ঢাকা ২২ আষাঢ় ১৪৩৩, সোমবার, ০৬ জুলাই ২০২৬

সর্বশেষ
টাঙ্গাইলে নারীকে পেটালেন ইউপি চেয়ারম্যান প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌদি রাষ্ট্রদূতের সাক্ষাৎ বরিশালে কথিত যুবদল নেতা গ্রেপ্তার যুক্তরাষ্ট্রে সুপার টাইফুনে নিহত ৫ কূটনৈতিক টানাপড়েনে আখাউড়া স্থলবন্দরে রপ্তানি আয়ে ভাটা স্পেনের বিপক্ষে ম্যাচের আগে বোমা ফাটালেন রোনালদো বরগুনায় সংরক্ষিত বন দখল ও গাছ কাটার অভিযোগে ৫ জন কারাগারে ভারতে কারাভোগ শেষে দেশে ফিরলেন ৫০ নারী-পুরুষ নান্দাইলে ধর্ষণের বিচার চড়থাপ্পড় ও জরিমানায় হালান্ডের জোড়া গোলে বিদায় ব্রাজিল, মধ্যরাতে উল্লাস মৌলভীবাজারে দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন কৌশলে যুক্তরাষ্ট্র পাবনায় পিস্তল-গুলিসহ গ্রেপ্তার ৭ স্বাধীনতা দিবসে ট্রাম্পের নির্বাচনি প্রচারমূলক ভাষণ ২৩ বছর ধরে আমাকে শেষ করে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে: রোনালদো কৃষিকে আধুনিকায়নে ঝিনাইদহে ৯০ কৃষকের হাতে উঠল স্প্রে মেশিন দেনমোহর আদায়ে নীতিমালা করতে হাইকোর্টে রিট জাতিসংঘের স্থায়ী প্রতিনিধি হচ্ছেন আইরিন খান ট্রাম্পের ফোনে বালোগানের নিষেধাজ্ঞা তুলে নিল ফিফা, বিশ্বকাপে তোলপাড় ৩ বছর পর বাংলাদেশ-জিম্বাবুয়ে মুখোমুখি ৬ বিভাগে ভারী বৃষ্টি, ৫ জেলায় বন্যার সতর্কতা ইস্টার্ন ব্যাংকের আলী রেজার দুর্নীতি: তথ্যের অপেক্ষায় অনুসন্ধান স্থবির আ.লীগের বিচার হবে কি না, তদন্ত চলছে ব্যবসায়ীদের ওপর হামলার প্রতিবাদ শিশু বলাৎকার ও যৌন হয়রানির অভিযোগে গ্রেপ্তার ২ শূলের মঞ্চে দুই রাকাত নামাজ লুঙ্গি পরা যুবকের ‘প্যান্টের পকেটে’ মিলেছে গাঁজা! কোয়ার্টার ফাইনালে কার মুখোমুখি হবে ইংল্যান্ড? কালো লেডিবার্ড বিটল ‘ট্রাম্পকে হত্যা করো’ স্লোগান, ইরানে ক্ষোভের আগুন এনসিটি পরিচালনার ভার পাচ্ছে ডিপি ওয়ার্ল্ড!

বিএনপির এক কোটির বেশি নেতাকর্মী ঘরছাড়া

প্রকাশ: ০৫ নভেম্বর ২০২৩, ১২:১০ পিএম
আপডেট: ২৬ অক্টোবর ২০২৫, ১১:০৮ এএম
বিএনপির এক কোটির বেশি নেতাকর্মী ঘরছাড়া
খবরের কাগজ গ্রাফিকস

গত ২৮ অক্টোবরের মহাসমাবেশকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট ঘটনার পর গ্রেপ্তার-আতঙ্কে বিএনপির অধিকাংশ নেতা-কর্মী এখন ঘরছাড়া। দলটির হিসাবমতে, এই সংখ্যা এক কোটিরও বেশি। কারণ, সারা দেশে বিএনপির বিভাগ, জেলা, উপজেলা ও পৌরসভা- কোথাও এখন দলটির অফিস যেমন খোলা নেই; তেমনি কমিটিতে নাম রয়েছে, এমন কোনো নেতাও এখন  ঘরে থাকতে পারছেন না। গ্রেপ্তারের ভয়ে প্রায় সবাই পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খানের মতে, দুই কোটিরও বেশি বিএনপি নেতা-কর্মী এখন ঘরছাড়া। তারা এখন পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘নেতা-কর্মীরা শুধু বাড়িতে নয়; আত্মীয়স্বজন এমনকি বন্ধুবান্ধবের বাড়িতেও থাকতে পারছেন না। কোনো বাড়িতে ভাড়া বা আশ্রয় নিলে সেই বাড়ির মালিককে এমনকি কাজের মানুষকে পর্যন্ত পুলিশ গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাচ্ছে। কাউকে বাসায় না পেলে তার ভাইবোনকে নিয়ে যাচ্ছে। হোটেল ও খাবার দোকান পর্যন্ত পুলিশ তল্লাশি করছে। তাহলে একটি স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে এখন আমরা কোথায় যাব?’ 

বিএনপির স্থায়ী কমিটির প্রবীণ এই নেতার মতে, ‘কেন্দ্রীয়ভাবে বা পুলিশের সব লেভেল থেকে এমন নির্দেশনা আছে কি না, জানি না। তবে অতি উৎসাহী বা গ্রেপ্তার-বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে এমন পরিস্থিতি তৈরি করা হতে পারে।’  

বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ দাবি করেন, বিএনপির  পালিয়ে থাকা নেতা-কর্মীর সংখ্যা এক কোটির অনেক বেশি হতে পারে। ঘরছাড়া এই নেতা-কর্মীরা কেউ বনজঙ্গলে, কেউ ধানখেতে আবার কেউবা বাঁশঝাড়ের মধ্যে সন্ত্রস্ত অবস্থায় রাত কাটাচ্ছেন। তার মতে, স্বাধীনতার পরে পুলিশি নির্যাতন-নিপীড়নের নজিরবিহীন এ রকম ঘটনা আর কখনো ঘটেনি।

বিএনপির কেন্দ্রীয় এবং গুলশান কার্যালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা ও কর্মকর্তারা বলছেন, সারা দেশে দলটির জেলা, পৌরসভা, উপজেলা ও ওয়ার্ড কমিটি মিলিয়ে নেতা-কর্মীর সংখ্যা ৩ কোটিরও বেশি। এই হিসাব তারা দিচ্ছেন বিএনপিসহ ১১টি অঙ্গসংগঠনের ১৫১ সদস্যবিশিষ্ট কাঠামোর কমিটি ধরে। তবে ন্যূনতম ৫১ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি ধরে হিসাব করলে বিএনপির নেতা-কর্মীর সংখ্যা পৌনে দুই কোটির কিছু বেশি দাঁড়ায়। দলটির নেতারা গতকাল শনিবার খবরের কাগজকে জানিয়েছেন, ১১টির মধ্যে সব অঙ্গসংগঠনের কমিটি দেশের সব ইউনিটে নেই। গুরুত্বপূর্ণ ৭টি ইউনিটের কমিটি সর্বত্র রয়েছে।    

দেশের প্রশাসনিক ৬৪টি জেলাসহ মোট ৮২টি সাংগঠনিক জেলা রয়েছে। প্রতিটি সাংগঠনিক জেলায় ১১টি অঙ্গসংগঠনের কমিটি রয়েছে, যার প্রতিটিতে ১৫১ সদস্যের কমিটি থাকার কথা। কিন্তু এই সংখ্যা ন্যূনতম ৫১ সদস্য ধরলে শুধু বিএনপিরই নেতা-কর্মীর মোট সংখ্যা দাঁড়ায় ৪ হাজার ৮০। আর ১১টি অঙ্গসংগঠনের হিসাবে ওই সংখ্যা হলো ৪৪ হাজার ৮৮০।

অন্যদিকে ন্যূনতম হিসাবে সারা দেশের ৪৯৫টি উপজেলায় ৫১ সদস্যবিশিষ্ট কমিটির নেতা-কর্মীর সংখ্যা ২৫ হাজার ২৪৫ এবং গুরুত্বপূর্ণ ৭টি অঙ্গসংগঠনের কমিটিতে ১ লাখ ৭৬ হাজার ৭১৫ জন নেতা-কর্মী রয়েছেন।

এর বাইরে ৩৫০টি পৌরসভার ৯টি করে ওয়ার্ডে মোট ৩১৫০টিতে কমিটি রয়েছে বিএনপির। ন্যূনতম ৫১ সদস্যবিশিষ্ট ধরলে বিএনপির নেতা-কর্মী রয়েছেন মোট ১ লাখ ৬০ হাজার ৬৫০ জন। সব অঙ্গসংগঠনের এই হিসাবে দাঁড়ায় ১১ লাখ ২৪ হাজার ৫৫ জন। তবে বিএনপি জানিয়েছে, পৌরসভাগুলোর প্রতিটি ইউনিটের ১৫১ সদস্যবিশিষ্ট কমিটিই রয়েছে। সেই হিসাবে ওই কমিটিগুলোতে নেতা-কর্মীর সংখ্যা প্রায় ৮০ লাখ।   
 
বিএনপির দেওয়া তথ্যমতে, সারা দেশে দলটির ৪০ হাজার ৪৮২টি ওয়ার্ড কমিটিতে ন্যূনতম হিসাবে নেতা-কর্মীর সংখ্যা ১ কোটি ৪৪ লাখ ৫২ হাজার ৭৪। 

এর বাইরে সারা দেশে সাড়ে চার হাজারের বেশি ইউনিয়ন কমিটিতে ২ লাখ ৩৩ হাজারের বেশি নেতা-কর্মী রয়েছেন। ৭টি অঙ্গসংগঠন ধরলে এই সংখ্যা হবে মোট ১৬ লাখ ৩৪ হাজারের বেশি। এই হিসাব মূল বিএনপিসহ এর প্রধান বা গুরুত্বপূর্ণ ৭টি অঙ্গসংগঠনের ৫১ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি ধরে। এর বাইরে বিএনপির অঙ্গসংগঠন হিসেবে স্বীকৃতি রয়েছে জাতীয়তাবাদী ওলামা দল, মুক্তিযোদ্ধা দল, মৎস্যজীবী দল ও জাসাসের (জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন)। তবে এগুলোর সব জায়গায় কমিটি নেই বলে বিএনপির কেন্দ্রীয় সূত্রে জানা গেছে।

বিএনপির দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের ১১ আগস্ট পর্যন্ত সারা দেশে নেতা-কর্মীদের নামে মোট মামলা হয়েছে ১ লাখ ৪১ হাজার ৬৩৩টি। এসব মামলায় মোট আসামির সংখ্যা ৪৯ লাখ ২৬ হাজার ৪৯২ জন। এ সময়ের মধ্যে ৫৯৩ জন নেতা-কর্মী হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন।

অন্যদিকে গত ২৮ অক্টোবরের পর বিএনপির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে সারা দেশে মোট শতাধিক মামলা করা হয়েছে। দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং স্থায়ী কমিটির দুজনসহ মোট পাঁচ হাজার নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ২৮ অক্টোবরের পর যশোরে বিএনপির নেতা-কর্মীদের নামে নতুন ২২টি মামলায় মোট দেড় হাজার নেতা-কর্মীকে আসামি করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিএনপির খুলনা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। গতকাল খবরের কাগজকে তিনি জানান, পুলিশের ভয়ে যশোর এবং বৃহত্তর খুলনা বিভাগের বিএনপির কোনো ইউনিটের অফিস খোলা রাখা যাচ্ছে না। নেতা-কর্মীদের বাড়ি বাড়ি পুলিশ হানা দিচ্ছে। ঘরবাড়ি ছেড়ে সবাই এখন উদ্বাস্তু জীবনযাপন করছেন।

২৮ অক্টোবরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে শনিবারের পর থেকে চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন স্থান থেকে ১৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মহানগরীর কার্যালয় নাসিমন ভবন এখন  নেতা-কর্মীশূন্য।

২৮ অক্টোবরের পর সিলেট জেলায় নতুন ১০টি মামলায় বিএনপির ৬ থেকে ৭ হাজার নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন জেলায় ২২ মামলায় ১১৫ জন এবং ঢাকা থেকে ২৫ জন, বাগেরহাটে ৫০ মামলায় ৩৮ জন, বরগুনায় নতুন ৩ মামলাসহ মোট ২৬ মামলায় ৪০ জন, চট্টগ্রাম জেলায় ২২ মামলায় ২৫০ জন, ফেনীতে ১৩ মামলায় ৮০ জন, জামালপুরে ৫০ মামলায় ৮৫ জন, যশোরে ২২ মামলায় ৪০০ জন, ঝালকাঠিতে ২৭ জন, খাগড়াছড়িতে ৯ মামলায় ৫৭ জন, খুলনায় ১৫ মামলায় ১৫০ জন, কিশোরগঞ্জে ১০ মামলায় ১৫০ জন, কুড়িগ্রামে ৫ মামলায় ৩৩ জন, মেহেরপুরে ৪ মামলায় ৮২ জন, নড়াইলে ৩ মামলায় ২০ জন, নেত্রকোনায় ৫ মামলায় ৫২ জন, লক্ষ্মীপুরে ৫ মামলায় ২০০ জন এবং টাঙ্গাইলে ১৫২ জন নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। চট্টগ্রাম বিভাগে ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ১০ হাজার ৬২৬টি মামলায় বিএনপির ১ লাখ ৫৫৯ জন নেতা-কর্মীকে আসামি করা হয়েছে। 

সর্বশেষ গত ২৪ ঘণ্টায় বিএনপির ১৭৬ জন নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বিভিন্ন মামলায় আসামি করা হয়েছে ৫৭৫ জনকে। 

বিএনপির সাংগঠনিক বিভাগে ১০ জন সাংগঠনিক সম্পাদক রয়েছেন। এর মধ্যে নাটোরে অ্যাডভোকেট রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু ও বরিশালে অ্যাডভোকেট বিলকিস জাহান শিরিনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সর্বশেষ গতকাল রাতে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ময়মনসিংহ বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক এমরান সালেহ প্রিন্সকে। বাকি সবাই গ্রেপ্তার এড়াতে আত্মগোপনে আছেন। রংপুরের আসাদুল হাবিব দুলু, ফরিদপুরের শামা ওবায়েদকে ফোন করেও পাওয়া যায়নি।

তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পুলিশ সদর দপ্তর বা উচ্চস্তর থেকে সারা দেশে বিএনপির নেতা-কর্মীদের হয়রানি করার বিষয়ে কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। কোথাও কোথাও পুলিশ নিজ উদ্যোগে বা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে তৃণমূল পর্যায়ে অতি উৎসাহ দেখাচ্ছে।  

এ বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মিডিয়া) এনামুল হক সাগর জানান, শুধু মামলার এজাহারে থাকা আসামিদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।

এনসিটি পরিচালনার ভার পাচ্ছে ডিপি ওয়ার্ল্ড!

প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২৬, ০৯:১৯ এএম
আপডেট: ০৬ জুলাই ২০২৬, ০৯:৩২ এএম
এনসিটি পরিচালনার ভার পাচ্ছে ডিপি ওয়ার্ল্ড!
চট্টগ্রাম বন্দর/ ছবি: সংগৃহীত

সরকারের চলমান কার্যক্রম ও চট্টগ্রাম বন্দর চেয়ারম্যানের সম্প্রতি দেওয়া বক্তব্য থেকে ইঙ্গিত মিলছে যে, বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার ভার সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছেই যাচ্ছে। কিন্তু এই টার্মিনালের পরিচালনার ভার বিদেশিদের না দিতে ৫ মাস আগে ৭ দিনের কর্মবিরতি দিয়ে বন্দর অচল করে দেয় বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক সংগঠন। বর্তমানে এনসিটি ইজারা প্রক্রিয়ার বিষয়টি আবার আলোচনায় এলেও নীরব ভূমিকায় রয়েছেন ৫ মাস আগে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের নেতারা।

গত ৪ জুন এই বিষয়ে দুটি দাপ্তরিক চিঠি ইস্যু করে মন্ত্রণালয়। প্রথম চিঠিতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানকে উদ্দেশ করে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন-১ অধিশাখার সিনিয়র সহকারী সচিব ফারজানা হোসেন স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের এনসিটি টার্মিনাল পরিচালনা প্রতিষ্ঠান নিয়োগের লক্ষ্যে চলমান নেগোসিয়েশন এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য অথবা নেগোসিয়েশন এগিয়ে নিতে ইচ্ছুক না হলে, সে ক্ষেত্রে এ প্রক্রিয়া বাতিল করার বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো।

সেদিন প্রকল্পটির বাস্তবায়ন নিয়ে পর্যালোচনা করতে নৌপরিবহনমন্ত্রীর সভাপতিত্বে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভা শেষে মন্ত্রণালয়ের একই কর্মকর্তা স্বাক্ষরিত আরেকটি চিঠি ইস্যু হয়। ওই চিঠিতে বন্দর চেয়ারম্যানের উদ্দেশে বলা হয়, পিপিপি প্রকল্প বাস্তবায়ন পর্যালোচনার লক্ষ্যে নৌপরিবহনমন্ত্রীর সভাপতিত্বে ৪ জুনের সভার আলোচনা মোতাবেক ওই প্রকল্পের পরিচালনা প্রতিষ্ঠান নিয়োগের লক্ষ্যে নেগোসিয়েশন কার্যক্রম অব্যাহত রাখার নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো। বর্তমানে সরকার এনসিটি নিয়ে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে দর-কষাকষির পর্যায়ে রয়েছে। 

এদিকে গত ১ জুলাই বন্দরের ওয়ান স্টপ সার্ভিস ভবনের উদ্বোধন শেষে এনসিটি ইস্যুতে বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান বলেন, সম্প্রতি দুবাইয়ে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ-ইউএই প্ল্যাটফর্ম বৈঠকে এনসিটির বিষয়টি আবারও গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। এরপর সরকার একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি গঠন করেছে, যা পুরো বিষয়টি পর্যালোচনা করছে। 

কোনো কিছু গোপন করা হবে না জানিয়ে বন্দর চেয়ারম্যান বলেন, আলোচনা ও দর-কষাকষিতে বাংলাদেশের স্বার্থে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না। দেশের স্বার্থই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাবে। সরকারের ওপর আস্থা রাখুন। পুরো প্রক্রিয়া স্বচ্ছভাবে আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ করে পরিচালিত হচ্ছে। কোনো কিছু গোপন করা হবে না এবং এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না, যা প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করে। 

বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান আরও বলেন, আরব আমিরাতে আমাদের প্রায় ২৬ লাখ প্রবাসী আছেন। দেশটি থেকে প্রতিবছর প্রায় ৪ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স আমাদের দেশে আসে। বিভিন্ন কারণে এতদিন প্রকল্পটি বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। এ কারণে বাংলাদেশ ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে পারস্পরিক অঙ্গীকার বাস্তবায়নেও মাঝেমধ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। 

সরকারের কার্যক্রম ও বন্দর চেয়ারম্যানের বক্তব্য থেকে ধারণা করা যায়, এনসিটি পরিচালনার ভার ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দিতেই সব প্রক্রিয়া এগিয়ে চলছে। 
পাঁচ মাস আগের সেই সরব আন্দোলন এখন কেন নীরবতায় রূপ নিল তা জানার চেষ্টা করেছে খবরের কাগজ। এই নীরবতা কি আন্দোলনের নয়া কৌশল নাকি বন্দর শ্রমিক নেতাদের সমর্থিত দল ক্ষমতায় থাকার কারণই জোরদার আন্দোলনের পথে বড় বাধা, তা বের করার চেষ্টা করেছে প্রতিবেদক।

পাঁচ মাস আগে কেমন ছিল আন্দোলনের গতি চলতি বছরের ২৯ জানুয়ারি দুপুরে চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি টার্মিনাল পরিচালনায় বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে বন্দর কর্তৃপক্ষের চুক্তি প্রক্রিয়া বৈধ বলে রায় দেন হাইকোর্ট। সেদিন বেলা সাড়ে ১১টায় ওই রায়কে কেন্দ্র করে অফিস চলাকালীন চট্টগ্রাম বন্দরের কিছু কর্মচারী বন্দর ভবনে, ফয়ারে এবং বন্দর ভবন এলাকায় মিছিলে অংশ নেন। সেখানে নেতৃত্ব দেন চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা পরিষদের সমন্বয়ক ইব্রাহিম খোকন ও হুমায়ুন কবীর এবং বন্দর শ্রমিক দলের সদস্য আনোয়ারুল আজীম ও ফরিদুর রহমান।

