শেরপুরের নাকুগাঁও স্থলবন্দর দিয়ে ১৯টি পণ্য আমদানির অনুমতি থাকলেও শুধু আমদানি হতো কয়লা ও পাথর। তবে গত দুই বছর ধরে কয়লা আমদানি বন্ধ রয়েছে। পাথর আমদানিতে কিছুটা সচল ছিল বন্দরের কার্যক্রম। তবে চার মাস ধরে ভারত থেকে কোনো পাথরও আসছে না। ফলে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন বন্দরের শ্রমিকরা, ব্যবসায়ীরাও পুঁজি বিনিয়োগ করে অসুবিধায় পড়েছেন।
১৯৯৭ সালে নাকুগাঁও শুল্ক বন্দরের কার্যক্রম শুরু হয়। পরে ২০০২ সালে এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এ বন্দর দিয়ে কয়লা ও পাথর ছাড়া সব পণ্য আমদানি বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এরপর ২০০৯ সালের ১২ ডিসেম্বর তৎকালীন নৌপরিবহন মন্ত্রী শাহজাহান খান বন্দরটি পরিদর্শনে এসে স্থলবন্দরটিকে পূর্ণাঙ্গ বন্দর হিসেবে চালুর ঘোষণা দেন। পরবর্তী সময়ে ২০১১ সালের ৩১ ডিসেম্বর নৌপরিবহন মন্ত্রী নাকুগাঁও এলাকায় পূর্ণাঙ্গ বন্দরের অবকাঠামোর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। সাড়ে ১৩ একর জমির ওপর ১৬ কোটি ১৯ লাখ টাকা ব্যয়ে বন্দরের অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়। এ ছাড়া সড়ক ও জনপথ বিভাগের অধীনে ২৩৯ কোটি টাকা ব্যয়ে নাকুগাঁও থেকে নকলা উপজেলা পর্যন্ত সাড়ে ২৯ কিলোমিটার সড়কের কাজ করা হয়। ২০১৫ সালের ১৮ জুন নাকুগাঁও স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের নিজস্ব পরিচালনায় কার্যক্রম শুরু হয়।
নাকুগাঁও স্থলবন্দর দিয়ে গবাদিপশু, মাছের পোনা, তাজা ফলমূল, গাছ-গাছড়া, বীজ, গম, পাথর, কয়লা, রাসায়নিক সার, চায়না ক্লে, কাঠ, টিম্বার, চুনাপাথর, পেঁয়াজ, মরিচ, রসুন, আদা, বলক্লে ও কোয়ার্টজ আমদানি করার অনুমতি মেলে । এতগুলো পণ্যের আমদানি করার অনুমতি থাকলেও আসতো শুধু পাথর। শুরুর দিকে কয়লা আমদানি করা হলেও পরিবেশবাদীদের আন্দোলনের মুখে তা বন্ধ হয়ে যায়। এরপর এ বন্দর দিয়ে ভারত ও ভুটান থেকে ট্রাক ভর্তি শুধু আসতো পাথর।
কিন্তু গত ৮ জুলাই থেকে ভারতের ব্যবসায়ীরা রাস্তা মেরামতের নামে হঠাৎ করে পাথর রপ্তানি বন্ধ করে দেয়। তবে এক সপ্তাহের কথা বললেও চার মাস হতে চললেও এখনো ভারত থেকে কোনো পাথরের ট্রাক আসছে না।
তবে, সম্প্রতি ভুটান থেকে কয়েকটি পাথরের ট্রাক নাকুগাঁওয়ে আসে। কিন্তু যে পরিমাণে পাথর এসেছে, তা একেবারে সামান্য।
স্থানীয় ব্যবসায়ী আজাদ মিয়া বলেন, ‘আমাদের অনেক ব্যবসায়ী লাখ লাখ টাকার ঋণপত্র (এলসি) খুলেছেন ভারতে। কিন্তু পাথর আটকে আছে সেখানে। আমরা খুব মুশকিলে আছি। শুধু আশ্বাস পাচ্ছি পাথর আসবে, কিন্তু আসে না। তাই আমি দাবি জানাচ্ছি যেন দ্রুতই ভারত থেকে এই বন্দরে পাথর আসে।’
ব্যবসায়ী আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, ‘আমাদের আমদানি-রপ্তানিকারক সমিতির নেতাদের সঙ্গে ভারতের মেঘালয়ের ব্যবসায়ী নেতাদের যোগাযোগের ঘাটতি থাকায় আজকে ব্যবসার আমাদের এই দশা। লাখ লাখ টাকা পুঁজি খাটিয়ে চার মাস ধরে বেকার বসে আছি। আশা করি, আমাদের দেশের ব্যবসায়ী নেতারা নিয়মিত যোগাযোগ করলে দ্রুতই সংকটের সমাধান হবে।’
বন্দরের শ্রমিক নেকবর আলী বলেন, ‘বন্দরে কাজ করেই তিনি সংসার চালান। কিন্তু চার মাস ধরে বসে আছি। খুব কষ্ট করতেছি। পাথর আর আসে না, আমাদের কাজও নাই। সকালে বন্দরে আসি, বিকেলে খালি হাতে বাড়িতে যাই। আমরা চাই এই বন্দর দিয়ে সব কিছু আসুক, তাহলে আমরা সংসার সুন্দরভাবে চালাতে পারব।’
নাকুগাঁও স্থলবন্দরের লোড-আনলোড শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক সুজন মিয়া বলেন, ‘অনেক দিন ধরে শুনছি এই বন্দর দিয়ে অনুমোদিত সব পণ্য আসবে। তবে পাথর ছাড়া কিছুই আসে না। এখন পাথরও বন্ধ। এখানে অনেক শ্রমিক কাজ করে সংসার চালান, কাজ না থাকায় তারাও বিপাকে পড়েছেন।’
নাকুগাঁও স্থলবন্দরের লোড-আনলোড শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি আলম মিয়া বলেন, ‘কয়লা আমদানি হয় না দুই বছরের বেশি সময় ধরে। তারপরও ভারত ও ভুটান থেকে ট্রাক বোঝাই করে পাথর আসতো। এখানে শ্রমিকরা এই পাথরের উপর নির্ভর করে টিকে থাকত। কিন্তু সেটিও বন্ধ হয়ে গেছে। এখানে প্রায় ৫ হাজারের বেশি শ্রমিক কাজ করে, তারা এখন বেকার। বর্তমানে সবাই মানবেতর জীবন-যাপন করছেন।’
নাকুগাঁও স্থলবন্দরের আমদানি-রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান মুকুল বলেন, ‘ভারতের ব্যবসায়ীরা রাস্তা মেরামতের কথা বলে প্রায় চার মাস ধরে পাথর রপ্তানি বন্ধ রেখেছে। পাথর আমদানি বন্ধ থাকায় এ বন্দরের ব্যবসায়ীদের ৬০ থেকে ৭০ কোটি টাকা আটকা পড়ে আছে। এতে লোকসানের মুখ দেখতে হচ্ছে। ভারতে আমরা যোগাযোগ রাখছি। তারা বলছে খুব দ্রুতই পাথর রপ্তানি শুরু হবে। আশ্বাস মেললেও কিন্তু পাথর আর আসে না। মাঝে মধ্যে ভুটান থেকে অল্প অল্প করে ট্রাক দিয়ে পাথর আসতেছে, কিন্তু পরিমাণে অল্প থাকায় পাথর জমানোও যাচ্ছে না। বন্দরের এমন অবস্থা থাকায় একদিকে যেমন ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, অন্যদিকে কর্মরত শ্রমিকরাও কর্মহীন হয়ে আছেন। পাশাপাশি সরকারও রাজস্ব হারাচ্ছে।’
নাকুগাঁও স্থলবন্দরের সহকারী পরিচালক (ট্রাফিক) পার্থ ঘোষ বলেন, ‘চলতি বছরের জুন মাসে নাকুগাঁও বন্দরের মাধ্যমে সরকারের রাজস্ব আদায় হয়েছে ৮৫ লাখ ৮৮ হাজার টাকা। আর জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত ভুটানের কিছু পাথর আসায় অল্প পরিমাণে রাজস্ব আদায় হয়েছে। এ ছাড়া ডলার সংকট না থাকলে আর আমদানি কার্যক্রম চালু থাকলে এ বন্দরে চার মাসে রাজস্ব আদায় হতো প্রায় দুই কোটি টাকা। আমরা, দ্রুত সময়ের মধ্যে ভারতীয় পাথর আমদানির ব্যাপারে সরকারিভাবে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিব। আশা করছি, কিছুদিনের মধ্যে সব কিছু স্বাভাবিক হবে এবং পাথর আমদানি শুরু হবে।’