ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতাচ্যুত ও শেখ হাসিনার দেশত্যাগের মাস পার হলেও সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম পুরোপুরি শুরু করা যায়নি। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যসহ শীর্ষ কর্মকর্তাদের পদত্যাগ এবং নতুন করে নিয়োগ না দেওয়ায় ইতোমধ্যে সেশনজটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন দাবি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনসহ (ইউজিসি) শিক্ষা-সংশ্লিষ্টসহ প্রশাসনেও এক ধরনের স্থবিরতা বিরাজ করছে। স্কুল-কলেজে শিক্ষকদের পদত্যাগ চেয়ে হেনস্তার ঘটনাও ঘটেছে। আন্দোলনের মুখে বাতিল করা হয়েছে এইসএসসির স্থগিত পরীক্ষা। পাঠ্যপুস্তক পরিবর্তনের ঘোষণা এবং মূল্যায়ন স্থগিত করায় নতুন শিক্ষাক্রমের ছন্দপতন হয়েছে।
নিরাপত্তা শঙ্কা কেটেছে স্কুল-কলেজে
৫ আগস্ট সরকার পতন হলে এদিন আইএসপিআর ৬ আগস্ট (মঙ্গলবার) থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ দেশের অফিস-আদালত খোলার কথা জানায়। তবে বিভিন্ন থানা পুড়িয়ে দেওয়া এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দৃশ্যমান কার্যক্রম না থাকায় সবখানে পরিস্থিতি ছিল থমথমে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রথম দিকে শিক্ষকদের উপস্থিতি থাকলেও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি মোটেও ছিল না। তবে ১৮ আগস্ট থেকে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়। ধীরে ধীরে নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা কেটে যায়। অভিভাবকরাও শিক্ষার্থীদের স্কুল-কলেজে নিয়ে আসে। কোথাও কোথাও আন্দোলনে নিহত শিক্ষার্থীদের স্মরণ করা হয়েছে। হাবিবুর রহমান নামে একজন অভিভাবক জানান, তার সন্তান প্রথম দিকে স্কুলে শুধু আসা-যাওয়া করেছে। ছুটির মেজাজ ছিল। সব ক্লাস হয়নি। ছুটিটাও বেশি দিন ছিল নানা কারণে। বাড়তি অস্থিরতা ছিল। যা শিক্ষার্থীদের ওপর প্রভাব পড়েছে। তবে এটা অনেকটা কমে গেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে সেশনজটের শঙ্কা
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকেই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরা পদত্যাগ করা শুরু করেন। প্রথমে পদত্যাগ করেন মাওলানা ভাসানি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (মাভাবিপ্রবি) উপাচার্য। খবরের কাগজের হিসাবে দেখা গেছে, ৫৫ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ৩৬টির উপাচার্য পদত্যাগ করেন। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক উপ-উপাচার্য, কোষাধ্যক্ষরাও পদ ছাড়েন। কোথাও কোথাও অনেককে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া বাকি সব বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগ দিতে পারেনি অন্তর্বর্তী সরকার। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে বেতন-ভাতা চালু রাখতে একজন জ্যেষ্ঠ অধ্যাপককে প্রশাসনিক দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। উপাচার্য না থাকায় অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে বন্ধ রয়েছে একাডেমিক কার্যক্রম। আন্দোলনের কারণে আগে থেকেই ক্লাস-পরীক্ষা না হওয়ায় সেশনজটের শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
আন্দোলনের মুখে বাতিল এইচএসসির পরীক্ষা