বন্দরের কোনো টার্মিনাল বিদেশিদের ইজারা না দিতে দফায় দফায় আন্দোলন চালিয়ে যায় চট্টগ্রাম সুরক্ষা কমিটি, চট্টগ্রাম বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল, চট্টগ্রাম বন্দর ইসলামী শ্রমিক সংঘ, গণ-অধিকার পরিষদ, বাংলাদেশে জুয়েলারি সমিতি চট্টগ্রাম বিভাগ, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী দেশপ্রেমিক জনগণ প্ল্যাটফর্ম, বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টিসহ (সিপিবি) বিভিন্ন রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক সংগঠন।

এনসিটি বিদেশি কোম্পানিকে ইজারা না দেওয়াসহ বিভিন্ন দাবিতে গত ৩১ জানুয়ারি থেকে ৮ ফেব্রুয়ারি (৬ ও ৭ ফেব্রুয়ারি বাদে) পর্যন্ত সাত দিনের ধর্মঘট পালন করেন শ্রমিক-কর্মচারীরা। এই ধর্মঘটের কারণে পণ্য সরবরাহে ভাটা পড়ে। ইয়ার্ডে বাড়তে থাকে কনটেইনারের সারি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও রমজানের পণ্য খালাসের স্বার্থে ৯ থেকে ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ধর্মঘট স্থগিত রাখে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ। এই অচলাবস্থার কারণে হাজার হাজার কোটি টাকার লোকসানের মুখে পড়ে বন্দর। 

পরবর্তী সময় কর্মসূচি নিয়ে গত ১৫ ফেব্রুয়ারি আলোচনায় বসলেও আর কোনো কর্মসূচি ঘোষণা করেনি সংগঠনটির নেতারা। মূলত ৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত জোরদার ছিল আন্দোলন। গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ক্ষমতায় আসে বিএনপি। এরপর থেকেই নীরব ভূমিকা পালন করে আসছে বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ, বন্দর শ্রমিক দলসহ অন্যান্য রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক সংগঠন। 

বর্তমানে আন্দোলন কারা চালিয়ে যাচ্ছে

এনসিটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া বাতিলের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ) এবং চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা কমিটি। ইজারা প্রক্রিয়া বাতিলসহ বিভিন্ন দাবি নিয়ে তারা স্মারকলিপি প্রদান, সমাবেশ ও মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে।

হঠাৎ নীরবতার কী কারণ? 

বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক ইব্রাহিম খোকনের সঙ্গে গত ৮ জুন ও ১৬ জুন কথা হলে তিনি জানান, সরকার এনসিটি ইস্যুতে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিলে আন্দোলন জোরদার করা হবে। এরপর স্কপ বা বন্দর রক্ষা কমিটি বিভিন্ন কর্মসূচি দিলেও তার সংগঠন ছিল নীরব। সম্প্রতি বন্দর চেয়ারম্যান এনসিটি ইস্যুতে মুখ খুললে স্কপ বা বন্দর রক্ষা কমিটি সঙ্গে সঙ্গে বিবৃতি দিলেও নীরব ভূমিকায় ছিল বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ। অথচ ফেব্রুয়ারির আন্দোলনের সময় বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের নেতারা অগ্রণী ভূমিকায় ছিলেন। 

এই নীরবতার কারণ সম্পর্কে স্পষ্ট কিছু ধারণা পাওয়া যায় বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের আরেক সমন্বয়ক ও বন্দর শ্রমিক দলনেতা হুমায়ুন কবীরের বক্তব্যে। গতকাল রবিবার তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে আমরা যেভাবে আন্দোলন করেছিলাম, সেখান থেকে এক চুলও বিচ্যুত হইনি। আগে যেভাবে আন্দোলন করেছি, সে আন্দোলন করতে আমরা এখনো প্রস্তুত। যেহেতু এখন আমাদের সরকার ক্ষমতায়, এনসিটি-সিসিটি ইস্যুতে আমরা সরকারকে বোঝাতে চাই এবং সে পদক্ষেপ আমরা নিয়েছি। কিন্তু সরকার যদি না বোঝে তখন শ্রমিকের স্বার্থে যেটা করার আমরা সেটা করব।’

হুমায়ুন কবীর বলেন, ‘আগের সরকার ছিল অরাজনৈতিক সরকার, তাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করা ছাড়া কোনো উপায় ছিল না। এখন গণতান্ত্রিক সরকার। আমরা বিশ্বাস করি, বর্তমান সরকার এ রকম কোনো সিদ্ধান্ত নেবে না। ইতোমধ্যে আমাদের ওই রকমই কথা হয়েছে। গোপনীয়তার স্বার্থে আমরা অনেক কথা বলতে পারি না। আমরা আশা করছি সরকারকে এই ব্যাপারে বোঝাতে সক্ষম হয়েছি। আমরা আগামী সপ্তাহে সংবাদ সম্মেলন করব। সেখানে আমাদের অবস্থান স্পষ্ট করব।’ 

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা দল করি বলেই সরকারকে বোঝানোর চেষ্টা করছি। আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান করার চেষ্টা করছি। সরকার যদি না বোঝে তখন আমাদের ভিন্ন চিন্তা করতেই হবে।’ 

এনসিটির যন্ত্রপাতির মেয়াদ নিয়ে ভিন্ন তথ্য

গত ১ জুলাই ওয়ান স্টপ সার্ভিস ভবনের উদ্বোধন শেষে এনসিটি ইস্যুতে কথা বলেন বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান। কথার একপর্যায়ে তিনি বলেছিলেন, বন্দরের অধিকাংশ ক্রেন ও যন্ত্রপাতি পুরোনো হয়ে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী যন্ত্রপাতির সচল থাকার হার ৯৩ শতাংশের বেশি হওয়া প্রয়োজন হলেও বর্তমানে তা প্রায় ৭০ শতাংশে নেমে এসেছে। আগামী এক থেকে দুই বছরের মধ্যে এ হার আরও কমে প্রায় ৫০ শতাংশে নেমে আসতে পারে। তখন কিন্তু আমরা এখন যে অর্জন দেখাচ্ছি সেটিও বাধার সম্মুখীন হবে। নিজস্ব অর্থায়নে নতুন যন্ত্রপাতি কিনতে চাইলে তিন থেকে চার হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে। এর সঙ্গে ভ্যাট-ট্যাক্স যুক্ত হয়ে ব্যয় আরও বাড়বে এবং পুরো প্রক্রিয়া শেষ করতে তিন থেকে চার বছর সময় লাগতে পারে। কিন্তু ডিপি ওয়ার্ল্ড দায়িত্ব পেলে তাদের বিনিয়োগে এক বছরের মধ্যে যন্ত্রপাতি বসাবে। কারণ যন্ত্রপাতি বসিয়ে তো তাদের আয় করতে হবে। লাভ না করলে তারা বিনিয়োগ কেন করবে? 

কিন্তু খবরের কাগজের সঙ্গে আলাপকালে গত ১৬ জুন বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক ইব্রাহিম খোকন জানান, বর্তমানে এনসিটিতে বসানো যন্ত্রপাতির মেয়াদ রয়েছে ১৫ বছরের ওপরে। এখানে নতুন করে বিনিয়োগের কিছু নেই। 

অপরদিকে গতকাল হুমায়ুন কবীরও একই সুরে বলছেন, আমাদের যন্ত্রপাতিগুলো একেবারেই আধুনিক এবং সক্ষম। আমরা বন্দর চেয়ারম্যানের সঙ্গে কোনো দ্বন্দ্বে জড়াতে চাই না। চেয়ারম্যান তার দৃষ্টিভঙ্গিতে কথা বলেছেন। আমার দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখি আমাদের যন্ত্রপাতিগুলো একেবারেই আধুনিক এবং সক্ষম। আমাদের যন্ত্রপাতি ভালো আছে তার প্রমাণ হলো- আমরা ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৩৫ লাখ টিইইউএস কনটেইনার হ্যান্ডলিং করেছি, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরের তুলনায় ৭ শতাংশ বেশি। যন্ত্রপাতি ভালো আছে বলেই তো এটা সম্ভব হয়েছে।

সেদিন এনসিটি ইস্যুতে আর যা বলেছিলেন বন্দর চেয়ারম্যান

গত ১ জুলাই বন্দর চেয়ারম্যান আরও বলেন, ২০১৯ সাল থেকেই এ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে এবং প্রতিটি ধাপ আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখেই এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। বন্দর কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা প্রতিষ্ঠানের নয়; এটি দেশের ১৮ কোটি মানুষের সম্পদ। এনসিটি-সংক্রান্ত যেকোনো সিদ্ধান্ত রাষ্ট্র, জনগণ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থ বিবেচনায় নেওয়া হবে।

তিনি জানান, ২০১৯ সালে বাংলাদেশ ও সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকারের (জি-টু-জি) প্ল্যাটফর্ম বৈঠকে প্রথম ডিপি ওয়ার্ল্ডকে এনসিটি পরিচালনার প্রস্তাব দেওয়া হয়। এরপর পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) প্রকল্প হিসেবে বিষয়টি এগিয়ে নিতে লেনদেন-পরামর্শক (ট্রানজ্যাকশন অ্যাডভাইজার) নিয়োগ দেওয়া হয়। এ প্রক্রিয়ায় বিশ্বব্যাংকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান আইএফসিও যুক্ত রয়েছে।

তবে এই বক্তব্যের প্রেক্ষিতে আরও জানতে গতকাল বন্দর চেয়ারম্যানকে ফোন দিলে তিনি কল রিসিভ করেননি। 

চিটাগং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক খবরের কাগজকে বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর আমাদের সবার সম্পদ। বন্দর শুধু চট্টগ্রাম নয়, পুরো দেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। এখানে বিদেশি বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ। তবে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অবশ্যই সবকিছু যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, যেন এটি সবার জন্য কল্যাণ বয়ে আনে।

এনবিআরের অদক্ষতায় নিষ্পত্তি হচ্ছে না রাজস্ব মামলা!

