সাংবাদিকতার ৩৭ বছর চলছে। রাজনৈতিক চাপে চাকরি হারানো, সংবাদ লেখার কারণে ধাওয়া খেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচতলা থেকে পাইপ বেয়ে নিচে নেমে জীবন বাঁচানোসহ আরও অনেক ঘটনা ঘটেছে। তবে বস্তুনিষ্ঠ একটি রিপোর্ট লেখার কারণে এক মাস আত্মগোপনে থাকার স্মরণীয় ঘটনাটি ঘটেছে খবরের কাগজে কাজ করার সময়ে। শেখ হাসিনার কঠিন শাসনামলের প্রায় শেষ ভাগ তখন। ২০২৩ সালের ৫ নভেম্বর। ওইদিনের লিড রিপোর্টের কারণে আমাকে এক মাসেরও বেশি সময় আত্মগোপনে থাকতে হয়েছিল। প্রচণ্ড ভয়ও পেয়েছিলাম।
‘বিএনপির এক কোটির বেশি নেতা-কর্মী ঘরছাড়া’ শিরোনামে প্রকাশিত রিপোর্টের কারণে ওইদিনের পর আমি বেশ কিছুদিন অফিস করতে পারিনি। সরকারের ক্ষমতাশালী দুটি গোয়েন্দা সংস্থা সরাসরি আমাকে চাকরিচ্যুত করার জন্য সম্পাদককে প্রচণ্ড চাপ দিয়েছিল। শুধু তাই নয়; প্রিন্ট ভার্সনে ওই রিপোর্ট ছাপা হয়ে গেলেও সকালে অনলাইনে আপলোড করার পর মাত্র ২০ মিনিট সেটি রাখা গিয়েছিল। এরপর ওই দুটি গোয়েন্দা সংস্থাসহ সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের চাপে অনলাইন থেকে রিপোর্টটি ডিলিট করা হয়। বিকেলে সম্পাদক মোস্তফা কামাল ভাই অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে আমাকে বলেন, এনাম ভাই, কিছুদিন একটু বাইরে থাকেন। বেশ ঝামেলা হয়ে গেছে। পরে দেখা যাক কী হয়। তবে অত্যন্ত ধৈর্যশীল কামাল ভাই সেদিন আমাকে প্রচণ্ড চাপের মুখেও চাকরিচ্যুত করেননি। এজন্য যেখানেই থাকি তার প্রতি চিরকৃতজ্ঞ থাকব। কারণ, এমন বেশ কয়েকজন সম্পাদককে চিনি যারা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে খুশি করতে বলার সঙ্গে সঙ্গেই অতি উৎসাহী হয়ে সেদিনই চিঠি ধরিয়ে দিতেন। এমন সম্পাদকও দেখেছি, ডিজিএফআইয়ের একজন মেজর ফোন করলে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াতেন। কিন্তু কামাল ভাই সেটি না করে বরং এক-দেড় মাসের মাথায় প্রভাবশালী ওই সংস্থার প্রধান দুই ব্যক্তিকে অফিসে আমন্ত্রণ করে আমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। পৃথকভাবে লাঞ্চে মিলিত হয়ে এই দুই কর্মকর্তা আলাপে-আলাপে স্বীকার করেন যে, আমাকে বিএনপির একজন দানব প্রকৃতির সাংবাদিক হিসেবে তাদের কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে; এবং সেটি করেছেন আওয়ামী লীগপন্থি কিছু সাংবাদিক। শুধু তাই নয়; ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তারা আমার নানা সমালোচনা করে বলেছিল, তারেক রহমান এবং সাবেক হাওয়া ভবনের লোকেরা টাকা দিয়ে আমাকে এ রিপোর্ট লিখিয়েছেন। আমি আত্মগোপনে থাকাকালে এ রিপোর্ট লেখার জন্য সম্পাদক এবং তৎকালীন প্রধান বার্তা সম্পাদক খালেদ ফারুকীকে (এখন ব্যবস্থাপনা সম্পাদক) পরিস্থিতি শান্ত করার জন্য বেশ কয়েকবার গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর অফিসে যেতে হয়েছে। খবরের কাগজের প্রত্যেক কর্মকর্তা-কর্মচারী তখন আমার জন্য উদ্বিগ্ন ছিলেন। তখনকার কপি এডিটর (বর্তমানে কালের কণ্ঠ সম্পাদক) কবি হাসান হাফিজ প্রায় প্রতিদিনই কয়েকবার ফোন করে বলতেন, আমার জন্য তার অসম্ভব খারাপ লাগছে। কারণ সকাল-বিকেল মিটিং ছাড়াও আমাদের লাঞ্চ, চা-আড্ডা সবই একসঙ্গে হতো। হাফিজ ভাই বাসায় যেতেন আমার সঙ্গে।
