গত ২৮ অক্টোবরের মহাসমাবেশকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট ঘটনার পর গ্রেপ্তার-আতঙ্কে বিএনপির অধিকাংশ নেতা-কর্মী এখন ঘরছাড়া। দলটির হিসাবমতে, এই সংখ্যা এক কোটিরও বেশি। কারণ, সারা দেশে বিএনপির বিভাগ, জেলা, উপজেলা ও পৌরসভা- কোথাও এখন দলটির অফিস যেমন খোলা নেই; তেমনি কমিটিতে নাম রয়েছে, এমন কোনো নেতাও এখন ঘরে থাকতে পারছেন না। গ্রেপ্তারের ভয়ে প্রায় সবাই পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খানের মতে, দুই কোটিরও বেশি বিএনপি নেতা-কর্মী এখন ঘরছাড়া। তারা এখন পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘নেতা-কর্মীরা শুধু বাড়িতে নয়; আত্মীয়স্বজন এমনকি বন্ধুবান্ধবের বাড়িতেও থাকতে পারছেন না। কোনো বাড়িতে ভাড়া বা আশ্রয় নিলে সেই বাড়ির মালিককে এমনকি কাজের মানুষকে পর্যন্ত পুলিশ গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাচ্ছে। কাউকে বাসায় না পেলে তার ভাইবোনকে নিয়ে যাচ্ছে। হোটেল ও খাবার দোকান পর্যন্ত পুলিশ তল্লাশি করছে। তাহলে একটি স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে এখন আমরা কোথায় যাব?’
বিএনপির স্থায়ী কমিটির প্রবীণ এই নেতার মতে, ‘কেন্দ্রীয়ভাবে বা পুলিশের সব লেভেল থেকে এমন নির্দেশনা আছে কি না, জানি না। তবে অতি উৎসাহী বা গ্রেপ্তার-বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে এমন পরিস্থিতি তৈরি করা হতে পারে।’
বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ দাবি করেন, বিএনপির পালিয়ে থাকা নেতা-কর্মীর সংখ্যা এক কোটির অনেক বেশি হতে পারে। ঘরছাড়া এই নেতা-কর্মীরা কেউ বনজঙ্গলে, কেউ ধানখেতে আবার কেউবা বাঁশঝাড়ের মধ্যে সন্ত্রস্ত অবস্থায় রাত কাটাচ্ছেন। তার মতে, স্বাধীনতার পরে পুলিশি নির্যাতন-নিপীড়নের নজিরবিহীন এ রকম ঘটনা আর কখনো ঘটেনি।
বিএনপির কেন্দ্রীয় এবং গুলশান কার্যালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা ও কর্মকর্তারা বলছেন, সারা দেশে দলটির জেলা, পৌরসভা, উপজেলা ও ওয়ার্ড কমিটি মিলিয়ে নেতা-কর্মীর সংখ্যা ৩ কোটিরও বেশি। এই হিসাব তারা দিচ্ছেন বিএনপিসহ ১১টি অঙ্গসংগঠনের ১৫১ সদস্যবিশিষ্ট কাঠামোর কমিটি ধরে। তবে ন্যূনতম ৫১ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি ধরে হিসাব করলে বিএনপির নেতা-কর্মীর সংখ্যা পৌনে দুই কোটির কিছু বেশি দাঁড়ায়। দলটির নেতারা গতকাল শনিবার খবরের কাগজকে জানিয়েছেন, ১১টির মধ্যে সব অঙ্গসংগঠনের কমিটি দেশের সব ইউনিটে নেই। গুরুত্বপূর্ণ ৭টি ইউনিটের কমিটি সর্বত্র রয়েছে।
দেশের প্রশাসনিক ৬৪টি জেলাসহ মোট ৮২টি সাংগঠনিক জেলা রয়েছে। প্রতিটি সাংগঠনিক জেলায় ১১টি অঙ্গসংগঠনের কমিটি রয়েছে, যার প্রতিটিতে ১৫১ সদস্যের কমিটি থাকার কথা। কিন্তু এই সংখ্যা ন্যূনতম ৫১ সদস্য ধরলে শুধু বিএনপিরই নেতা-কর্মীর মোট সংখ্যা দাঁড়ায় ৪ হাজার ৮০। আর ১১টি অঙ্গসংগঠনের হিসাবে ওই সংখ্যা হলো ৪৪ হাজার ৮৮০।