প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২৬, ০৯:১১ এএম
আপডেট: ০৬ জুলাই ২০২৬, ০৯:৩৩ এএম
এনবিআরের অদক্ষতায় নিষ্পত্তি হচ্ছে না রাজস্ব মামলা!
ছবি: খবরের কাগজ

১০-১৫ বছর বা এর আগেরও বহু রাজস্ব মামলা আদালতে অনিষ্পত্তি অবস্থায় পড়ে আছে। কবে এসব নিষ্পত্তি হবে তার সময় জানাতে পারেনি কেউ। প্রায় ৩১ হাজার রাজস্ব মামলা অনিষ্পত্তি থাকায় প্রায় এক লাখ কোটি টাকার রাজস্ব অনাদায়ী রয়েছে। এর সঙ্গে নতুন রাজস্ব মামলা যোগ হচ্ছে। ফলে অনাদায়ী রাজস্বের পরিমাণও বাড়ছে। অর্থনীতির বিশ্লেষকরা রাজস্ব মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) দক্ষতা-সক্ষমতার অভাবকে দায়ী করেছেন। 

  • দেশে আয়কর, মূসক ও শুল্কসংক্রান্ত প্রায় ৩১ হাজার ৭০০টি রাজস্ব মামলা দীর্ঘদিন ধরে আদালতে অনিষ্পত্তি অবস্থায় রয়েছে।
  • এসব মামলায় জড়িত রাজস্বের পরিমাণ প্রায় এক লাখ কোটি টাকা, যা এখনো আদায় করা সম্ভব হয়নি।
  • অনেক রাজস্ব মামলা ১০ থেকে ১৫ বছর, এমনকি এক বা দুই যুগ ধরে আদালতে ঝুলে আছে।

মামলা সম্পর্কে দায়িত্বরত এনবিআর কর্মকর্তাদের ধারণা কম থাকা, আদালতে সময়মতো তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করতে না পারা, মামলা শেষ হওয়ার আগেই দায়িত্বরত কর্মকর্তার বদলি হওয়াও রাজস্ব মামলা নিষ্পত্তিতে বিলম্ব হওয়ার কারণ বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। 

অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, অভিজ্ঞ আইনজীবীদের ফি বেশি থাকে। কিন্তু রাজস্ব মামলা পরিচালনায় বাজেট কম থাকে। এই বাজেটে অভিজ্ঞ আইনজীবী নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হয় না। এমন পরিস্থিতিতে রাজস্ব মামলা পরিচালনায় কম ফিয়ের অল্প অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আইনজীবী নিয়োগ দিতে বাধ্য হয়। এতে মামলা পরিচালনায় দক্ষতার ঘাটতি থাকে। 

তারা দাবি করেন, অনাদায়ী রাজস্ব আদায় করা সম্ভব হলে এনবিআরের হিসাবে ঘাটতি থাকবে না, বরং লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি রাজস্ব আদায় হবে। ফলে সরকারের অর্থসংকট কমবে। দেশের অর্থনীতিতে গতি আসবে। 

এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মো. আবদুল মজিদ খবরের কাগজকে বলেন, এক/দুই যুগ আগে করা বহু রজস্ব মামলা এখনো আদালতে পড়ে আছে। এর সঙ্গে নতুন নতুন মামলা যুক্ত হচ্ছে। কবে এসব মামলা নিষ্পত্তি হবে তা বলা সম্ভব না। ফলে এসব মামলায় জড়িত প্রায় এক লাখ কোটি টাকার রাজস্ব আদায় প্রক্রিয়া কবে শেষ হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। 

তিনি বলেন, ‘আমি যখন এনবিআরের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি তখন অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিসে যোগাযোগ করেছি। বিশেষ আদালত গঠন করে আদালতে জমে থাকা মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির অনুরোধ করেছিলাম। কিন্তু বিষয়টির খুব একটা অগ্রগতি হয়নি।’

আদালতে রাজস্ব মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ার কারণ হিসেবে এনবিআরে প্রস্তুতির অভাবকে দায়ী করে রাজস্ব খাতের এই বিশ্লেষক বলেন, এনবিআরের দক্ষ কর্মকর্তারা মামলা নিষ্পত্তিসংক্রান্ত কাজে জড়িত থাকতে বেশির ভাগ সময়ে আগ্রহী হন না। অনেক সময় মামলা সম্পর্কে রাজস্ব কর্মকর্তার জানাশোনায় ঘাটতি থাকে। মামলা সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার জানাশোনা বাড়তে থাকলে অনেক সময় তাকে বদলি করে দেওয়া হয়। নতুন কর্মকর্তা এসে মামলা পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে তাকে প্রথম থেকে বুঝতে হয়। এতে মামলা নিষ্পত্তিতে সময় লেগে যায়।
 
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের এক সাবেক কর্মকর্তা খবরের কাগজকে বলেন, ‘মামলা নিষ্পত্তিতে আদালতে দৌড়াদৌড়ি করতে হয়। তথ্য-প্রমাণ জোগাড়েও অনেক ভোগান্তি হয়। এর চেয়ে মাঠপর্যায়ের কাজে ঝামেলা কম। এ ছাড়া মাঠপর্যায়ের অনৈতিক সুবিধা পাওয়ার সহজ সুযোগও বেশি থাকে। তবে মতিউরের মতো এমন অনেক কর্মকর্তা এখনো এনবিআরে আছেন।’ এদের মতো কর্মকর্তারা আদালতে এনবিআরের বিপক্ষদের কাছ থেকে মোটা অঙ্ক নিয়ে কৌশলে মামলা পরিচালনায় সময় ক্ষেপণ করেন বলেও জানান এই কর্মকর্তা। এনবিআরের তদন্তেও মামলায় বিপক্ষদের কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা নিয়ে এনবিআরসংশ্লিষ্টদের মামলায় সময়ক্ষেপণের জড়িত থাকার প্রমাণ মিলেছে। 

অর্থনীতির আরেক সাবেক চেয়ারম্যান ড. নাসির উদ্দিন খবরের কাগজকে বলেন, সাধারণত করদাতা বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে পাওনা রাজস্ব আদায় করতেই এনবিআরে তলব করা হয়। এরপর চূড়ান্ত নোটিশ দেয় বা হিসাব জব্দের মতো সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে। মামলা করে সাধারণত করদাতা বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত এনবিআরের পাওনা পরিশোধের প্রয়োজন হয় না। এটাকে করদাতা বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সুবিধা হিসেবে দেখে। এটা আসলে কর ফাঁকি দেওয়ার একটি কৌশল। এসব মামলা নিষ্পত্তি করতে হলে এনবিআরকে আরও কৌশলী ও দক্ষ হতে হবে। সরকার আসে সরকার যায়, কিন্তু আদালতে রাজস্ব মামলার সংখ্যা কমছে না, বরং বাড়ছে।

বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, রাজস্ব-জিডিপির (মোট দেশজ উৎপাদন) হার আগের চেয়ে কমে ৮ শতাংশের মধ্যে আটকে আছে। চলতি অর্থবছর শেষে ঘাটতি দাঁড়াতে পারে ৮৮ হাজার কোটি টাকা থেকে ৯০ হাজার কোটি টাকা বা তার বেশি। মামলা করা না করে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর) আইনের আওতায় মামলা নিষ্পত্তিতে গুরুত্ব বাড়াতে হবে। আশা করি, নতুন সরকার বিষয়টি ভেবে দেখবে। 

এনবিআরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের আদালতে আয়কর, মূসক ও শুল্কসংক্রান্ত মোট মামলার পরিমাণ ৩১ হাজার ৭০০টি। জড়িত অর্থের পরিমাণ ৯৯ লাখ ৭০০ কোটি টাকা। কমপক্ষে ৪ হাজার ৭০০ করসংক্রান্ত মামলার বিপরীতে জড়িত অর্থের পরিমাণ অন্তত ৩৫ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। মূসকের মামলার পরিমাণ ১১ হাজারের বেশি, জড়িত অর্থের পরিমাণ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বেশি। শুল্কের মামলার সংখ্যা ১৫ হাজারের বেশি। এর মধ্যে শুধু চট্টগ্রামেই ১২ হাজার মামলা চলমান। জড়িত অর্থের পরিমাণ প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকা।

মামলাজটের এমন বেহাল দশায়ও নতুন করে এনবিআর আরও প্রায় এক লাখ রিটার্ন অডিটের কাজ শুরু করেছে। এরই মধ্যে ৯২ হাজার ৮৪৯ করদাতাকে অডিটের জন্য বাছাই করে এনবিআরের ওয়েবসাইটে (nbr.gov.bd) প্রকাশ করেছে। এনবিআর সূত্র জানায়, অডিটে নিষ্পত্তি না হলে অনেকে নতুন করে মামলা করবে। এতে আদালতে মামলার সংখ্যা আরও বাড়বে। 

বাংলাদেশ ভ্যাট প্রফেশনালস ফোরামের চেয়ারম্যান ড. মো. আব্দুর রউফ খবরের কাগজকে বলেন, মামলাজট দীর্ঘদিনের বিষয়। এসব মামলাজট কমানোর জন্য এনবিআরকে নতুন কৌশলে যেতে হবে। 

তিনি বলেন, ২০১১ সালে মামলাজট কমানোর জন্য এডিআর পদ্ধতি প্রবর্তন করা হয়েছিল। তবে এ পদ্ধতিও মামলাজট কমাতে সফল হয়নি।

রাজস্ব খাতের এই বিশেষজ্ঞ বলেন, সবচেয়ে বেশি মামলা আছে বর্তমানে হাইকোর্ট বিভাগে। হাইকোর্ট বিভাগে শুধু ভ্যাটসংক্রান্ত মামলা আছে প্রায় ৪ হাজার ৫০০, যেখানে রাজস্ব জড়িত আছে প্রায় ২৩ হাজার কোটি টাকা। ভ্যাট অফিস, অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিস এবং আদালত একত্রে ক্রাশ প্রোগ্রাম গ্রহণ করে অন্তত সমজাতীয় মামলাগুলো নিষ্পত্তি করা যায়। এর জন্য এনবিআরসংশ্লিষ্টদের দক্ষতা বাড়াতে হবে।
 
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি ও ইফাদ গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান তাসকীন আহমেদ খবরের কাগজকে বলেন, রাজস্ব আইন ও বিধির ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা, দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এবং কর নির্ধারণে মতপার্থক্যের কারণে মামলা বাড়ছে। ব্যবসায়ী এই নেতা বলেন, কর নির্ধারণ, মূল্যায়ন ও রিটার্ন যাচাইয়ের ক্ষেত্রে প্রযুক্তিনির্ভর ও স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা চালু হলে ব্যক্তিনির্ভর সিদ্ধান্তের সুযোগ কমে যাবে, ফলে করদাতা ও কর প্রশাসনের মধ্যে বিরোধও হ্রাস পাবে, যা ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে।