বস্তুত, আমার ওই রিপোর্টের কারণে বিশ্বের মানবাধিকার সংগঠনগুলো হাসিনা সরকারের দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে উঠেছিল। পিনাকী ভট্টাচার্যসহ অনেক মানবাধিকার কর্মী এবং ইউটিউবার এ নিয়ে সরব হন। কারণ ব্যাপক দমন-পীড়ন চলা সত্ত্বেও বাংলাদেশের গণমাধ্যমে তখন অলিখিত এক ধরনের সেন্সরশিপ চলছিল। ফলে ওই রকম একটি খবরে দেশে-বিদেশে তখন তোলপাড় সৃষ্টি হয়। সরকারও এ কারণে প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়।…
বস্তুত, আমার ওই রিপোর্টের কারণে বিশ্বের মানবাধিকার সংগঠনগুলো হাসিনা সরকারের দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে উঠেছিল। পিনাকী ভট্টাচার্যসহ অনেক মানবাধিকার কর্মী এবং ইউটিউবার এ নিয়ে সরব হন। কারণ ব্যাপক দমন-পীড়ন চলা সত্ত্বেও বাংলাদেশের গণমাধ্যমে তখন অলিখিত এক ধরনের সেন্সরশিপ চলছিল। ফলে ওই রকম একটি খবরে দেশে-বিদেশে তখন তোলপাড় সৃষ্টি হয়। সরকারও এ কারণে প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়।
এবারে প্রতিবেদনটি তৈরির গল্পে আসি। সেদিন ছিল ৪ নভেম্বর ২০২৩। বাংলা ১৪৩০ সালের ১৯ কার্তিক। অন্যান্য দিনের মতোই দুপুর ১২টায় সেদিনের খবরের কাগজের নিউজ পরিকল্পনা নিয়ে আমাদের মিটিং চলছিল। সম্পাদক মোস্তফা কামাল ছাড়াও তৎকালীন উপসম্পাদক হিসেবে আমি, প্রধান বার্তা সম্পাদক খালেদ ফারুকী, তৎকালীন কপি এডিটর কবি হাসান হাফিজ এবং তৎকালীন চিফ রিপোর্টার তৌফিক মারুফ (বর্তমানে নেদারল্যান্ড প্রবাসী) উপস্থিত ছিলেন।
ওই বছরের ২৮ অক্টোবর নয়াপল্টনে বিএনপির জনসভা পুলিশি হামলায় পণ্ড হয়ে যাওয়ার কারণে দেশের রাজনীতিতে চরম অস্থিরতা বিরাজ করছিল। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ দলটির হাজার হাজার নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করায় দেশে চলছিল টানটান উত্তেজনা। পুলিশি গ্রেপ্তার, ধরপাকড় ও হামলা তখন শুধু ঢাকা বা মহানগরীগুলোয় সীমাবদ্ধ ছিল না। গ্রামে-গঞ্জে এমনকি পাড়া-মহল্লায় পর্যন্ত পুলিশ যাকেই কাছে পেয়েছে তাকেই গ্রেপ্তার করেছে। ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তখন খবর বের হচ্ছিল যে, বিএনপি ও শরিক দলগুলোর নেতা-কর্মীরা বন-জঙ্গলে, এমনকি ধান খেতে পর্যন্ত লুকিয়ে থাকছেন। ধান খেতে মশারি টানিয়ে ঘুমানোর ছবিও তখন দু-একটি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়েছে। ওই সময় বিএনপিতে আমার ঘনিষ্ঠ নেতারাও আত্মগোপনে ছিলেন বলে কোনো খবর পাচ্ছিলাম না। তবে আমার বন্ধু লক্ষ্মীপুর আসনের সাবেক এমপি আশরাফ উদ্দিন নিজানের সঙ্গে সিগন্যাল ও হোয়াটসঅ্যাপে গোপনে যোগাযোগ হতো। কথায় কথায় তিনি আমাকে জানালেন, বিএনপির সব নেতা-কর্মী ঘরছাড়া। কোথাও কেউ বাসায় দূরে থাক, পালিয়েও পুলিশের হাত থেকে রক্ষা পাচ্ছেন না। দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান আমাকে জানালেন, নেতা-কর্মীরা শুধু বাড়িতে নন, আত্মীয়-স্বজন এমনকি বন্ধুবান্ধবের বাড়িতেও থাকতে পারছেন না। কোনো বাড়িতে ভাড়া বা আশ্রয় নিলে সেই বাড়ির মালিককে, এমনকি কাজের মানুষকে পর্যন্ত পুলিশ গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করলেন। বললেন, কাউকে বাসায় না পেলে তার ভাইবোনকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। হোটেল ও খাবার দোকান পর্যন্ত পুলিশ তল্লাশি করছে।
