিটের (বিআরটি) কাজ চলছে। বিআরটির কাজ পুরোপুরি শেষ হয়ে গেলে গাজীপুর হবে আধুনিক ও আদর্শ শিল্পনগরী। এই জেলা হবে তৈরি পোশাকশিল্পের প্রধান কেন্দ্রস্থল। এ ছাড়া আরও নতুন নতুন শিল্প গড়ে উঠবে। অবকাঠামোগত সুবিধা দেখে বিদেশিরা এখানে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হবেন। তখন আরও কর্মমুখর হয়ে উঠবে গাজীপুর।
খবরের কাগজ: করোনার সময় পোশাকশিল্পে কিছুটা স্থবিরতা বিরাজ করছিল । এ অবস্থা থেকে কীভাবে উত্তরণ ঘটল?
সালাউদ্দিন চৌধুরী: করোনার সময় শুধু গাজীপুরেই না, পুরো দেশই স্থবির হয়ে গিয়েছিল। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য সরকার ও শিল্প মালিক উভয়েই চেষ্টা করেছে। সরকার তৈরি পোশাকশিল্পে প্রণোদনা দিয়েছে, ব্যাংক ঋণ সহজতর করেছে, বিদেশি ক্রেতারা যেন অন্য দেশ থেকে পোশাক না কেনেন, সে জন্য পোশাক কারখানার মালিকরা বিদেশি ক্রেতাদের সঙ্গে ব্যক্তিগত যোগাযোগ রক্ষা করেছেন। আমাদের দেশে স্বাস্থ্যবিধি মেনে পোশাক তৈরি করা হচ্ছে, শ্রমিকরা যেন করোনায় আক্রান্ত না হয় সে জন্য নানামুখী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, তা আমরা তাদের বোঝাতে সক্ষম হয়েছি।
যার ফলে গাজীপুরের পোশাক কারখানার বন্ধ হয়নি। উৎপাদন অব্যাহত ছিল। রপ্তানি আয়ে তেমন একটা প্রভাব পড়েনি। দেশের অর্থনীতির চাকা করোনাকালীন সচল ছিল মূলত তৈরি পোশাক উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়নি বলেই।
খবরের কাগজ: করোনার ধকল কাটিয়ে ওঠার পর তৈরি পোশাক শিল্প যখন ঘুরে দাঁড়িয়েছিল, তখন শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি বাড়ানোর অজুহাতে আবারও এ শিল্পে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে। এ বিষয়ে আপনার বক্তব্য জানতে চাই।
সালাউদ্দিন চৌধুরী: সরকার ও শিল্প মালিকদের প্রচেষ্টায় করোনার ধকল বাংলাদেশ ভালোভাবেই কাটিয়ে উঠেছে। করোনার সময়ে চেষ্টা চলেছিল বাংলাদেশের তৈরি পোশাক যে বাজার রয়েছে সেটাকে ভিয়েতনাম বা অন্য কোনো দেশে নিয়ে যাওয়ার। সে প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। তার পরও সেই পক্ষটি থেমে নেই। এবার তারা শ্রমিকদের উসকে দিচ্ছেন এই বলে যে, পোশাক কারখানার মালিকরা অনেক টাকা মুনাফা করেন। সে তুলনায় শ্রমিকদের মজুরি দেন খুব সামান্য। রাজনৈতিকভাবে দেশে যখন একটা অস্থিরতা চলছিল, ঠিক সে সময়েই শ্রমিকদের উসকে দেওয়া হয়, ন্যূনতম মজুরি ২৩ হাজার টাকা নির্ধারণের জন্য। কারখানায় কারখানায় হামলা চালানো হয়। রাস্তা অবরোধ করা হয়। শ্রমিক অসন্তোষের কারণে অনেক গার্মেন্ট বন্ধ হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। বেশির ভাগ শ্রমিকই তা মেনে নেয়। ষড়যন্ত্রকারীরা ব্যর্থ হয়।
খবরের কাগজ: মূল্যস্ফীতির এই সময়ে ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা যথার্থ বলে আপনি মনে করেন?