কর্ণফুলী টানেল: নিয়ম ভেঙে লুটপাটের মহোৎসব

প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২৬, ০৮:৫৩ এএম
আপডেট: ০৬ জুলাই ২০২৬, ০৯:০৮ এএম
কর্ণফুলী টানেল: নিয়ম ভেঙে লুটপাটের মহোৎসব
ছবি: খবরের কাগজ

কর্ণফুলী টানেল নির্মাণে সরকারি অর্থের নয়ছয় ও লুটপাটের চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে মহা-হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের (সিএজি) নিরীক্ষা প্রতিবেদনে। প্রকল্পের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সরকারি বিধিমালা লঙ্ঘন করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অবৈধভাবে হয়েছে নানা সমঝোতা। ভেরিয়েশন অর্ডারের নামে অতিরিক্ত অর্থ প্রদান, কাজের দাম বাড়িয়ে দেখানো এবং ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে এই প্রকল্প থেকে হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রকল্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের স্বেচ্ছাচারিতা ও দুর্নীতির ফলে কেবল সরকারি অর্থের অপচয়ই হয়নি, বরং রাষ্ট্রের রাজস্বের বড় একটি অংশ হাতছাড়া হয়েছে। ২০১৫-১৬ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত সব মিলিয়ে ১ হাজার ৯০১ কোটি টাকার দুর্নীতি হয়েছে বলে সিএজির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। 

২০২৩-২৪ অর্থবছরে ঠিকাদার লুটে নিয়েছেন কোটি কোটি টাকা

২০২৩-২৪ অর্থবছরে ঠিকাদার প্রকৃতপক্ষে যতটুকু কাজ করেছেন বা খরচ করেছেন তার চেয়ে বেশি টাকা তাকে দিয়ে দেওয়া হয়েছে। এতে সরকারের ১০ কোটি ২৯ লাখ টাকা গচ্চা গেছে। ঠিকাদারের গাফিলতির কারণে সময়মতো নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়নি। অথচ জরিমানা না করে ঠিকাদারকে ছাড় দেওয়া হয়েছে। এতে সরকারের ২৮৬ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। এটি একটি বড় ধরনের আর্থিক অনিয়ম।
সরকারি কেনাকাটাসংক্রান্ত আইন অমান্য করে এবং কোনো প্রতিযোগিতা (টেন্ডার) ছাড়াই ২১ কোটি ২৫ লাখ টাকা খরচ করা হয়েছে, যা সম্পূর্ণ নিয়মবহির্ভূত।

কেনাকাটায় বিস্তর অনিয়ম, দেদার লুটপাট

সিএজির প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২২-২৩ অর্থবছরে প্রকল্পের রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়কে নির্মাণকাজের ব্যয় হিসেবে দেখানোর চেষ্টাও করা হয়েছে। এতে সরকারের ৪৮ কোটি টাকা অপচয় হয়েছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ প্রকল্পের নকশা, নির্মাণ উপাদান সংগ্রহ এবং নির্মাণকাজ সম্পন্ন করে প্রকল্প কর্মকর্তাদের বুঝিয়ে দিতে ‘টার্ন কি’ চুক্তি স্বাক্ষর করে। এই চুক্তির আওতায় ভেরিয়েশনের মাধ্যমে ঠিকাদারকে অতিরিক্ত ৫৮ কোটি টাকা দেওয়া হয়। প্রকল্প তত্ত্বাবধানে পরামর্শক থাকা সত্ত্বেও আলাদা করে নির্মাণকাজের পরামর্শক নিয়োগে ব্যয় দেখানো হয়। এতে সরকারের ৭০ কোটি টাকারও বেশি অর্থের অপচয় হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যুরো অব স্ট্যাটিস্টিকস (বিবিএস) পণ্যের যে দাম নির্ধারণ করে রেখেছিল, সরকারি কেনাকাটায় তার চেয়ে বেশি দাম দেখানো হয়েছে। অর্থাৎ বিদেশি পণ্য কেনার সময় নিয়ম লঙ্ঘন করে উচ্চমূল্য দেখানো হয়েছে। এতে ৪২ কোটি টাকা অতিরিক্ত খরচ হয়েছে। অন্যায্য মূল্য সমন্বয়ের কারণে সরকারি অর্থের অপচয় হয়েছে ২২৪ কোটি টাকা। টানেলের জন্য প্রয়োজন না হওয়া সত্ত্বেও সার্ভিস এরিয়া নির্মাণের জন্য ৫০৩ কোটি টাকার অনিয়ম হয়েছে। প্রকল্পের সাইট অফিসে বাংলো মেরামতে অস্বাভাবিক উচ্চব্যয় দেখানো হয়েছে। এতে ১০ কোটি টাকা অর্থের অপচয় হয়েছে। ডিজেল জেনারেটর কিনতেও ৬ কোটি টাকা অপচয় করা হয়েছে।

একই কাজের জন্য টাকা একবার খরচ হওয়ার কথা থাকলেও বিভিন্ন খাতে ঘুরিয়ে সেটাকে অস্বাভাবিকভাবে বড় অঙ্কের খরচ হিসেবে দেখানো হয়েছে। এতে সরকারের ২৫০ কোটি টাকা অপচয় করা হয়েছে।

প্রকল্প শেষ হওয়ার পর ব্যবহৃত যানবাহনগুলো নিয়ম অনুযায়ী মূল প্রকল্পে ফেরত বা জমা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেগুলো ফেরত না দিয়ে ব্যক্তিগত বা অন্য কোনো কাজে ব্যবহার করা হয়েছে, যার ফলে সরকারের ১৪ কোটি টাকা মূল্যের অর্থের অপচয় হয়েছে। ঝোপঝাড় পরিষ্কার না করে এবং আনুষঙ্গিক বৃক্ষরোপণ কাজ সম্পন্ন না করায় সরকারের ৪৯ কোটি টাকা অপচয় হয়েছে। পরামর্শকদের থাকা-খাওয়া বাবদ ৮ কোটি টাকার অনিয়ম হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সরকারি ক্রয় বিধিমালা অনুসরণ না করে প্রকল্পের কাজের পরিধি পরিবর্তন করা হয়েছে; যাকে ‘ভেরিয়েশন অর্ডার’ বলে। এতে সরকারের ৭৩ কোটি টাকা অতিরিক্ত খরচ করা হয়েছে। পরামর্শকের পাওনা থেকে আয়কর কম কর্তন করা হয়েছে। এতে সরকারের প্রায় ৯ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। সাব-কন্ট্রাক্টরকে বিল পরিশোধ করার সময় নির্ধারিত ভ্যাট কেটে রাখা হয়নি। এতে সরকারের ২ কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে।

অর্জিত ব্যাংক সুদ জমা হয়নি কোষাগারে

২০২১-২২ অর্থবছরে প্রকল্পের অর্জিত ব্যাংক সুদ সরকারি কোষাগারে জমা না দেওয়ায় সরকার ২ কোটি টাকার রাজস্ব হারায়। তখন সরকারি ক্রয় পদ্ধতির তোয়াক্কা না করে, কাজের সঠিক দাম যাচাই না করে ঠিকাদারদের সঙ্গে চুক্তি করে ফেলেন প্রকল্প কর্মকর্তারা। এতে ৬ কোটি টাকার অনিয়ম ধরা পড়েছে। উন্নয়ন প্রকল্পে দাতা সংস্থা থেকে সরাসরি ঠিকাদার বা সরবরাহকারীর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে অর্থ পরিশোধ প্রক্রিয়ায় ১৪ কোটি টাকা নয়ছয় করা হয়েছে।

২০১৯-২০, ২০২০-২১ এই দুই অর্থবছরে প্রকল্প কর্মকর্তারা আইএফআইসি ও মিডল্যান্ড ব্যাংকে অনিয়মিতভাবে ফিক্সড ডিপোজিট রিসিট এফডিআর (FDR) কেনাকাটা করেন। এতে সরকারের ১৫ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়। ওই দুই অর্থবছরের আর্থিক বিবরণীতে উল্লিখিত আমদানি শুল্ক ও মূল্য সংযোজন করের সমাপনী স্থিতি এবং চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের স্থিতির মধ্যে বিস্তর তফাত পাওয়া যায়। এতে ৩৩ কোটি টাকারও বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে অডিট আপত্তি এসেছে। ভূমি অধিগ্রহণের জন্য চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনকে অগ্রিম অর্থ দেওয়া হলেও কর্মকর্তারা প্রকল্প কার্যালয়ে কাঙ্ক্ষিত জমি হস্তান্তর করেনি। এতে ১০৫ কোটি টাকার অনিয়ম হয়েছে।

২০১৯-২০, ২০২০-২১ অর্থবছরের চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না কমিউনিকেশন কনস্ট্রাকশন কমিউনিকেশনকে ট্যাগ বোট ক্রয়ের জন্য অতিরিক্ত ১ কোটি টাকা দেওয়া হয়। প্রকল্পের ক্রয় প্রস্তাবনায় না থাকলেও ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার তৈরির জন্য এই প্রতিষ্ঠানকে ৪৯ লাখ টাকা বিল দেওয়া হয়।

শুরু থেকেই ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগসাজশ

২০১৫-১৬ অর্থবছরে প্রকল্প কার্যালয় থেকে ঠিকাদারদের অগ্রিম বিল প্রদান করা হয়েছিল। কিন্তু সেই অর্থবছরে প্রকল্প ব্যয়ের চূড়ান্ত হিসেবে ২০১ কোটি টাকার অনিয়ম ধরা পড়েছে। একই অর্থবছরে সরকারি আদেশ অমান্য করে প্রকল্পের আনুষঙ্গিক ব্যয় বাবদ চট্টগ্রামের তৎকালীন জেলা প্রশাসককে ৪ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছিল। পরের ২০১৬-১৭ অর্থবছরেও একই অনিয়ম হয়েছে। সরকারের আদেশ অবজ্ঞা করে জেলা প্রশাসককে আরও ১ কোটি ৪২ লাখ টাকা দেওয়া হয়। তখন ভূমি অধিগ্রহণে নানা অনিয়মে ১৪৩ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে আরও বলা হয়, বিদেশি পরামর্শকের বিল থেকে আয়কর কম কাটা হয়েছে। এতে সরকার ১ কোটি ৮৬ লাখ টাকা রাজস্ব হারায়। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান বিমা কাভারেজ দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিল সে বছরই; কিন্তু তা করেনি প্রকল্প কর্তৃপক্ষ। 

