ঢাকা ৭ বৈশাখ ১৪৩১, শনিবার, ২০ এপ্রিল ২০২৪
Khaborer Kagoj

সর্বস্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহার চাই

প্রকাশ: ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৯:৩১ এএম
সর্বস্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহার চাই
ওসমান গনি

বাংলা আমাদের মাতৃভাষা। এ ভাষার মাধ্যমেই আমরা একে অপরের সঙ্গে মনের ভাব প্রকাশ করে থাকি। এ ভাষায় কথা বলতে পেরে আমরা আত্মতৃপ্তি পাই। আমরা বাঙালিরা যেভাবে বাংলা ভাষায় কথা বলে বা লিখে আমরা মনের ভাব প্রকাশ করতে পারি, তা অন্য ভাষায় প্রকাশ করা আমাদের জন্য বেশ কষ্টকর। তাই পৃথিবীতে যত ভাষা রয়েছে সব ভাষার চেয়ে আমাদের মাতৃভাষা বাংলা আমাদের কাছে সবার চেয়ে ঊর্ধ্বে। তাতে কারও কোনো সন্দেহ থাকার কথা না। 

বর্তমানে আমাদের এ বাংলা ভাষা হাঁটি হাঁটি পা পা করে আজ আন্তর্জাতিক ভাষার মর্যাদা লাভ করছে। যেটা আমাদের বাঙালির কাছে সবচেয়ে বড় সম্মানের বিষয়। কিন্তু আমাদের এ ভাষা আমরা কোনো ব্যক্তি বা জাতির করুণায় পাইনি। এ ভাষার জন্য আমাদের অনেক সংগ্রাম করতে হয়েছে। এ ভাষা আদায় করার জন্য বাঙালি জাতি তাদের বুকের তাজা রক্ত দিয়েছে। শহিদ হয়েছে এ দেশের লাখ লাখ মানুষ। বহু ত্যাগ-তিতিক্ষার মধ্য দিয়ে আমরা আমাদের এ প্রিয় বাংলা ভাষাকে চিনিয়ে আনতে হয়েছে। যাদের বুকের তাজা রক্তের বিনিময়ে আমরা আমাদের বাংলা ভাষাকে পেয়েছি আজ আমরা তাদের কাছে চিরঋণী। কিন্তু যারা সংগ্রাম করে আমাদের বাংলা ভাষা এনে দিয়ে গেল আমরা আজ তাদের জন্য কী করতে পেরেছি? আর এ বাংলা ভাষার প্রচলনই বা কতটুকু ধরে রাখতে পেরেছি। যারা ভাষার জন্য নিজেদের জীবন বাজি রেখে ভাষা আনল তারা কি আজ তাদের যথাযথ মর্যাদা পাচ্ছে। 

আমরা প্রায় সময় বিভিন্ন গণমাধ্যমে দেখি ভাষা শহিদদের স্মৃতিগুলো অযত্ন আর অবহেলায় পড়ে থাকে। এগুলোর যথাযথ কোনো মূল্যায়ন করা হয়নি। প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি মাস আসলে পরে আমরা আমাদের ভাষার জন্য পাগল হয়ে যাই। বছরের অন্য দিনগুলোয় তার কোনো খবর থাকে না। এমনটা হওয়া আমাদের জন্য মোটেও ঠিক না। যে ভাষার জন্য লাখো লোক শহিদ হয়ে ভাষা আনল, সেই ভাষার প্রতি আমাদের সব সময় সচেতন থাকতে হবে। ভাষার কোনো বিকৃত হয় কি না, সে ব্যাপারে আমাদের সজাগ থাকতে হবে। দেশের সর্বত্র বাংলা ভাষার প্রচলন হয় কি না, সেটাও দেখতে হবে। আমাদের দেশের সর্বত্র যদি বাংলা ভাষার প্রচলন চালু রাখতে পারি তাহলে আমাদের ভাষার জন্য সংগ্রাম সার্থক ও সফল হবে। এখনো আমাদের দেশের অনেক জায়গায় ভিনদেশের ভাষার প্রচলন দেখা যায়। যেটা আমাদের জন্য মোটেও কাম্য না। হ্যাঁ ভিনদেশের ভাষারও প্রয়োজন আছে। দেশের কিছু আন্তর্জাতিক ব্যাপার রয়েছে, যেগুলোয় ভিনদেশি ভাষার দরকার হয়। সেক্ষেত্রে আমরা আমাদের ভাষার স্থান দিতে হবে সবার ঊর্ধ্বে। প্রয়োজনে বাংলা ভাষার নিচে ছোট করে ভিনদেশি ভাষা ব্যবহারের নিয়ম করা যেতে পারে। নিজ দেশের ভাষাকে বিসর্জন দিয়ে অন্য দেশের ভাষাকে ওপরে স্থান দিতে হবে তা মানা যায় না। যদি দেওয়া হয় তাহলে ভাষার জন্য বাঙালির সংগ্রাম ও রক্ত বৃথা যাবে। এটা হবে আমাদের বাঙালির জন্য আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। যেটা এ দেশের কোনো শিক্ষিত বা অশিক্ষিত লোকই মেনে নেবে না। বাংলা ভাষা অতি সহজ ও মধুর ভাষা হওয়ার কারণে বিশ্বের অনেক দেশের লোক এখন ধীরে ধীরে বাংলা ভাষা শিখতে শুরু করছে। তাদের এ ভাষা শেখানোর জন্য প্রশংসার দাবিদার আমাদের দেশের খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ। যারা কর্মের তাগিদে বিভিন্ন দেশে গিয়ে কর্মের স্বার্থে নিজ দেশের ভাষা বিদেশিদের শেখান। অনেক ভিনদেশি লোক আমাদের দেশে আসেন আমাদের দেশের লোকজনের সঙ্গে। তারা ধীরে ধীরে বাংলা ভাষায় কথা বলেন। আবার অনেক ভিনদেশি লোক পুরোপুরি বাংলা ভাষায় কথা বলতে শিখেছেন। এটা আমাদের বাঙালিদের গৌরব। কারণ আমাদের মাতৃভাষায় ভিনদেশিরা কথা বলে। 

বাংলা ভাষার প্রসার ঘটাতে যদি আমাদের দেশের নিরীহ লোকেরা এতটুকু দায়িত্ব পালন করে থাকেন তাহলে আমাদের দেশের উচ্চশিক্ষিত লোকেরা কী করেন? তারা ব্যস্ত থাকেন তাদের ছেলেমেয়েদের ইংরেজি শেখাতে। তারা মনে করেন ছেলেমেয়েরা ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত হলে তাদের গৌরব। যেটা মোটেও ঠিক না। হ্যাঁ ইংরেজি শিখবে, তবে আগে নিজ মাতৃভাষা বাংলা শেখার পর। তাহলেই তাদের গৌরব করা সাজে। নিজের মাতৃভাষা পদদলিত করে অন্য দেশের ভাষা ছেলেমেয়েদের শিখানো সেটা বোকামি ছাড়া আর কিছুই না। ইংরেজি যেমন বর্তমানে সারা বিশ্বের ভাষা, পর্যায়ক্রমে বাংলাও হবে একদিন সারা বিশ্বের ভাষা। হয়তো সেদিন আর বেশি দূরে নয়। বর্তমানে আমাদের দেশে লাখ লাখ নতুন লেখক সৃষ্টি হয়েছে। যারা সারা বছর বিভিন্ন গল্প ও উপন্যাসের বই লিখেন একুশের বইমেলায় প্রকাশের জন্য। আর এ বইগুলো এত প্রাঞ্জল ভাষায় লিখেন যেগুলো মানুষ শুধু পড়তেই চায়। এতে মানুষের বই পড়ারও একটা অভ্যাস হচ্ছে। তবে বই লেখার ক্ষেত্রে আমাদের দৃষ্টি রাখতে হবে যাতে ভাষার বানান ও রূপ সঠিক থাকে। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার জন্য যেমন আমরা জীবন দিয়েছি এ ভাষার প্রসার ঘটাতে ও আমরা জোর চেষ্টা চালিয়ে যাব। 

রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সুনির্দিষ্ট দাবি দুটির একটি ছিল রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই, অপরটি সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলন চাই। পেছনে ফিরে তাকালে প্রশ্ন উঠতে পারে যে, দুটি দাবি কেন তোলা হলো, একটিই তো যথেষ্ট হওয়ার কথা। রাষ্ট্রভাষা যদি বাংলা হয় তাহলেও সর্বস্তরে তার যে প্রচলন ঘটবে কি না, সে বিষয়ে কোনো সংশয় ছিল কি? জবাব হচ্ছে, হ্যাঁ, ছিল। প্রথমত পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা যে বাংলা হবে এমন দাবি পূর্ববঙ্গের মানুষ তোলেনি, তারা চেয়েছে বাংলা হবে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা অর্থাৎ দুটির একটি। তাই বাংলাকে যদি রাষ্ট্রের ভাষা হিসেবে মেনে নেওয়াও হয় তাহলেই যে সর্বস্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহার নিশ্চিত হয়ে যাবে এমন ভরসা কোথায়? ভরসা নেই বলেই বোধহয় রাষ্ট্রভাষা দাবি সঙ্গে বাংলা প্রচলনের দাবিটাও উঠেছিল।

অখণ্ড পাকিস্তানে বাংলাকে শেষ পর্যন্ত অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে মেনে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু নতুন জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ বাঙালি ওই মেনে নেওয়াতে সন্তুষ্ট হতে পারেনি, যে জন্য ধাপে ধাপে এগিয়ে এবং পূর্ণ স্বাধীনতা প্রাপ্তির প্রয়োজনে তারা এমন একটি রাষ্ট্রই প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছে যার অন্যতম নয়, একমাত্র রাষ্ট্রভাষাই বাংলা। বাংলা উচ্চশিক্ষার মাধ্যম হয়নি। তদুপরি শিক্ষা তিন ধারায় বিভক্ত হয়ে গেছে। তিনটির মধ্যে যে ধারাটি ক্রমাগত শক্তি সঞ্চয় করছে এবং যার ভেতরে থেকে বিত্তবান পরিবারের সন্তানরা লেখাপড়া করছে এবং আগামী দিনে যে ধারায় শিক্ষিতরাই সমাজে কর্তৃত্ব করবে বলে ধরে নেওয়া যায়, সেই ধারাটির মাধ্যম অবশ্যই বাংলা নয়। সেটি ইংরেজি। আর বাংলা মাধ্যমে যারা লেখাপড়া করে তাদের ভেতরও ইংরেজির প্রতি আগ্রহ যে কমছে না বরং বাড়ছে এতেও নিশ্চয়ই সন্দেহ নেই। উচ্চস্তরে মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষা না দেওয়ার ব্যর্থতার দরুন শিক্ষা গভীর হচ্ছে না, এমনকি তাকে যথার্থ শিক্ষাও বলা যাচ্ছে না, কেননা মাতৃভাষা ছাড়া কোনো শিক্ষাই যথার্থ হয় না। উচ্চ আদালতে বাংলাভাষার কার্যকর ব্যবহার নেই, অথচ সেখানে বাদী-বিবাদী আইনজীবী বিচারক সবাই বাঙালি। এটিও বাংলার অপ্রচলনের একটি করুণ দৃষ্টান্ত বৈকি। কিন্তু এসবের কারণ কী?

কারণটা স্পষ্ট, সেটা হলো দেশের শাসক শ্রেণি বাংলা ব্যবহারে আগ্রহী নয়। আমাদের দুর্ভাগ্য যে এদেশের শাসক শ্রেণি বাংলা ভাষার ব্যাপারে কখনোই উৎসাহী ছিল না। অতীতে আমরা পরাধীন ছিলাম, বিদেশিরা আমাদের শাসন করেছে, তারা বাংলা ভাষা ব্যবহার করবে না, বরং তাদের নিজেদের ভাষা চাপিয়ে দিতে চাইবে এটাই ছিল স্বাভাবিক। এ জন্য আমরা দেখেছি সংস্কৃত, ফার্সি এবং পরে ইংরেজি হয়েছে সরকারি ভাষা, বাংলা ভাষা সে মর্যাদা পায়নি। পাকিস্তানিরা চেয়েছিল উর্দুকে চাপিয়ে দেবে। শেষ পর্যন্ত পারেনি। কিন্তু তখন তো দেশ শাসন করছে স্বদেশিরা, তাহলে এখনো কেন বাংলা সর্বত্র প্রচলিত হচ্ছে না? না হওয়ার ঘটনা এই মর্মান্তিক সত্যের প্রতিই ইঙ্গিত করে যে, আমাদের শাসক শ্রেণি এ দেশেরই যদিও তবু তারা ঠিক দেশি নয়। তারা জনগণের সঙ্গে নেই। নিজেদের তারা জাতীয়তাবাদী বলে দাবি করে, কিন্তু তাদের ভেতর দেশপ্রেমের নিদারুণ অভাব। এককথায় এ দেশে তাদের অবস্থানও আগের বিদেশিদের মতোই; তারা কেবল যে জনবিচ্ছিন্ন তা নয়, জনবিচ্ছিন্নতার দরুন তাদের ভেতর গোপন অহংকার রয়েছে। অন্যদিকে তাদের সংযোগ যে পুঁজিবাদী বিশ্বের সঙ্গে তার ভাষা স্পষ্টরূপে ইংরেজি। বাংলা জনগণের ভাষা, চিরকালই তাই ছিল, এখনো সে রকমই আছে; কিন্তু শাসকরা জনগণের থেকে দূরেই রয়ে গেছে, যেমন তারা আগে ছিল। শাসক শ্রেণির সন্তানরা ইংরেজি শেখে, তারা দেশের সম্পদ বিদেশে পাচার করে, বিদেশে ঘরবাড়ি কেনে এবং তাদের সন্তানরা বিদেশমুখো হয়। তাছাড়া বাংলাদেশের রাজনীতিতেও বিদেশিদের হস্তক্ষেপ ঘটছে। বাংলার প্রচলনের অন্তরায় অন্য কেউ ঘটাচ্ছে না, জ্ঞাতে অজ্ঞাতে দেশের বিদেশমুখো ও বিদেশপ্রভাবিত শাসকরাই ঘটাচ্ছে। শাসক শ্রেণির ভেতর রাজনীতিক, ব্যবসায়ী, আমলা পেশাজীবী, সবাই আছে। তাদের প্রধান যোগ্যতা তারা ধনী। এরা ইংরেজি ব্যবহার করতে পারলে খুশি হয় এবং যখন বাংলা ব্যবহার করে তখন মনমরা থাকে এবং ভাষাকে বিকৃত করে। রাজনীতিকরাই প্রধান, তারাই সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান, তাদের বক্তব্যই আমরা শুনি; লোকে তাদেরই দৃষ্টান্ত বলে মানে, প্রভাবিত হয়, অনুকরণ করে। জাতীয় সংসদে, সভা-সমিতিতে রাজনীতিকরা যে ভাষা ব্যবহার করে তাতে অনেক সময় কানে আঙুল দিতে ইচ্ছা করে। যারা রাজনীতিক নয় তারাও বাংলা ব্যবহার করে বেশ স্বাধীনভাবে, উচ্চারণ ও ব্যাকরণের তোয়াক্কা করে না, আঞ্চলিকতার সঙ্গে ইংরেজি শব্দ মিলিয়ে জগাখিচুড়ি তৈরি করে। যেসব ভুল ইংরেজির ব্যবহার ঘটালে তারা লজ্জায় ম্রিয়মাণ হতো সেগুলো নির্বিচারে ঘটাতে থাকে। লজ্জা পাবে কি, অনেক সময় তারা গর্ব অনুভব করে, ভাবে বাংলা ভালোভাবে না জানাটাই তাদের আভিজাত্যের প্রমাণ। দেশের পরিস্থিতিতে যে নৈরাজ্য বিরাজমান তার ছবি ভাষার প্রতি এই দুর্ব্যবহারের মধ্যে চমৎকারভাবে ফুটে ওঠে। ওদিকে জনসাধারণের বড় একটা অংশ অশিক্ষিত, যাদের শিক্ষিত বলে গণ্য করা হয় তাদেরও অনেকেই অক্ষর জ্ঞানসম্পন্ন মাত্র, যথার্থ অর্থে শিক্ষিত নয়। এদের পক্ষে বাংলা ভাষার যথার্থ ব্যবহার সম্ভব নয়।

