সম্প্রতি কলকাতা থেকে ফোন করেছিলেন প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সহধর্মিণী স্বাতী গঙ্গোপাধ্যায়। দীর্ঘদিনের পারিবারিক সম্পর্কের সূত্রে আমাদের প্রায়ই কথা হয়। সাহিত্য, স্মৃতি, মানুষ এবং দুই বাংলার সাংস্কৃতিক অঙ্গন- এসবই আমাদের আলাপের প্রধান বিষয়। কিন্তু এবারের কথোপকথনে একটি বিষয় বিশেষভাবে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
আলাপের এক পর্যায়ে স্বাতী বৌদি বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রসঙ্গ তুললেন। তিনি জানতে চাইলেন, ‘তোমাদের বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নাকি খুবই বিনয়ী মানুষ?’
আমি উত্তর দিলাম, ‘বাংলাদেশের মানুষ অন্তত এখন পর্যন্ত তাঁর মধ্যে সেই বিনয়ী আচরণই দেখছেন।’
কথোপকথনটি ছিল খুবই সংক্ষিপ্ত। কিন্তু এর তাৎপর্য আমার কাছে ছিল অনেক বড়। কারণ বিষয়টি কেবল একজন রাজনৈতিক নেতাকে ঘিরে নয়; বরং এটি ছিল প্রতিবেশী দেশের একজন বিশিষ্ট সাহিত্যিকের বাংলাদেশের প্রতি আগ্রহের বহিঃপ্রকাশ।
রাজনীতি যেমন সীমান্ত তৈরি করে, সাহিত্য ও সংস্কৃতি তেমনি সীমান্ত অতিক্রম করে মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। বাংলা ভাষা তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। পদ্মার দুই পারে রাষ্ট্র আলাদা হলেও ভাষা, সাহিত্য, গান, কবিতা এবং সংস্কৃতির আবেগ আমাদের এক সুতোয় বেঁধে রেখেছে।
দুই বাংলার সাহিত্যিকদের পারস্পরিক যোগাযোগের ইতিহাস বহু পুরোনো। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, জীবনানন্দ দাশ, জসীমউদ্দীন, শামসুর রাহমান, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সৈয়দ শামসুল হক, আল মাহমুদ, শঙ্খ ঘোষ- তাঁদের সাহিত্য কোনো রাজনৈতিক সীমারেখা মানেনি। পাঠকের হৃদয়ে তাঁরা সমানভাবে স্থান করে নিয়েছেন।
আমি দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপে বসবাস করছি। এই সময়ে লক্ষ্য করেছি, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যখন বাংলা ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে আলোচনা হয়, তখন খুব কম ক্ষেত্রেই পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশকে আলাদা করে দেখা হয়। বিদেশিদের কাছে আমরা সবাই বাংলা ভাষার মানুষ। আমাদের সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং সৃজনশীলতাই আমাদের যৌথ পরিচয়।
ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলায় দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে কাজ করতে গিয়ে আমি অসংখ্য ভারতীয় ও বাংলাদেশি লেখক, প্রকাশক এবং গবেষকের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছি। সেখানে প্রতিযোগিতা যেমন আছে, তেমনি সহযোগিতাও আছে। বই বিনিময় হয়, অনুবাদ হয়, যৌথ আলোচনা হয়, নতুন প্রজন্মের লেখকদের পরিচয় ঘটে। এই সাংস্কৃতিক বিনিময়ই ভবিষ্যতের সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করে।
এই কারণেই স্বাতী গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো একজন বরেণ্য ব্যক্তিত্ব যখন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা সম্পর্কে আগ্রহ প্রকাশ করেন, তখন সেটিকে আমি কেবল রাজনৈতিক কৌতূহল হিসেবে দেখি না, বরং এটি দুই বাংলার মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগের একটি স্বাভাবিক বহিঃপ্রকাশ।
আজকের বিশ্বে রাষ্ট্রের সম্পর্ক যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ People-to-People Contact বা জনগণের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক। কূটনীতির ভাষায় যাকে বলা হয় সফট পাওয়ার। সাহিত্য, চলচ্চিত্র, সংগীত, নাটক, শিল্পকলা এবং ভাষা- এসবই সফট পাওয়ারের সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম।
বাংলাদেশ আজ অর্থনীতি, প্রযুক্তি, ক্রীড়া ও সংস্কৃতিতে নতুন পরিচয় গড়ে তুলছে। একইভাবে পশ্চিমবঙ্গও বাংলা ভাষা ও সাহিত্যচর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এই দুই ধারার মধ্যে যত বেশি আদান-প্রদান হবে, ততই বাংলা ভাষার বিশ্বজনীন অবস্থান শক্তিশালী হবে।
দুঃখজনক হলেও সত্য, রাজনৈতিক উত্তেজনা অনেক সময় সাংস্কৃতিক সম্পর্ককেও অকারণে প্রভাবিত করে। অথচ ইতিহাস বলে, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও সাহিত্যিকদের মধ্যে সংলাপ কখনো পুরোপুরি থেমে থাকেনি। লেখকেরা সব সময়ই সেতুবন্ধন তৈরি করেছেন, দেয়াল নয়।
আমার ব্যক্তিগত জীবনের অভিজ্ঞতাও তাই বলে। গত চার দশকে ফ্রাঙ্কফুর্টে আমার বাড়িতে দুই বাংলার বহু লেখক, কবি, সাংবাদিক ও শিল্পী অতিথি হয়ে এসেছেন। তাঁদের মধ্যে মতাদর্শের ভিন্নতা ছিল, রাজনৈতিক অবস্থানের পার্থক্য ছিল; কিন্তু সাহিত্য এবং মানবিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সেই বিভাজন কখনো মুখ্য হয়ে ওঠেনি।
আমার বিশ্বাস, ভবিষ্যতের বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কেও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। সরকার পরিবর্তন হবে, রাজনৈতিক সমীকরণ বদলাবে, কিন্তু ভাষা, সাহিত্য এবং সংস্কৃতির সম্পর্ক অটুট থাকলে দুই দেশের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বোঝাপড়াও টিকে থাকবে।
স্বাতী গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে সাম্প্রতিক কথোপকথন আমাকে আবারও সেই সত্যের কথা মনে করিয়ে দিয়েছে। একজন আশি-উর্ধ্ব সাহিত্যপ্রেমী মানুষ বাংলাদেশের খবর রাখছেন, নতুন নেতৃত্ব সম্পর্কে জানতে চাইছেন, আবার একই সঙ্গে একটি বইয়ের জন্য আশীর্বাদ করছেন। এই চিত্রটি আমাদের বলে দেয়- রাজনীতির বাইরে আরও একটি বাংলাদেশ আছে, আরও একটি বাংলা আছে; যার পরিচয় সাহিত্য, সংস্কৃতি, মানবিকতা এবং সম্পর্ক।
আমরা যদি সেই সম্পর্ককে আরও গভীর করতে পারি, তবে দুই বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য আগামী প্রজন্মের কাছে আরও সমৃদ্ধ হয়ে পৌঁছাবে। ভাষার যে বন্ধন আমাদের এক করেছে, সেটিই হোক ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় শক্তি। রাজনৈতিক সীমান্ত রাষ্ট্রকে আলাদা করতে পারে, কিন্তু বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির যে আত্মীয়তা, তাকে কোনো সীমান্ত কখনো বিভক্ত করতে পারেনি এবং ভবিষ্যতেও পারবে না।
লেখক: জার্মানভিত্তিক সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক