সৃজনশীল প্রশ্ন ও উত্তর-১
উদ্দীপকটি পড়ে নিচের প্রশ্নগুলোর উত্তর লেখ।
মহি তার বাবার সঙ্গে একটি শহর দেখতে বের হলো। শহরটির চারদিকে প্রাচীর দ্বারা সুরক্ষিত। পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী উঁচু ভিত্তির ওপর শহরটি নির্মিত। শহরের এক পাশে উঁচু ভিত্তির ওপর একটি করে নগর দুর্গ আছে। নগরীর ভেতর দিয়ে চলে গেছে পাকা রাস্তা। রাস্তাগুলো ছিল সোজা। প্রতিটি বাড়িতে খোলা জায়গায় কূপ ও স্নানাগার ছিল।
ক) একজন বাঙালি প্রত্নতত্ত্ববিদের নাম লেখ। ১
খ) মিসরকে নীলনদের দান বলা হয় কেন? ২
গ) মহির দেখা শহরের সঙ্গে পাঠ্যবইয়ের কোন সভ্যতার বৈশিষ্ট্যের মিল রয়েছে? ব্যাখ্যা করো। ৩
ঘ) তুমি কি মনে করো ওই সভ্যতার অধিবাসীদের চমৎকার স্থাপত্যশৈলীর নিদর্শন রয়েছে? উত্তরের স্বপক্ষে যুক্তি দাও। ৪
উত্তর: ক) রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় বাঙালি প্রত্নতত্ত্ববিদদের মধ্যে একটি প্রখ্যাত নাম। তিনি ১৯২১ সালে মহেঞ্জোদারো শহরের ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কারের মাধ্যমে সিন্ধু সভ্যতার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
খ) মিসরকে নীলনদের দান বলা হয় কারণ নীলনদ ছিল মিসরীয় সভ্যতার মূল ভিত্তি। নীলনদের বন্যা মিসরের ফসলের জন্য উর্বর মাটি সরবরাহ করত এবং এর পানি সরাসরি কৃষিকাজের জন্য ব্যবহার করা হতো। এ ছাড়া নদীটি মিসরীয়দের জন্য একটি প্রধান যোগাযোগ মাধ্যম এবং বাণিজ্য রুট হিসেবে ব্যবহৃত হতো। নীলনদের পলি জমি উর্বর করায়
ওই অঞ্চলের কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পায়, যা মিসরীয়দের অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতায় সহায়ক ছিল। মিসরীয়রা নীলনদকে জীবনদাত্রী হিসেবে শ্রদ্ধা করত এবং এর ওপর নির্ভর করেই তাদের সভ্যতার বিকাশ ঘটে। এজন্যই প্রাচীন গ্রিক ইতিহাসবিদ হেরোডোটাস মিসরকে নীলনদের দান বলে উল্লেখ করেছিলেন।
গ) মহির দেখা শহরের বিবরণ সিন্ধু সভ্যতার সঙ্গে মিল রয়েছে। সিন্ধু সভ্যতার শহরগুলো যেমন মহেঞ্জোদারো এবং হরপ্পা উঁচু ভিত্তির ওপর নির্মিত ছিল এবং চারপাশে প্রাচীর দ্বারা সুরক্ষিত ছিল। এই শহরগুলোয় সোজা ও পরিকল্পিত পাকা রাস্তা ছিল এবং প্রতিটি বাড়িতে কূপ ও স্নানাগারের ব্যবস্থা ছিল। নগর পরিকল্পনা ও স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্যগুলো অত্যন্ত উন্নত ছিল, যা মহির দেখা শহরের সঙ্গে মিল পাওয়া যায়।
সিন্ধু সভ্যতা ছিল অত্যন্ত পরিকল্পিত এবং এর প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো থেকে জানা যায়, শহরগুলোয় পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধির জন্য বিশেষ ব্যবস্থা ছিল। মহির শহরের মতো, প্রতিটি বাড়িতে ব্যক্তিগত স্নানাগার ও কূপ ছিল, যা এই সভ্যতার উন্নত জীবনযাত্রার নির্দেশক। এ ছাড়া শহরের কেন্দ্রে অবস্থিত দুর্গগুলো প্রশাসনিক ও প্রতিরক্ষামূলক কেন্দ্র হিসেবে কাজ করত। এসব বৈশিষ্ট্য মহির দেখা শহর ও সিন্ধু সভ্যতার মধ্যে সুস্পষ্ট মিল প্রমাণ করে।
ঘ) হ্যাঁ, ওই সভ্যতার অধিবাসীরা নিঃসন্দেহে চমৎকার স্থাপত্যশৈলীর নিদর্শন রেখে গেছে।
প্রথমত, তাদের নগর পরিকল্পনা ছিল অত্যন্ত সুসংগঠিত এবং উন্নত। প্রতিটি শহর পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী গড়ে উঠেছিল, যেখানে সোজা এবং সমান্তরাল পাকা রাস্তা ছিল, যা শহরজুড়ে চলাচল সহজ করত। শহরগুলো উঁচু ভিত্তির ওপর নির্মিত ছিল এবং প্রাচীর দ্বারা সুরক্ষিত ছিল, যা শহরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করত। এ ছাড়া নগর দুর্গ প্রশাসনিক কেন্দ্র এবং শহরের প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থার অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হতো।