বাঙালি তার ভাষা নিয়ে গৌরব করে থাকে। গৌরবের কারণ আছে। একটি কারণ বাংলা ভাষায় উচ্চারণের সঙ্গে লিখিতরূপের নৈকট্য। আমরা যেভাবে উচ্চারণ করি সেভাবেই লিখে থাকি। শাসক শ্রেণি মনে হয় শাসিত শ্রেণিকে অন্যদিক থেকে তো বটেই, বানানের ক্ষেত্রেও হ্রস্ব করে ছাড়বে, কোনো ক্ষেত্রেই রেহাই দেবে না। হায় দরিদ্র শ্রেণির মানুষ, তোমরা পালাবে কোথায়? হরফ বিতাড়নের উদ্যোগটা পাকিস্তানি শাসকরাও নিয়েছিল, সফল হয়নি, কেননা শিক্ষিত বাঙালি সেদিন রুখে দাঁড়িয়েছিল; এখন শিক্ষিত বাঙালিদের বিত্তবান অংশ শাসক শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়ে বিতাড়নের কাজটি নিজেরাই সিদ্ধ করছে। 

দুর্দশাটা এমনকি একুশে ফেব্রুয়ারির উদযাপনের ক্ষেত্রেও দৃশ্যমান। আয়োজনের অভাব নেই, কিন্তু একুশের উদযাপনে মৌলিক পরিবর্তন ঘটানো হয়েছে, সেটা হলো মধ্য রাতে উদযাপনের সূচনাকরণ। বাঙালির উৎসব শুরু হয় সকালে, ইউরোপীয়দেরটা মধ্য রাতে। ওদের মধ্য রাত আক্রমণ করেছে আমাদের সকালবেলাকে। যা ছিল স্বাভাবিক তাকে কৃত্রিম করে দেওয়ার আয়োজন বৈকি! সাংস্কৃতিকভাবে মধ্য রাত থার্টিফার্স্ট নাইটের ব্যাপার, পহেলা বৈশাখের নয়। থার্টিফার্স্ট নাইট আর পহেলা বৈশাখ এখন আলাদা হয়ে গেছে, ইংরেজি নববর্ষ হুমকি দিচ্ছে বাংলা নববর্ষকে; হুমকির লক্ষণ একুশের উদযাপনেও দেখা দিয়েছে। হুমকি এসেছে আরও একটি। সেটি বিশ্বভালোবাসা দিবস। এটি আমাদের নয়, ইউরোপের। এর সঙ্গে যোগ রয়েছে বাণিজ্যের। দখলদারিত্বের ভেতর দিয়ে বিশ্ববাজার এখন কোণঠাসা করতে চায় দেশীয় উৎপাদনকে, ভালোবাসা দিবস প্রকাশ্যে উদ্দীপনা তৈরির মধ্য দিয়ে গোপনে শত্রুতা করছে শহিদ দিবসের সঙ্গে। যে তরুণদের কাছে প্রত্যাশিত ছিল মাতৃভাষার প্রতি ভালোবাসার ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হওয়া, তারা প্রদর্শনী ঘটাচ্ছে একেবারে ব্যক্তিগত পর্যায়ে দুজনে দুজনে মিলবার অভিপ্রায়ের। আবার ভারতীয় টেলিভিশন চ্যানেলের মধ্য দিয়ে বর্তমানে আমাদের দেশের ঘরে ঘরে আগমন ঘটছে হিন্দি ভাষার। এ ভাষার জন্য দেশের প্রতিটি ঘরের দরজা-জানালা খোলা। যার কারণে অনেকেই অতি সহজে বাংলাকে বিতারিত করে হিন্দি ভাষা শিখছে। অতীতে আমরা উর্দুর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলাম, বর্তমানে হিন্দির জন্য আমাদের দরজা-জানালা খোলা। 

সাহিত্যের ব্যাপারটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সাহিত্য অনেক কিছুকেই প্রতিফলিত করে, ভাষা ব্যবহারে উৎকর্ষকে তো অবশ্যই। সাহিত্যের মাধ্যমেই ভাষার সর্বোৎকৃষ্ট বিকাশ ঘটে থাকে। দেশে এখন প্রচুর বই, প্রতি বছর বইমেলাতে বই উপচে পড়ে। কিন্তু অধিকাংশ বইয়েরই অন্তর্গত বস্তু অকিঞ্চিতকর। প্রচুর পরিমাণে বিক্রি হয় উপন্যাস ও উপন্যাসসদৃশ রচনা। জনপ্রিয় এই ধারা পাঠকদের জন্য এক ধরনের আমোদ সরবরাহ করে, অল্প সময়ের জন্য হলেও বাস্তব জগৎকে ভুলিয়ে দেয়। ফলে পাঠকদের একটা রুচি তৈরি হয়, যে রুচি গভীর ও তাৎপর্যপূর্ণ সাহিত্যের স্বাদ গ্রহণের জন্য মোটেই অনুকূল নয়, বরং প্রতিকূল বটে। মাদকাসক্তির মতো অতটা ক্ষতিকর না হলেও কথিত জনপ্রিয় সাহিত্যও এক ধরনের আসক্তি বটে, এ নেশায় যাকে পেয়েছে তার পক্ষে গভীর কোনো বিষয়ে গভীরভাবে চিন্তা করা সম্ভব না হওয়াটাই স্বাভাবিক। এই সঙ্গে এ ঘটনাও তাৎপর্যহীন নয় যে, মেধাবী লেখকদের কেউ কেউ এখন ইংরেজিতে লিখছেন। তারা ইংরেজিতে উচ্চশিক্ষিত, সেই সঙ্গে ইংরেজি বইয়ের বাজারও তুলনামূলকভাবে উন্নত। এটাও অবধারিত যে, জনমাধ্যমের গুরুত্ব আরও বাড়বে। অনেক বেড়েছে, থামবে না। জনমাধ্যম কিন্তু ভাষার উন্নতিতে সহায়ক হচ্ছে না। সেখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা তো হয়ই না, ভাষাবিকৃতি ঘটে বিজ্ঞাপনে এবং নাটকে। সরকার নিয়ন্ত্রিত মাধ্যমগুলো সরকারের মহিমা প্রচার করতে ব্যস্ত থাকে, তাতে মানুষের বিরক্তি উৎপাদিত হয় এবং প্রচারের ভাষাও হয় নিম্নমানের। এফএম রেডিও তরুণদের যে ভাষা শেখাচ্ছে তা ভাষাচর্চার জন্য মোটেই স্বাস্থ্যকর নয়।

বিশ্বে এখন বাংলাভাষীর সংখ্যা প্রচুর, ৩০ কোটিরও বেশি হবে; সংখ্যাবিচারে বাংলাভাষী মানুষের স্থান পঞ্চম। কিন্তু বাংলা ভাষার মর্যাদা খুবই কম। কারণ কী? কারণ হচ্ছে আমরা সংখ্যায় অনেক ঠিকই কিন্তু ক্ষমতায় সামান্য। অনেকটা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার মতোই; পরিমাণে শিক্ষিতদের সংখ্যা অনেক, কিন্তু গুণগতমান নিম্নগামী।

ক্ষমতাহীনতার একাধিক কারণ রয়েছে। প্রধান ও প্রাথমিক কারণটা হলো জ্ঞানচর্চার অপ্রতুলতা। জ্ঞানচর্চা ঠিকমতো হচ্ছে না। আর তার কারণ হলো চর্চা যেটুকু যা হচ্ছে তা বাংলাভাষার মাধ্যমে ঘটছে না। জ্ঞানই যে শক্তি, এ সত্যে কোনো ভেজাল নেই; জ্ঞানের চর্চায় আমরা উঁচুতে উঠতে পারছি না; মেধা ও মনন অবিকশিত রয়ে যাচ্ছে। ফলে ক্ষমতা বাড়ছে না। আমরা তরল হচ্ছি, ঘন হতে ব্যর্থ হয়ে। বিশ্বে তাই বাঙালির কোনো সম্মান নেই। ওদিকে সব বাঙালি বাংলাদেশের দিকে তাকিয়ে আছে, কেননা বাংলাদেশই হচ্ছে বাংলাভাষা চর্চার কেন্দ্রভূমি এবং ভরসাস্থল। আবারও ওই শাসক শ্রেণির জনশত্রুতার বিষয়টির কাছেই যেতে হয়। রাষ্ট্র অনেক কিছুই করতে পারেনি; রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা বাংলা ভাষার চর্চার ক্ষেত্রেই ঘটেছে। ওই ব্যর্থতা অনেক ব্যর্থতার প্রতিপালক। ব্যর্থতার কারণ হলো রাষ্ট্র ভেঙেছে ঠিকই, কিন্তু বদলায়নি। ভেতরে সে আগের মতোই রয়ে গেছে। বদলাবার কথা ছিল, কেননা এই রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা বাঙালির মুক্তি সংগ্রামের ফলশ্রুতিতে। মুক্তির ওই সংগ্রামেরই অংশ রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন, তারই পরিণতিতে মুক্তিযুদ্ধ এবং তার ভেতর দিয়েই বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা। মুক্তির জন্য প্রয়োজন ছিল বাংলাভাষা চর্চার স্বাধীনতা। সেটা সম্ভব হতো রাষ্ট্রের চরিত্রে অর্থাৎ রাষ্ট্রের ভেতরে শাসক ও শাসিতের সম্পর্কের ক্ষেত্রে যদি মৌলিক পরিবর্তন ঘটত তবেই। সেটা ঘটেনি। শাসক বদল হয়েছে, শাসক-শাসিতের সম্পর্কে বদল হয়নি। মুক্তির সংগ্রামে চালিকাশক্তি ছিল সাধারণ মানুষ। সেই সাধারণ মানুষের মুক্তি আসেনি। তাই তাদের মাতৃভাষাও মুক্তি পায়নি; আগের মতোই শাসকদের অবহেলা ও উৎপীড়নের শিকার হচ্ছে।

কিন্তু হতাশ হওয়ার কারণ নেই। জনগণ আছে এবং তাদের ভাষাও থাকবে। কেবল বাংলাদেশে নয় বিশ্বজুড়ে যে বাঙালিরা রয়েছে তাদের ভাষা অবশ্যই নিজের জন্য মর্যাদার স্থান খুঁজে নেবে। কিন্তু দায়িত্বটা বাংলাদেশের মানুষেরই, নেতৃত্ব তাদেরই দিতে হবে। বাংলাভাষার উৎকর্ষ ও প্রয়োগ বৃদ্ধির জন্য আমরা বিভিন্ন কাজের সুপারিশ করতে পারি। যেমন পাঠাগার গড়ে তোলা; সংস্কৃতিচর্চার গুণ ও ব্যাপকতা বৃদ্ধি। বলতে পারি ব্যক্তিগত উদ্যোগ গ্রহণের আবশ্যকতার কথা। সাহিত্যচর্চার অপরিহার্যতার বিষয় তুলে ধরতে পারি। উচ্চ আদালতের সঙ্গে যারা যুক্ত তাদের অনুরোধ জানাতে পারি বাংলা ব্যবহারের। কিন্তু মূল ব্যাধিটাকে যেন না ভুলি। সেটা হলো বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় চরিত্র। ওই চরিত্রে বদল ঘটিয়ে, রাষ্ট্রকে জনগণের অধীনে নিয়ে আসতে হবে। সেটা ঘটলে রাষ্ট্র, সমাজ ও ব্যক্তিজীবনের সর্বত্র জনগণের ভাষা অব্যাহতরূপে ব্যবহৃত হবে, তার উন্নতির পথে অন্তরায় থাকবে না।

এর জন্য যে সামাজিক বিপ্লব দরকার তার পথে অন্তরায় হচ্ছে পুঁজিবাদ। পুঁজিবাদ মানুষ ও প্রকৃতির মূল শত্রু; পুঁজিবাদ বাংলা ভাষা, বাঙালিদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্র এবং বাঙালির দুর্দশার জন্য দায়ী। ভরসা এখানে যে পুঁজিবাদবিরোধী সংগ্রাম বিশ্বজুড়েই শক্তিশালী হচ্ছে, সেই সংগ্রাম বাংলাদেশেও চলছে। সারা বিশ্বে মানুষের মুক্তি যেমন বৃদ্ধ পৃঁজিবাদের যুবকসুলভ দুরন্তপনায় মোকাবিলা না করলে ঘটবে না, আমাদের মুক্তিও তেমনি আসবে না পুঁজিবাদের দুঃশাসনের অবসান ঘটাতে ব্যর্থ হলে। এটা যেন কখনোই না ভুলি যে, ভাষার শত্রু ও মানুষের শত্রু অভিন্ন এবং ওই শত্রুটির নাম পুঁজিবাদ। সমস্যাটা রাজনৈতিক, অরাজনৈতিক পথে এর সমাধান নেই। বাংলাভাষার প্রয়োজনে আমরা রাষ্ট্র ভেঙেছি, ওই একই প্রয়োজনে শাসক-শাসিতের সম্পর্কের ভেতর পরিবর্তন আনা অত্যাবশ্যক হয়ে পড়েছে। বাংলা ভাষার মর্যাদা আমাদেরই রক্ষা করতে হবে। দেশের সর্বত্রই বাংলা ভাষার প্রচলনের ব্যাপারে সরকারের পাশাপাশি সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। আমাদের সন্তানদের বাংলা ভাষা শেখার ব্যাপারে আগ্রহী করে তোলতে হবে।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট
Email : [email protected]

সড়কে মৃত্যুর মিছিলের অবসান কাম্য

প্রকাশ: ২০ এপ্রিল ২০২৪, ০৩:০৬ পিএম
সড়কে মৃত্যুর মিছিলের অবসান কাম্য
আর কে চৌধুরী

সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর মিছিলের শেষ কোথায়, তা আমাদের জানা নেই। ট্রাফিক শৃঙ্খলার অভাবে ঘটছে একের পর এক দুর্ঘটনা। সব সম্ভবের এই দেশে মহাসড়ক বা হাইওয়েগুলোতেও চলে নসিমন, করিমন ও অটোরিকশার মতো যানবাহন। 

সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে যেসব কারণ দায়ী তার মধ্যে অন্যতম হলো- আইন অমান্যের প্রবণতা। যানবাহন চালক, পথচারী সবার মধ্যে এ প্রবণতা ক্রিয়াশীল। 

সড়ক দুর্ঘটনার রাশ টানতে হলে যেমন ইচ্ছা তেমন চলার প্রবণতায় বাঁধ সৃষ্টি করতে হবে। মোটরসাইকেলের ফ্রি-স্টাইল চলাচলে বাধা সৃষ্টি করা দরকার। সবচেয়ে আগে কী কারণে একের পর এক সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে তা উদঘাটন করে মূল জায়গায় হাত দিতে হবে। আমাদের বিশ্বাস, সড়কে যানবাহন চলাচলে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা গেলে দুর্ঘটনার সংখ্যা ৮০ শতাংশ কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। এজন্য লক্কড়ঝক্কড় যানবাহন চলাচল নিষিদ্ধ করা দরকার। যথাযথ প্রশিক্ষণ ছাড়া কেউ যাতে যান্ত্রিক যানবাহন চালাতে না পারে সে বিষয়েও নিশ্চিত হতে হবে। যানবাহন মালিক ও শ্রমিকদের সঙ্গে ট্রাফিক পুলিশের সম্পর্ক নিয়ে যে রটনা রয়েছে তার ইতি ঘটানোও জরুরি। 

সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিনই বিপুলসংখ্যক প্রাণ ঝরবে তা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। হতাহতের মিছিল আর দীর্ঘায়িত করতে না চাইলে যানবাহনে চালক, যাত্রী, পথচারী এবং ট্রাফিক ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণে যারা জড়িত তাদের সবাইকে সচেতন হতে হবে। জনসচেতনতা গড়ে তোলাও জরুরি। এক্ষেত্রে ঘাটতি আছে বলেই সড়কে বাড়ছে মৃত্যুর মিছিল। তা যেভাবেই হোক এ দুর্ভোগের অবসান ঘটাতে হবে।

নানা ব্যবস্থা নেওয়ার পরও প্রতিদিনই দেশজুড়ে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির প্রকাশিত মাসিক দুর্ঘটনার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সারা দেশে গত মার্চে ৫৫২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৫৬৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এসব দুর্ঘটনায় আহত হয়েছে অন্তত ১ হাজার ২২৮ জন। 

সারা বছর যতসংখ্যক মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায়, তার প্রায় সাড়ে ৭ শতাংশের মৃত্যু হয় শুধু ঈদের সময়।

যাত্রীকল্যাণ সমিতির তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত তিন ঈদুল ফিতরে মোট ৯৯৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১ হাজার ৬৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ সময় ঈদুল আজহায় ৭৮৬টি দুর্ঘটনায় ৭৭০ জনের প্রাণ ঝরেছে সড়কে। গত মঙ্গলবার ফরিদপুরসহ সাত জেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় ২২ জনের মৃত্যু হয়েছে। ঈদের দিনই সারা দেশে ২১ জনের মৃত্যু হয়েছে।

গত বুধবার ঝালকাঠিতে একটি সিমেন্টবোঝাই ট্রাকের চাপায় দুমড়েমুচড়ে গেছে একটি প্রাইভেটকার ও তিনটি অটোরিকশা। এ ঘটনায় ১৪ জন নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে অন্তত ১২ জন। এ ছাড়া দেশের তিন জেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে আরও চারজন।

সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানিকে শুধুই দুর্ঘটনা বলে চালিয়ে দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। দেশের সড়ক-মহাসড়কে এমন অনেক দুর্ঘটনা ঘটে, যেগুলোকে দুর্ঘটনা না বলে হত্যাকাণ্ড বলা যায়। অনেক দুর্ঘটনাই চালকের কারণে ঘটে থাকে। অনেক চালক রাত-দিন গাড়ি চালান। অত্যধিক ক্লান্তি এবং গাড়ি চালাতে চালাতে ঘুমিয়ে যাওয়ার কারণেও অনেক দুর্ঘটনা ঘটে।

লাইসেন্সহীন অদক্ষ চালকের হাতে, এমনকি অপ্রাপ্তবয়স্ক চালকের হাতে গাড়ির চাবি তুলে দেওয়া হয়। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ চালকের বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই। আমাদের দেশে চালকদের আরেকটি বড় সীমাবদ্ধতা হচ্ছে প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা না থাকা। চালকদের মাদকাসক্তিও সড়ক দুর্ঘটনার বড় কারণ। 

মাদকাসক্ত অবস্থায় গাড়ি চালানো বন্ধে চালকদের ডোপ টেস্ট করানোর ব্যবস্থা নিতে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা দিয়েছিলেন। সেই নির্দেশনা কি মেনে চলা হচ্ছে? সেই সময় ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদ থেকে জানানো হয়েছিল চালকরা মাদকাসক্ত কি না, তা রাস্তায়ই পরীক্ষা করা হবে। পরীক্ষায় কোনো চালক ধরা পড়লে তাকে সরাসরি জেলে পাঠানো হবে। চালকদের সেই ডোপ টেস্ট কত দূর?

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ৯০ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনার জন্য দায়ী যানবাহনের অতিরিক্ত গতি ও চালকের বেপরোয়া মনোভাব। মহাসড়কে অপরিকল্পিত স্পিড ব্রেকার বা গতিরোধকগুলোও দুর্ঘটনার জন্য অনেকাংশে দায়ী। এ ছাড়া ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, সড়কের পাশে হাটবাজার বসা, চালকদের পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাব ইত্যাদি কারণেও দুর্ঘটনা ঘটছে। মহাসড়কে যান চলাচলের সর্বোচ্চ গতি বেঁধে দিয়ে এবং গতি পরিমাপক যন্ত্র ব্যবহার করে চালকদের ওই নির্দিষ্ট গতি মেনে চলতে বাধ্য করা হলে দুর্ঘটনা অনেক কমে আসবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে আইনের প্রয়োগ, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত দক্ষ চালক এবং সড়কে চলাচল উপযোগী ভালো মানের যানবাহন অবশ্যই প্রয়োজন। তবে একই সঙ্গে জনগণকেও হতে হবে সচেতন।

সরকারি-বেসরকারি ও নিজস্ব সমীক্ষার ভিত্তিতে প্রণীত রিপোর্টে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর দিক থেকে ভারত ও পাকিস্তানের পর বাংলাদেশ রয়েছে তৃতীয় অবস্থানে। পরিসংখ্যানে জানা যায়, বাংলাদেশে বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় গড়ে চার হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। আধুনিক, নিরাপদ, পরিবেশবান্ধব ও প্রযুক্তিনির্ভর সড়ক পরিবহন ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে জাতিসংঘের ঘোষণা অনুযায়ী বাংলাদেশ অনুসমর্থনকারী হিসেবে ২০২০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ও আহত মানুষের সংখ্যা বর্তমানের চেয়ে অর্ধেকে নামিয়ে আনার সিদ্ধান্ত ও সুপারিশের বেশির ভাগই বাস্তবায়ন হয়নি। দেখা গেছে বড় ধরনের কোনো দুর্ঘটনা হলে, বিশেষ কোনো ব্যক্তি দুর্ঘটনায় নিহত হলে বা সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে সড়কে আন্দোলন দেখা দিলে কিছুদিন প্রশাসন নড়েচড়ে বসে। কিছু আলোচনা, কিছু সিদ্ধান্তও গ্রহণ করা হয়। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনা রোধে তা তেমন কার্যকর ভূমিকা রাখে না।

বাংলাদেশ এরই মধ্যে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উত্তীর্ণ হয়েছে এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে উন্নীত হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। কোনো দেশের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়নের জন্য উন্নত পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা অপরিহার্য। আর্থসামাজিক অগ্রগতির পূর্বশর্ত উন্নত পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা। অর্থাৎ অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং উন্নত পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা এ দুটি বিষয় অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। এ ছাড়া উন্নত পরিবহন ব্যবস্থা সভ্যতার পরিচয় বহন করে। সুতরাং উন্নত দেশের উপযোগী পরিবহন ব্যবস্থা নিয়ে পরিকল্পনা ও কাজ এখনই শুরু করতে হবে।

সড়ক দুর্ঘটনার আরেকটি বড় কারণ ফিটনেসহীন যানবাহন। সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, বেপরোয়া গতি, চালকের বেপরোয়া মানসিকতা, অদক্ষতা ও শারীরিক-মানসিক অসুস্থতা, বেতন ও কর্মঘণ্টা নির্দিষ্ট না থাকা ইত্যাদি কারণে দুর্ঘটনা বাড়ছে। আমরা চাই, সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে সব ব্যবস্থা নেওয়া হোক। চালকদের ডোপ টেস্ট করে প্রয়োজনে নতুন ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়া হোক।

লেখক: মুক্তিযোদ্ধা ও শিক্ষাবিদ, মহান মুক্তিযুদ্ধে ২ ও ৩নং সেক্টরের রাজনৈতিক উপদেষ্টা
[email protected]

ঈদ, পয়লা বৈশাখের ভরা বাজারেও ভোটের হানা

প্রকাশ: ০৮ এপ্রিল ২০২৪, ০২:২৭ পিএম
ঈদ, পয়লা বৈশাখের ভরা বাজারেও ভোটের হানা
দীপঙ্কর দাশগুপ্ত

সৌজন্যে ভোট। ঈদ ও পয়লা বৈশাখের আগে শাড়ি, জুতো থেকে জামার বাজার জমজমাট। বেশ কিছুদিন হলো শেষ হয়েছে রঙের উৎসব। তবে ভোটের রঙে বাজার এখনো রঙিন। দোকানে দোকানে দেখা যাচ্ছে লাল, সবুজ থেকে গেরুয়া রঙের ছোঁয়া। সামনের লোকসভা নির্বাচন। তাকে ঘিরে প্রচার শুরু করে দিয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। আর ভোট মানেই প্রচারে অভিনবত্ব এনে একে ওপরকে মাত দেওয়ার পালা। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর হাতিয়ার পতাকা, টুপি থেকে ছাতা। ভোটের ময়দানে মুখ দেখাদেখি না-পছন্দ হলেও একসঙ্গে বিকোচ্ছে মোদি, মমতা থেকে রাহুলের মুখোশ। একসঙ্গে উড়ছে বিভিন্ন দলীয় পতাকা।

লাল, তেরঙা, গেরুয়া পতাকা, ঘাস ফুল, পদ্মফুলের শাড়িতে সেজে উঠেছে বড়বাজার। ভোটবাক্সে সমীকরণ যাই হোক না কেন পতাকা, ছাতাসহ প্রচারের সরঞ্জাম বরাতের দিকে প্রথম স্থানে রয়েছে রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল, দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে সিপিএম, এরপর কংগ্রেস। সবশেষে বিজেপি। এর পেছনে কারণ দর্শালেন বিক্রেতারা। এবারে রাজ্যে প্রথম দফা থেকে শেষ দফা পর্যন্ত লোকসভা ভোট রয়েছে। প্রায় দীর্ঘ দুই মাসের বেশি সময় ধরে চলবে ভোট প্রক্রিয়া। তাই যত দফা নির্বাচন এগিয়ে আসবে ততই বিভিন্ন জায়গায় থেকে বরাত বেশি আসবে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।

তবে এবছর নজর কাড়ছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ছবি দেওয়া টি-শার্ট থেকে নরেন্দ্র মোদির মুখোশ। ঘাস ফুল প্রতীকের শাড়ি যেমন আছে, তেমন পদ্ম ফুল প্রতীকের শাড়িও মিলছে বাজারে। দলীয় প্রতীক চিহ্নসহ এক একটি শাড়ি বিক্রি হচ্ছে ১৫০ টাকা থেকে ২০০ টাকায়। টি-শার্টের দাম যাচ্ছে ৫০ থেকে ৭০ টাকা, বিভিন্ন মাপের পতাকা বিকোচ্ছে সাড়ে ৪ থেকে সাড়ে ৭ টাকায়। ছবি আঁকা সান গার্ড ৮০ পিসের পকেট মিলছে ৫০ টাকা-৬০ টাকায়। বিভিন্ন দলের টুপির দাম যাচ্ছে ৪ টাকা-১০ টাকা।

অন্যদিকে নরেন্দ্র মোদি, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, রাহুল গান্ধী, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মুখোশ বিকোচ্ছে ৪০০ টাকা ১০০ পিস। বিভিন্ন দলের ব্যাজ আলাদা আলাদা মাপের রয়েছে। এগুলোর ৪ থেকে ১০ টাকা করে দাম। আছে উত্তরীয়। সেগুলোর দাম যাচ্ছে ৯ টাকা-৩৫ টাকা পর্যন্ত। এসবের পাশাপাশি ভালো চাহিদা রয়েছে বাইক ফ্ল্যাগ স্ট্যান্ডের, যার দাম ৮ টাকা প্রতি পিস। এ ছাড়া রোদ থেকে বাঁচতে ছাতা কিনছে লোকজন। ছাতা প্রতি পিসের দাম ৮০ থেকে ১০০ টাকা।

বড়বাজারের ব্যবসায়ী দেবাশীষ পালোধি জানাচ্ছেন, তার কাছে ইতোমধ্যেই যাদবপুর, মথুরাপুর, জয়নগর কেন্দ্রের তৃণমূলের তরফে পতাকার বরাত দেওয়া হয়েছে। আরও এক ব্যবসায়ী সুরজিৎ মুখোপাধ্যায়ের কথায়, কলকাতায় যেহেতু পরে ভোট তাই এই মুহূর্তে কলকাতার কোনো দলই জিনিসের বরাত দেয়নি। তবে নদিয়া, কৃষ্ণনগর, হাওড়া, হুগলি থেকে পতাকা, টুপি ও ছাতার বরাত এসেছে। তৃণমূল, সিপিএম, কংগ্রেস সব দলের তরফেই বরাত দেওয়া হয়েছে। বিক্রেতাদের কথায়, ভোটের ক্ষেত্রে পতাকা হোক বা শাড়ি, টুপি বা সান গার্ড বেশি বরাত আসে তৃণমূলের। তারপর সিপিএমের বরাত আসে। তবে তারা পতাকা, টুপি, ছাতা এগুলোর বরাত দেয় বেশি। কংগ্রেসের তরফে বেশ খানিকটা বরাত এসেছে।

পশ্চিম বাংলায় ভোটের আবহে ফের জাগছে গণসংগীত 
এক সময় বলা হতো, বক্তৃতা করে মানুষের মধ্যে যত-না দ্রুত পৌঁছানো সম্ভব হয়েছিল, দীনবন্ধু মিত্রের ‘নীলদর্পণ’ নাটক অনেক বেশি দ্রুততার সঙ্গে মানুষের কাছে ব্রিটিশ অত্যাচারের কাহিনি পৌঁছে দিয়েছিল। এই বাংলায় গণসংগীতের প্রাণপুরুষ হেমাঙ্গ বিশ্বাস, অজিত পান্ডেদের হাত ধরে বামপন্থিরা মানুষের কাছে সর্বহারা ও অত্যাচারিতদের নিদারুণ কাহিনি গানের মাধ্যমে তুলে ধরেছিলেন। বামপন্থি আন্দোলনের সঙ্গে গণসংগীতের এই ধারা মিশে আছে কয়েক দশক আগে থেকেই।

