বর্ষা পুরোপুরি শুরু হওয়ার আগেই দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ উদ্বেগজনকভাবে বাড়তে শুরু করেছে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় এডিস মশার ঘনত্ব আশঙ্কাজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিনই বাড়ছে ডেঙ্গু উপসর্গ নিয়ে আসা রোগীর সংখ্যা। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এখনই কার্যকর ও সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে আগস্ট-সেপ্টেম্বরে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
সিটি করপোরেশনের দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, চলতি বছর ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছেন। বিশেষ করে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনকে ডেঙ্গু ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সমন্বিতভাবে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে এ লক্ষ্যে একটি বিশেষ টাস্কফোর্সও গঠন করা হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমকে প্রধান সমন্বয়ক করে এক বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। এর নাম দেওয়া হয়েছে ‘সারা দেশে ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত অন্যান্য রোগ প্রতিরোধে টাস্কফোর্স কমিটি’। এই কমিটির সদস্যরা রাজধানীর বাড়ি বাড়ি গিয়ে এডিস মশার লার্ভা শনাক্ত ও ধ্বংসে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করছে।
ইতোমধ্যে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন এলাকায় এ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। গতকাল বুধবার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের নিয়ে বৈঠক হয়েছে। সেখানে ডেঙ্গু মোকাবিলায় একাধিক নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
কীটতত্ত্ববিদ কবিরুল বাশার সাংবাদিকদের জানান, ঢাকাসহ দেশের অনেক জেলায় এডিস মশার ঘনত্বের সূচক এখন ২০-এর বেশি। বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা, আর্দ্রতা এবং রোগীর সংখ্যা বিশ্লেষণ করে তৈরি পূর্বাভাস অনুযায়ী আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে দেশের বেশ কয়েকটি জেলায় ডেঙ্গুর সংক্রমণ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়তে পারে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্যমতে, গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে একজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে ১৬৩ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। আক্রান্তদের মধ্যে বরিশালে ৪৬ জন, চট্টগ্রামে ২৭, ঢাকা বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) ২৩, ঢাকা উত্তর সিটিতে ৮, দক্ষিণ সিটিতে ১৭, খুলনায় ২৪, ময়মনসিংহে ১৪ এবং রাজশাহীতে ৪ জন রয়েছেন। এ নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৯ জনে এবং আক্রান্তের সংখ্যা ছয় হাজার ছাড়িয়েছে।
গত দুই বছরের অভিজ্ঞতাও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। ২০২৫ সালে দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছিলেন ১ লাখ ২ হাজার ৮৬১ জন, মৃত্যু হয়েছিল ৪১৩ জনের। ২০২৪ সালে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ১ হাজার ২১৪ এবং প্রাণ হারান ৫৭৫ জন। সেই অভিজ্ঞতায় এবার বর্ষার শুরুতেই সতর্ক হওয়ার তাগিদ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
তাদের মতে, এবার ডেঙ্গুর ঝুঁকি আগেভাগে বেড়ে যাওয়ার প্রধান কারণ হলো রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় বর্ষার আগেই এডিস মশার লার্ভার ঘনত্ব অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়া। বৃষ্টির পানি জমে থাকা, অপরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনা এবং মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের দুর্বলতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
রাজধানীর সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিনই জ্বর, মাথাব্যথা, শরীর ব্যথা, বমি ও দুর্বলতা নিয়ে রোগীরা চিকিৎসা নিতে আসছেন। চিকিৎসকদের ভাষ্য, অনেকেই প্রথমদিকে সাধারণ জ্বর ভেবে চিকিৎসা নিতে দেরি করেন। এতে জটিলতা বাড়ছে। তারা উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত পরীক্ষা করানো এবং চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ধরনের ব্যথানাশক ওষুধ সেবন না করার পরামর্শ দিয়েছেন।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে দুই সিটি করপোরেশনের প্রস্তুতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। যদিও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন প্রথমবারের মতো নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ৭৫টি ওয়ার্ডে ২ হাজার ২৫০টি বাড়িতে প্রাক-বর্ষা এডিস লার্ভা জরিপ পরিচালনা করছে। জরিপের প্রাথমিক ফলাফলই উদ্বেগ বাড়িয়েছে। দক্ষিণ সিটির ৭৫টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৬৩টিতেই এডিস মশার ঘনত্ব নির্ধারিত নিরাপদ মাত্রার চেয়ে বেশি পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ২৭টি ওয়ার্ডকে চরম ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। উত্তর সিটি করপোরেশনেরও অন্তত ২৪টি ওয়ার্ড উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে।
মাঠপর্যায়ের কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস, জনপ্রতিনিধিদের অনুপস্থিতি এবং বিভিন্ন পদে দীর্ঘদিন শূন্যতা থাকায় মশকনিধন কার্যক্রমে ধারাবাহিকতা ব্যাহত হয়েছে। তদারকির দুর্বলতার কারণে অনেক এলাকায় নিয়মিত লার্ভা ধ্বংস ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালিত হয়নি। নির্বাচনের পরও স্থানীয় পর্যায়ে জনপ্রতিনিধি (কাউন্সিলর) না থাকায় অনেক ওয়ার্ডে কাঙ্ক্ষিত গতি ফিরে আসেনি।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসকের একান্ত সচিব (উপসচিব) মোহাম্মদ আবদুল্লাহ খবরের কাগজকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে বিশেষ টিম গঠন করা হয়েছে। রাজধানীজুড়ে বিশেষ অভিযান পরিচালিত হচ্ছে এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী সরাসরি এসব কার্যক্রম তদারকি করছেন। প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি রয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. জাহানে ফেরদৌস বিনতে রহমান বলেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে ডেঙ্গু প্রতিরোধে বিশেষ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। পরিস্থিতিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র ভিন্ন। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, কয়েক দিনের বৃষ্টিতে খাল, নালা, ড্রেন ও পরিত্যক্ত স্থানে পানি জমে রয়েছে। অনেক জায়গায় গিয়ে দেখা গেছে, আবর্জনায় ভরা স্থির পানি এডিস মশার প্রজননক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ–নিয়মিত ফগিং হলেও লার্ভা ধ্বংস ও জমে থাকা পানি অপসারণে কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে।
চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, বর্ষা মৌসুম শুরুর আগেই বৃষ্টিপাত শুরু হওয়ায় এবার ডেঙ্গুর প্রকোপও আগেভাগেই দেখা দিয়েছে। কার্যকর প্রতিরোধব্যবস্থার অভাবে ডেঙ্গু এখন আর রাজধানীকেন্দ্রিক নয়, দেশের বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে। তার মতে, ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন মশাবাহিত রোগের বিস্তার জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারি সংস্থাগুলোকে নিয়মিত মশকনিধন কার্যক্রম পরিচালনা, লার্ভা ধ্বংস এবং কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে জনসচেতনতা বাড়িয়ে ব্যক্তি ও সামাজিক পর্যায়ে প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ জোরদার করা জরুরি। সময়মতো এসব ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে সামনের মাসগুলোতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
পরিকল্পনাবিদ ও ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, শুধু কাগজে-কলমে প্রস্তুতি নয়, মাঠপর্যায়ে লার্ভিসাইডিং, নিয়মিত ফগিং, খাল-নালা পরিষ্কার এবং আবর্জনা অপসারণে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে সিটি করপোরেশনসহ দায়িত্বপ্রাপ্তদের কার্যক্রমে জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়বে।