দ্বিতীয়ত, প্রতিটি বাড়িতে কূপ ও স্নানাগার থাকার বিষয়টি তাদের উন্নত সামাজিক ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রতিফলন। পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং নিকাশী ব্যবস্থাও ছিল উন্নত, যা তখনকার সময়ের অন্যান্য সভ্যতার তুলনায় অনেক এগিয়ে ছিল।
অন্যদিকে, তাদের শিল্প ও কারুশিল্পের নিদর্শনগুলো থেকেও বোঝা যায় যে, তারা স্থাপত্য ও নির্মাণশৈলীতে অত্যন্ত দক্ষ ছিল। মহেঞ্জোদারো এবং হরপ্পার ধ্বংসাবশেষ থেকে প্রাপ্ত প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো যেমন ইটের তৈরি বাড়ি, স্নানাগার, জলাধার প্রভৃতি তাদের স্থাপত্য কৌশলের উৎকর্ষতার প্রমাণ দেয়।
সৃজনশীল প্রশ্ন ও উত্তর-২
উদ্দীপকটি পড়ে নিচের প্রশ্নগুলোর উত্তর লেখ।
সভ্যতার বিকাশ সম্পর্কে জানতে হলে ইতিহাস পাঠ করা উচিত। প্রাচীন সভ্যতায় গ্রিকদের অবদান অবিস্মরণীয়। শিক্ষাক্ষেত্রে ইতিহাস, দর্শন, পদার্থ, সাহিত্য প্রতিটি শাখায় রয়েছে তাদের উর্বর মননের সুস্পষ্ট ছাপ। এখানেই গণতন্ত্রের উন্মেষ ঘটে। গ্রিক সভ্যতার প্রভাব বর্তমান বিশ্বে বিরাজমান।
ক) ইলিয়াড ও ওডিসি মহাকাব্যের রচয়িতা কে? ১
খ) নগর রাষ্ট্র স্পার্টাকে সামরিক ছাউনি বলা হয় কেন? ২
গ) শিক্ষাক্ষেত্রে প্রাচীন গ্রিসের অবদান উল্লেখ করো। ৩
ঘ) ‘এখানেই গণতন্ত্রের উন্মেষ ঘটেছিল’ উক্তিটির যথার্থতা বিশ্লেষণ করো। ৪
উত্তর: ক) ইলিয়াড ও ওডিসি মহাকাব্যের রচয়িতা হলেন হোমার, একজন প্রাচীন গ্রিক কবি। ধারণা করা হয়, তিনি খ্রিষ্টপূর্ব অষ্টম শতাব্দীতে জীবিত ছিলেন এবং তার রচিত এই দুটি মহাকাব্য প্রাচীন গ্রিক সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ কীর্তি হিসেবে বিবেচিত।
খ) স্পার্টাকে সামরিক ছাউনি বলা হয় কারণ এর পুরো সমাজব্যবস্থার সামরিক ভিত্তি ছিল এবং সব নাগরিকের জীবনে সামরিক দায়িত্ব পালন ছিল প্রধান কাজ। স্পার্টার জীবনযাত্রা এবং শিক্ষাব্যবস্থা ছিল সম্পূর্ণ সামরিক শৃঙ্খলা ও প্রশিক্ষণের ওপর নির্ভরশীল।
এখানে নবজাতক থেকে শুরু করে প্রাপ্তবয়স্কদের জীবন সামরিক নিয়মানুবর্তিতার অধীন ছিল। শিশুরা জন্মের পরপরই পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেত এবং দুর্বল বা অসুস্থ শিশুকে পরিত্যাগ করা হতো। ছেলেরা সাত বছর বয়স থেকে কঠোর সামরিক প্রশিক্ষণ শুরু করত, এই প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্য ছিল শক্তিশালী যোদ্ধা তৈরি করা এবং যুদ্ধে সক্ষম নাগরিক তৈরি করা। স্পার্টার পুরুষদের প্রধান লক্ষ্য ছিল যুদ্ধে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করা। তাদের সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে সামরিক প্রশিক্ষণ এবং শৃঙ্খলার কারণে স্পার্টাকে সামরিক ছাউনি বলে অভিহিত করা হয়।
গ) প্রাচীন গ্রিসের শিক্ষাক্ষেত্রে অবদান ছিল অসাধারণ। গ্রিসের শিক্ষাব্যবস্থা এবং তাদের চিন্তাশক্তি বর্তমান সময়েও গভীর প্রভাব ফেলেছে। তাদের কিছু উল্লেখযোগ্য অবদান নিচে আলোচনা করা হলো-
১. দর্শন: প্রাচীন গ্রিসের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অবদান ছিল দর্শন। সক্রেটিস, প্লেটো, অ্যারিস্টটল প্রমুখ দার্শনিকরা যুক্তিবিদ্যা, নৈতিকতা এবং রাজনৈতিক চিন্তায় যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছিলেন। তারা জ্ঞান, ন্যায়বিচার এবং সমাজব্যবস্থার মৌলিক প্রশ্নগুলো উত্থাপন করেন। এই দর্শন-পরবর্তী যুগে পশ্চিমা শিক্ষাব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপন করেছে।
