অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস বাংলাদেশের নতুন যাত্রায় বিশ্ববাসীকে সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ছাত্র-জনতা তাদের অদম্য সংকল্প ও প্রত্যয়ের মাধ্যমে একটি স্বৈরাচারী ও অগণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা থেকে আমাদের মুক্তি এনে দিয়েছে। আর আমাদের মুক্তি ও গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবে রূপ দিতে আমি বিশ্বসম্প্রদায়কে নতুন বাংলাদেশের সঙ্গে নতুনভাবে সম্পৃক্ত হওয়ার উদাত্ত আহ্বান জানাই। ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি পূর্ণ সমর্থন প্রকাশ করেছেন জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস। তিনি বলেছেন, জাতিসংঘ বাংলাদেশের সংস্কারে সহায়তা করতে প্রস্তুত। বাংলাদেশের নতুন যাত্রায় যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ীদের অংশীদারত্ব চেয়েছেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বলেছেন, বহুমুখী সংস্কারের মাধ্যমে বাংলাদেশে ব্যবসার পরিবেশ উন্নত করতে আমরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
নিউইয়র্কে জাতিসংঘের ৭৯তম সম্মেলনে দেওয়া ভাষণে ড. ইউনূস বিশ্বসম্প্রদায়ের কাছে দেশ সংস্কারে ইতিবাচক বার্তা দিয়েছেন। তিনি বাংলাদেশের তরুণদের প্রেরণার উৎস হিসেবে দেখেছেন। এ দেশের তরুণরা বন্দুকের গুলি উপেক্ষা করে বুক পেতে দাঁড়িয়েছিল দেশমাতৃকার জন্য। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান আগামীর দিনগুলোতে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে মানুষকে মুক্তি ও ন্যায়বিচারের পক্ষে দাঁড়াতে প্রেরণা জুগিয়ে যাবে। অন্তর্বর্তী সরকারকে এমন এক অবস্থায় দেশকে পুনর্গঠন এবং জনগণের কাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্রব্যবস্থা ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। অতীতের ভুলগুলোকে সংশোধন করে একটি প্রতিযোগিতামূলক ও শক্তিশালী অর্থনীতি এবং ন্যায়ভিত্তিক সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলাই এখন অন্তর্বর্তী সরকারের মূল লক্ষ্য।
বিভিন্ন দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ব্যাপারেও অন্তর্বর্তী সরকার বেশ আগ্রহ দেখিয়েছে। পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, মর্যাদা ও স্বার্থসংরক্ষণের ভিত্তিতে বাংলাদেশ বিশ্বসম্প্রদায়ের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনে এগিয়ে যাবে।
অন্তর্বর্তী সরকার ব্যবসাবাণিজ্যে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির লক্ষ্যে ব্যাংক ও আর্থিক খাতের সংস্কারের ব্যাপারে ইতোমধ্যে বেশকিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ব্যবসা এবং বিনিয়োগে বিদেশিরা যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় তা নিশ্চিতে সরকার কাজ করছে। সংস্কার টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদি করতে এবং অবাধ, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের জন্য উপযোগী পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যে সরকার বদ্ধপরিকর।
ধরিত্রী ও তরুণদের জন্য ‘তিন শূন্য প্রস্তাব’- যার মাধ্যমে শূন্য দারিদ্র্য, শূন্য বেকারত্ব এবং শূন্য নেট কার্বন নিঃসরণ অর্জন করা যায়। প্রধান উপদেষ্টা বলেন, যেখানে পৃথিবীর প্রতিটি তরুণ-তরুণী চাকরিপ্রার্থী না হয়ে বরং উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার সুযোগ পাবে। তারা যেন সম্পদের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও নিজ নিজ সৃজনশীলতার বিকাশ করতে পারে। যেখানে একটি ব্যবসায়িক উদ্যোগ সামাজিক সুফল, অর্থনৈতিক মুনাফা এবং প্রকৃতির প্রতি দায়িত্বশীলতার মধ্যে একটি চমৎকার ভারসাম্য আনতে মনোযোগী হতে পারে। যেখানে সামাজিক ব্যবসার মাধ্যমে যেকোনো ব্যক্তি ভোগবাদী জীবনধারা থেকে উত্তরণ করে সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সৃজনশীল শক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে।
ড. ইউনূসের নিউইয়র্ক সফর সামগ্রিক বিবেচনায় অত্যন্ত সফল ও ফলপ্রসূ হয়েছে। তিনি জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগদান করলেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টসহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র, সরকারপ্রধান ও উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকের সুযোগ হয়েছে। সারা বিশ্বের মানুষের কাছে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থা তুলে ধরার সুযোগ পেয়েছেন। একজন নোবেলজয়ী হিসেবে তার ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি দেশের স্বার্থে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। এর ফলে দেশের উন্নয়নে বৈদেশিক সাহায্য-সহযোগিতা বাড়বে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।