কর্ণফুলী টানেলে দিনে ১০ লাখ টাকা লোকসান

ট্রাফিক পূর্বাভাসের সঙ্গে বাস্তবতার আকাশ-পাতাল পার্থক্যের কারণে বর্তমানে টানেলটি পরিচালনায় প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০ লাখ টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে বলে জানিয়েছে বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)। আইএমইডির প্রভাব মূল্যায়ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, প্রকল্পের অব্যবস্থাপনা এবং অদূরদর্শী পরিকল্পনার ফলে এটি এখন জাতীয় অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের বোঝার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের সময় দাবি করা হয়েছিল, উদ্বোধনের পর প্রতিদিন ১৭ হাজার যানবাহন চলবে এবং ২০২৬ সাল নাগাদ এই সংখ্যা বেড়ে ২৮ হাজার ৩০৫টিতে দাঁড়াবে। অথচ বর্তমানে টানেল ব্যবহার করছে প্রাক্কলিত লক্ষ্যের মাত্র ১৪ শতাংশ, অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে মাত্র ৪ হাজার থেকে ৪ হাজার ৫০০টি যানবাহন।

এই ভরাডুবির ফলে ২০২৪-এর নভেম্বর থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত প্রাপ্ত উপাত্ত অনুযায়ী, প্রতিদিন প্রায় ১০ লাখ টাকা লোকসান হচ্ছে। বর্তমানে টোলের মাধ্যমে যে আয় হচ্ছে, তা টানেলটির মোট পরিচালন ব্যয়ের মাত্র ৫৪ থেকে ৫৫ শতাংশ মেটাতে সক্ষম।

আইএমইডির পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, কেবল টানেল নির্মাণ করলেই হয় না, এর সঙ্গে সংযোগকারী শিল্পাঞ্চল ও পরিকল্পিত নগরায়ণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন ছিল। দক্ষ জনবলের অভাব ও দুর্বল সংযোগ সড়কের কারণে টানেলটির সুফল পাওয়া যাচ্ছে না।

‘ওপেন সিক্রেট’ মাদক

প্রকাশ: ০৫ জুলাই ২০২৬, ০৮:৪৩ এএম
আপডেট: ০৫ জুলাই ২০২৬, ০৮:৫৪ এএম
‘ওপেন সিক্রেট’ মাদক
খবরের কাগজ গ্রাফিকস

হাত বাড়ালেই যেন মিলছে মরণনেশা ইয়াবাসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায় মাদকের বিস্তার উদ্বেগজনক পর্যায়ে গেছে। চিহ্নিত মাদক স্পটের গণ্ডি পেরিয়ে এখন রাজধানীর অলিগলি, মহল্লা ও আবাসিক এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়েছে মাদকের কারবার। 

সংশ্লিষ্ট অপরাধ বিশ্লেষক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, মায়ানমারভিত্তিক ইয়াবা ট্যাবলেট মারাত্মক হারে ছড়িয়ে পড়েছে ঢাকাসহ দেশের অধিকাংশ শহর ও প্রত্যন্ত গ্রামে। এ ছাড়া হেরোইন, গাঁজা, ফেনসিডিল, ক্রিস্টাল মেথ (আইস), সিসা, এলএসডিসহ আরও একাধিক কৃত্রিম মাদকেরও ভয়াবহ বিস্তার ঘটেছে বিভিন্ন এলাকায়।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চিহ্নিত মাদকের স্পটে কেনাবেচা ছাড়াও অনলাইনে বিজ্ঞাপন দিয়ে বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পেজ বা গ্রুপ খুলে মাদক বেচাকেনা চলছে। এমনই একটি চক্রের তিন সদস্যকে প্রায় ৬৬ কেজি সিসা, বিভিন্ন সরঞ্জামসহ গত বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর ভাটারা এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)। গ্রেপ্তার তিনজনের মধ্যে দুজনই ইরানি বংশোদ্ভূত সহোদর, যারা পারিবারিক ব্যবসার সূত্রে ঢাকায় বসবাস করে আসছিলেন। একই দিন টেকনাফ সীমান্ত এলাকা থেকে দুই কেজি ক্রিস্টাল মেথ (আইস) ও একটি রাইফেল জব্দ করে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। তার আগের দিন বুধবার টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ এলাকায় বিজিবির পৃথক দুটি অভিযানে ২ লাখ ৯০ হাজার পিস ইয়াবাসহ দুজনকে আটক করা হয়। এ ছাড়া গতকাল শুক্রবার পাকস্থলীর ভেতরে করে পাচারকালে ১ হাজার ৩২০ পিস ইয়াবাসহ দুই মাদক কারবারিকে গ্রেপ্তার করে ডিএমপির ‘সিটিটিসি’ ইউনিট।
 
ম কৌশল ব্যবহার করা হচ্ছে। বিভিন্ন ধরনের পণ্যের দোকানের আড়ালে বা ভ্রাম্যমাণ ক্ষুদ্র দোকান, এমনকি হাঁটাচলার মাঝেই লেনদেন হচ্ছে ইয়াবা-গাঁজাসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্য। অনেকে পাকস্থলীর ভেতর, বিভিন্ন পণ্যের ভেতর, যানবাহনে কৌশলে লুকিয়ে বা মোবাইল ফোনের ব্যাটারির চেম্বারে করেও ইয়াবা বহন করছে। এমনকি ঢাকার কিছু এলাকায় ইয়াবা ও গাঁজা সেবন এখন অনেকটাই ‘ওপেন সিক্রেট’। 

চিহ্নিত মাদক স্পট ও কারবারিদের তৎপরতা

একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা ও ডিএনসির তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা মহানগরে সুনির্দিষ্টসংখ্যক কোনো মাদক স্পট নেই। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় মাদক কারবারিদের তৎপরতা অনুসারে মাদকের স্পটের বিভিন্ন সংখ্যা অনেকেই বলে থাকেন। সে হিসাবে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) আটটি ক্রাইম জোনে বর্তমানে মাদক বেচাকেনার জন্য স্পট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে ২৪৭টি স্থান। এ ছাড়া এসব মাদক কারবারের নেপথ্যে অন্তত ২৩১ জন ডিলার পর্যায়ের মাদক ব্যবসায়ী এবং ৩ হাজার ৫০০-এর বেশি মাদক কারবারি সক্রিয় রয়েছেন। 

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) হালনাগাদ পরিসংখ্যান বলছে, ঢাকার চারপাশের অন্তত ১০৫টি রুট দিয়ে প্রতিদিন ইয়াবা, আইস (ক্রিস্টাল মেথ), হেরোইন ও ফেনসিডিলের মতো ভয়াবহ মাদক প্রবেশ করছে।এর মধ্যে সম্প্রতি মেরুল বাড্ডার কাঁচাবাজার এলাকায় মাদকের নতুন স্পট চোখে পড়েছে সাধারণ বাসিন্দাদের। বাড্ডা থানা ভবন থেকে মাত্র কয়েক শ মিটার দূরত্বে এই কাঁচাবাজার রোডে এখন অনেকটা প্রকাশ্যেই ইয়াবা বেচাকেনা চলছে বলে জানিয়েছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন প্রত্যক্ষদর্শী। স্থানীয় ওই ব্যক্তির দাবি, স্থানীয় পুলিশও বিষয়টি সম্পর্কে অবগত। কিন্তু রহস্যজনক কারণে কঠোর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয় না। 

অন্যদিকে সায়েদাবাদ জনপদের মোড় থেকে দয়াগঞ্জ সড়কের একটি রিকশা গ্যারেজ ঘিরে আরেকটি নতুন মাদক স্পটের খবর পাওয়া গেছে। স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা খবরের কাগজকে জানিয়েছেন, জনপদের মোড় থেকে দয়াগঞ্জ সড়কের দিকে কিছুটা এগোলেই ডান পাশে সেই রিকশা গ্যারেজ। রিকশার গ্যারেজ হলেও এটি মূলত মাদকের আস্তানা। স্থানীয় একাধিক ব্যক্তির অভিযোগ, রিকশা গ্যারেজের আড়ালে এখানে ইয়াবা, হেরোইন ও গাঁজা কেনাবেচা চলে। এমনকি যাদের রিকশার চালক হিসেবে এখানে দেখা যায়, তাদের বেশির ভাগই মাদকের কারবার ও ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িত। তাদের সংশ্লিষ্ট থানার এলাকাভিত্তিক দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা মদদ দিচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। থানায় ফোন করে অভিযোগ জানানোর পরও এই মাদক স্পটটি বন্ধ হয়নি বলে জানান স্থানীয়রা। 

এলাকাভিত্তিক স্থানীয় বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, কারওয়ান বাজার লেভেল ক্রসিং থেকে নাখালপাড়া রেলস্টেশন পর্যন্ত রেললাইনের দুই পাশ মাদকের অন্যতম প্রধান ও উন্মুক্ত হটস্পট। অন্যদিকে মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প ও টাউন হল এলাকা এখন মাদকের বড় স্পট হিসেবে পরিচিত। মিরপুর ও পল্লবীর বিভিন্ন বিহারি ক্যাম্প, আগারগাঁওয়ের বস্তি এলাকা মাদকের পুরোনো ও অন্যতম বড় স্পট। এ ছাড়া বাড্ডা, মহাখালী, তেজগাঁও, তুরাগ, যাত্রাবাড়ী, শনির আখড়া, ডেমরা, খিলগাঁও, সবুজবাগ, হাজারীবাগ, রায়েরবাজার, গাবতলী-বাগবাড়ী, ফকিরাপুল কালভার্ট বস্তি, গোলাপবাগ, সিটি কলোনি এবং গোপীবাগ মেথরপট্টি রেললাইন এলাকাও মাদকের হটস্পট হিসেবে পরিচিত। 

রাজধানীর সবচেয়ে কুখ্যাত তিন ‘মাদকের হাট’

