ব্রেন্ডেন লিঞ্চের নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বাণিজ্য প্রতিনিধি দপ্তরের (ইউএসটিআর) একটি প্রতিনিধিদল তিন দিনের সফরে গত রবিবার ঢাকায় এসেছিল। বাংলাদেশের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটা গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত করতে তারা ঢাকায় আসেন। এই চুক্তির সঙ্গে জড়িত রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের শুল্কহ্রাসের বিষয়টি। প্রতিনিধিদলটি সফরকালে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, বাণিজ্য উপদেষ্টা সেখ বশির উদ্দিন, পোশাক উৎপাদন ও রপ্তানিকারক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিজিএমইএর নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছে। তবে মূল আলোচনা হয়েছে বাণিজ্য উপদেষ্টা সেখ বশির উদ্দিনসহ বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে। বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে যেসব পণ্য কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, সেই সব প্রতিশ্রুতির অগ্রগতি আর চুক্তি স্বাক্ষর নিয়ে সভায় আলোচনা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদলের এই সফরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র উভয় দেশই বাণিজ্যিকভাবে আরও কাছাকাছি এসে লাভবান হতে চেয়েছে। যতটা সম্ভব রক্ষা করতে চেয়েছে নিজ নিজ দেশের স্বার্থ। বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য সংকটের উৎস হচ্ছে দুই দেশের মধ্যকার বাণিজ্য ঘাটতি। তবে এই ঘাটতি যে খুব বেশি তাও নয়। বাংলাদেশের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি মাত্র ৬ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশ চাইলেই এ ঘাটতি অনেকখানি কমানো সম্ভব।
এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিভিন্ন পণ্য আমদানি বাড়াতে পারে। ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা, গম, সয়াবিন ও জ্বালানি আমদানি বাড়াতে শুরু করেছে বাংলাদেশ। এতে সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে বাংলাদেশের রপ্তানির ওপর ২০ শতাংশ মার্কিন পাল্টা শুল্ক কমানোর। বাণিজ্য উপদেষ্টা তো বলেই দিয়েছেন, এটা ১৮ শতাংশে নামতে পারে, যদিও বাংলাদেশের লক্ষ্য হচ্ছে ১৫ শতাংশে নামিয়ে আনা। তবে ১৮ শতাংশ ছাড় পাওয়া গেলেও বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে তৈরি পোশাকের প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের নতুন সুযোগ তৈরি হবে। বাণিজ্য ঘাটতিতেও আসবে ভারসাম্য।
এর আগে বাংলাদেশের পণ্যের ওপর প্রথমে ৩৭ শতাংশ এবং পরে ৩৫ শতাংশ পাল্টা শুল্ক ঘোষণা করে আলোচনার পথ উন্মুক্ত রেখেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ওয়াশিংটনে তৃতীয় দফার আলোচনা শেষে গত ৩১ জুলাই তা ২০ শতাংশে নামিয়ে আনেন তিনি। কিন্তু বাংলাদেশের লক্ষ্য ছিল বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে শুল্কহার ১৫ শতাংশে নামিয়ে আনা। এ জন্যই বাংলাদেশ ইউএসটিআরকে আলোচনার জন্য ঢাকায় আমন্ত্রণ জানায়। এরই অংশ হিসেবে দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক মার্কিন বাণিজ্যনীতি বাস্তবায়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী ব্রেন্ডন লিঞ্চের নেতৃত্বাধীন একটি প্রতিনিধিদল ঢাকায় এসেছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইউএসটিআরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে বাণিজ্য চুক্তির একটি খসড়া তৈরি করা হয়েছে। নতুন দর-কষাকষিতে দুই পক্ষ একমত হলে খসড়ায় সংশোধন এনে তা চূড়ান্ত করা হবে। বিষয়টি আপাতদৃষ্টিতে প্রশংসনীয়। কিন্তু আমরা এই চুক্তির বিষয়টি যাতে পরস্পরের স্বার্থকে সমভাবে রক্ষা করে, সে দিকটির ওপর গুরুত্বারোপ করতে চাই। খবরের কাগজেই গতকাল একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে দেখা যাচ্ছে পাল্টা শুল্ক নিয়ে দর-কষাকষির অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের উড়োজাহাজ কোম্পানি বোয়িংয়ের কাছ থেকে বাংলাদেশ ২৫টি বিমান কেনার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, সেই প্রতিশ্রুতিতে আস্থা রাখতে পারছে না ট্রাম্প সরকার।
এ জন্য দেশটি নতুন শুল্কহার কমানোর আগেই ২৫টি বোয়িং কেনার চুক্তি করতে চায়। অথচ গত সোমবার বাণিজ্য উপদেষ্টা বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র থেকে কোন বছর কতটি বোয়িং উড়োজাহাজ আমদানি করা হবে, সে বিষয়ে সরকার কোনো পরিকল্পনা দেয়নি। ২০৩২ সাল পর্যন্ত (বোয়িং ও এয়ারবাস) কোনো উড়োজাহাজ সরবরাহও করতে পারবে না। বোয়িংয়ের উড়োজাহাজ আমদানির যে ঘাটতি কমবে, তা হবে দীর্ঘমেয়াদে বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর একটা পথ। বাণিজ্য উপদেষ্টার এ কথায় বোঝা যায়, বাংলাদেশ সুনির্দিষ্টভাবে বোয়িংয়ের উড়োজাহাজ কেনার বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দেয়নি। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র শুল্ক কমানোর আগেই এই চুক্তি করতে চায়। আমরা মনে করি, বাংলাদেশ যা-ই করুক, যাচাই-বাছাইয়ের পর যেন করে। শুল্ক কমানোর নামে যেন আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। সবার ওপরে দেশ। দেশের স্বার্থকেই সবার আগে আমাদের গুরুত্ব দিতে হবে।