সভা-সমিতির আগে এই গণসংগীত গেয়ে মানুষের কাছে অসহায়, নিপীড়িত, অত্যাচারিত মানুষের কথা তুলে ধরত বামপন্থিরা। সেকালেও প্রতুল মুখোপাধ্যায়, সলিল চৌধুরীসহ আরও বহু সংগীত স্রষ্টাদের নাম উঠে আসে। গণসংগীত কী? বলতে গিয়ে সলিল চৌধুরী বলেছিলেন, ‘শ্রমজীবী মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা সংগ্রামের সাংগীতিক ইতিহাসই হলো গণসংগীত।’ আবার গণসংগীতের রূপকার হেমাঙ্গ বিশ্বাস বলেছিলেন, ‘স্বদেশ চেতনা যেখানে গীতচেতনায় মিলিত হয়ে শ্রমিকশ্রেণির আন্তর্জাতিকতার ভাবাদর্শের সাগরে মেশে, সেই মোহনাতেই গণসংগীতের জন্ম।’

শোষণহীন, নিপীড়নহীন, অত্যাচার-মুক্ত সমাজ গঠনে বামপন্থিদের বার্তাকে গানে গানে মানুষের মাঝে তুলে ধরার কাজ এই গণসংগীত শিল্পীরা আজও নিপুণভাবে পালন করে চলেছেন শ্রমিকনগরী দুর্গাপুরে। একদা লালদুর্গ, অবিভক্ত বর্ধমান জেলার শস্যগোলা গ্রামীণ বর্ধমান বা ইস্পাতনগরী দুর্গাপুর কিংবা খনি অঞ্চল রানিগঞ্জ কিংবা আসানসোলে বামেদের শাসনব্যবস্থা কায়েম থাকার সময় বহু গণসংগীতের দল, বামফ্রন্টের সভা-সমাবেশের আগে গণসংগীতের দ্বারা মানুষের কাছে প্রতিবাদের কথা পৌঁছে দেওয়ার কাজ করত।

কিন্তু, তাদের মধ্যে অধিকাংশ গণসংগীত গোষ্ঠীর মৃত্যুঘণ্টা বেজে যায় বামদের ৩৪ বছরের রাজ্যপাটের বিদায়ের সঙ্গে। তবে শিল্পশহর দুর্গাপুরে আজও মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে কয়েকটি গণসংগীতের দল। ‘লহরী’ দুর্গাপুরের গণসংগীতের আয়োজনকে বাঁচিয়ে রেখেছে সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে। আরও একটি নির্বাচন এসে গেছে। বর্ধমান-দুর্গাপুর ও আসানসোল লোকসভা কেন্দ্রে যেখানেই বামেদের সভা হবে, সেখানে এই গণসংগীতের মাধ্যমে প্রতিবাদ ও বার্তা তুলে ধরবে লহরীর শিল্পীরা। তবে, এই দুই লোকসভা ও আশপাশের অঞ্চলেই তাদের এই গণসংগীত সীমাবদ্ধ থাকছে।

দুর্গাপুর লহরীর অন্যতম প্রাণপুরুষ সীমান্ত তরফদার জানিয়েছেন, ‘পুরাতন গণসংগীতের সেই ধারাকে বজায় রেখে, অতীতকে অস্বীকার না-করে হেমাঙ্গ বিশ্বাস, অজিত পান্ডেদের দেখানো পথেই আমরা আজও হাঁটছি। শিকড়কে না ছিঁড়ে গান বাঁধছি। করপোরেট দুনিয়ার হাতে সব চলে যাওয়ার প্রতিবাদ, বেকারের পেটে ভাত দেওয়ার দাবি, শ্রমিকের হাতে আসুক কাজ, গণতান্ত্রিক বামপন্থি সংগঠনগুলো যে আবেদন রাখছে, আমরা সেই আবেদনকেই তুলে ধরছি গানে গানে।’

আজও রীতিমতো গণসংগীতের রেওয়াজ হয়। নাই-বা থাকল বামেরা এ রাজ্যে ক্ষমতায়। তবুও গণসংগীতশিল্পীদের মানসিক আনন্দে ভাটা পড়েনি। আজও তাই যুদ্ধের বিরুদ্ধে, শান্তির পক্ষে গণসংগীতশিল্পীরা সমবেতভাবে গেয়ে ওঠেন, ‘কীসের শোক করিস রে ভাই/আবার তোরা মানুষ হ।’ শুধু এই বাংলায় নয়, প্রতিবেশী রাজ্য অসমেও গণসংগীতের ধারা অব্যাহত ছিল বহুকাল। ত্রিপুরাতেও গণসংগীতের নিয়মিত আয়োজন ছিল বামপন্থিদের সভা-সমাবেশের আগে। তবে, আজ অনেকটাই ফিকে হয়ে গেছে গণসংগীতের সেই সুর। পাশ্চাত্যের অনুকরণে বহু গণসংগীতের সৃষ্টি। আজও তাই কান-পাতলে শোনা যায় ভূপেন হাজারিকার কণ্ঠে গাওয়া, ‘বিস্তীর্ণ দুপারের অসংখ্য মানুষের হাহাকার শুনেও, নিঃশব্দে নীরবে ও গঙ্গা তুমি, গঙ্গা তুমি বইছ কেন?’

লেখক: কলকাতা প্রতিনিধি, খবরের কাগজ

পরিবর্তনশীল সমাজের সামাজিক ব্যাধির শিকার সাদি মহম্মদ-ফাইরুজ অবন্তিকা

প্রকাশ: ৩১ মার্চ ২০২৪, ০৩:৫৮ পিএম
পরিবর্তনশীল সমাজের সামাজিক ব্যাধির শিকার সাদি মহম্মদ-ফাইরুজ অবন্তিকা
ড. মতিউর রহমান

সামাজিক ব্যাধি মোকাবিলা এবং ন্যায়বিচার ও সমতা বৃদ্ধির জন্য সরকার ও প্রতিষ্ঠানকে দায়বদ্ধ রাখতে সুশীল সমাজের সংগঠন, তৃণমূল কর্মী এবং অ্যাডভোকেসি গ্রুপগুলোর একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। জনসমর্থন জোগাড় করে, সচেতনতা বৃদ্ধি করে এবং নীতি পরিবর্তনের জন্য সমর্থন করে, এই গ্রুপগুলো অর্থপূর্ণ অগ্রগতি এবং পরিবর্তন চালাতে সাহায্য করতে পারে।…

বাংলাদেশ, একটি জাতি যা সমৃদ্ধ ইতিহাস ও ঐতিহ্যে গৌরবান্বিত। যুগ যুগ ধরে, আমরা বারবার রূপান্তরিত হয়েছি, অগ্রসর হয়েছি এবং নতুন করে গড়ে উঠেছি। এই অবিরাম প্রবাহ আমাদের জাতীয় পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, শিক্ষার হার বৃদ্ধি এবং দারিদ্র্যবিমোচনের ক্ষেত্রে আমরা উল্লেখযোগ্য সাফল্য লাভ করেছি। প্রযুক্তির অগ্রগতি সমাজের সব স্তরে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতি, তথ্যের সহজলভ্যতা এবং জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে প্রযুক্তি ব্যাপক অবদান রাখছে। নারীর ক্ষমতায়ন, শিশু অধিকার এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে আমরা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছি। তা সত্ত্বেও সামাজিক ব্যাধি যেমন- দুর্নীতি, অসমতা এবং সামাজিক বৈষম্য আমাদের সমাজের দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে। রাজনৈতিক, সামাজিক অস্থিরতা এবং সহিংসতা আমাদের অগ্রগতিকে ব্যাহত করছে। পরিবর্তনের ধারায় অনেক দুর্বল মানুষ পিছিয়ে পড়ছে। অবিচার, অবহেলা এবং বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন তারা।

সম্প্রতি প্রখ্যাত রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী সাদি মহম্মদ এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের ছাত্রী ফাইরুজ অবন্তিকার আত্মহত্যার ঘটনা দেশবাসীকে হতবাক করেছে। তাদের অকালমৃত্যু কেবল ব্যক্তিগত শোকের বিষয় নয় বরং বাংলাদেশের বর্তমান সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন।

এই দুটি ঘটনা আধুনিকতা ও ঐতিহ্যের জটিলতার সঙ্গে জর্জরিত বাংলাদেশের সামনে অগণিত চ্যালেঞ্জের মর্মান্তিক অনুস্মারক হিসেবে কাজ করে। একজন প্রতিভাবান শিল্পী হতাশার শিকার হয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। তার মৃত্যু সমাজের গভীরতম অন্ধকার দিকগুলো, যেমন- মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি অবহেলা, সামাজিক চাপ এবং শিল্পীদের জীবনে অনিশ্চয়তা তুলে ধরে। একজন তরুণী, সমাজের প্রচলিত রীতিনীতি ও রক্ষণশীলতার বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে হতাশার শিকার হন। তার মৃত্যু নারীদের অধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং পিতৃতান্ত্রিক সমাজের কঠোর নিয়মকানুনের বিরুদ্ধে প্রশ্ন উত্থাপন করে।

সাদি মহম্মদের আত্মহত্যা বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক জগতে প্রবল ধাক্কা দিয়েছে। একজন প্রতিভাবান রবীন্দ্রসংগীত শিল্পীর অকালমৃত্যু কেবল তার পরিবার ও বন্ধুদের জন্যই বেদনাদায়ক নয়, বরং সমগ্র বাংলাদেশের জন্য একটি ক্ষতি। রবীন্দ্রসংগীত সংরক্ষণ ও প্রচারে সাদি মহম্মদের বিরাট অবদান ছিল। তিনি দীর্ঘদিন ধরে রবীন্দ্রসংগীত পরিবেশন করে আসছিলেন এবং তার সুমধুর কণ্ঠে অনেক গান জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল।
দুঃখজনকভাবে, সাদি মহম্মদকে কখনো একুশে পদক বা স্বাধীনতা পুরস্কারের মতো মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারে ভূষিত করা হয়নি। এই পুরস্কারগুলো বাংলাদেশি সংস্কৃতি ও সমাজে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য ব্যক্তিদের দেওয়া হয়। সাদি মহম্মদের পুরস্কার না পাওয়া বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক জগতের একটি বেদনাদায়ক বাস্তবতা। সাদি মোহাম্মদের মৃত্যু শিল্পী ও সংগীতশিল্পীদের দুর্দশার কথা তুলে ধরে। অনেকেই সরকার ও সমাজের দ্বারা অস্বীকৃত এবং অপ্রশংসিত হন। সাদি মহম্মদের মৃত্যু আমাদের জাতির সংস্কৃতি ও সমাজের প্রতি গভীর প্রশ্ন উত্থাপন করে।

সাদি মহম্মদের মতো একজন প্রতিভাবান শিল্পীর প্রতি সরকারের অবহেলা বাংলাদেশের শিল্প ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে অবমূল্যায়ন করার একটি বৃহত্তর প্রবণতার প্রতীক। বাংলাদেশ সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের দেশ। সাহিত্য, সংগীত, নৃত্য, নাটক, চলচ্চিত্র- সব ক্ষেত্রেই আমাদের দেশের অবদান অনস্বীকার্য। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, এই ঐতিহ্য ধারণ করে এমন শিল্পী ও সংগীতজ্ঞরা প্রায়শই জীবন ধারণ করতে এবং তাদের প্রাপ্য স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য লড়াই করে।

শিল্প ও সংস্কৃতির বিকাশে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। শিল্পীদের জন্য আর্থিক সহায়তা প্রদান, প্রশিক্ষণ ও কর্মশালার ব্যবস্থা করা এবং তাদের জন্য পুরস্কার ও সম্মাননার ব্যবস্থা করা সরকারের দায়িত্ব। বাংলাদেশে শিল্পকলার প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা ও বিনিয়োগের অভাব রয়েছে। এর ফলে শিল্পীরা তাদের প্রতিভা বিকশিত করতে এবং তাদের জীবিকা নির্বাহ করতে সমস্যায় পড়েন।

প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার অভাবে শিল্পীরা জীবিকা নির্বাহের জন্য অন্য পেশার ওপর নির্ভরশীল হন। এর ফলে তারা তাদের শিল্পকলার ওপর পূর্ণ মনোযোগ দিতে পারেন না। প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার অভাবে এবং স্বীকৃতি না পাওয়ায় অনেক প্রতিভাবান শিল্পী হতাশায় ভোগেন এবং প্রান্তিক হয়ে পড়েন। সাদি মহম্মদের মৃত্যু এই বেদনাদায়ক বাস্তবতার একটি মর্মান্তিক প্রতিফলন।

অন্যদিকে, ফাইরুজ অবন্তিকার আত্মহত্যা, যৌন হয়রানি এবং লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার ব্যাপক ইস্যুতে আলোকপাত করে যা বাংলাদেশি সমাজকে ক্রমাগত জর্জরিত করে চলেছে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের ছাত্রী হিসেবে, ফাইরুজ আবন্তিকা তার সহপাঠী দ্বারা যৌন হয়রানির শিকার হন, এমন একটি অভিজ্ঞতা যা তাকে মানসিক আঘাত এবং দুর্বল করে রেখেছিল। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে ঘটনাটি জানানো সত্ত্বেও কোনো প্রতিকার পাননি, যা তার হতাশা এবং অসহায়ত্বের অনুভূতি আরও বাড়িয়ে তোলে। সমাজে নিজেকে পরিত্যক্ত ও অপ্রয়োজনীয় মনে করেন।

ফাইরুজ অবন্তিকার সুইসাইড নোট যেখানে তার আত্মহত্যাকে একটি ‘কৌশলগত হত্যা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন, যা প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলা এবং উদাসীনতার ছলনাময় প্রকৃতির কথা বলে। যদিও তার মৃত্যু হত্যার আইনি সংজ্ঞার সঙ্গে মানানসই নাও হতে পারে, এটি এমন একটি ব্যবস্থার জন্য একটি কঠোর অভিযোগ, যা তার অধিকার রক্ষা করতে এবং তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ব্যর্থ হয়েছে। ‘কৌশলগত হত্যা’ শব্দটি যৌন হয়রানি ও সহিংসতার শিকার, যারা ন্যায়বিচার ও প্রতিকার থেকে বঞ্চিত, তাদের দ্বারা অনুভূত বিশ্বাসঘাতকতা এবং অবিচারের গভীর অনুভূতিকে অন্তর্ভুক্ত করে।

