‘বই পড়ি, স্বপ্ন আঁকি’ এই স্লোগানে শনিবার (১৯ জুলাই) অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘বাংলাদেশ বুক অলিম্পিয়াড’। মুক্তযুদ্ধবিষয়ক সংগঠন মুক্ত আসরের উদ্যোগে ও বাংলাদেশ বুক অলিম্পিয়াড কমিটির আয়োজনে স্কুল-কলেজ শিক্ষার্থীদের নিয়ে প্রথমবারের মতো এ অলিম্পিয়াড অনুষ্ঠিত হয়।
শিশু-কিশোরদের বই পড়ার অভ্যাস তৈরি করার জন্য এই আয়োজন করা হয়। রাজধানীর আগারগাঁওয়ে আলোক শিক্ষালয়ে অনুষ্ঠিত এই আয়োজনে ২০০ জন শিক্ষার্থী অংশ নেয়।
শনিবার সকাল সাড়ে ৯টায় জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে অলিম্পিয়াডের যাত্রা শুরু হয়। লাল ফিতা কেটে বাংলাদেশ বুক অলিম্পিয়াড উদ্বোধন করেন শব্দঘর সম্পাদক ও কথাসাহিত্যিক মোহিত কামাল।
তিনি বলেন,‘ প্রথমবারের এমন আয়োজনে সঙ্গে যুক্ত হতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে করছি। বইয়ের সঙ্গে থাকতে চাই। অত্যাধিক নেট-আসক্তির কারণে 'ব্রেনরট' নামের নতুন শব্দ চালু হয়েছে বিশ্ব-ডিকশনারিতে। বলা যায় ব্রেনের অবিরত তথ্যপ্রবাহে জট তৈরি হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মস্তিষ্কের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া। পড়াশোনাবিমুখ হচ্ছে সন্তানেরা, আচরণেও ব্যাপক বিধ্বংসী অবস্থা তৈরি হচ্ছে। মা-বাবা হয়ে যাচ্ছেন সন্তানের বিরুদ্ধপক্ষ। শিশুকাল থেকে নেটের এই অপব্যবহার কেবল ‘ব্রেনরট’ করেই থেমে যাচ্ছে না, পড়াশোনা থেকেও দূরে সরিয়ে দিচ্ছে সন্তানদের। প্রযুক্তির এ যুগে অবশ্যই নেটের লাগামহীন ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে শিশুকাল থেকেই। নেটের সঙ্গে তারা পরিচিত হবে, সমস্যা নেই। কিন্তু অনিয়ন্ত্রিত হয়ে গেলে রক্ষা নেই। নেটের বিকল্প বিনোদনের উপাদান থাকতে হবে। তার ঘরে লাইব্রেরি গড়ে তুলতে হবে। শিশুতোষ বই কিংবা বয়স অনুযায়ী শিশুদের ঘরে পারিবারিক সামর্থ্যের আলোকে লাইব্রেরি সাজাতে হবে। মজার মজার বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে পারলে, পড়ার মাধ্যমে বিনোদন দেওয়ার ব্যবস্থা করতে পারলে, অনিয়ন্ত্রিত হওয়ার সুযোগ পাবে না সন্তান।’
তিনি বলেন, ‘পরিবারের বড়দেরও নেট থেকে দূরে থাকতে হবে। তাদেরই রোলমডেল প্লে করতে হবে। শিশুর ঘরে চিত্রাংকনের নানা উপকরণ কিংবা লুডু, ক্যারামবোর্ড, দাবা ইত্যাদি ঘরোয়া খেলাধুলার পুরোনো দিনের অভ্যাসটাকে চালু করতে হবে।’
শিশু সাহিত্যিক আখতার হুসেন বলেন, আমার এখন ৮১ বছর বয়স। তবু আমি এখানে এসেছি। কারণ বুক অলিম্পিয়াড বিষয়টা আমার কাছে দারুণ লেগেছে। প্রথমবারের মতো এমন আয়োজনের সাক্ষী হিসেবে থাকতে পেরে আমি আবেগাপ্লুত। নিশ্চয়ই একদিন গণিত অলিম্পিয়াডের মতো এর ব্যাপক বিস্তার পাবে।’
বাংলাদেশ বুক অলিম্পিয়াড কমিটির সভাপতি রোকেয়া ইসলাম বলেন, ‘আমরা চাই, বই পড়ার মাধ্যমে ছেলেমেয়ের চিন্তার বিকাশ হোক। আমরা বুক অলিম্পিয়াডকে অনেকদূর নিয়ে যেতে চাই। ছেলেমেয়েরা বই পড়ার মাধ্যমে তাদের স্বপ্নকে বড় করবে।’
বাংলাদেশ বুক অলিম্পিয়াড কমিটির সাধারণ সম্পাদক আবু সাঈদ বলেন, ‘আমরা চাই বই পড়ার মাধ্যমে ছেলে মেয়েদের সৃজনশীল ও মননশীল চিন্তার সৃষ্টি হোক। প্রতিবছর কমপক্ষে ক্লাসের পড়া ছাড়াও ২০-২৫টি বই পড়ার অভ্যাস গড়ে উঠুক।’
এছাড়া বক্তব্য রাখেন শিশুসাহিত্যিক দন্ত্যস রওশন, লেখক ও গবেষক সাহাদাত পারভেজ, যোগাযোগ বিষয়ক প্রধান সমন্বয়ক আবুল বাসার মিরাজ, আলোক শিক্ষালয়ের শিক্ষক শাওলিন আক্তার, মুক্ত আসরের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কৌশিক চাকমাসহ প্রমুখ।
এক ঘণ্টা বইবিষয়ক নানা ধরনের প্রশ্ন নিয়ে তিনটি ক্যাটাগরিতে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। পরীক্ষা পর্ব শেষ হলে শুরু হয় সাংস্কৃতিক ও আলোচনা অনু্ষ্ঠান। নজরুল সংগীত পরিবেশন করেন নজরুলসংগীত শিল্পী ও আমিই নজরুলের পরিচালক উম্মে রুমা ট্রফি ও সহপরিচালক সংগীতা পাল। এছাড়া গান পরিবেশন করেন আলোক শিক্ষালয়ের শিক্ষার্থীরা। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন বাংলাদেশ বুক অলিম্পিয়াডের প্রধান সমন্বয়ক আয়শা জাহান নূপুর।
তিনটি ক্যাটাগরিতে ৩২ জনকে বিজয় করা হয়। প্রত্যেক বিজয়কে দেওয়া হয়ে বই ও সনদ। প্রস্তুতি পর্বের বিজয়ীরা সরাসরি জাতীয় পর্যায় অংশ নেবে।
বাংলাদেশ বুক অলিম্পিয়াডে সহযোগিতায় আছে স্বপ্ন ৭১ প্রকাশন, বইচারিতা ও কাঠবিড়ালি প্রকাশন।