দেশজুড়ে নারীদের বিরুদ্ধে হয়রানি, নির্যাতন, ধর্ষণ, গণপিটুনি ও সাইবার বুলিংয়ের ঘটনা ‘উদ্বেগজনক হারে বেড়ে চলায়’ বাংলাদেশের সব স্তরের নারীদের নিরাপত্তা এখন একটি প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মন্তব্য এসেছে নাগরিক সমাজের একটি প্রতিবাদী সমাবেশ থেকে। দেশব্যাপী নারী নির্যাতনের প্রতিবাদ জানাতে ‘নারীর সহিংসতার বিরুদ্ধে নারীরা’- নামের একটি ব্যানারে শুক্রবার (৭ মার্চ) বিকেলে রাজধানীর জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে এ প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
এই প্রতিবাদী সমাবেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. তানজিমউদ্দিন খান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. সামিনা লুৎফা, অধিকারকর্মী শিরিন হক ছাড়াও বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার নারীরা অংশ নেন। তাদের সঙ্গে সংহতি জানাতে তরুণরাও সবান্ধব অংশ নেন প্ল্যাকার্ড, ফেস্টুন হাতে; যোগ দেন ফ্ল্যাশ মবেও।
শুক্রবার বিকেল ৩টায় শুরু হওয়া এই সমাবেশের শুরুতে প্ল্যাকার্ড হাতে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে পড়েন প্রতিবাদ জানাতে আসা নারী, পুরুষ। নারী নির্যাতন বন্ধে রাষ্ট্রের ব্যর্থতা নিয়ে কটাক্ষমূলক বার্তা লেখা হয় প্ল্যাকার্ডে। নারী নির্যাতনের ঘটনায় স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট (অব.) জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর মন্তব্যের কড়া সমালোচনা আসে এই সমাবেশ থেকে। অবিলম্বে তার পদত্যাগের দাবিতে দুটি বড় ব্যানারও নিয়ে আসেন নারীরা।
প্রতিবাদী নারীদের একজন সমাবেশে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন। তিনি বলেন, ‘সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দেশজুড়ে সমাজের সকল স্তরের নারীদের বিরুদ্ধে হয়রানি, নির্যাতন, ধর্ষণ, গণপিটুনি ও সাইবার বুলিংয়ের উদ্বেগজনক ঘটনা ঘটছে। এগুলোকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি নারীদের বিরুদ্ধে একটি সুপরিকল্পিত সহিংসতা ও ভয় দেখানোর ধারাবাহিক প্যাটার্নের অংশ।’
প্রতিবাদী নারীরা ঢাকার শ্যামলীতে যৌনকর্মীদের ওপর হামলা, লালমাটিয়ায় দুই শিক্ষার্থীর ওপর জনসমক্ষে নির্যাতন ও হয়রানি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী একই বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি স্টাফের কাছে নিগ্রহের ঘটনার তীব্র নিন্দা জানান। পাশাপাশি কক্সবাজারে হিজড়া সম্প্রদায়ের ওপর হামলা, রংপুর ও জয়পুরহাটে মেয়েদের ফুটবল মাঠে আক্রমণ, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নারীসসহ ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় নারীদের প্রতিদিনের হয়রানির ঘটনায় সরকারের ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করেন।
লিখিত বক্তব্যে বলা হয়েছে, ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যা গণ-আন্দোলন এবং জনগণের বিচার, স্বাধীনতা ও বৈষম্যহীনতার দাবির মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছে, এখন পর্যন্ত তাদের প্রতিশ্রুতি ও আকাঙ্ক্ষা রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে। নারীদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক হামলার বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ তারা গ্রহণ করেনি, অপরাধীদের আইনের আওতায় আনেনি। বরং তাদের নিষ্ক্রিয়তা এসব অপরাধকে আরও উসকে দিযেছে। সরকারের এই নিষ্ক্রিয়তা খুবই উদ্বেগজনক, যেন নারীদের ওপর হামলা ও ভয় দেখানো স্বাভাবিক ও গ্রহণযোগ্য ঘটনা।’
নারীদের প্রতি সহিংসতার পাশাপাশি দেশের অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধেও প্রতিশোধমূলক হামলা, হুমকি ও সংগঠিত ‘মব অ্যাটাকের’ ঘটনায় লিখিত বক্তব্যে আতঙ্ক প্রকাশ করেন বিক্ষুব্ধ নারীরা।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী এবং পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের বিবৃতি নারীদের আশ্বস্ত করার পরিবর্তে ‘পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে’ বলে অভিযোগ করেন তারা। লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, ‘ভুল তথ্য, আইন ও বাস্তবতা সম্পর্কে বিভ্রান্তি তাদের বক্তব্যে স্পষ্ট, যা কিনা ঘটনার বিচার না করে বরং অপরাধীদের রক্ষা করেছে।’
জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীকে ‘নারী নির্যাতনের উসকানিদাতা’ হিসেবে উল্লেখ করে বলা হয়, ‘আমরা দাবি করছি, স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীকে অবিলম্বে অপসারণ করা হোক। তার দায়িত্বহীন ও বিভ্রান্তিকর বক্তব্য জনমানুষের আস্থা নষ্ট করেছে। আমাদের দাবি, সকল শ্রেণি, ধর্ম, জাতি ও পরিচয়ের নারী যেন নিরাপদে ও নির্ভয়ে তাদের অধিকার চর্চা করতে পারে। আমরা চুপ থাকব না। আমরা আমাদের প্রতিবাদ চালিয়ে যাব, যতক্ষণ না আমরা একটি নিরাপদ, স্বাধীন ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করতে পারি।’
গণমাধ্যমে নারীর প্রতিবাদকে ‘ভুলভাবে দেখানো’ হচ্ছে বলে সমাবেশে অভিযোগ আনা হয়েছে। তারা বলেন, ‘সহিংসতাকে স্বাভাবিক হিসেবে দেখানোর চেষ্টা চলছে, যা আমরা কখনও মেনে নেব না।’
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শাসন কাঠামো জোরদার করে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান নারীরা। সাইবার বুলিং বন্ধ করতে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনার কথাও বলেন তারা।
প্রতিবাদী সমাবেশ শেষে নারীরা একটি বিক্ষোভ মিছিলও বের করেন পরে। মিছিলটি মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ প্রদক্ষিণ করে আবার জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে এসে শেষ হয়।
জয়ন্ত সাহা/মাহফুজ