২. বিজ্ঞান ও গণিত: প্রাচীন গ্রিসে গণিত ও বিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও ব্যাপক অগ্রগতি ঘটে। পিথাগোরাস, ইউক্লিড, আর্কিমিডিস প্রমুখ গণিতবিদরা জ্যামিতি এবং সংখ্যা তত্ত্বের ওপর যুগান্তকারী কাজ করেন। এ ছাড়া চিকিৎসাশাস্ত্রেও গ্রিকদের বিশাল অবদান রয়েছে। হিপোক্রেটিসকে আধুনিক চিকিৎসাশাস্ত্রের জনক বলা হয়, যিনি চিকিৎসা পদ্ধতির বৈজ্ঞানিক দিকগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে ছিলেন।
৩. গণতন্ত্র ও রাজনৈতিক শিক্ষা: প্রাচীন গ্রিসের অ্যাথেন্সে গণতন্ত্রের জন্ম হয়। এটি ছিল বিশ্বের প্রথম গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা, যেখানে নাগরিকরা সরাসরি অংশগ্রহণ করতে পারত। রাজনীতি ও নৈতিকতা নিয়ে গ্রিকদের চিন্তাভাবনা পরবর্তী সময়ে আধুনিক গণতান্ত্রিক শিক্ষার ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছে।
৪. সাহিত্য ও নাটক: গ্রিসের সাহিত্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। হোমারের মহাকাব্য থেকে শুরু করে এস্কিলাস, সফোক্লিস এবং ইউরিপিডিসের নাটকগুলো প্রাচীন সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে। এসব সাহিত্যকর্মে মানব প্রকৃতি, নৈতিকতা এবং সামাজিক সম্পর্কের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে, যা আধুনিক সাহিত্যেও প্রভাব বিস্তার করেছে।
ঘ) প্রাচীন গ্রিসের অ্যাথেন্সেই প্রথম গণতন্ত্রের উন্মেষ ঘটে, যা বিশ্বের প্রথম গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা হিসেবে ইতিহাসে স্থান পায়। এই শাসনব্যবস্থার মূল ভিত্তি ছিল নাগরিকদের সক্রিয় রাজনৈতিক অংশগ্রহণ।
গণতন্ত্রের সূচনা ও বিকাশ: খ্রিষ্টপূর্ব ৫০৮ অব্দে ক্লেইস্টেনিস অ্যাথেন্সে একটি নতুন সংবিধান প্রবর্তন করেন, যা গণতন্ত্রের সূচনা করে। এ সময় নাগরিকদের জন্য রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয় এবং নাগরিকরা সরাসরি সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার পায়। পরবর্তী সময়ে পেরিক্লিসের শাসনামলে (খ্রিষ্টপূর্ব ৪৬১-৪২৯ অব্দ) অ্যাথেন্সের গণতন্ত্র তার সর্বোচ্চ বিকাশ লাভ করে।
গণতন্ত্রের মৌলিক বৈশিষ্ট্য: অ্যাথেন্সের গণতন্ত্রে সরাসরি ভোটের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হতো। সব প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ নাগরিকের ভোটাধিকার ছিল, যদিও নারী, দাস এবং অভিবাসীরা ভোট দিতে পারত না। এই শাসনব্যবস্থা রাজনৈতিক শিক্ষার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল এবং সব নাগরিকের রাজনৈতিক দায়িত্ব ছিল।
গণতন্ত্রের প্রভাব: অ্যাথেন্সের গণতন্ত্র পরবর্তী সময়ে রোমান প্রজাতন্ত্র এবং আধুনিক পশ্চিমা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। বর্তমান সময়ের গণতন্ত্রের অনেক নীতি এবং ধারণা প্রাচীন গ্রিসের গণতান্ত্রিক প্রথা থেকে উদ্ভূত হয়েছে।
‘এখানেই গণতন্ত্রের উন্মেষ ঘটেছিল’ উক্তিটি প্রাচীন গ্রিসের রাজনৈতিক ইতিহাসের ক্ষেত্রে অত্যন্ত যথার্থ। গ্রিসে গণতন্ত্রের সূচনা এবং বিকাশ পরবর্তী সময়ে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে গণতন্ত্রের ধারণা ছড়িয়ে দেয়, যা আজও রাজনৈতিক চিন্তাধারার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক।
সহকারী শিক্ষক
সাভার অধরচন্দ্র সরকারি উচ্চবিদ্যালয়, সাভার, ঢাকা
কবীর