সালাউদ্দিন চৌধুরী: ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা মানে এই নয় যে, একটি কারখানার সব শ্রমিকের মজুরি এটি। একটি কারখানায় যদি ১ হাজার ২০০ শ্রমিক থাকে, তাহলে মাত্র শ-খানেক শ্রমিক ন্যূনতম মজুরির আওতায় থাকে। কারখানায় একজন শ্রমিক ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকাও মজুরি পান। প্রতিবছর ৫ শতাংশ হারে ইনক্রিমেন্ট দেওয়া হয়। সে হিসেবে আমি বলতে পারি, মূল্যস্ফীতি থাকলেও ন্যূনতম মজুরি নিয়ে শ্রমিকরা খুশি।
খবরের কাগজ: রাজনৈতিক অস্থিরতাকে পুঁজি করে ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা হওয়ার পর আবারও আন্দোলন হতে পারে কি?
সালাউদ্দিন চৌধুরী: না, আমি তা মনে করি না। কারণ, সম্প্রতি ঘটে যাওয়া অপ্রীতিকর ঘটনা শ্রমিকরা ঘটিয়েছে বলে আমি মনে করি না। যে কারখানা তার রুটি-রুজির ব্যবস্থা করে, সে শ্রমিক কিছুতেই তার নিজের কারখানায় হামলা করতে পারে না। এটা বহিরাগতদের কাজ। আমরা সিসিটিভি ফুটেজে দেখেছি, যারা হামলা চালিয়েছে, তারা কেউ শ্রমিক নয়। তারা বহিরাগত। সরকার ও প্রশাসন যদি সতর্ক থাকে তাহলে আমি মনে করি না, স্বার্থান্বেষী মহল বহিরাগতদের দিয়ে আবারও একই কাজ করাতে পারবে।
খবরের কাগজ: আপনি কি মনে করেন গাজীপুরের পোশাক কারখানাগুলোর পরিবেশবান্ধব?
সালাউদ্দিন চৌধুরী: গাজীপুরের রপ্তানিমুখী সব পোশাক কারখানায় আন্তর্জাতিক মানের। অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্সের তৎপরতার ফলে নিয়ম-নীতি না মেনে কেউ কারখানা চালাতে পারে না। শ্রমিকদের সব ধরনের সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। তাদের জন্য নাস্তার ব্যবস্থা করা, চিকিৎসার জন্য সার্বক্ষণিক ডাক্তার রাখা হচ্ছে। ডে-কেয়ার সেন্টার আছে অনেক কারখানায়। শ্রমিকদের ছেলেমেয়েদের জন্য স্কুলেরও ব্যবস্থা করেছে অনেকে। সব মিলিয়ে বলা যায়, রানা প্লাজার ঘটনার পর থেকে অ্যাকর্ড-অ্যালয়েন্সের গৃহীত নানা পদক্ষেপের কারণে গাজীপুরের প্রতিটি কারখানায় এখন পরিবেশবান্ধব ও শ্রমিকবান্ধব অবস্থা বিরাজ করছে।
খবরের কাগজ: ডলারসংকট সম্পর্কে আপনার অভিমত কী?
সালাউদ্দিন চৌধুরী: সাম্প্রতিক সময়ে ডলারের তীব্র সংকট চলছে। ফলে শিল্পমালিকরা ঋণপত্র (এলসি) খুলতে পারছেন না। আমদানি-রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তবে আমি মনে করি এটা সাময়িক। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে এটা হয়েছে। আগামী কয়েক মাসের মধ্যে ডলারসংকট কেটে যাবে।
খবরের কাগজ: কিছু গার্মেন্ট মালিকের বিরুদ্ধে রাজস্ব ফাঁকি দেয়ার অভিযোগ আছে। এ সম্পর্কে আপনার বক্তব্য কী?
সালাউদ্দিন চৌধুরী: এ ধরনের অভিযোগ থাকতেই পারে। সবাই ধোয়া তুলসীপাতা নয়। এ ক্ষেত্রে রাজস্ব কর্মকর্তাদেরও যোগসাজশ আছে। রাজস্ব বিভাগ যদি কঠোর হয়, তাহলে এ ধরনের প্রবণতা কমে আসবে। এর চেয়ে বড় কথা হলো, ভ্যাট-ট্যাক্স দেওয়ার বিষয়টিকে শতভাগ অনলাইনের মাধ্যমে আনা গেলে সরকারের রাজস্ব আয় আরও বাড়বে।
পলাশ প্রধান: আপনাকে ধন্যবাদ।
সালাউদ্দিন চৌধুরী: আপনাকেও ধন্যবাদ।