আগামী (২০২৫-২৬) বাজেটে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে শিক্ষা খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় একগুচ্ছ পদক্ষেপ গ্রহণে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবে শিক্ষা উপকরণের দাম কমাতে উৎপাদন ও আমদানিতে সব ধরনের রাজস্ব মওকুফ সুবিধা বহাল রাখার সুপারিশ করা হয়েছে।
উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের এসব প্রস্তাব খতিয়ে দেখে অনুমোদন দেওয়ার পর চূড়ান্ত বাজেটে অর্ন্তভুক্ত করা হবে। এ ক্ষেত্রে উপদেষ্টা পরিষদ প্রস্তাব বাতিল বা সংশোধন করতে পারে। আবার সম্পূর্ণ নতুন প্রস্তাবও যোগ করতে পারে।
অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘আগামী বাজেটে শিক্ষা খাতে গুরুত্ব বাড়ানো হবে। শুধু তাই না শিক্ষা খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠায়ও জোর দেওয়া হবে।’ নাম প্রকাশ না করার শর্তে অর্থ মন্ত্রণালয়ের বাজেট প্রণয়ন কমিটির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা খবরের কাগজকে বলেন, ‘এবার প্রধান উপদেষ্টা নিজেই আগামী বাজেটে শিক্ষা খাতে গুরুত্ব বাড়াতে নির্দেশ দিয়েছেন। প্রধান উপদেষ্টার নির্দেশ সামনে রেখে বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়া হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকেও সুপারিশ নেওয়া হয়েছে। সবকিছু বিবেচনায় রেখে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে কিছু প্রস্তাব প্রণয়ন করা হয়েছে।’
অর্থ মন্ত্রণালয়ের শিক্ষা বাজেটবিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি (২০২৪-২৫) অর্থবছরের বাজেটে জিডিপি (মোট দেশজ উৎপাদন) অনুপাতে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ এর আগের (২০২৩-২৪) অর্থবছরের তুলনায় কমানো হয়েছে। বাজেটে শিক্ষা খাতে মোট বরাদ্দ জিডিপির তুলনায় ১ দশমিক ৬৯ শতাংশ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে শিক্ষা খাতে মোট বরাদ্দ ছিল জিডিপির ১ দশমিক ৭৬ শতাংশ। ২০২২-২৩ অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল জিডিপির ১ দশমিক ৮৩ শতাংশ এবং ২০২১-২২ অর্থবছরে ছিল ২ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ। বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠনের পক্ষ থেকে থেকে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষায় বাজেট-বরাদ্দ বাড়ানোর দাবি জানানো হচ্ছে। সবার জন্য কর্মোপযোগী উপযুক্ত শিক্ষা প্রসারের মাধ্যমে যুবকদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা সম্ভব। শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য গবেষণায় পর্যাপ্ত তহবিল বরাদ্দ বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জুলাই আন্দোলনে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করে। নতুনভাবে রাষ্ট্রের কাঠামো নির্মাণে পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য বর্তমান সরকার অঙ্গীকার করেছে। বিশেষভাবে শিক্ষার সুস্থ পরিবেশ নিশ্চিত ও শিক্ষা খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা এখন জরুরি হয়ে পড়েছে। শিক্ষাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে এক শ্রেণির অসাধু মানুষ বড় অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাইরে কোচিং সেন্টারের ব্যবসাতেও এসব ব্যক্তি জড়িত।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন দুটি বিভাগ রয়েছে। এর মধ্যে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ এবং কারিগরি ও মাদ্রাসা বিভাগের জন্য আলাদা বরাদ্দ রাখা হয়। এ ছাড়া প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্যও বরাদ্দ থাকে। প্রতি বিভাগের জন্য আনুপাতিক হারে বরাদ্দ বাড়ানোর আহ্বান জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিক্ষায় সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে প্রাথমিক পর্যায় থেকে পদক্ষেপ নিতে হবে। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নতুন বছরের শুরুতেই বেতন বাড়ানো হয়, যা খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি বাড়াতে প্রত্যক্ষভাবে ভূমিকা রাখছে। খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতিতে লাগাম টানতে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বেতন বাড়ানোয় কড়াকড়ি আনতে হবে। মানহীন কোচিং সেন্টারের কারণে শিক্ষা খাতে সুশাসন নষ্ট হচ্ছে। এসব বন্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে। শিক্ষা উপকরণের দাম বাড়ার কারণেও খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি বাড়ছে। আবার সিন্ডিকেট করে এসব পণ্যের দাম বাড়ানোয় শিক্ষা খাতে সুশাসন নষ্ট হচ্ছে। শিক্ষা উপকরণ উৎপাদন এবং আমদানিতে রাজস্ব (শুল্ক কর ভ্যাট) আদায়ে ছাড় দিতে হবে। অতি প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণের রাজস্ব মওকুফ সুবিধা আগামী দুই অর্থবছরের জন্য বহাল রাখতে হবে। একই সঙ্গে বাজারে দাম নিয়ন্ত্রণ করতে নজরদারি বাড়াতে আগামী বাজেটে অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, ‘বিগত সরকারের সময়ে শিক্ষা খাতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হলেও শেষ পর্যন্ত তার বেশির ভাগই বাস্তবায়ন হয়নি। উন্নত দেশের তুলনায় আমাদের দেশে শিক্ষাবিষয়ক গবেষণা, পড়ালেখার মান অনেক পিছিয়ে।’
তিনি বলেন, ‘ডিসেম্বর থেকে জুনের মধ্যে নির্বাচন হলে আগামী বাজেট অন্তর্বর্তী সরকারের প্রণীত একমাত্র বাজেট। যেহেতু বর্তমান সরকার অরাজনৈতিক সরকার- তদবির, সুপারিশের কোনো চাপ এই সরকারের ওপর থাকার কথা না, তাই এই নিরপেক্ষ সরকারের উচিত শিক্ষার মতো অতি গুরুত্ব খাতে এমন কিছু আইনি পদক্ষেপ নেওয়া, যা ভবিষ্যতের নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকারও যেন মানতে বাধ্য হয়। শিক্ষা খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা খুব জরুরি। শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানো উচিত। মনে রাখতে হবে পর্যাপ্ত তহবিল না থাকলে কোনো পরিকল্পনাই বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় না।’
এরই মধ্যে প্রধান উপদেষ্টা আগামী অর্থবছরের বাজেটের রূপরেখা কেমন হবে তা নিয়ে অর্থ উপদেষ্টা, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান, প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়, অর্থ মন্ত্রণালয় ও এনবিআরের বাজেট প্রস্তুত কমিটির কর্মকর্তাদের নিয়ে একাধিক বৈঠক করেছেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে শিক্ষা খাতের মানোন্নয়নে পাঠানো সুপারিশমালা নিয়েও এসব বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। আধুনিক শিক্ষা খাত গড়ে তুলতে আগামী বাজেটে শিক্ষা খাতে গুরুত্ব বাড়ানোর বিষয়ে সবাই একমত হয়েছেন।
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান এবং নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নাসির উদ্দিন খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমাদের দেশের বাজেটে উন্নয়ন ব্যয়ের বেশির ভাগই ব্যয় হয় অবকাঠামোতে আর পরিচালন ব্যয়ের বেশির ভাগ খরচ হয় বেতন-ভাতা বাবদ। বিগত সময়ে শিক্ষা খাতে গুরুত্ব কম ছিল। শিক্ষা খাতের জন্য যে সব প্রস্তাব বাজেটে রাখা হয়েছিল তা গতানুগতিক। গুণগত শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের জন্য যা যথেষ্ট না। আগামী বাজেটে এসব বিষয়ে সঠিক পদক্ষেপ নিতে হবে।’