বাংলাদেশের অর্থনীতিকে স্থিতিশীল ও সুসংহত করতে হলে প্রয়োজন সুষ্ঠুনীতি প্রণয়ন, কৌশল নির্ধারণ এবং বাস্তবায়ন। বর্তমানে আমাদের বেশকিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে, যেগুলো আমাদের মোকাবিলা করতে হবে এবং চ্যালেঞ্জগুলো সম্পর্কে এখনই পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। আমাদের প্রধান তিন মূল সমস্যা; সেগুলো হলো মূল্যস্ফীতি, অপর্যাপ্ত রিজার্ভ এবং জ্বালানি সমস্যা। এর পেছনে সঠিক দর্শনের অভাব এবং নীতির সীমাবদ্ধতা আমরা বহুদিন থেকেই লক্ষ্য করেছি। সেই সঙ্গে কৌশলগুলোর দুর্বলতা এবং সবশেষে, বাস্তবায়নের ব্যর্থতা দিন দিন বিদ্যমান সমস্যাগুলোকে প্রকট করে তুলছে।
মুদ্রানীতি এবং রাজস্বনীতির ব্যাপারে বলা যায়, মুদ্রানীতির সঙ্গে রাজস্বনীতির সমন্বয় নেই। কারণ মুদ্রানীতি সংকোচনমূলক। রাজস্ব সম্প্রসারণশীল। প্রথমত, সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি বিদ্যমান আছে। অর্থাৎ যেটা আমরা বলছি, চাহিদাটাকে কমানো। চাহিদা যদি কমানো হয়, মূল্যস্ফীতি কমবে। পলিসি রেটগুলো পরিবর্তন হয়েছে। পলিসি রেটগুলো পরিবর্তন করলে বিশেষ করে প্রাইভেট সেক্টরে অর্থের সরবরাহ কমবে। সুদের হার বৃদ্ধি হয়েছে। আমাদের সঞ্চয় বা ব্যাংকের জামানতকৃত টাকা কমে যাচ্ছে। অন্যদিকে চাহিদা বাড়ছে। ফলে সুদের হার বাড়ছে। সুদের হার আগে নয়ছয় ছিল, সেটা মোটেও যুক্তিসংগত ছিল না। সেটাও বেড়েছে। এর জন্য মুদ্রানীতিতে যেটা দরকার, সেটা করতে হবে। বর্তমানে খেলাপি ঋণ একটা ব্যবসায়িক মডেল হয়ে গেছে। এই মডেল একটা ভালো মডেলের বিকৃত রূপ। মডেল হবে ঋণ নেবে, ঋণ ফেরত দেবে। লোকজনের কর্মসংস্থান করবে। ঋণটা সুষ্ঠুভাবে আদায় করবে। ঋণ শুধু ব্যাংকের ওপর নির্ভরশীল হবে না, পুঁজিবাজারের ওপরও হবে। বিগত সময়ে এগুলো কিছুই হয়নি। যারা ঋণখেলাপি, তারা ব্যাংক থেকে শুধু ঋণ নিয়েছে কিন্তু শোধ দিচ্ছে না। দিন দিন ওদের ব্যবসার প্রসার হয়তো ঘটছে অথবা ব্যবসার প্রসার ঘটুক না ঘটুক, দিন দিন বিপুল পরিমাণে আয় ও সম্পদ বেড়েছে। এটা বাংলাদেশে অত্যন্ত আশ্চর্যজনক। বেশকিছু নীতি সংস্কার করে এগুলো দূর করতে হবে।
বাংলাদেশে ব্যাংকিং খাতকে আমূল সংস্কার করতে হবে। খেলাপি ঋণের কারণ কী? ব্যাংকের সুশাসন কেন হয়নি? এ ব্যাপারে যথেষ্ট পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন আছে। জ্বালানি নীতির ব্যাপারে বলতে গেলে বলব, সমস্যাগুলোকে অনেকটা আড়াল করে দেওয়া হয়। এভাবে সমস্যাগুলোকে আড়াল করার উদ্দেশ্য হলো বর্তমান ও ভবিষ্যতে সেগুলোর দায়ভার এড়ানো। সে ক্ষেত্রে আমি বলব, আমাদের মনোভাব/মনন ও চিন্তার যে বৈশিষ্ট্য- এটা যথেষ্ট পরিবর্তন করতে হবে।
গভীর উদ্বেগের বিষয় হলো, দেশ থেকে প্রচুর পরিমাণে মুদ্রা পাচার হয়ে গেছে। টাকাটা কনভার্ট করে ব্ল্যাক মার্কেট থেকে অথবা কার্ব মার্কেট থেকে ডলার কিনে দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। যারা নানারকমভাবে অর্থ পাচার করেছে, হুন্ডি করেছে, তাদের ধরতে হবে। সে ক্ষেত্রে কোনোরকম ছাড় দেওয়া যাবে না। বিষয়টা শুধু মুদ্রানীতির ব্যাপার নয়, আর্থিক খাতে দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা দূর করতে সরকারকে এ ব্যাপারে অতিসত্বর পদক্ষেপ নিতে হবে। গত কয়েক বছরের মধ্যে আমরা যেটা অবলোকন করেছি সেটা কিন্তু আমাদের জন্য খুব সন্তুষ্টির কারণ হয়ে দাঁড়ায়নি। দ্রুত বিচার-বিবেচনা করে নীতিগুলো ও তার কৌশলগুলো নির্ধারণ করা জরুরি। একই সঙ্গে প্রথমত, কৌশলগুলো হতে হবে স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি এবং কৌশলগুলো ও নীতিগুলোর বাস্তবায়ন। বাস্তবায়নের জন্য যার প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি, সেটা হলো সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহায়তা করতে হবে। দ্বিতীয়ত, যারা এই সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে আছে সেই জনবল; তৃতীয়ত, তাদের সক্ষমতা; চতুর্থত, তাদের নিষ্ঠা এবং পঞ্চমত, তাদের সততা- এগুলো থাকলেই আমাদের অর্থনৈতিক সমস্যাগুলো সমাধান করা যাবে।