ফাইরুজ অবন্তিকা তার প্রতি সংঘটিত অপরাধের যথাযথ ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থতার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তাদের দোষারোপ করেছেন, যেটি বাংলাদেশে লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা এবং দায়মুক্তি অব্যাহত রাখার পদ্ধতিগত ব্যর্থতার ওপর জোর দেয়। যৌন হয়রানির শিকারদের জন্য জবাবদিহিতা এবং ন্যায়বিচারের অভাব একটি শীতল বার্তা পাঠায় যে, অপরাধীরা দায়মুক্তির সঙ্গে কাজ করতে পারে, যখন বেঁচে থাকা ব্যক্তিরা নীরবতায় ভোগেন।

সাদি মহম্মদ এবং ফাইরুজ অবন্তিকার আত্মহত্যা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় বরং বাংলাদেশে বৃহত্তর সামাজিক অসঙ্গতি এবং পদ্ধতিগত ব্যর্থতার লক্ষণ। সমাজ ও সংষ্কৃতির উজ্জ্বল ব্যক্তিত্বদের প্রতি অবহেলা থেকে শুরু করে যৌন হয়রানি এবং লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার ব্যাপকতা, এই ট্র্যাজেডিগুলো ব্যবস্থাগত সংস্কার এবং সামাজিক পরিবর্তনের জরুরি প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেয়।

এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করতে এবং আরও ন্যায্য ও ন্যায়সঙ্গত সমাজ গঠনে সরকার এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। শিল্প ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে বিনিয়োগ করে, শিল্পী ও সংগীতজ্ঞদের অবদানকে স্বীকৃতি দিয়ে এবং যৌন হয়রানি ও সহিংসতা থেকে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের সহায়তা ও সংস্থান প্রদান করে, সরকার এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে সাহায্য করতে পারে যেখানে সব ব্যক্তি তাদের সম্ভাবনাকে পূর্ণ করতে পারে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে, বিশেষ করে, যৌন হয়রানি প্রতিরোধ এবং শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও মঙ্গল নিশ্চিত করতে সক্রিয় পদক্ষেপ নিতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে ঘটনাগুলো রিপোর্ট করার জন্য দৃঢ় নীতি ও পদ্ধতি বাস্তবায়ন করা, অভিযোগের জবাব দেওয়ার বিষয়ে শিক্ষক এবং কর্মীদের প্রশিক্ষণ প্রদান এবং ক্যাম্পাসে সম্মান ও সমতার সংস্কৃতি গড়ে তোলা।

সামাজিক ব্যাধি মোকাবিলা এবং ইতিবাচক পরিবর্তনের প্রচারের ক্ষেত্রেও সম্প্রদায়ের সম্পৃক্ততা এবং ক্ষমতায়ন গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। যৌন হয়রানি এবং লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা, ক্ষতিকারক নিয়ম এবং মনোভাবকে চ্যালেঞ্জ করে এবং বেঁচে থাকা ব্যক্তিদের সমর্থন করার মতো বিষয়গুলো সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে, সম্প্রদায়গুলো সবার জন্য আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং সহায়ক পরিবেশ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
সামাজিক ব্যাধি মোকাবিলা এবং ন্যায়বিচার ও সমতা বৃদ্ধির জন্য সরকার ও প্রতিষ্ঠানকে দায়বদ্ধ রাখতে সুশীল সমাজের সংগঠন, তৃণমূল কর্মী এবং অ্যাডভোকেসি গ্রুপগুলোর একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। জনসমর্থন জোগাড় করে, সচেতনতা বৃদ্ধি করে এবং নীতি পরিবর্তনের জন্য সমর্থন করে, এই গ্রুপগুলো অর্থপূর্ণ অগ্রগতি এবং পরিবর্তন চালাতে সাহায্য করতে পারে।

সাদি মহম্মদ ও ফাইরুজ অবন্তিকার আত্মহত্যার ঘটনা আমাদের জাতির মনোবলের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলেছে। আমাদের সবার উচিত এই সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য একসঙ্গে কাজ করা। সরকারের উচিত শিল্প ও সংস্কৃতির জন্য বাজেট বৃদ্ধি করা এবং শিল্পীদের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা প্রদান করা। শিল্পীদের জন্য প্রশিক্ষণ ও কর্মশালার ব্যবস্থা করা। তাদের জন্য পুরস্কার ও সম্মাননার ব্যবস্থা করা। সমাজের সব স্তরে শিল্প ও সংস্কৃতি সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা।

মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি সচেতনতা বৃদ্ধি এবং মানসিক স্বাস্থ্যের সেবাদানের ব্যবস্থা উন্নত করা। সমাজের প্রচলিত রীতিনীতি ও রক্ষণশীলতার বিরুদ্ধে প্রগতিশীল চিন্তাভাবনার প্রসার ঘটানো। নারীদের অধিকার ও ক্ষমতায়নের জন্য কাজ করা। সবার জন্য ন্যায়বিচার ও সুযোগের সমান অধিকার নিশ্চিত করা।

সাদি মহম্মদ ও ফাইরুজ অবন্তিকার মৃত্যু আমাদের জাতির জন্য একটি বেদনাদায়ক ক্ষতি। তাদের মৃত্যু আমাদের সমাজের অন্ধকার দিকগুলো তুলে ধরে এবং আমাদের সবার জন্য একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ গঠনের জন্য কাজ করার প্রেরণা জোগায়।

সামাজিক ব্যাধি মোকাবিলা করে এবং আরও ন্যায্য ও ন্যায়সঙ্গত সমাজ গঠনের জন্য একসঙ্গে কাজ করার মাধ্যমে, বাংলাদেশ সাদি মহম্মদ এবং ফাইরুজ অবন্তিকার আত্মত্যাগকে সম্মান জানাতে পারে এবং তাদের জীবন দান যাতে বৃথা না যায় তা নিশ্চিত করতে পারে।

লেখক: গবেষক ও উন্নয়নকর্মী

মুক্তিযুদ্ধ আমাদের গৌরব ও এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা

প্রকাশ: ২৬ মার্চ ২০২৪, ০৩:৫৬ পিএম
মুক্তিযুদ্ধ আমাদের গৌরব ও এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা
হীরেন পণ্ডিত

যারা মুক্তিযুদ্ধ দেখেনি, কিন্তু শুনেছে গল্পের আকারে তাদের পরিবারের কোনো বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তির কাছে, শিক্ষকের কাছে, কোনো নেতার কাছে, কোনো মুক্তিযোদ্ধার কাছে বা বইতে পড়েছে। সেই শোনা বা পড়া কতটুকু সঠিক বা তার বিস্তৃতি কতটুকু, তা আমরা জানি না। একটি উদ্যোগ নিতে পারে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস তুলে ধরার জন্য আমরা কতটুকু সফল? ইতিহাস বিকৃতি জাতিকে ধ্বংস আর বিভ্রান্তি ছাড়া কিছুই দিতে পারে না।... 

বাঙালি জাতির জীবনে সবচেয়ে গৌরব ও অহঙ্কারের বিষয় হলো একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ। কোনো জাতির জাতীয় মুক্তি সংগ্রামে শরিক থাকা, সামান্যতম অবদান রাখতে পারা যে কোনো ব্যক্তির জন্য গর্বের ব্যাপার। আমাদের গৌরবের জায়গা হলো এ দেশের মানুষ মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি এবং সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে। শোষণ-বঞ্চনামুক্ত একটি উদার, গণতান্ত্রিক, সমতাভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন নিয়েই এ দেশের মানুষ মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে।

১৯৪৭ সাল থেকেই শেখ মুজিব ছিলেন বাঙালি জাতির প্রধান আকর্ষণ। বাঙালি জাতির মুক্তির ইতিহাস তাকে ঘিরে আবর্তিত হয়েছে। তরুণ শেখ মুজিব ধীরে ধীরে হয়ে উঠলেন বাঙালি জাতির মুক্তিদাতা। নতুন রাজনৈতিক চিন্তাচেতনা নিয়ে ১৯৪৮ সালে ছাত্রলীগ গঠন করেন। ১৯৪৯ সালে নবগঠিত পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি আন্দোলনে অংশ নেওয়ার মাধ্যমেই রাজনৈতিক তৎপরতার সূচনা হয়। এরপর ১৯৫২-এর মহান ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪-এর যুক্তফ্রন্ট গঠন, ১৯৫৮-এর সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন, ১৯৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন ও ১৯৬৬-এর ঐতিহাসিক ছয় দফা-ভিত্তিক আন্দোলনের মাধ্যমে তিনি হয়ে ওঠেন বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা।

১৯৭০ সালের নির্বাচনে বাঙালিরা ছয় দফার পক্ষে অকুণ্ঠ সমর্থন জানায়। কিন্তু পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে ষড়যন্ত্রের রাজনীতি শুরু করে। তার দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেতৃত্বের কারণে একাত্তরের মার্চ মাসের শুরুতেই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ অনিবার্য। তাই তিনি একাত্তরের ৭ মার্চ বাংলাদেশের মানুষকে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। এ ভাষণে বাঙালির প্রতি পাকিস্তানিদের হত্যা-নিপীড়ন-নির্যাতনের চিত্র মূর্ত হয়ে ওঠে। শত্রুর মোকাবিলায় তিনি বাঙালি জাতিকে নির্দেশ দেন, ‘তোমাদের যা কিছু আছে, তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো।’ এই সম্মোহনী ভাষণে অনুপ্রাণিত হয়ে বাঙালি জাতি সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে।

বঙ্গবন্ধু অত্যন্ত প্রতীকী স্টাইলে ভাষণটি দিয়েছিলেন। একদিকে মুক্তিকামী মানুষকে দীর্ঘ সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত হতে বলেছেন, অন্যদিকে পাকিস্তানি শাসকদের বৃদ্ধাঙুলি দেখিয়ে দিয়েছেন। তিনি শুধু একজন বিজ্ঞ রাজনীতিবিদই ছিলেন না, তিনি ছিলেন বিশ্বমাপের কূটনীতিবিদ। ৭ মার্চের ভাষণে তিনি সবকিছুকে প্রকাশ করেন একজন কূটনীতিবিদের মতো। তিনি বলেন, বিগত ২৩ বছরের বঞ্চনার ইতিহাস। তিনি ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪-এর নির্বাচন, ১৯৫৮-এর সামরিক শাসন, ১৯৬৬-এর ছয় দফা, ১৯৬৯-এর গণ অভ্যুত্থান, ১৯৭০-এর নির্বাচনসহ তৎকালীন পাকিস্তানে বাঙালি বঞ্চনার কথা জানান, অন্যদিকে যুদ্ধকৌশলও বলে দেন এবং একটি সাজানো গোছানো অলিখিত ভাষণ দেন।

২৬ মার্চ বাংলাদেশের নেতা হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন, ওই ঘোষণাই বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের ভিত্তি, এই ঘোষণাকে ভিত্তি ধরে ১০ এপ্রিল স্বাধীনতার পূর্ণাঙ্গ ঘোষণাপত্র বা সংবিধানের মাতৃকোষ ঘোষিত হয় এবং স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার গঠিত হয়। এই ঘোষণাপত্রের ওপর ভিত্তি করেই বাংলাদেশের পূর্ণাঙ্গ সংবিধান রচিত হয়। ১৯৭০-এর নির্বাচনের ভেতর দিয়ে আসা বাংলাদেশের ওপর গণহত্যা শুরু ও যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়ার পরেই বাংলাদেশের জনগণের নির্বাচিত নেতা হিসেবে ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। সেটাকেই স্বাধীনতা ঘোষণাপত্রের মাধ্যমে সব জনপ্রতিনিধি বাংলাদেশের জনগণের পক্ষ থেকে বৈধ ঘোষণা হিসেবে মেনে নেন। আর বঙ্গবন্ধু ঘোষিত স্বাধীন দেশের জন্য সরকার গঠন করেন। বঙ্গবন্ধুকে ওই সরকারের প্রধান অর্থাৎ রাষ্ট্রপতি ও সৈয়দ নজরুল ইসলামকে উপরাষ্ট্রপতি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। বৈধ সরকার তখন দেশের ওপর ওই ঘোষণাপত্র অনুযায়ী সব আইন প্রণয়ন ও রাজস্ব-সংক্রান্ত সব অধিকার পায়। এই পথে দুটি মাত্র বাধা থাকে। প্রথম হলো দেশের অভ্যন্তরে বেশ কিছু স্থান তখন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর দখলে ছিল এবং দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের জন্য অন্য রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দরকার।

এই আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির জন্য দুটি বিষয় জরুরি ছিল। প্রথমত, যারা এই রাষ্ট্র গঠন করেছে তাদের প্রমাণ করতে হবে তারা বিচ্ছিন্নতাবাদী নয় এবং দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্র নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে কি না? কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য অন্য একটি গণতান্ত্রিক নতুন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিতে গেলে প্রথমেই দেখতে হয় যারা নতুন রাষ্ট্র গঠন করেছে বলে দাবি করছেন, তারা বিচ্ছিন্নতাবাদী কি না? যদি তারা বিচ্ছিন্নতাবাদী প্রমাণিত না হয় তাহলে স্বীকৃতি পাওয়ার বেশির ভাগ শর্ত তারা পূরণ করেন।

বাংলাদেশের এই পাকিস্তানি হানাদার বিতাড়িত করার যুদ্ধে বঙ্গবন্ধু যদি পালিয়ে যেতেন বা আন্ডার গ্রাউন্ডে গিয়ে বিপ্লবীদের মতো যুদ্ধ পরিচালনা করার চেষ্টা করতেন, তাহলে পাকিস্তানের সামরিক শাসক তাকে বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে প্রমাণ করার যথেষ্ট সুযোগ পেত। কিন্তু দেশ আক্রান্ত হওয়ার পরও বঙ্গবন্ধু নিজ বাসভবনে বসেই স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। তিনি দেশের জনগণকে আক্রমণকারীদের প্রতিহত করার আহ্বান জানান এবং বিশ্ববাসীর কাছে ওই নতুন রাষ্ট্রের জন্য স্বীকৃতি চান।

এই ঘোষণা ও স্বীকৃতি চাওয়ার কাজটি ছিল প্রকাশ্যে এবং নির্বাচিত নেতা হিসেবে। তাই পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যখন বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করে তখন তারা একটি স্বাধীন দেশের নির্বাচিত সরকারপ্রধানকে গ্রেপ্তার করে। তিনি বা তার দল বিচ্ছিন্নতাবাদী নয়। অর্থাৎ বঙ্গবন্ধু প্রকাশ্যে এভাবে গ্রেপ্তার হওয়ার ভেতর দিয়ে, স্বাধীনতা ঘোষণার পর এই দেশটির আর বাকি যে বিজয় অর্জন করার ছিল তার বেশির ভাগ তিনি একাই করেন। অর্থাৎ তিনি বিশ্ববাসীর কাছে প্রমাণ করেন, তিনি ও তার দল বিচ্ছিন্নতাবাদী নয়, তারা মূলত নিজস্ব ভূমি থেকে হানাদার মুক্তির জন্য যুদ্ধ করছেন।