কোটা সংস্কার আন্দোলনের কারণে এইচএসসির পরীক্ষা কয়েক দফায় স্থগিত করা হয়। সেই পরীক্ষাগুলো ১১ আগস্ট থেকে নেওয়ার জন্য রুটিন প্রকাশ করা হয়। কিন্তু সরকার পতনের পর দেশের বিভিন্ন থানায় রক্ষিত পরীক্ষার সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর আসে। ফলে নির্ধারিত সময়ে পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব হবে নয় জানিয়ে ৭ আগস্ট বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয় এবং ১৫ আগস্ট শিক্ষা বোর্ড নতুন রুটিন প্রকাশ করে। যেখানে ১১ সেপ্টেম্বর থেকে পরীক্ষা নেওয়ার কথা বলা হয়। কিন্তু পরীক্ষার্থীরা অটোপাসের দাবিতে কর্মসূচি পালন শুরু করে। এ দাবি নিয়ে একদল পরীক্ষার্থী মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড ঘেরাও করে। পরে বোর্ড শিক্ষা মন্ত্রণায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এরই মধ্যে শিক্ষার্থীদের দাবি নিয়ে ২০ আগস্ট সচিবালয়ে সভা করেন শিক্ষা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। সেখানে পরীক্ষা অর্ধেক নম্বরে এবং পূর্ব ঘোষিত ১১ সেপ্টেম্বর থেকে পিছিয়ে আরও দুই সপ্তাহ পরে নেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। কিন্তু আন্দোলনকারীরা সচিবালয়ে উপদেষ্টার কক্ষের সামনে অবস্থান নেয়। পরে তাদের দাবির মুখে সেখানে পরীক্ষা বাতিলের ঘোষণা দেওয়া হয়। বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা হয় বিভিন্ন মহল ও শিক্ষার্থীদের একটি অংশের পক্ষ থেকে।
ইউজিসি, মাউশিতে অস্থিরতা
সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মতো বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনে (ইউজিসি) অস্থিরতা তৈরি হয়। পরিবর্তন আনা হয় সচিব পদে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শাখার উপ-পরিচালক ড. মহিবুল আহসান ইউজিসির চেয়ারম্যান (রুটিন দায়িত্ব) অধ্যাপক আলমগীরকে ১৯ জন কর্মকর্তার বদলি, পদায়নে স্বাক্ষর করার জন্য জোর করেন। বিগত সময়ে বঞ্চিত ছিলেন দাবি করে, সর্বশেষ ইউজিসির চেয়ারম্যান ও সদস্যদের অফিস করতে না দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে কর্মকর্তাদের একটা গ্রুপের বিরুদ্ধে। মহাপরিচালক ও পরিচালকদের দাবিতে অস্থির ছিল মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরও।
স্কুল-কলেজে পদত্যাগে বাধ্যকরণ, হেনস্তা
রাজধানীতে ঢাকা কলেজ, কবি নজরুল কলেজ, সোহরাওয়ার্দী কলেজ ও তিতুমীর কলেজের অধ্যক্ষরা এবং ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, সিদ্বেশরী গার্লস স্কুলের প্রধান শিক্ষকরা আন্দোলনের মুখে পদত্যাগ করেন। কোথাও কোথাও জোর করে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে শিক্ষকদের হেনস্তা করার অভিযোগ ওঠে। তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে নিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের কথা জানিয়ে হেনস্তা না করার নির্দেশনা দেওয়া হয়, যা তদারকি করবেন জেলা প্রশাসক।
শিক্ষাক্রম নিয়ে তালগোল
দায়িত্ব নিয়ে নতুন শিক্ষাক্রমে পরিবর্তন করার কথা জানান শিক্ষা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। গত ২ সেপ্টেম্বর সরকার পরিপত্র জারি করে। সেখানে মাধ্যমিকে বিভাগ বিভাজন, চলমান মূল্যায়ন স্থগিত করে ডিসেম্বরে বার্ষিক পরীক্ষা এবং ২০২৫ সালে পাঠ্যপুস্তকে সংশোধন আনার কথা বলা হয়। নতুন শিক্ষাক্রমে অভ্যস্ত হওয়া শিক্ষার্থীরা এতে অস্বস্তি প্রকাশ করছেন।
ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি বন্ধের পক্ষে জনমত
দীর্ঘ সময় পর ছাত্রলীগের বাধ্যতামূলক রাজনৈতিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ ও গেস্টরুমে নির্যাতন থেকে মুক্তির পর শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি বন্ধ রাখার পক্ষে জনমত গড়ে তুলেছে। তারা ছাত্র সংসদকে কার্যকর দেখতে চাইছেন। ইতোমধ্যে একাধিক ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কমিটির সভাপতি পদে পরিবর্তন
সরকার গত ২০ আগস্ট বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডি/ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি পদে জেলা পর্যায়ে জেলা প্রশাসক/জেলা প্রশাসকের মনোনীত প্রতিনিধি, উপজেলা পর্যায়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে; এবং মহানগর এলাকায় বিভাগীয় কমিশনার/বিভাগীয় কমিশনারের মনোনীত প্রতিনিধিকে সভাপতির দায়িত্ব প্রদান করে।