তেহরানে শোকাবহ পরিবেশে এক আবেগঘন দৃশ্যের অবতারণা হয়। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোর প্রকাশিত ছবিতে দেখা যায়, জাতীয় পতাকায় আচ্ছাদিত খামেনির কফিন ধীরগতিতে বহন করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে গ্র্যান্ড মোসাল্লার দিকে—যা ইসলামী প্রজাতন্ত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার কেন্দ্র।
দাফনের পূর্ববর্তী শোকানুষ্ঠানে কালো পোশাকে অংশগ্রহণকারীরা অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে কফিনটি নির্ধারিত স্থানে স্থাপন করেন। লাল ফুলে সজ্জিত প্রাঙ্গণ আর চারদিকে উড়তে থাকা সাদা প্রজাপতি যেন শোক, শ্রদ্ধা ও বিদায়ের প্রতীক হয়ে পুরো পরিবেশকে আরও গম্ভীর ও আবেগময় করে তোলে।
ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুর চার মাসেরও বেশি সময় পর অনুষ্ঠিত এই দাফন প্রক্রিয়া কেবল একটি ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়; এর রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও প্রতীকী তাৎপর্য।
ইরানের শাসকগোষ্ঠী এই আয়োজনকে ইসলামী প্রজাতন্ত্রের প্রতি জনগণের সমর্থন ও আনুগত্যের প্রকাশ হিসেবে তুলে ধরছে।
একই সঙ্গে বিপুল জনসমাগমের মাধ্যমে দেশটির বিপ্লবী আদর্শ ও রাষ্ট্রীয় ঐক্য এখনো অটুট রয়েছে—এমন বার্তাই দেশ-বিদেশে পৌঁছে দিতে চাইছে তেহরান।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও সব জাতি, ধর্ম ও রাজনৈতিক মতাদর্শের ইরানিদের জানাজায় অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে তিনি বলেছেন, ‘আপনাদের ব্যাপক উপস্থিতি সন্ত্রাসবাদ, সহিংসতা ও জবরদস্তির বিরুদ্ধে একটি চূড়ান্ত জবাব হবে। একই সঙ্গে বিশ্বের কাছে এটি একটি স্পষ্ট বার্তা দেবে যে, ইরানি জাতি তার স্বাধীনতা ও মর্যাদা রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ।’
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি আমেরিকা ও ইসরায়েলের বিমান হামলায় নিহত হয়েছেন আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। দেরিতে দাফন নিয়ে একটি মহল নেতিবাচক কথা বলছেন।
ইরান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাথে চলমান যুদ্ধ অত্যন্ত ভয়াবহ ও বিপজ্জনক রূপ নেওয়ায় তখন শেষকৃত্য করা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে দুই পক্ষ সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে রাজি হওয়ায় এই বিশাল জানাজার আয়োজন করা হচ্ছে।
সে দেশের কর্মকর্তারা আরও জানান, ধর্মীয় ও আইনি নিয়ম মেনেই এতদিন তার মরদেহ সংরক্ষণ করা হয়েছিল। ইসলাম ধর্মে রাসায়নিক দিয়ে লাশ মমি বা তাজা রাখা নিষেধ। তাই খামেনির মরদেহ মমি না করে আধুনিক ফরেনসিক মর্গের হিমাগারে (ফ্রিজে) বরফ করে রাখা হয়েছিল। শিয়া ধর্মীয় আইন অনুযায়ী, বিশেষ জরুরি পরিস্থিতিতে লাশ ফ্রিজে রেখে দাফন দেরিতে করার সুযোগ রয়েছে।
শুক্রবার আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মরদেহ তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লা মসজিদে নেওয়া হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে ৩৬ বছরেরও বেশি সময় দেশটির নেতৃত্ব দেওয়া এই নেতার শেষকৃত্যের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হলো। যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই এ খবর জানিয়েছে।
ইরানি কর্তৃপক্ষের আশা, খামেনির শেষ বিদায়ে প্রায় ২ কোটি মানুষ অংশ নেবেন। তা হলে এটি হবে দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় শেষকৃত্যের অনুষ্ঠান।
তেহরানে রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে খামেনির মরদেহ নেওয়া হবে ইরাকের পবিত্র শহর নজফ ও কারবালায়, যেখানে লাখো ভক্ত-অনুসারী শেষ শ্রদ্ধা জানানোর সুযোগ পাবেন। এরপর আগামী ৯ জুলাই উত্তর-পূর্ব ইরানের জন্মস্থান মাশহাদে ইমাম রেজার পবিত্র মাজার প্রাঙ্গণে তাকে দাফন করা হবে। এই দীর্ঘ পরিক্রমার মাধ্যমে ইরান কেবল একজন নেতাকে বিদায়ই জানাচ্ছে না, বরং তার রাজনৈতিক ও ধর্মীয় উত্তরাধিকারের প্রতিও আনুষ্ঠানিক শ্রদ্ধা নিবেদন করছে।
এসএন/