অন্যদিকে ন্যূনতম হিসাবে সারা দেশের ৪৯৫টি উপজেলায় ৫১ সদস্যবিশিষ্ট কমিটির নেতা-কর্মীর সংখ্যা ২৫ হাজার ২৪৫ এবং গুরুত্বপূর্ণ ৭টি অঙ্গসংগঠনের কমিটিতে ১ লাখ ৭৬ হাজার ৭১৫ জন নেতা-কর্মী রয়েছেন।
এর বাইরে ৩৫০টি পৌরসভার ৯টি করে ওয়ার্ডে মোট ৩১৫০টিতে কমিটি রয়েছে বিএনপির। ন্যূনতম ৫১ সদস্যবিশিষ্ট ধরলে বিএনপির নেতা-কর্মী রয়েছেন মোট ১ লাখ ৬০ হাজার ৬৫০ জন। সব অঙ্গসংগঠনের এই হিসাবে দাঁড়ায় ১১ লাখ ২৪ হাজার ৫৫ জন। তবে বিএনপি জানিয়েছে, পৌরসভাগুলোর প্রতিটি ইউনিটের ১৫১ সদস্যবিশিষ্ট কমিটিই রয়েছে। সেই হিসাবে ওই কমিটিগুলোতে নেতা-কর্মীর সংখ্যা প্রায় ৮০ লাখ।
বিএনপির দেওয়া তথ্যমতে, সারা দেশে দলটির ৪০ হাজার ৪৮২টি ওয়ার্ড কমিটিতে ন্যূনতম হিসাবে নেতা-কর্মীর সংখ্যা ১ কোটি ৪৪ লাখ ৫২ হাজার ৭৪।
এর বাইরে সারা দেশে সাড়ে চার হাজারের বেশি ইউনিয়ন কমিটিতে ২ লাখ ৩৩ হাজারের বেশি নেতা-কর্মী রয়েছেন। ৭টি অঙ্গসংগঠন ধরলে এই সংখ্যা হবে মোট ১৬ লাখ ৩৪ হাজারের বেশি। এই হিসাব মূল বিএনপিসহ এর প্রধান বা গুরুত্বপূর্ণ ৭টি অঙ্গসংগঠনের ৫১ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি ধরে। এর বাইরে বিএনপির অঙ্গসংগঠন হিসেবে স্বীকৃতি রয়েছে জাতীয়তাবাদী ওলামা দল, মুক্তিযোদ্ধা দল, মৎস্যজীবী দল ও জাসাসের (জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন)। তবে এগুলোর সব জায়গায় কমিটি নেই বলে বিএনপির কেন্দ্রীয় সূত্রে জানা গেছে।
বিএনপির দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের ১১ আগস্ট পর্যন্ত সারা দেশে নেতা-কর্মীদের নামে মোট মামলা হয়েছে ১ লাখ ৪১ হাজার ৬৩৩টি। এসব মামলায় মোট আসামির সংখ্যা ৪৯ লাখ ২৬ হাজার ৪৯২ জন। এ সময়ের মধ্যে ৫৯৩ জন নেতা-কর্মী হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন।
অন্যদিকে গত ২৮ অক্টোবরের পর বিএনপির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে সারা দেশে মোট শতাধিক মামলা করা হয়েছে। দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং স্থায়ী কমিটির দুজনসহ মোট পাঁচ হাজার নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ২৮ অক্টোবরের পর যশোরে বিএনপির নেতা-কর্মীদের নামে নতুন ২২টি মামলায় মোট দেড় হাজার নেতা-কর্মীকে আসামি করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিএনপির খুলনা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। গতকাল খবরের কাগজকে তিনি জানান, পুলিশের ভয়ে যশোর এবং বৃহত্তর খুলনা বিভাগের বিএনপির কোনো ইউনিটের অফিস খোলা রাখা যাচ্ছে না। নেতা-কর্মীদের বাড়ি বাড়ি পুলিশ হানা দিচ্ছে। ঘরবাড়ি ছেড়ে সবাই এখন উদ্বাস্তু জীবনযাপন করছেন।