এমন পরিস্থিতির মধ্যেই সেদিন কী রিপোর্ট হতে পারে তা নিয়েই আলোচনা হয়। বলা বাহুল্য, রাজনৈতিক রিপোর্ট ও অ্যানালাইসিস নিয়ে আমার লেখালেখির অভিজ্ঞতা ৩৬ বছরের বেশি। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এ বিষয়ে আমার মতামতই খবরের কাগজে তখনো গুরুত্ব পেয়েছে, এখনো পায়। এ বিষয়ে সম্পাদক মোস্তফা কামালের উদারতার প্রশংসা করতেই হয়।
আলোচনা উঠল, কী রিপোর্ট করা যায়। বিএনপির সর্বস্তরের নেতা-কর্মীর আত্মগোপনে থাকার বিষয়টি তখন ব্যাপকভাবে আলোচিত থাকায় আমি মতামত দিলাম, বিএনপির বেশির ভাগ নেতা-কর্মী ঘরছাড়া- এমন রিপোর্ট করা যায়। এ ধরনের রিপোর্ট খুবই সময়োপযোগী হবে বলে সম্পাদক কামাল ভাইসহ উপস্থিত সবাই সম্মতি দিলেন। সবাই এও বললেন, রিপোর্টটি পাঠকমহলে বেশ আলোচিত হবে।
উল্লেখ করতে পারি যে, ওই রিপোর্ট করার পেছনে আমাদের পাঁচজনের কারোরই কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল না। রাজনৈতিকভাবেও আমরা সবাই একই মতাদর্শের নই। শুধু পাঠকের কথা এবং কাগজকে আলোচনায় রাখার জন্য পেশাগত দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ওই রিপোর্ট করার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। পরিস্থিতিও তখন এ ধরনের রিপোর্টই ডিমান্ড করছিল। কিন্তু এ রিপোর্টের জন্য যে তুলকালাম হবে এবং আমাকে এক মাস আত্মগোপনে থাকতে হবে, সেটি শুধু আমি নই, কেউই বুঝতে পারিনি। বুঝতে পারলে শেখ হাসিনার শাসনামলে এত বড় ঝুঁকি নিতাম কি না সন্দেহ।
যাই হোক, সিদ্ধান্তের পরে আমি তখন দলটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রিজভী আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করি। তিনিও হঠাৎ হঠাৎ বিএনপি কার্যালয়ে কয়েক মিনিটের ব্রিফ করে আবার আত্মগোপনে যেতেন। পুলিশ বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যলয়সহ সারা দেশের কার্যালয় ঘিরে রেখেছিল। তাই মাঝে-মধ্যে সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে রিজভী ভাই দলের অবস্থান জানাতেন।
এমন পরিস্থিতির মধ্যে বহু চেষ্টা করে রিজভী ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানার চেষ্টা করি বিএনপির মোট নেতা-কর্মীর সংখ্যা কত। আশরাফ উদ্দিন নিজানের সঙ্গেও এ বিষয়ে আলাপ করি। তারা দুজনেই জানান, সংখ্যা ২ কোটির বেশি হবে।
আমি তখন সহকর্মী শফিকুল ইসলামকে নিয়ে সারা দেশে দলটির জেলা, পৌরসভা, উপজেলা ও ওয়ার্ড কমিটির একটি হিসাব কষতে বসি। দলটির হিসাব মতে, বিএনপি ও এর ১১টি অঙ্গসংগঠনের ১৫১ সদস্যবিশিষ্ট কাঠামো হিসাব করলে এর নেতা-কর্মীর সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় পৌনে ৩ কোটি। তবে ন্যূনতম ৫১ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি ধরে হিসাব করলে এর সংখ্যা হলো পৌনে ২ কোটি। এর বাইরে সারা দেশে ৪ হাজারের বেশি ইউনিয়নের সবগুলো অঙ্গসংগঠনের কমিটিতেও কয়েক লাখ নেতা-কর্মী রয়েছেন। তবে ঝামেলা এড়ানোর জন্য এই সংখ্যার প্রকৃত হিসাব বাদ দিয়ে আমি শুধু ১ কোটি নেতা-কর্মীর কথা উল্লেখ করি। কিন্তু তাতেই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। আমাকে এক মাসের জন্য অফিসের বাইরে থাকতে হয়। পরে পরিস্থিতি শান্ত হলে কামাল ভাই আবার অফিসে ডেকে নেন। আলোচিত এ রিপোর্ট করতে পেরে সাংবাদিক হিসেবে আমি কিছুটা গর্বিত। আমাদের মতো দেশে সাংবাদিকদের জীবনে তো ঝুঁকি থাকবেই। তার পরও চেষ্টা থাকে সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ খবর লেখার।
লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, খবরের কাগজ