১৯৭১-এর ৯ মাসে পাকিস্তানের জেলে থেকে তিনি যেমন বেশির ভাগ যুদ্ধে জিতিয়ে দেন বাঙালিকে, তেমনি জেলে বসেও তিনি আগরতলা মামলার মতো নিজেকে রূপান্তরিত করেন; তার আকৃতি আরও বিশাল হয়। গণতান্ত্রিক বিশ্ব প্রশ্ন করে এই নির্বাচিত নেতাকে গ্রেপ্তার করার অধিকার পাকিস্তানি সামরিক কর্তৃপক্ষের রয়েছে কি না? মার্কিন প্রেসিডেন্ট পাকিস্তানের পক্ষ নিলেও সিনেটে বারবার বাধাগ্রস্ত হন পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থানের জন্য। সবাই বলেন একমাত্র বঙ্গবন্ধুই তার দেশ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারী। পাকিস্তানি সামরিক কর্তৃপক্ষ নয়। তাই মুক্তিযুদ্ধে যেমন বজ্রকণ্ঠের মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধাদের রাইফেলে, মাইন, গ্রেনেডে সবখানে ছিলেন বঙ্গবন্ধু, তেমনি আন্তর্জাতিক বিশ্বে প্রায় এককভাবে লড়াই করেন গ্রেপ্তার হওয়া নেতা বঙ্গবন্ধু।

যে কোনো মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা সংগ্রাম যেমন দেশের মানুষের আত্মত্যাগের মাধ্যমে হয়, তেমনি তার সঙ্গে সহযোদ্ধা হিসেবে পাশে দাঁড়ায় সারা পৃথিবীর মুক্তিকামী মানুষ। সারা পৃথিবীর মুক্তিকামী মানুষকে সেদিন বাংলাদেশের পক্ষে দাঁড়ানোর নায্যতা দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। কূটনীতিতে সেদিন ইয়াহিয়াকে পরাজিত করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির মধ্য দিয়ে সরকার গঠন করে, সশস্ত্র পথে হানাদার তাড়ানোর যুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর কূটনীতির কাছে হেরে যায় পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ। বিজয়ী হন বঙ্গবন্ধু, রূপান্তরিত হন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান থেকে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এ। বাংলার অনেক সূর্যসন্তান হয়তো বাঙালি জাতির শৃঙ্খল মোচনের স্বপ্ন দেখেছেন। কিন্তু সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপান্তরিত করেছেন ইতিহাসের মহানায়ক, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু। তাই বলা যায়, বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধু এক ও অভিন্ন, একে অপরের পরিপূরক। একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটিকে কল্পনা করা যায় না।

১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন। রেসকোর্সে লাখো জনতার মাঝ থেকে বঙ্গবন্ধু বাসায় পৌঁছেন সন্ধ্যা ৬টায়। দীর্ঘ পথযাত্রা, দীর্ঘ আনুষ্ঠানিকতা, জনসভা, আবেগ-উচ্ছ্বাস-কান্নার বিনিময়ের পর ১১ জানুয়ারি থেকে বঙ্গবন্ধু সব ক্লান্তি-ভাবাবেগ উপেক্ষা করে এক মুহূর্ত বিলম্ব না করে দেশ পরিচালনা শুরু করেন। সেদিনই মন্ত্রিসভার সঙ্গে দুই দফা বৈঠক করেন এবং বৈঠকে সংবিধান প্রণয়নসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

বিজয়ের অর্ধ শত বছর পর বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। ডিজিটাল বাংলাদেশের বীজ রোপণ করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। তিনি বাংলাদেশকে ইন্টারন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়ন-এর সদস্যপদ গ্রহণ করান ১৯৭৩ সালে। ১৯৭৫ সালের ১৪ জুন তিনি বেতবুনিয়ায় ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র উদ্বোধন করেন। এই রোপিত বীজ থেকে জন্ম নেওয়া চারাগাছটির বিকাশ দেখি ১৯৯৬ সালে জননেত্রী শেখ হাসিনা যখন প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করার পর।

মুক্তিযোদ্ধারা যে জীবনকে তুচ্ছ করে, নিজের জীবনকে উৎসর্গ করে দেশমাতা ও মাতৃভূমিকে মুক্ত করে, স্বাধীন বাংলাদেশের বিজয়ের পতাকা ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছিলেন, তা নতুন প্রজন্মকে জানাতে হবে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অর্জন তাদের সামনে তুলে ধরতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের সময় একটি জাতিকে চিরতরে নিশ্চিহ্ন করার জন্য যত ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া দরকার সব ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। ফলে তারা শ্রমজীবী, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী ও সাংবাদিকসহ এ দেশের সূর্যসন্তানদের হত্যা করেছিল। বাঙালি জাতি কীভাবে তাদের পরাজিত করেছিল, তার যথাযথ ইতিহাস নতুন প্রজন্ম, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার দায়িত্ব ও কর্তব্য সবারই। কিন্তু আমরা সেটি কতটুকু করছি, সেই প্রশ্ন আমাদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধ হলো বাঙালি জাতির শোষণের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হওয়ার যুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা হলো আমাদের বাঙালি জাতির আজন্মলালিত স্বপ্ন, একটি জাতির চেতনার স্বপ্ন। এই স্বপ্ন দোলা দিয়েছে আমাদের মনে, আমাদের স্বপ্নকে অনুপ্রাণিত করেছে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে। সহায়তা করেছে স্বপ্ন বাস্তবায়নে এবং এই স্বপ্নকে বেগবান করেছে এবং এক নতুন আশা ত্বরান্বিত করেছে। যে চেতনা বাঙালি জাতিকে একতাবদ্ধ করেছিল একটি গণতান্ত্রিক ও শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠায়। এই চেতনা নতুন প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে আমাদের আরও কাজ করতে হবে। নতুন প্রজন্মের চেতনাকে আরও শাণিত করতে হবে।

যারা মুক্তিযুদ্ধ দেখেনি, কিন্তু শুনেছে গল্পের আকারে তাদের পরিবারের কোনো বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তির কাছে, শিক্ষকের কাছে, কোনো নেতার কাছে, কোনো মুক্তিযোদ্ধার কাছে বা বইতে পড়েছে। সেই শোনা বা পড়া কতটুকু সঠিক বা তার বিস্তৃতি কতটুকু, তা আমরা জানি না। একটি উদ্যোগ নিতে পারে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস তুলে ধরার জন্য আমরা কতটুকু সফল? ইতিহাস বিকৃতি জাতিকে ধ্বংস আর বিভ্রান্তি ছাড়া কিছুই দিতে পারে না। 

বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে দেশ স্বাধীন হয়েছে সে বিষয়টি নতুন প্রজন্ম, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা। যা নতুন প্রজন্মকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করবে। মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাসই হবে নতুন প্রজন্মের অনুপ্রেরণার উৎস, এই চেতনাকে শাণিত করতে আমাদের এখনই কাজ শুরু করা উচিত। 

শেখ হাসিনার স্বপ্ন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া, দেশের মানুষকে উন্নয়নের স্বাদ পাইয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে কাজ করছেন। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস রচনা, বঙ্গবন্ধুর অস্তিত্বকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে স্থান দিয়ে যথাযথ মর্যাদার আসনে বসানোই ছিল মূল লক্ষ্য। বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের অঙ্গীকার ছিল দেশবাসীর অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা ও শিক্ষা ইত্যাদি মৌলিক অধিকার পূরণ করা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশি-বিদেশি নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে উন্নয়ন, অগ্রগতি আর সমৃদ্ধির পথে হাঁটছেন। ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত একটি প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ে তোলার জন্য চারটি ভিত্তি সফলভাবে বাস্তবায়নে কাজ করে যাচ্ছে সরকার। এগুলো হলো- স্মার্ট সিটিজেন, স্মার্ট ইকোনমি, স্মার্ট গভর্নমেন্ট ও স্মার্ট সোসাইটি। এর পাশাপাশি হাতে নেওয়া হয়েছে ২১০০ সালের বদ্বীপ কেমন হবে- সেই পরিকল্পনা। স্মার্ট বাংলাদেশে সব কাজ, সম্পাদন করা হবে প্রযুক্তির মাধ্যমে। যেখানে প্রত্যেক নাগরিক প্রযুক্তি ব্যবহারে হবে দক্ষ। ২০৪১ সালের স্মার্ট বাংলাদেশ হবে সাশ্রয়ী, টেকসই, বুদ্ধিভিত্তিক, জ্ঞানভিত্তিক এবং উদ্ভাবনী বাংলাদেশ। 

আমরা সবসময় মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশ গড়ার অঙ্গীকার করি, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়নের কথা বলি, কিন্তু নতুন প্রজন্মকে বোঝাতে হবে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশ গড়া কী? বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ছিল একটা দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়া। অসাম্প্রদায়িক চেতনায় একটি বৈষম্যহীন সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলা। সবার জন্য অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসা নিশ্চিত করা। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, মুক্তিযোদ্ধাদের চেতনা কোমলমতিদের হৃদয়ে গেঁথে দিতে হবে। এদের হাত ধরেই এ দেশ একদিন দুর্নীতিমুক্ত, হিংসামুক্ত, বৈষম্যহীন বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ে উঠবে।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও গবেষক

বঙ্গমাতার উদ্বাস্তু জীবন

প্রকাশ: ২৬ মার্চ ২০২৪, ০৩:৫২ পিএম
বঙ্গমাতার উদ্বাস্তু জীবন
ইশতিয়াক আলম

১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর সারা দেশে সাময়িক আইন জারি করা হয়। ক্ষমতায় আসেন জেনারেল আইয়ুব খান। ১৯৬৮ সালের ৩ জানুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমানসহ ৩৫ জনের বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করা হয়। ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি গণ অভ্যুত্থানে সেই মামলা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয় সরকার। ২৩ ফেব্রুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে বিশাল এক জনসভায় শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়।...

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ আওয়াসী লীগ ও ছাত্র নেতাদের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে বঙ্গবন্ধু ৩২ নম্বরে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। সে রাতে বেগম মুজিবের সঙ্গে থাকেন দুই ছেলে শেখ রাসেল ও শেখ কামাল। শেখ কামাল বিদায় নিয়ে সেই রাতে ও তারপরে কয়েকদিন ঢাকায় অন্য কোথাও থাকেন।

জামাতা ড. ওয়াজেদ, সন্তানসম্ভবা হাসিনা (২৪) এবং তার ১০ বছরের ছোট বোন রেহানা এবং এ টি এম সৈয়দ হোসেনের (বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠ বোন খোদেজা বেগম লিলির স্বামী) মেয়ে জলীকে নিয়ে ধানমন্ডি ১৫ নম্বর রোডের এক ভাড়াটিয়া বাড়িতে থাকেন। রাত ১টা ৩০ মিনিটে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করে ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যাওয়া হয় এবং ২৯ মার্চ নেওয়া হয় পাকিস্তানে। 

২৫ মার্চ রাতে বেগম মুজিব দুই ছেলে জামাল ও রাসেলকে নিয়ে ৩২ নম্বর বাড়িতে কাটান। পরদিন ২৬ মার্চ সারা দিন কারফিউ থাকায় তাদের একইভাবে দিন ও রাতেও ওই বাসাতেই কাটাতে হয়। তখন শেখ মুজিবুর রহমানের মেজো ফুপু আছিয়া বেগমের  ছেলে মমিনুল হক খোকা থাকতেন মোহাম্মদপুরের বাসায়। 

সেদিন অর্থাৎ ২৫ মার্চ রাতে একে একে সবাই যখন বিদায় নিয়ে চলে যান তখন হঠাৎ করে বঙ্গবন্ধু বেগম মুজিব এবং খোকাকে বারান্দায় ডেকে নিয়ে বলেন, ‘শোন, আমি জানি না আমার ভাগ্যে কী হতে যাচ্ছে। খোকা রইল, ও তোমাদের দেখবে।’ স্ত্রীকে এ কথা বলে খোকাকে বললেন, ‘খোকা তোর ওপরই ছেড়ে দিলাম ওদের ভার।’

২৭ মার্চ খোকা মোহাম্মদপুরের বাসা থেকে লালমাটিয়ার ভেতর দিয়ে এ বাসা-ও বাসা হয়ে ৩২ নম্বরে পৌঁছান। নিচ তলার সিঁড়িতে দেখতে পান বেগম মুজিব এবং রাসেল ও জামালকে। খোকাকে দেখে বেগম মুজিব হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন। বলেন, ‘আমরা এখন কোথায় যাব।’

খোকা তাদের সান্ত্বনা জানিয়ে নিজের গাড়ি নিয়ে আসার কথা বলে বাইরে আসেন। এই সময়ে একটা গাড়ি এসে থামে তাদের সামনে। গাড়ির চালক কামালের বন্ধু তারেক। গাড়িতে তারা চারজন (খোকা, বেগম মুজিব এবং রাসেল ও জামালসহ) ধানমন্ডির দুই নম্বর রোডের খোকার বন্ধুও আত্মীয় মোরশেদ মাহমুদের বাসায় যান। বাসার লোকজন তখন বাক্সপেঁটরা গুটিয়ে বাসা ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। খোকা কালরাত ২৫ মার্চ নিজের বাসায় যাওয়ার আগে তার গাড়িটি জাকি ভাইয়ের ২ নম্বর রোডের বাসায় রেখে গিয়েছিল। তখন খোকা বেরিয়ে নিজের গাড়িটি নিয়ে এসে মিসেস মুজিব, রাসেল ও জামালকে নিয়ে নিজের গাড়িতে ওঠেন। কিন্তু কোথায় যাবেন? কারফিউ শিথিল করা হয়েছে বিকাল ৪টা পর্যন্ত। লোকজন প্রাণভয়ে ঢাকার বাইরে যাওয়ার জন্য ছুটছে। খোকা গাড়ি নিয়ে আসেন ধানমন্ডি ১৫ নম্বর রোডে বন্ধু ক্যাপ্টেন রহমানের বাসায়। জাকি ভাইয়ের বাসা থেকে খোঁজ পেয়ে শেখ কামাল এবং শেখ মুজিবুর রহমানের প্রেস সচিব আমিনুল হক বাদশা আসেন দেখা করতে। ক্যাপ্টেন রহমান ব্লেড দিয়ে তাদের দুজনকে (শেখ কামাল এবং আমিনুল হক বাদশকে) গোঁপ কামিয়ে ফেলতে পরামর্শ দেন। ক্যাপ্টেন রহমান সরকারি কর্মকর্তাবলে তাকে অফিসে যেতে হবে বলে অফিসে রওনা হন। যাওয়ার আগে গোপন কথা বলার মতো করে জানান, তিনি পরিবার নিয়ে লঞ্চে ভারতে চলে যাবেন, সে ব্যবস্থা হয়েছে।

খোকা ঠিক করেন ওয়ারীতে তার শ্বশুরবাড়িতেই যাবেন। বেগম মুজিব বলেন, ধানমন্ডি ১৫ নম্বর রোডে ভাড়া বাসায় রয়েছে রেহানা, জলি  ও হাসিনা। ২৫ মার্চের সন্ধ্যার পর থেকে তাদের কোনো খোঁজ জানেন না। অগ্যতা ওয়ারী যাওয়ার আগে খোকা যান তাদের দেখতে। গিয়ে দেখেন বাসায় শুধু রেহানা রয়েছেন। 

খোকা তার ইচ্ছায় তাকে নিয়ে ফিরে এসে সবাইকে নিয়ে ওয়ারীর উদ্দেশে রওনা দেন। রাস্তায় সন্ত্রস্ত মানুষের মিছিল। সবাই ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটছে বুড়িগঙ্গার দিকে। আবার কারফিউ হওয়ার আগে নদীর ওপারে পৌঁছতে চায় সবাই। মগবাজারের চৌরাস্তা পার হওয়ার সময় গোলাবর্ষণের আওয়াজ তাদের কানে আসে। সকাল থেকে কম ঘোরাঘুরি হয়নি। বেলা হয়েছে, কারফিউ বিরতির ভেতর ওয়ারী পৌঁছানো যাবে না ভেবে মগবাজারের এক গলিতে গাড়ি ঢুকিয়ে ওঠেন সুপারিনটেন্ড্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার আলী সাহেবের বাড়ির এক রুমে। এখানে দেখা পান চলচ্চিত্রকার আলমগীর কবির, অভিনেতা সিডনি, ধানমন্ডির মোরশেদ মাহমুদ, মগবাজারের খায়ের সাহেবের মতো পরিচিতজনদের। অনেকগুলো খারাপ খবর পান, শহিদ মিনার ভেঙে ফেলা হয়েছে। আগরতলা মামলার প্রধান আসামি কমান্ডার মোয়াজ্জাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. গোবিন্দ চন্দ্র দেব, মধুর ক্যান্টিনের মধু ও তার পরিবার এবং ইকবাল হলের ছাত্র ও কর্মচারীদের হত্যা করা হয়েছে। 

সকালে উঠে দেখা যায় সব বাড়ি নিস্তব্ধ। বাড়িভর্তি লোকজন তাদের কিছু না জানিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে চলে গেছে। অবস্থা দেখে বেগম মুজিব বলেন, আর তো এখানে থাকা সম্ভব নয়। কাজেই এই বাড়ি ছেড়ে তারা রাজারবাগ হয়ে ওয়ারীর দিকে রওনা হন। পথে দেখা পেলেন ধ্বংসস্তূপ ও মৃত মানুষের লাশ। 

বলদা গার্ডেনের পাশে শ্বশুরবাড়িতে কাটে কিছুদিন। পাড়া-প্রতিবেশীরা তাদের অবস্থানকে সহজভাবে নিতে পারছিল না দেখে বেগম মুজিব অন্য কোথাও যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। পরদিন সকালে গাড়ি নিয়ে একাই বের হন খোকা। মালিবাগ চৌধুরীপাড়া এলাকায় অনেক খালি বাসা আছে জেনে ফিরে গিয়ে বেগম মুজিবসহ অন্যদের নিয়ে রওনা হন তারা। চৌধুরীপাড়ায় বাসা দেখতে গেলে স্থানীয় কৌতূহলী মানুষ গাড়ি ঘিরে ধরে। অবস্থা দেখে গাড়ি ঘুরিয়ে খোকা বলেন, আজকে না হয় ওয়ারীতেই ফিরে যাই। বেগম মুজিব অসম্মতি জানিয়ে বলেন, দরকার হলে গাড়িতেই রাত কাটিয়ে দেব সবাই। বাধ্য হয়ে খোকা চৌধুরীপাড়ার ভেতরের দিকেই যেতে থাকেন। সন্ধ্যা প্রায় হয়ে আসছে। কারফিউ শুরু হবে। এই সময় একটি দোতলা নির্জন প্রায় পরিত্যক্ত বাড়ি দেখে বাড়ির আঙিনায় গাড়ি ঢোকান। সবাইকে গাড়িতে রেখে খোকা একা বাড়িতে ঢোকেন। নিচতলা ফাঁকা, কেউ নেই। কোথাও কোনো সাড়াশব্দ না থাকলেও খোকার মনে হয় দোতালা জনশূন্য নয়। সাহস করে দোতলার একটা রুমে ঢুকে অবাক হয়ে দেখেন কামরাতে জবুথবু হয়ে বসে রয়েছে পলি (সৈয়দ হোসেনের বড় মেয়ে, জলির বড় বোন) এবং তার স্বামী ওদুদ সাহেব। খোকাকে দেখে পলি মামা বলে ছুটে আসে। সেই রাতে প্রায় বিনিদ্র ও অনাহারে রাত কাটে সবার। পরদিন সকালেই উঠে খোকা আবার বেরোয় বাড়ির খোঁজে। চৌধুরীপাড়াতেই সুন্দর দোতলা একটা বাড়ি ভাড়া দেওয়া হবে জেনে দেখা করতে গিয়ে বিস্মিত হতে হয় খোকাকে। বাড়ির মালিক মহিলা এবং তার বিশেষ পরিচিত। কমলাপুরের জাহাজ বাড়ির মালিক এই মহিলার বাড়িতে ১৯৫৫ সালে খোকা এবং তার বন্ধু ইঞ্জিনিয়ার গিয়াসউদ্দিন ভাড়া ছিলেন। স্নেহশীল এই মহিলা সব শুনে খুশি মনেই সম্মত হন। বেগম মুজিব এবং বাচ্চাদের নিয়ে এ বাড়িতে আসবার সময় পলিও সঙ্গি হয়, সে তখন অন্তঃসত্ত্বা।

কয়েকদিন না যেতেই বেগম মুজিব হাসিনার খোঁজ নিতে বললেন। খোকা তার শালাকে ড. ওয়াজেদের অফিসে পাঠিয়ে জানতে পারল তারা এই চৌধুরীপাড়াতেই এক বন্ধুর বাসায় আছে। খোকা তার বাসায় দেখা করতে গেলে ড. ওয়াজেদ তার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন। তার আশঙ্কা খোকার পেছনে মিলিটারি গোয়েন্দা আছে। 

বিষণ্ন মন নিয়ে আসার সময় তার সঙ্গে আসে জলি (সৈয়দ হোসেন সাহেবের মেয়ে)। 

বেগম মুজিব যখন কামালের জন্য চিন্তিত তখন এক দুপুরে সে এলো খোকার সমন্ধী মুরাদ ভাইয়ের মোটরসাইকেলের পেছনে বসে। কামাল থাকল না, দেখা করে সন্ধ্যার পরে চলে গেল। সম্ভবতঃ এর পরই শেখ কামাল ফরিদপুর থেকে সাতক্ষীরা হয়ে ভোমরা সীমান্ত দিয়ে ভারতে চলে যায়। যাওয়ার আগে মায়ের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল। 

কদিন পরে বেগম মুজিব খোকাকে বললেন, সৈয়দ হোসেন সাহেবের খোঁজ করতে। ২৫ মার্চের পর পলি-জলিদের সঙ্গে পিতা-মাতার দেখা হয়নি। সাইদ সাহেব তখন পরিবার নিয়ে সোবহানবাগ সরকারি কলোনিতে থাকতেন। 

সেখানে গিয়ে খোকা নতুন ঝামেলায় পড়েন। সৈয়দ সাহেবের স্ত্রী খোদেজা বেগম লিলি ধরে বসেন তাদের সদরঘাট পৌঁছে দিতে, তারা ঢাকায় থাকবেন না। লঞ্চে দেশে যাবেন, গাড়ি নিয়ে সদরঘাট যাাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ, পথে পাকিস্তানিরা চেক করবে। এরপরও খোকাকে যেতে হয়। তবে তার ভাগ্য ভালো, নিরাপদে সদরঘাট পৌঁছে দিয়ে ফিরে আসেন। 

এই সময়ে আকাশ বাণীর খবরে জানতে পারেন বৈদ্যনাথ তলায় স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার গঠন ও শপথ নেওয়ার সংবাদ। 

একদিন বিকালে শেখ শহীদ (এরশাদ সরকারের মন্ত্রী) এসেছিল সম্পর্কে ভাবী বেগম মুজিবের কাছে বিদায় নিতে, সে কিছুদিনের মধ্যে ভারত যাবে। শেখ শহীদ চলে যাওয়ার পর তার পরিচিত এক মহিলা এসে চেঁচামেচি শুরু করে। বাড়িওয়ালীকে রাগত স্বরে বলেন, আমাদের না জানিয়ে ভাড়া দিয়েছেন, এখন পাকবাহিনী এসে সমস্ত পাড়া জ্বালিয়ে দেবে।

সব শুনে বেগম মুজিব আবার বাসা দেখার কথা বললে খোকা তার পরিচিত অবসরপ্রাপ্ত সচিব মইনুল ইসলামের সঙ্গে জহুরুল ইসলামের অফিসে দেখা করেন। 

তিনি পরামর্শ দেন মগবাজারে জনাব নুরুদ্দিন ও বদরুন্নেসাদের খালি বাসায় ওঠার জন্য। তারা ভারতে চলে গেছেন। সেদিনই তারা সবাই মগবাজারের শূন্য বাসায় ওঠেন। সেদিনের ‘দৈনিক পাকিস্তান’ সংবাদপত্রের করাচি বিমানবন্দরে বন্দি শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি দেখে তারা নিশ্চিত হলেন যে শেখ সাহেব জীবিত আছেন। 

একদিন বাইরে থেকে ফিরে এলে বেগম মুজিব ব্যতিব্যস্ত হয়ে বলেন, এখুনি এই বাড়ি ছাড়তে হবে। কিছু আগে দুজন মিলিশিয়া খোকারগাড়ি দেখে তাদের সম্বন্ধে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। সে আবার আসবে বলেও জানিয়েছে। ব্যস তখনি তারা সে বাসা ছেড়ে গাড়িতে ওঠেন। 

মগবাজারের পেট্রলপাম্পের পাশের এক গলির ভেতর দিয়ে যেতে একটা দোতালা বাড়ির নিচতলা ভাড়া হবে জেনে বাড়ির মালিক মহিলার সঙ্গে দেখা করে তাকে সবিস্তারে জানান। তিনি খুশি মনে ভাড়া দিতে রাজি হন। এই বাসায় ওঠেন সবাই। 

এর মধ্যে ঢাকার বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযোদ্ধারা বোমা হামলা শুরু করেছে। একদিন ড. ওয়াজেদ শেখ হাসিনাকে নিয়ে উপস্থিত। তারা চৌধুরীপাড়ায় যেখানে থাকতেন সেখানে থাকা নিরাপদ মনে করছেন না। আসন্ন প্রসবা হাসিনাকে কাছে পেয়ে মা বেগম মুজিব স্বস্তি পেলেন। 

কয়েক দিন পর কামালের খবরের জন্য খোকা গেলেন মরহুম মানিক মিঞার স্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে। তিনি তখন ছোট ছেলে আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে ধানমন্ডির বাসায় থাকতেন। ওখানেই শুনলেন সেনাবাহিনীর লোকজন এ বাড়িতে আসে বেগম মুজিবের খোঁজে। তারা পরামর্শ দিলেন আত্মসমর্পণের জন্য। আত্মসমর্পণ করলে  সেনাবাহিনী নিরাপত্তা দেবে। নয়তো তারা ঠিকই খুঁজে বের করবে তখন সাধারণ সৈনিকরা হয়তো তাদের বাসাই উড়িয়ে দেবে। 

মগবাজারের বাসায় ফিরে আসার কিছুক্ষণের মধ্যে আনোয়ার হোসেন মঞ্জু তার মাকে নিয়ে এসে উপস্থিত হন। মা আর ছেলে বেগম মুজিবকে আত্মসমর্পণ করে সেনাবাহিনীর নিরাপত্তায় থাকার পক্ষে বিভিন্নভাবে বোঝান। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে কথা না দিয়ে কয়েকদিন সময় নেন। শেখ হাসিনা মায়ের কাছে আসন্ন প্রসবা, তার শরীরও ভালো নয়। এর ভেতরে ঢাকা শহর উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। খালেদ মোশাররফ এবং মেজর হায়দারের  গেরিলা বাহিনী ঢাকায় সেনাবাহিনীকে ব্যতিব্যস্ত করে তুলেছে যখন তারা বিশ্বকে দেখাতে চাচ্ছে পূর্ব পাকিস্তানে কোনো গণ্ডগোল নেই। 

এর ভেতর একদিন জরুরি খবর এলো আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর বাসায় যাওয়ার। গিয়ে দেখেন জেনারেল ওমর বসে। সম্ভবতঃ তিনি তখন পাকিস্তানের আইএসআইয়ের প্রধান। যাওয়ার পরপরই জেনারেল সরাসরি মূল কথায় চলে আসেন। প্রথমে তিনি নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য পাকিস্তানের কোনো বড় শহর বা ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের উল্লেখ করেন। খোকা দুই প্রস্তাবে অসম্মতি জানান। তখন জেনারেল ওমর বলেন, আপনাদের পছন্দের কোনো বাড়ির কথা বলেন, সেখানেই আমরা ব্যবস্থা করে দেব। কিন্তু আমাদের প্রহরাধীনে থাকতে হবে। সেদিন, তখুনি বাড়ি দেখতে বেরোন তারা। অনেকগুলো বাড়ি দেখার পর ধানমন্ডির ১৮ নম্বর সড়কে (বাড়ি নম্বর ২৬। বর্তমানে রোড নম্বর ৯এ, বাড়ি নম্বর ২৬) একটা বাড়ি পছন্দ হলো। এক তলা বাড়ি, উঁচু সীমানা প্রাচীর। পেছনে বেশ জায়গা, সামনে সুন্দর গেট। 

জেনারেল ওমর বললেন, ‘কোই বাত নেহি, হাম লেলেতে ইয়ে মাকান। তুমি অভি যাকে তোমহারা ভাবিকে লেআও।’
‘পড়েছি যবনের হাতে, খানা  খেতে হবে সাথে’ সেই প্রবাদের মতো। সেদিনই উঠতে হলো ১৮ নম্বর সড়কের সেই বাড়িতে। ওঠার আগে ৩২ নম্বরের বাড়ি থেকে নিত্য ব্যবহার্য কিছু জিনিসপত্র এবং মেঝেয় পড়ে থাকা শেখ মুজিবুর রহমানের ইস্টার্ন মার্কেন্টাইল ব্যাংকের চেক নিয়ে আসেন। জেনারেল ওমর সেই অ্যাকাউন্টের টাকা ওঠানোর চেকে এবং অথরিটি লেটারে শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাক্ষর আনিয়ে দেন পাকিস্তান থেকে। বাসায় ওঠার সঙ্গে সঙ্গে সেনাবাহিনীর চৌকি বসে গেল। সম্ভবতঃ সেদিন ছিল ১২ মে ১৯৭১।

এই ফাঁকে ২৫ মার্চের আগের সময়ে দেখে নেওয়া যায়
টুঙ্গিপাড়ার শেখ জহরুল হক ও  হোসেন আরা বেগমের মেয়ে বেগম ফজিলাতুন নেছা রেনুর তিন বছর বয়সে বিয়ে ঠিক হয় আপন চাচাতো ভাই শেখ মুজিবুর রহমান খোকার সঙ্গে। এর পাঁচ বছর পর ১৯৩৮ সালে রেনু ও খোকার বিয়ে হয়। তখন রেনুর বয়স ৮ এবং খোকার বয়স ১৮। খোকা অর্থাৎ শেখ মুজিবুর রহমান পড়তেন ক্লাস টেনে। ছোট বেলায় চোখে বেরিবেরি রোগ হওয়ায় তার তিন বছর সময় নষ্ট হয় এবং একটু বেশি বয়সে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। পাঁচ বছর বয়সে পিতা-মাতা দুজনই মারা যাওয়ায় রেনু চাচা শেখ লুৎফুর রহমানের (খোকার পিতার) বাড়িতেই থাকতেন। ১৯৪৭ সালে ইসলামিয়া কলেজ থেকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বিএ পাস করে শেখ মুজিবুর রহমান ওই সালের সেপ্টেম্বর মাসে ঢাকায় এসে ১৫০ মোগলটুলিতে ওঠেন। 

১৯৫৪ সালে পূর্ববঙ্গ প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনের প্রাক্কালে ১৯৫৩ সালে শেখ মুজিবুর রহমান তার দুই বন্ধু খোন্দকার আব্দুল হামিদ ও জালাল মোল্লাকে সঙ্গে নিয়ে মেজো ফুপু আছিয়া বেগমের ছেলে মমিনুল হক খোকার ৮/৩ রজনী বোস লেনের বাসায় ওঠেন। এর কিছুদিন পর, আগে থেকে কিছু না জানিয়ে হঠাৎ করে শেখ মুজিবুর রহমান বেগম ফজিলাতুন নেছাকে নিয়ে আসেন রজনী বোস লেনের ছোট বাসায়। তখন শেখ হাসিনার বয়স ছয় বছর এবং শেখ কামালের বয়স চার। বাসায় উঠে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন শেখ মুজিবুর রহমান। 

১৯৫৪ সালের ৭ থেকে ১২ মার্চ অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিরোধী দলের নির্বাচনি জোট যুক্তফ্রন্ট নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন লাভ করে। শেখ মুজিবুর রহমান মুসলিম লীগের প্রভাবশালী ওয়াহিদুজ্জামানকে গোপালগঞ্জের আসনে ১৩ হাজার ভোটে পরাজিত করেন। শেরেবাংলার নেতৃত্বে গঠিত প্রাদেশিক মন্ত্রিসভায় তাকে কৃষি ও বনমন্ত্রী করা হয়।

মন্ত্রী হয়ে শেখ মুজিবুর রহমান রজনী বোস রোডের বাসা ছেড়ে মিন্টু রোডের সরকারি বাসায় ওঠেন। মমিনুল হক খোকা বাড়িতে গিয়েছিলেন, ভাঙ্গা থেকে এসে দেখেন শেখ মুজিবুর রহমান পরিবার এবং সব জিনিসপত্র নিয়ে আগের বাসা ছেড়ে দিয়ে গেছেন। তাকে কিছুই জানানো হয়নি। খোকার বিছানাপত্র, দুটো ট্রাংকও নিয়ে যাওয়া হয়েছে। খোকা অসন্তুষ্ট হন। শেখ মুজিব খোকার পিঠে হাত দিয়ে বলেন, ‘তোর আবার আলাদা বাসা কীসের? এখন থেকে তুই তো সবসময় এখানেই থাকবি।’

বেগম মুজিব বলেন, ‘ভাডি, তোমার ভাই কী বলেন মনে রেখ, আজ থেকে তোমার আলাদা কোনো ঠিকানা নেই’। ভাডি মানে ভাইডি, খোকাকে তার ভাবী আদর করে ভাডি বলেই ডাকতেন। শেখ মুজিব পাশে বসে পিঠে হাত রেখে বললেন, ‘খোকা তোর ওপর আমি নির্ভর করতে পারি। আমার জীবনের তো কোনো নিশ্চিত ঠিকানা নেই। কখন কোথায় থাকতে হয় বলা যায় না। তোর ভাবী  আর পরিবারকে দেখাশোনার ভার আমি তোকেই দিলাম। তোকে আমার বড় কাছের মানুষ বলে মনে হয়। তুই আমার একমাত্র নির্ভরযোগ্য সাথী।’ খোকার ওপর এই নির্ভরতা পরবর্তী দুঃসহ বছরগুলোতে তিনি যথাযথভাবে পালন করেছেন।

যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা স্থায়ী হয়নি। আদমজী জুটমিলে মুসলিম লীগ সরকারের বাঁধানো বাঙালি-বিহারি দাঙ্গার অভিযোগে যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা ভেঙে দেওয়া এবং শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়। মিন্টু রোডের বাসা সঙ্গে সঙ্গে ছেড়ে দিতে হয়। সবাই ওঠেন নাজিরা বাজারে মেয়র হানিফদের বাসায়। সেখানে বেশি দিন থাকা হয়নি। ১৯৫৪ সালের প্রলয়ংকরী বন্যায় বাড়িতে পানি ওঠায় নাজিরা বাজারের বাসা থেকে গিয়ে তারা ওঠেন আরমানীটোলার ঢাকা আওয়ামী লীগের সভাপতি হাফেজ মোহাম্মদ মুসার বাড়িতে। সেখানেই শেখ রেহানার জন্ম হয়।

১৯৫৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর আতাউর রহমান খানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ মন্ত্রিসভা গঠন করলে শেখ মুজিবুর রহমান বাণিজ্য, শিল্প ও দুর্নীতি দমন বিভাগের মন্ত্রী  হন এবং পরিবারের সদস্যরা আব্দুল গনি রোডের সরকারি বাসায় উঠে আসেন। এই সময়ে শেখ মুজিব পাকিস্তান টি বোর্ডের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং সেগুনবাগিচায় টি বোর্ডের বাসায় সবাইকে নিয়ে ওঠেন। ১৯৫৮ আইয়ুব খানের মার্শাল জারির পর ১২ অক্টোবর সেগুনবাগিচার বাসা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। এর পরদিনই বেগম মুজিব এই বাসা ছেড়ে শান্তিনগরের একটি নির্মীয়মাণ বাসায় ওঠেন। বাসাটি বসবাসের উপযোগী না হওয়ায় এই বাসা ছেড়ে ওঠেন সেগুনবাগিচার এক অবসরপ্রাপ্ত জজ সাহেবের বাসায়। এই সময়ে জেল থেকে পাঠানো শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে ৩২ নম্বরের বাড়ির কাজ শুরু করা হয়। এবং বাড়ির কাজ ভালোভাবে শেষ না হলেও বেগম মুজিব ছেলেমেয়েদের নিয়ে ওঠেন ৩২ নম্বরের বাড়িতে [সঠিক নম্বর: পুরাতন বাড়ি নং-৬৭৭, রোড-৩২; নতুন বাড়ি নং-১০, রোড-১১]। ১৯৫৬ সালে শেখ মুজিবুর রহমান বাণিজ্য, শিল্প ও দুর্নীতি দমন বিভাগের মন্ত্রী। তখন বেগম মুজিবের অনুরোধে শেখ মুজিবুর রহমানের একান্ত  সচিব নূরুজ্জামান গণপূর্ত বিভাগে আবেদন করেন। ১৯৫৭ সালে ৬ হাজার টাকায় এক বিঘা জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়। এই জমিতে বাড়ি  নির্মাণ করা হয় এবং এ কাজে ইসলাম গ্রুপের জহুরুল ইসলাম এবং সম্পর্কিত আত্মীয় ও সিঅ্যান্ডবির চিফ ইঞ্জিনিয়ার মইনুল ইসলামের আশ্বাস ও সহযোগিতা ছিল। এই সময়ে কামাল ও জামাল শাহীন স্কুলে এবং শেখ হাসিনা প্রথমে নারী শিক্ষা মন্দিরে এবং পরে কামরুন্নেছা গার্লস স্কুলে ভর্তি হন। 

১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর সারা দেশে সাময়িক আইন জারি করা হয়। ক্ষমতায় আসেন জেনারেল আইয়ুব খান। ১৯৬৮ সালের ৩ জানুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমানসহ ৩৫ জনের বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করা হয়। ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি গণ অভ্যুত্থানে সেই মামলা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয় সরকার। ২৩ ফেব্রুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে বিশাল এক জনসভায় শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

১৮ নম্বর রোডের বাসায় থাকা অবস্থায় কিছু ঘটনা ঘটে 
বঙ্গবন্ধুর পিতা-মাতা গুরুতর অসুস্থ হয়ে ঢাকায় এসে ওঠেন সদরঘাটের নৌকায়। বেগম মুজিবের নির্দেশে খোকা ছোটেন সোহানবাগে। বঙ্গবন্ধুর ছোট বোন খোদেজা হোসেন লিলি সদরঘাট থেকে লঞ্চে চলে গিয়েছিলেন বাড়িতে, তারা ফিরে এসে সোবহানবাগ সরকারি কোয়ার্টারে উঠেছেন। খোকা গিয়ে সদরঘাট থেকে তাদের নিয়ে এসে লিলিদের বাসায় ওঠান। কিছুদিন পর ডা. নুরুল ইসলামের সহায়তায় পিজি হাসপাতালে ভর্তি হন তারা।

শেখ হাসিনার প্রসবের সময় হয়ে এলে তাকে ভর্তি করা হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। তার সঙ্গে একজন আয়া থাকতে পারে জেনে স্বেচ্ছায় তার ছোট ফুপু খোদেজা হোসেন লিলি (এটিএম সৈয়দ হোসেনের স্ত্রী) আয়া হিসেবে হাসিনার সঙ্গে থাকেন। ২৭ জুলাই রাত ৮টায় জন্ম নেয় সজীব ওয়াজেদ জয়। বেগম মুজিবের চোখের অসুবিধার জন্য শান্তিনগরে ডা. মতিনকে দেখানো হয়। ফেরার পথে বেগম মুজিব পিজি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শ্বশুর-শাশুড়িকে দেখে আসেন। এই চলাচলের সময় সার্বক্ষণিক সেনাবাহিনীর লোকজন সঙ্গে থাকত। আগস্ট মাসের প্রথম দিকে ঘটল বিস্ময়কর ঘটনা। এক সকালে উঠে জানা গেল জামাল বাসায় নেই। মানে সে উধাও হয়েছে। 

১৮ নম্বর বাড়ির সামনে ছিল একটি পান-সিগারেটের দোকান, জামাল মাঝে মাঝে সেখানে যেত। দোকানদার রহমান একসময় তাদের বাসার কাজের লোক ছিল। তার কাছ থেকে জানা যায় জামাল ভারতে গেছে। 

আসন্ন বিপদের সম্ভাবনায় সম্পর্কীয় মামু মইনুল ইসলাম (অবসরপ্রাপ্ত সচিব)-এর পরামর্শে দরখাস্ত দিয়ে বেগম মুজিব রাও ফরমান আলীর সাক্ষাৎকার প্রার্থনা করেন। অনুমতি পাওয়া গেলে বেগম মুজিবকে নিয়ে খোকা বেরোবেন। এই সময় ড. ওয়াজেদ এসে জেদ ধরলেন খোকা নয় সঙ্গে যাবেন তিনি। বাধ্য হয়ে বেগম মুজিবের সঙ্গে যান ড. ওয়াজেদ। ফিরে এসে কী কথা হয়েছে তা না বলে অবিলম্বে খোকাকে পালিয়ে যেতে বললেন ড. ওয়াজেদ। তাকে নাকি শিগগিরই ক্যান্টেনমেন্টে ডাকা হবে। 

বেগম মুজিব খোকাকে ছাড়লেন না। দুই দিন পরে যে মেজর সাহেব এই পরিবারের দায়িত্বে ছিলেন তিনি এসে খোকাকে নিয়ে রওনা হলেন ক্যান্টনমেন্টের উদ্দেশে। প্রথমে মেজর সাহেব তার অফিস এবং পরে বাসায় নিয়ে যান। বাসা মানে একটা স্টেশন ওয়াগান। মেজর সাহেব কফি খাওয়ালেন। কিন্তু কোনো কথা বলছেন না। এর মধ্যে খোকার সঙ্গে মেজর সাহেবের অনেক কথা হয়েছে, অন্তরঙ্গতা হয়েছে। আজ যখন কোনো কথা বলছেন না তখন তার অর্থ তাকে নিয়ে আসা হয়েছে ইন্টারোগেশন সেলে অত্যাচারের জন্য এবং শেষে দেওয়া হবে মৃত্যুর আদেশ। নিশ্চুপ অনেকটা সময় পার হওয়ার পর একটা ফোন আসে। ফোন রেখে মেজর সাহেব চিৎকার করে ওঠেন, ‘খোকা সাব, তোম বাচ গ্যায়ে-বাচ গায়ে।’ খোকাকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে বলেন, ‘জানো অর্ডার হয়েছিল তোমাকে বধ্যভূমিতে পাঠাতে হবে। তাই এতক্ষণ আমি নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করছিলাম কী করে এ কাজ করি। এতদিন তোমাকে দেখছি, তোমার স্ত্রীকে দেখছি, তোমার ছেলেকে দেখছি- খোদা আমাকে বাঁচিয়েছেন আর তোমাকে দিয়েছেন প্রাণভিক্ষা।’

> বামে ১৮ নম্বরের সেই বাড়ি যেখান থেকে বেগম মুজিব ও অন্যদের মেজর তারা উদ্ধর করেন
> ডানে বেগম ও শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে মেজর তারা, পেছনে ডান খেকে জামাল, কামাল ও মমিনুল হক খোকা

বামে ১৮ নম্বরের সেই বাড়ি যেখান থেকে বেগম মুজিব ও অন্যদের মেজর তারা উদ্ধার করেন ১৬ ডিসেম্বর বিকালে পাকিস্তান সেনাবাহিনী রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তান বাহিনীর সমর নায়ক লে. জেনারেল এ কে নিয়াজি ভারত-বাংলাদেশ যৌথবাহিনীর কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করে। 

এর এক দিন পর ভারতীয় বাহিনী কুমিল্লার গঙ্গাসাগরের যুদ্ধে অসম সাহসের পরিচয় দিয়ে ‘বীরচক্র’ খেতাবপ্রাপ্ত মেজর অশোক কুমার তারা সিং একাকী এবং খালি হাতে গিয়ে ধানমন্ডি ১৮ নম্বরের রোডের বাড়ি (নম্বর ২৬, বর্তমান রোড নং-৯এ) থেকে ডজনখানেক সশস্ত্র পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর জিম্মায় থাকা বেগম মুজিব এবং তার সঙ্গে থাকা পরিবারের সদস্যদের উদ্ধার করেন। তার ফিরে আসেন ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে। শেখ কামাল ও শেখ জামাল মুক্তিযুদ্ধ থেকে সেনাবাহিনীর পোশাকে ফিরে আসেন ৩২ নম্বরে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ফিরে আসেন ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ তারিখে। পরিপূর্ণ হয় ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়ি।

ঋণ স্বীকার: মমিনুল হক খোকার  ‘অস্তরাগে স্মৃতি সমুজ্জ্বল বঙ্গবন্ধু, তাঁর পরিবার ও আমি’ এবং নেট থেকে প্রাপ্ত তথ্য।

লেখক: শিক্ষাবিদ ও প্রাবন্ধিক