বাংলাদেশের সীমান্ত ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় মানব পাচার চক্রের সদস্যরা অনেকটা শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। তাদের আস্তানা এখন সীমান্তবর্তী এলাকায়। গোয়েন্দাদের ব্যাপক তৎপরতায় রাজধানী এবং নগর-মহানগর থেকে পালিয়ে সীমান্ত ও সীমান্তবর্তী এলাকায় ঘাঁটি গেড়েছে মানব পাচারকারীরা। বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে। চক্রগুলো সীমান্তবর্তী এলাকায় ওতপেতে থাকে। তাদের সদস্যরা দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে নারী ও শিশুকে কৌশলে অপহরণ করে সীমান্তে পৌঁছে দেয়। তারপর তাদের নিয়ে প্রতিবেশী দেশ ভারত ও মায়ানমারে পাড়ি জমায়। দফায় দফায় অপহরণকারী ও মানব পাচারকারীরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হয়। কিন্তু জামিনে বের হয়ে এসে কৌশলে আবার অপরাধে যুক্ত হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, চক্রগুলোর সদস্যরা দেশের গরিব, ছিন্নমূল ও অসহায় নারী-শিশুদের বিদেশে কাজ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বাংলাদেশ থেকে পাচার করে। এসব চক্র চুক্তিরভিত্তিতে বিদেশের পাচারকারীদের কাজে লাগিয়ে অপকর্ম করে আসছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু অসাধু সদস্যও এর সঙ্গে জড়িত। মানব পাচারের জন্য যশোর সীমান্ত, টাঙ্গুয়ার হাওর, কলমাকান্দা, দুর্গাপুর, টেকনাফ, সেন্ট মার্টিন, মৌলভীবাজার, নোয়াখালীয়াপাড়া, শাপলাপুর, সাতঘরিয়াপাড়া, উখিয়াসহ ৩০-৪০টি রুট ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব সীমান্ত এলাকায় পাচারকারী ও চোরাকারবারিদের নিয়মিত যাতায়াত রয়েছে। সম্প্রতি দেশে এমন মানব পাচারের চাঞ্চল্যকর কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে।
ভুক্তভোগী একজন নারী জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করে পুলিশকে জানায়, তারা পাচার হতে চলেছে। যা ঘটেছে ঝিনাইদহের মহেশপুর সীমান্তবর্তী যাদবপুর ইউনিয়নের জলুলী গ্রামের সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে। জরুরি সেবা ৯৯৯-এর গণমাধ্যম ও জনসংযোগ কর্মকর্তা পুলিশ পরিদর্শক আনোয়ার সাত্তার খবরের কাগজকে বলেন, মাঝেমধ্যে আমরা এ ধরনের ফোনকল পেয়ে থাকি। সেগুলো গুরুত্বসহকারে দেখা হয়।
টাঙ্গুয়ায় হাওর, কলমাকান্দা, দুর্গাপুর এসব এলাকায় মানুষের যাতায়াত কম থাকায় এলাকাটি সন্ত্রাসীদের জন্য অভয়ারণ্য হয়ে উঠেছে। এসব স্থানে চোরাকারবারিদের নিয়মিত যাতায়াত আছে বলে তথ্য পাওয়া যায়। এসব জায়গায় মায়ানমার ও ভারতের সিমকার্ড অবাধে বিক্রি হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন পণ্য অবাধে কেনাবেচা হয়।
গত ২৬ ডিসেম্বর রাজধানীর উত্তরা থেকে শেরপুর যাওয়ার পথে অপহরণ হন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হাসিবুর রহমান হিমেল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতায় সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের দুর্গম পাহাড় থেকে হিমেলকে উদ্ধার করা হয়। এ সময় গ্রেপ্তার করা হয় অপহরণ চক্রের হোতাসহ ১২ জনকে। গোয়েন্দা তথ্য মতে, অপহরণের মূল পরিকল্পনায় ছিলেন তার ব্যক্তিগত গাড়িচালক ছামিদুল ইসলাম।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার ( গোয়েন্দা) মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ বলেন, ‘সহজে কোনো ব্যক্তির তথ্য সংগ্রহ করা যায় না। কাদের লোকজন এটা পারে। যখন কোনো ধনী ঘরের সন্তান বা পরিবারের সন্তানকে অপহরণ করতে চায়, তখন তার গাড়িচালকদের ব্যবহার করে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করে। হিমেলের ক্ষেত্রেও অপহরণ চক্রটি গাড়িচালক ছামিদুলকে টার্গেট করেছিল। এভাবেই ছামিদুল অপহরণ চক্রের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ঘটনাটি ঘটায়। অন্যদিকে চাকরির বিজ্ঞাপনের আড়ালেও অপহরণ ও মানব পাচার চক্রের সদস্যরা গোপনে আঁতাত করে অন্তত ১৫০-এর বেশি নারী ও শিশুকে পাচার করেছে। অপরাধীরা বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করেই অপরাধ করে। এ জন্য কাউকে বিশ্বাস করার আগে যাচাই-বাছাই করা উচিত।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমাদের কাছের লোকজন অনেক সময় বিশ্বাসঘাতকতা করে, যার কারণে মানুষের প্রতি মানুষ বিশ্বাস হারিয়ে ফেলছে। সম্প্রতি আমাদের দেশের সীমান্তে কিছু অস্থিরতা দেখা গেছে। অপহরণকারী ও পাচারকারীরা অনেক বেশি সক্রিয়। তাদের থেকে সবাইকে সামাজিক ও পারিবারিকভাবে সচেতন হতে হবে।’
সীমান্তে মানব পাচার বন্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সতর্ক অবস্থানে থাকতে হবে। পাচারকারীদের ফাঁদে যাতে নারী ও শিশুরা না পড়ে সে জন্য সামাজিকভাবে সবাইকে সচেতন করতে হবে। সীমান্তবর্তী এলাকায় অবৈধ মাদক পাচার, চোরাকারবারি, মানব পাচার রোধে সবাইকে তৎপর থাকতে হবে। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সীমান্তবর্তী এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্বে যারা রয়েছেন তাদের আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা নিয়ে নারী ও শিশুদের পাচার হওয়া থেকে মুক্ত করতে হবে। তাহলেই সীমান্তে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে।