মাগুরায় বোনের বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে ‘ধর্ষণের শিকার’ শিশুটিকে অচেতন অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। অবস্থা্র অবনতি হওয়ায় তাকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়েছে। শিশুটির চিকিৎসার দায়িত্ব নেওয়া স্থানীয় এক রাজনীতিক খবরের কাগজকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
ওই ঘটনায় শিশুটির দুলাভাই ও তার বোনের শ্বশুরকে আটক করেছে পুলিশ। এদিকে আটক ব্যক্তিদের ছিনিয়ে নিতে গতকাল একদল বিক্ষুব্ধ জনতা মাগুরা সদর থানা ঘেরাও করে। পরে সেনাসদস্যরা এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। এদিকে মাগুরায় শিশু ধর্ষণের ঘটনায় ক্যাম্পাসে প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ মিছিল করেছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।
জানা যায়, ঘটনার পর শিশুটিকে প্রথম অচেতন অবস্থায় ঘরের মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখা যায়। পরে ওই অবস্থায় শিশুটিকে মাগুরা ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
শিশুটির মায়ের ভাষ্য, বোনের বাড়িতে মেয়েকে ঘরের মধ্যে একা পেয়ে কেউ একজন ধর্ষণ করেছে। যেহেতু ওই সময় বাড়িতে সে একা ছিল, আর এখনো মেয়ের জ্ঞান ফেরেনি, তাই তাকে কে ধর্ষণ করেছে তা সঠিকভাবে বলা যাচ্ছে না।
মাগুরা সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক সুবাস রঞ্জন হালদার বলেন, শিশুটিকে প্রথমে শ্বাসকষ্টের রোগী হিসেবে নিয়ে আসা হয়। পরে মেডিসিন বিভাগে নিয়ে গেলে ধর্ষণ আর হত্যাচেষ্টার আলামত পাওয়া যায়। মেয়েটির অবস্থা শঙ্কামুক্ত নয়। সে কারণে তাকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
মাগুরা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আইয়ুব আলী বলেন, ‘শিশুটির সঙ্গে কী ঘটেছে, সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। শিশুটি অচেতন অবস্থায় ছিল। যে বাসায় সে বেড়াতে এসেছিল, ধারণা করা হচ্ছে, সেখানেই ঘটনা ঘটেছে। পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ শিশুটির বোনের জামাই সজীব শেখ ও বোনের শ্বশুর হিটু শেখকে আটক করেছে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।’
ওসি আইয়ুব আলী আরও বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, শিশুটিকে ধর্ষণ করা হয়েছে। তার পরিবারের সবাই ঢাকায় হাসপাতালে। এখন পর্যন্ত কেউ থানায় লিখিত অভিযোগ দেননি।’
এদিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজে চিকিৎসাধীন শিশুটির এখনো জ্ঞান ফেরেনি। তাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (পিআইসিইউ) রাখা হয়েছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, অবস্থা আরও খারাপ হলে তাকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হবে।
শিশুটির পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাদের বাড়ি মাগুরার শ্রীপুর উপজেলায়। শিশুটি কয়েক দিন আগে তার বড় বোনের (শ্বশুর) বাড়িতে বেড়াতে এসেছিল।
এ ঘটনা নিয়ে ফেসবুকে অনেকে পোস্ট দিয়েছেন। এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার ও বিচার দাবিতে গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় মাগুরা শহরে মিছিল বের করা হয়।
আসামি ছিনিয়ে নিতে থানা ঘেরাও
শিশু ধর্ষণের ঘটনায় সদর থানা ঘেরাও করে আসামি ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে বিক্ষুদ্ধ জনতা। গতকাল শুক্রবার জুমার নামাজের পর শহরের ভায়না মোড় ও চৌরঙ্গী মোড়ে বিক্ষোভ করতে থাকে একদল কিশোর। সেখানে তারা সড়ক অবরোধ করে। পরে তারা সদর থানা গেটে অবস্থান নেয়। গেট ভাঙতে গেলে পুলিশ তাদের বাধা দেয়। পরে সেনাবাহিনীর সদস্যরা তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়।
এ বিষযে মাগুরা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘ধর্ষণের ঘটনায় সন্দেহভাজন দুজনকে আটক করেছে পুলিশ। ভিকটিমের পরিবারের কেউ এখন পর্যন্ত অভিযোগ দেয়নি। শিশুটির চিকিৎসা চলছে। সে জন্য হয়তো আইনগত পদক্ষেপ নিতে তার পরিবার বিলম্ব করছে। কিন্তু একদল বিক্ষুদ্ধ জনতা এখনই অভিযুক্তদের বিচার দাবি করছে। তাদের বাড়ি ফিরে যাওয়ার অনুরোধ করলেও তারা থানা ঘেরাও করতে আসে। সেনাসদস্যদের সহযোগিতায় পরিস্থিতি শান্ত করা হয়েছে।
জবিতে বিক্ষোভ
জবি প্রতিনিধি জানান, মাগুরায় শিশু ধর্ষণের ঘটনায় ক্যাম্পাসে প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ মিছিল করেছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি) শিক্ষার্থীরা। গতকাল বিক্ষোভ মিছিলটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাস্কর্য চত্বর থেকে শুরু করে সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ ঘুরে এসে ভাষাশহিদ রফিক ভবনের সামনে সমাবেশে মিলিত হয়। এ সময় দেশের প্রতিটি ধর্ষণের বিচার ও ধর্ষণের শাস্তি প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ডের দাবি জানান তারা।
ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী সজিবুর রহমান বলেন, ‘কেউ বলে ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হলে মানবাধিকার লঙ্ঘন হবে। আমরা বলছি, আমেরিকার দেওয়া মানবাধিকারের সংজ্ঞা আমরা মানি না। রাষ্ট্র যদি ধর্ষণের মতো অপরাধের জন্য কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা না করে, তাহলে নারীরা নিরাপদ হবে না।’
আতিকুর রহমান তানজিল নামের আরেক শিক্ষার্থী বলেন, ‘গত ৫ আগস্টের পর থেকে দেশে ২৫টির মতো ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।’