২৮ অক্টোবরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে শনিবারের পর থেকে চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন স্থান থেকে ১৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মহানগরীর কার্যালয় নাসিমন ভবন এখন নেতা-কর্মীশূন্য।
২৮ অক্টোবরের পর সিলেট জেলায় নতুন ১০টি মামলায় বিএনপির ৬ থেকে ৭ হাজার নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন জেলায় ২২ মামলায় ১১৫ জন এবং ঢাকা থেকে ২৫ জন, বাগেরহাটে ৫০ মামলায় ৩৮ জন, বরগুনায় নতুন ৩ মামলাসহ মোট ২৬ মামলায় ৪০ জন, চট্টগ্রাম জেলায় ২২ মামলায় ২৫০ জন, ফেনীতে ১৩ মামলায় ৮০ জন, জামালপুরে ৫০ মামলায় ৮৫ জন, যশোরে ২২ মামলায় ৪০০ জন, ঝালকাঠিতে ২৭ জন, খাগড়াছড়িতে ৯ মামলায় ৫৭ জন, খুলনায় ১৫ মামলায় ১৫০ জন, কিশোরগঞ্জে ১০ মামলায় ১৫০ জন, কুড়িগ্রামে ৫ মামলায় ৩৩ জন, মেহেরপুরে ৪ মামলায় ৮২ জন, নড়াইলে ৩ মামলায় ২০ জন, নেত্রকোনায় ৫ মামলায় ৫২ জন, লক্ষ্মীপুরে ৫ মামলায় ২০০ জন এবং টাঙ্গাইলে ১৫২ জন নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। চট্টগ্রাম বিভাগে ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ১০ হাজার ৬২৬টি মামলায় বিএনপির ১ লাখ ৫৫৯ জন নেতা-কর্মীকে আসামি করা হয়েছে।
সর্বশেষ গত ২৪ ঘণ্টায় বিএনপির ১৭৬ জন নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বিভিন্ন মামলায় আসামি করা হয়েছে ৫৭৫ জনকে।
বিএনপির সাংগঠনিক বিভাগে ১০ জন সাংগঠনিক সম্পাদক রয়েছেন। এর মধ্যে নাটোরে অ্যাডভোকেট রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু ও বরিশালে অ্যাডভোকেট বিলকিস জাহান শিরিনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সর্বশেষ গতকাল রাতে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ময়মনসিংহ বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক এমরান সালেহ প্রিন্সকে। বাকি সবাই গ্রেপ্তার এড়াতে আত্মগোপনে আছেন। রংপুরের আসাদুল হাবিব দুলু, ফরিদপুরের শামা ওবায়েদকে ফোন করেও পাওয়া যায়নি।
তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পুলিশ সদর দপ্তর বা উচ্চস্তর থেকে সারা দেশে বিএনপির নেতা-কর্মীদের হয়রানি করার বিষয়ে কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। কোথাও কোথাও পুলিশ নিজ উদ্যোগে বা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে তৃণমূল পর্যায়ে অতি উৎসাহ দেখাচ্ছে।
এ বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মিডিয়া) এনামুল হক সাগর জানান, শুধু মামলার এজাহারে থাকা আসামিদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।