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতিবেদন ও মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে দেখা যায়, ঢাকার অন্তত তিনটি মাদক স্পটকে অনেকটা মাদকের হাট হিসেবে ধরা হয়। ২৪ ঘণ্টাই খোলাবাজারের মতো বিভিন্ন ধরনের মাদক কেনাবেচা হয় এসব স্পটে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মাঝেমধ্যে অভিযানও চালায়, কিন্তু তার পরও চলছে মাদক কেনাবেচা। এই তিনটি হটস্পটের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে–আটকে পড়া পাকিস্তানি নাগরিকদের বসবাস কেন্দ্র মোহাম্মদপুরের ‘জেনেভা ক্যাম্প’। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের দাবি, এটি রাজধানীর সবচেয়ে ভয়াবহ মাদকের ট্রানজিট পয়েন্ট। ক্যাম্পের মুরগিপট্টি, বাবর রোড এবং হুমায়ুন রোড এলাকায় নারী ও শিশুদের ব্যবহার করে ইয়াবা-হেরোইন বিক্রি করা হয়। এই অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে প্রায়ই সশস্ত্র সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সম্প্রতি মাদক-ছিনতাইকারী চক্র ওই এলাকায় অভিযানে যাওয়া পুলিশের ওপরও হামলা চালায়।

এদিকে কারওয়ান বাজার লেভেল ক্রসিং থেকে নাখালপাড়া পর্যন্ত বিস্তৃত রেললাইন এলাকা আরেকটি ‘মাদকের বাজার’ হিসেবে পরিচিত। ভাসমান খুচরা বিক্রেতারা এখানে ব্যাপকভাবে সক্রিয়। পাশাপাশি রেললাইনের আশপাশে এখানে মাদকসেবীদের সবচেয়ে বড় মিলনমেলাও বসে।

এ ছাড়া মিরপুর বিহারি ক্যাম্প আরেকটি অন্যতম প্রধান মাদক স্পট হিসেবে পরিচিত। এই ক্যাম্পগুলোতে রাতে হাঁকডাক ছেড়ে মাদক বিক্রি হয়। ঘনবসতির সুযোগ নিয়ে অপরাধীরা খুব সহজেই পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে আত্মগোপন করে।

যা বলছেন অপরাধ বিশেজ্ঞরা

মাদকের নেটওয়ার্ক অনেক শক্তিশালী ও উচ্চপর্যায়ের বলে মনে করেন অপরাধ বিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ উমর ফারুক। মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের এই অধ্যাপক গত শুক্রবার খবরের কাগজকে বলেছেন, ‘মাদকের নেটওয়ার্ক অনেক উচ্চপর্যায়ের। মাদক চোরাচালান বন্ধ হয়ে গেলে সরকারিভাবে দায়িত্বশীল অনেকেরই নিয়মিত আয়ের উৎস কমে যাবে। অন্যদিকে দেশের সীমান্ত এলাকাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে একশ্রেণির প্রভাবশালী রাজনীতিক-ক্ষমতাধর ব্যক্তিরাও মাদক কারবারে মদদ দিয়ে যাচ্ছে। ফলে দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা মুখে মাদকবিরোধীর বড় কথা বললেও তাদের অনেকেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মাদক বিস্তারে কাজ করছে। মাদক চোরাচালান বন্ধ না হওয়ার পেছনে এগুলো বড় কারণ।’

অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ উমর ফারুক বলেন, মাদক চোরাচালানের রুট এবং কেনাবেচার চিহ্নিত কিছু স্পটের খবর বিভিন্ন মাধ্যমে জানা গেলেও সুনির্দিষ্টভাবে সেটি নির্ধারণ করা কঠিন। বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের মাদকের এতটাই বিস্তার ঘটেছে যে, রাজধানীসহ বড় শহরগুলোর প্রায় সব এলাকায় বা পাড়া-মহল্লার অলিগলিতে মাদক কারবারি ও সেবনকারীদের তৎপরতার খবর পাওয়া যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে মাদকবিরোধী সামাজিক অংশগ্রহণ ও সচেতনতা বাড়ানো খুব জরুরি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদারকিতে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের যুক্ত করে সামাজিক নেটওয়ার্ক গড়ার মাধ্যমে মাদকবিরোধী আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। অন্যথায় দেশের বর্তমান ও আগামী প্রজন্ম অন্ধকারে ডুবে যাবে।’

মাদক থেকেই অধিকাংশ অপরাধের সূত্রপাত ঘটে বলে মনে করেন সামাজিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক। গতকাল তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘মাদক দেশের যুবসমাজকে ধ্বংসের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। কারণ অধিকাংশ অপরাধের সূত্রপাত হয় মাদক থেকে। পাশাপাশি মাদক যেমন কর্মস্পৃহা কমিয়ে দিচ্ছে, তেমনি তরুণ সমাজের মেধা ধ্বংস করে দিচ্ছে, যা বৈজ্ঞানিকভাবেও স্বীকৃত। ফলে মাদকের ছোবলে আমাদের সম্ভাবনার একটি জাতি (জেনারেশন) পঙ্গু হয়ে যাচ্ছে। মুখে আমরা অনেকেই মাদকবিরোধী নানা রকম কথা বলে থাকি, কিন্তু বাস্তবে রাষ্ট্রীয়ভাবে কঠোর কোনো পদক্ষেপ এবং সামাজিক ও পারিবারিক সচেতনতা দেখা যাচ্ছে না।’
 
ড. তৌহিদুল হক বলেন, ‘আগে একসময়ে পাড়া-মহল্লাগুলোতে বিট পুলিশিং ও কমিউনিটি পুলিশিং ব্যাপক কার্যকর ছিল। পুলিশের নিয়মিত টহল বা আনাগোনা দেখা যেত। এখন এগুলো খুব একটা চোখে পড়ে না। যদিও পুলিশকে আরও নানা কাজে যুক্ত থাকতে হয়। অন্যদিকে বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি মাদক কারবারিসহ পেশাদার অপরাধীদের ভয়ভীতিও কমে গেছে। অনেকে প্রকাশ্যই মাদক কেনাবেচা বা সেবন করে যাচ্ছে। ফলে মাদকবিরোধী কঠোর অবস্থান আরও দৃশ্যমান করতে হবে। মাদকবিরোধী সামাজিক নেটওয়ার্ক গড়ে নজরদারি বৃদ্ধি ও সাঁড়াশি অভিযান চালানো জরুরি।’ 

যা বলছেন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা

এ প্রসঙ্গে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) এস এন মো. নজরুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, ‘মাদকবিরোধী অভিযান ডিএমপির নিয়মিত কাজের অংশ হিসেবে চলমান রয়েছে। আমাদের বিভিন্ন গোয়েন্দা দল থেকে যখনই তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, তখনই অভিযান চালানো হচ্ছে। কিন্তু তার পরও মাদকের বিস্তার কমছে না, বরং মারাত্মক হারে গ্রামগঞ্জে ছড়িয়ে যাচ্ছে। এ জন্য সবার আগে সীমান্ত ‘সিল’ (বন্ধ) করার ব্যবস্থা করতে হবে। সীমান্তে টহল বৃদ্ধিসহ কঠোরভাবে যদি মাদক প্রবেশ বন্ধ করা যায়, তাহলে রাজধানী ঢাকাসহ অন্য সবখানেই মাদক কমে যাবে। এর বাইরেও মাদকবিরোধী সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলাও জরুরি। মসজিদ, মন্দির, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সবখানে মাদকের কুফল তুলে ধরতে হবে। সমাজে যাদের কথা সবাই মান্য করে, তাদের এ বিষয়ে বিশেষ ভূমিকা পালন করার আহ্বান জানান ডিএমপির এই অন্যতম শীর্ষ কর্মকর্তা।

৭৯৭৫ কোটির প্রকল্পে ২৮৪ কোটি টাকা অনিয়ম

প্রকাশ: ০৫ জুলাই ২০২৬, ০৮:০৮ এএম
৭৯৭৫ কোটির প্রকল্পে ২৮৪ কোটি টাকা অনিয়ম
ছবি: সংগৃহীত

‘সাসেক ঢাকা-সিলেট করিডর সড়ক উন্নয়ন’ শিরোনামে গৃহীত মেগা প্রকল্পের মেয়াদ আট বছরে বেড়েছে পাঁচ বার, উন্নয়ন ব্যয় (ডিপিপি) ব্যয় বেড়েছে ৫১ শতাংশ। ২০১৮ সালে ৩ হাজার ৮৮৫ কোটি টাকা ডিপিপি ব্যয় অনুমোদনের পর ২০২২ সালে ডিপিপি সংশোধন করা হয়। সেই ডিপিপি প্রস্তাব অপরিবর্তিত রেখে প্রকল্পের উন্নয়ন ব্যয় বাড়িয়ে করা হয়েছে ৭ হাজার ৯৭৫ কোটি টাকা। সম্প্রতি বাংলাদেশের মহা-হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ের এক নিরীক্ষায় দেখা গেছে, গত চার অর্থবছরে এই প্রকল্পে ২৮৪ কোটি ৯৩ লাখ ৪৬ হাজার ৪১৪ টাকার অনিয়ম হয়েছে। 

অনিয়ম আর অনিয়ম, কর্মকর্তারা চুপ

অডিট প্রতিবেদন ঘেঁটে দেখা গেছে, সাসেকের এই প্রকল্পে ২০২১-২২ অর্থবছরে আউটসোর্সিংয়ের মোট বিল থেকে আয়কর কর্তন না করায় ৪২ হাজার ১১৩ টাকা সরকারি রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে। 

২০২২-২৩ অর্থবছরে ঠিকাদারকে চুক্তির অতিরিক্ত মূল্য প্রদান, সর্বনিম্ন দরদাতাকে উপেক্ষা করে দ্বিতীয় দরদাতার সঙ্গে চুক্তি, ঠিকাদারদের অতিরিক্ত পারিশ্রমিক এবং আয়কর কম কর্তনসহ নানা অনিয়ম হয়েছে। এ অনিয়মে ২৪৯ কোটি ৯৫ লাখ ৮৬ হাজার ৭৩ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

২০২৩-২৪ অর্থবছরে চুক্তির সাধারণ শর্ত লঙ্ঘন করে বিশেষ শর্তাবলি প্রণয়ন করা হয়েছে। পরে সে অনুযায়ী মূল্য সমন্বয় করে ঠিকাদারদের বিল দেওয়ায় ২৫ লাখ ৮ হাজার ৮০৬ টাকা আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। ওই অর্থবছরে প্রকল্পে নিয়োজিত প্রকৌশলীদের জন্য অর্ধ-স্থায়ী আবাসন নির্মাণের কোনো কাজ সম্পাদন না করেই ঠিকাদার উধাও হয়ে গিয়েছিল। এ কাণ্ডে ৩ কোটি ৮০ লাখ ১৭ হাজার ৫৫৬ টাকার অনিয়ম হয়েছে। 