এখানে একটা বিষয় উল্লেখ্য, ঋণের বোঝা সাধারণ মানুষের ওপর পড়ে। আমাদের মনে রাখতে হবে যে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর যেন আমরা ঋণের বোঝা ক্রমাগত চাপিয়ে না দিই। আরেকটা বিষয় হলো- আমাদের ফরেন রিজার্ভ, সেটা বাড়াতে হবে। এক্সপোর্ট বাড়ানো দরকার। রেমিট্যান্স বাড়ানো দরকার। ফরেন ডাইরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট তথা প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। এগুলো বাড়াতে হলে আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোগুলো শক্ত করতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো বলতে বাংলাদেশ ব্যাংক, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন, বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ডেভেলপমেন্ট অথরিটির কথা বলছি। দেশের আইনকানুনগুলো সহজতর করতে হবে। আইনকানুন থাকবে, কিন্তু কোনোক্রমেই যেন সেটা বিদেশিদের জন্য বাধাস্বরূপ না হয়ে যায়। আইনশৃঙ্খলার ব্যাপার আছে। এর পর আছে দুর্নীতির ব্যাপকতা। এগুলো সমাধান না করলে কিন্তু এফডিআই আসবে না। অতএব, এই জিনিসগুলো আমাদের বিশেষভাবে লক্ষ্য করতে হবে।
আমরা বেশি নির্ভরশীল রেডিমেড গার্মেন্টসের ওপর। মানে অন্য রপ্তানি বহুমুখীকরণ হয়নি। এটা আমি আলাদা করে বলতে চাই। কারণ রপ্তানি করার অনেক জিনিস আছে এখনো। আমাদের চামড়া আছে, পাট ও পাটজাত দ্রব্য আছে, সিরামিক আছে, ইলেকট্রনিক দ্রব্যাদি এবং হিমায়িত খাদ্য আছে। এর থেকে আরও বেশকিছু দ্রব্য আমরা রপ্তানি করে থাকি। কিন্তু সেগুলোর দিকে উৎসাহ-প্রণোদনা, সরকারের সংস্থা বা সরকারের প্রণোদনা, এমনকি বাংলাদেশ ব্যাংকের যে ফান্ড আছে, এগুলোর সুযোগসুবিধা কিন্তু অত্যন্ত কম। অতএব, আমাদের রপ্তানিটাকে বহুমুখী করতে হবে, পণ্যের বহুমুখীকরণ এবং গন্তব্য বাড়াতে হবে। শুধু ইউরোপের বাজারে পাঠাব, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া পাঠাব, সেটা নয়। পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও পাঠাতে হবে, সেখানেও হয়তো আমাদের পণ্যের চাহিদা আছে। সে জন্য আমাদের পণ্যের প্রচার এবং পণ্যের গুণগতমান বাড়াতে হবে।
মূল্যস্ফীতির সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো- শুধু চাহিদা কমানোর চেষ্টা না করে বরং সরবরাহ বৃদ্ধির দিকে নজর দেওয়া উচিত। এমন ঋণব্যবস্থা প্রয়োজন, যা ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পগুলোকে সহায়তা করে এবং পণ্য উৎপাদন বৃদ্ধি করে। সেবা, পরিবহন, অবকাঠামো খাতের দিকে মনোযোগ দিলে এগুলো ভবিষ্যতে কাজে লাগতে পারে কিন্তু অবিলম্বে আমাদের পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহ খাতের দিকে নজর দেওয়া উচিত।
দেশের আপামর জনসাধারণের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন এবং একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার জন্য অর্থনীতির সব খাতের নীতির সমন্বয়, কার্যকর কৌশল প্রণয়ন, সর্বোপরি বাস্তবায়নের দিকে অতিসত্বর দৃষ্টি দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারি, বেসরকারি এবং স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সম্মিলিত প্রয়াস নিশ্চিত করা জরুরি। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে এসে পৌঁছেছে। উন্নয়নশীল দেশ এবং মধ্যম আয়ের দেশ থেকে উচ্চমধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে আমাদের বর্তমান চ্যালেঞ্জগুলোকে মোকাবিলা করার সঙ্গে সঙ্গে সামনের দিকে অগ্রসরমান হওয়ার রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে। এই প্রেক্ষিতে বাংলাদেশকে বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও প্রসার ও গভীর করতে হবে।
লেখক: অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা; অর্থ, বাণিজ্য এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়
[email protected]