২০২৩-২৪ অর্থবছরের নিরীক্ষায় দেখা গেছে, ঠিকাদারদের বিল থেকে ভ্যাট ও আয়কর বাবদ ৪ কোটি ৬৩ লাখ ৩৭ হাজার ৯৩৮ টাকা আদায় করা হয়নি। সেই অর্থবছরে সঞ্চিত ব্যাংক সুদ সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়নি, যার পরিমাণ ৫ লাখ ১৫ হাজার ৭৭৮ টাকা। ভেরিয়েশন অনুমোদন ছাড়া প্রকল্পের খরচের জন্য নির্ধারিত অর্থ থেকে অতিরিক্ত ৪৫ লাখ ৯৪ হাজার ৪৯২ টাকা ঠিকাদারকে দেওয়া হয়েছে। চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করে বিমা কাভারেজ করা হয়নি; এতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ১৬ হাজার ৫০০ টাকা।

প্রকৃত ব্যয়ের পরিবর্তে পরামর্শক, ঠিকাদারদের সঙ্গে চুক্তির হারে আন্তর্জাতিক বিমান ভাড়ার বিল পরিশোধ করা হয়েছিল সেই বছর। এতে ৮ লাখ ৯৫ হাজার ৬১ হাজার ৯৬৭ টাকার অনিয়ম ধরা পড়েছে।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে ঠিকাদারের বিল থেকে ভ্যাট ও আয়কর আদায় করা হয়নি ৪ কোটি ৬৩ লাখ ৩৭ হাজার ৯৩৮ টাকা। সঞ্চিত ব্যাংক সুদ থেকে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়নি ৫ লাখ ১৫ হাজার ৭৭৮ টাকা। 

নির্মাণকাজের জন্য নির্ধারিত বিল থেকে ভেরিয়েশন অনুমোদন ছাড়াই ঠিকাদারকে ৪৫ লাখ ৯৪ হাজার ৪৯২ টাকা অতিরিক্ত অর্থ প্রদান করা হয়েছে। চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করে বিমা কাভারেজ করা হয়নি ১৬ হাজার ৫০০ টাকার। ঠিকাদার ও পরামর্শকদের বিমানযাত্রার বিলে ১১ কোটি ৬৬ লাখ ২০ হাজার ৪৮৩ টাকার অনিয়ম ধরা পড়েছে।

প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত চার বছরে সাসেক প্রকল্প কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে মোট ১৯টি অডিট আপত্তি উত্থাপিত হয়েছে। এর মধ্যে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সময়মতো ব্রডশিট জবাব দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে বড় অঙ্কের আর্থিক আপত্তিগুলো দীর্ঘদিন ধরে অমীমাংসিত অবস্থায় ঝুলে আছে।

এ বিষয়ে জানতে প্রকল্প পরিচালক এ কে রেজাউল করিমের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে খবরের কাগজ। তিনি ফোন ধরেননি। রাজধানীর সড়ক ভবনে তার কার্যালয় ও প্রকল্প কার্যালয়ে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। প্রকল্পের অন্য কর্মকর্তারা অডিট আপত্তির বিষয়ে কোনো কথা বলতে রাজি হননি।

প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ল ২০২৭ পর্যন্ত

সাসেক ঢাকা (কাঁচপুর)-সিলেট-তামাবিল মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ এবং উভয় পাশে পৃথক সার্ভিস লেন নির্মাণ করতে ‘সাপোর্ট’ প্রকল্পটির মেয়াদ আরও দুই বছর বাড়ানো হয়েছে। সর্বশেষ সিদ্ধান্তের আলোকে এখন প্রকল্পের কাজ ২০২৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত চলবে।

২০১৮ সালের ২৩ অক্টোবর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটি প্রথম অনুমোদন পায়। সে সময় ডিপিপিতে (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) এই প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল ৩ হাজার ৮৮৫ কোটি ৭২ লাখ টাকা।

নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০১৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া এই প্রকল্পের সামগ্রিক মেয়াদ দাঁড়িয়েছে ২০২৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত। অর্থাৎ মূল মেয়াদের তুলনায় প্রকল্পটির মেয়াদ বৃদ্ধির হার এখন ৩০০ শতাংশ।

ভৌত অগ্রগতি এখনো ৫০ শতাংশের নিচেই

এই প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া চার বছর পেরিয়ে গেলেও কাঙ্ক্ষিত গতি পায়নি। প্রকল্পের সর্বশেষ তথ্য বলছে, সামগ্রিক ভৌত অগ্রগতি এখনো ৫০ শতাংশের নিচেই রয়ে গেছে। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, হবিগঞ্জ, সিলেট ও নরসিংদীর মতো জেলাগুলোতে ভূমি অধিগ্রহণের ধীরগতি মূল প্রকল্পের অবকাঠামো নির্মাণকাজকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। প্রকল্পের সবচেয়ে ধীরগতি পরিলক্ষিত হয়েছে নরসিংদী জেলায়। সেখানে ১৫৮ দশমিক শূন্য ৩ একর ভূমির মধ্যে মাত্র ৩৮ দশমিক ৩৫ একর জমি হস্তান্তর হওয়ায় ভৌত অগ্রগতির হার মাত্র ২১ দশমিক ৯৮ শতাংশে আটকে আছে।
মাঠপর্যায়ের তথ্য ও সরকারের বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণ মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) নিবিড় পরিবীক্ষণ প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, জেলা প্রশাসন ও প্রকল্প কর্তৃপক্ষের মধ্যে যোগাযোগের দীর্ঘসূত্রতা এবং মাঠপর্যায়ে যৌথ জরিপ পরিচালনায় অতিরিক্ত সময়ক্ষেপণ হয়েছে। খতিয়ান ও জমির মালিকানাসংক্রান্ত জটিলতা, ভূমির শ্রেণি পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট দেওয়ানি মামলা এবং দীর্ঘমেয়াদি আইনি বিরোধও জমি অধিগ্রহণে জটিলতার সৃষ্টি করেছে। এসব কারণে দফায় দফায় প্রকল্পের মেয়াদ বাড়াতে হয়েছে।

নতুন ‘সেফটি ইন্টারভেনশন’ পরিকল্পনা

ব্যয় সীমাবদ্ধ রাখতে প্রস্তাবিত নকশা থেকে ২২টি ওভারপাস ও ৭টি আন্ডারপাসসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা কাঠামো বাদ দিয়েছিল প্রকল্প অফিস। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সিদ্ধান্তের ফলে মহাসড়কটির ভবিষ্যৎ ট্রাফিক গতি এবং সার্বিক সড়ক নিরাপত্তা চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে। ‘রোড সেফটি অডিট’ প্রতিবেদনে বর্তমান নকশায় বেশ কিছু গুরুতর ‘ব্ল্যাক স্পট’ ও নিরাপত্তাঝুঁকি চিহ্নিত করা হয়েছে। চিহ্নিত ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে–রাস্তা বা মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে কোনো উড়াল সড়ক বা আন্ডারপাস না রাখা; সার্ভিস লেনের ধীরগতির যানবাহন মূল সড়কের দ্রুতগতির যানবাহনের সঙ্গে মিশে যাওয়া; মূল রাস্তা থেকে কোনো লেনে ঢোকা বা বেরিয়ে যাওয়ার সময় গতি কমাতে আলাদা লেন না থাকা; ত্রুটিপূর্ণ ফুটওভারব্রিজ।

এখন মহাসড়কের স্থায়িত্ব ও ব্যবহারকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নতুন করে ‘সেফটি ইন্টারভেনশন’ বা নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সড়ক অবকাঠামো প্রকল্পের নকশায় বিদ্যমান দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে এই সংশোধনী আনা হচ্ছে বলে জানা গেছে।

সময় ও ব্যয় বৃদ্ধির ঝুঁকি

আইএমইডির নিরীক্ষা প্রতিবেদন বলছে, অনুমোদিত নকশা সাইটে পৌঁছানোর আগে চেইনেজে (সাইটে) কাজ স্থগিত রাখতে বাধ্য হচ্ছেন ঠিকাদার। দাপ্তরিক অনুমোদনের এই বর্ধিত ‘রেসপন্স টাইম’ প্রকল্পের সামগ্রিক মেয়াদ ও ব্যয় উভয়ই বাড়িয়ে দিচ্ছে, যা প্রকল্পের সময় ও ব্যয় বৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি করছে।

সাত বছর আগে করা প্রাথমিক সমীক্ষায় ভূগর্ভস্থ মাটির বৈশিষ্ট্য সঠিকভাবে নিরূপণ করা হয়নি। এর ফলে বাস্তবে সড়ক অ্যালাইনমেন্টে ক্ষতিকর মাটি ও নরম কাদার উপস্থিতি ধরা পড়েছে। তাই মাঝপথেই নকশা সংশোধন করতে হচ্ছে।

২০২৪ সালের আগস্ট-পরবর্তী পরিস্থিতিতে ঠিকাদারদের অভ্যন্তরীণ আর্থিক তারল্যসংকট এবং নগদ অর্থের প্রবাহ সংকুচিত হয়ে পড়ায় নির্মাণকাজের স্বাভাবিক ধারাবাহিকতা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

ঋণচুক্তি অনুযায়ী, দরপত্র প্রক্রিয়ার প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপে, বিশেষ করে কারিগরি ও আর্থিক মূল্যায়নের ক্ষেত্রে এডিবির পূর্ব অনুমোদন বা ‘নো অবজেকশন’ গ্রহণ করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু এই অনুমোদনের জন্য এডিবির দীর্ঘস্থায়ী প্রক্রিয়া প্রকল্পের সময়সীমাকে প্রলম্বিত করেছে। এ ছাড়া এডিবির ক্রয় বিভাগ বারবার বিভিন্ন বিষয়ে ব্যাখ্যা চাওয়ার ফলে সময়ক্ষেপণ হয়েছে। উচ্চমূল্যের ক্রয়ের ক্ষেত্রে এডিবির সদর দপ্তর সময়ক্ষেপণ করেছে বলে ব্যাখ্যা দিয়েছে আইএমইডি।

ক্রয় প্রক্রিয়ার ধীরগতির কারণে ঠিকাদারদের জমা দেওয়া দরপত্রের বৈধতার মেয়াদ বারবার বাড়াতে হয়েছে। এডিবি গাইডলাইনের স্বাভাবিক নিয়ম ভঙ্গ করে এই মেয়াদ ১২০ থেকে সর্বোচ্চ ৩৯৫ দিন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।