২০১৫ সালে বয়সভিত্তিক দলের নির্বাচক হিসেবে বিসিবিতে এসেছিলেন হান্নান সরকার। জাতীয় দলের হয়ে ২০ ওয়ানডে ও ১৭ টেস্ট খেলা হান্নান বয়সভিত্তিক দলে কাজ করেছেন দীর্ঘ ৯ বছর। এবার সিনিয়র দলের নির্বাচক হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন। বয়সভিত্তিক দলকে সাফল্য এনে দেওয়া হান্নান চান জাতীয় দলেও একই ধরনের প্রভাব রাখতে। সিনিয়র দলের নির্বাচক হিসেবে কী পরিকল্পনা নিয়ে এগোবেন এবং দায়িত্ব পাওয়ার পর অনুভূতি কী? সেসব নিয়ে হান্নান সরকার কথা বলেন খবরের কাগজের ক্রীড়া প্রতিবেদক পার্থ রায়ের সঙ্গে।
দীর্ঘদিন বয়সভিত্তিক দলে নির্বাচক ছিলেন। এখন সিনিয়র দলে এলেন। পথচলাটা কেমন ছিল?
হান্নান সরকার- আমি দীর্ঘ ৮ বছর ৮ মাস বিভিন্ন বয়সভিত্তিক দলে কাজ করলাম। মূলত দেখা হয় অনূর্ধ্ব ১৯ দলের পারফরম্যান্স দিয়ে। একেক বার একেক নির্বাচক অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের দলগুলো নির্বাচন করে। রোটেশন অনুযায়ী আমি ২০২০ এবং ২০২৪ অনূর্ধ্ব ১৯ বিশ্বকাপ দল নির্বাচন করেছি। সৌভাগ্যবশত ২০২০ সালে দল চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। ২০২৪ সালে আবার দল নির্বাচন করলাম, এবার দল এশিয়া কাপ চ্যাম্পিয়ন হলো। এটা হয়তো বা ক্রিকেট বোর্ডের নজরে ছিল। কাজের প্রসেসটা কী সেটা তো ফল দেখে বোঝা যায়। দল যেহেতু ভালো ফল এনেছে তাই...। পাপন ভাই এবার বিশ্বকাপের সময় ব্যক্তিগতভাবে প্রতি ম্যাচের আগে ও পরে কথা বলেছেন। পাপন ভাই আমার কাজ খুব কাছ থেকে দেখেছেন। পাশাপাশি অন্যান্য বোর্ড পরিচালকরাও দেখেছেন। সবচেয়ে ভালো জিনিস হলো- আমি অনূর্ধ্ব ১৯ পর্যায়ে যাদের সঙ্গে কাজ করেছি এরাই এখন জাতীয় দলকে নেতৃত্ব দেবে। এখন শুধু তো বয়সভিত্তিক দল না, এখানে যারা খেলেনি তাদেরকে নিয়েও কাজ করতে হবে। বয়সভিত্তিক দলে যেমন নিজের লজিক দিয়ে কাজ করেছি, এখনো সেটাই করব।
বয়সভিত্তিক দলে যাদের সঙ্গে কাজ করেছেন, এখনো তাদের সঙ্গে কাজ করবেন। ভবিষ্যতে কাজ করাটা সহজ হবে কি না?
হান্নান সরকার- বিষয়টা হলো, আমি যোগ দেওয়ার পরপরই শান্ত-মিরাজরা বয়সভিত্তিক দল থেকে বের হয়ে গেছে। ওদেরকে যতটা কাছ থেকে দেখেছি, তার চেয়ে বেশি কাছ থেকে দেখেছি শরিফুল-তাওহিদ হৃদয়দের। যেহেতু ওদের সঙ্গে প্রায় দেড় বছর কাজ করেছি। ওদের মধ্যে অনেকে এখন জাতীয় দলে খেলছে। বাকিরাও প্রায় জাতীয় দলের আশেপাশে। তাই আমার জন্য সহজ হবে, কারণ ওরা আমার ভাষা বোঝে, ইশারা বোঝে। সবকিছু মিলিয়ে এটা আমার অনেক কাজ সহজ করে দেবে। ওদের চিন্তাভাবনাগুলো আমার জন্য বুঝা সহজ হবে। তবে এটা সত্য, আমি সাকিব-তামিমদের সঙ্গেও কাজ করব। ওদের সঙ্গে কাজ করতে আসলে কোনো বাধা হবে না। কারণ, তামিমের সঙ্গে আমি একই দলে খেলেছি। মুশফিকের সঙ্গে একই দলে কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে। এদের সঙ্গে আমার কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে। যেহেতু ভবিষ্যৎ ক্রিকেট নিয়ে কথা হচ্ছে, ভবিষ্যতে যারা খেলবে, তাদের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা আমাকে ভালো সুবিধা দিবে।
সিনিয়র দলের দায়িত্ব পাওয়ায় প্রত্যাশার চাপ বাড়ল কি না?
হান্নান সরকার- চাপ তো সব সময় থাকে এবং থাকবে। আমি আমার কাজ কতটুকু ডেডিকেশন নিয়ে করতেছি এবং কতটুকু সৎ থাকতে পারতেছি এটা মূল বিষয়। সেই জায়গাগুলো যদি ঠিক থাকে তাহলে কোনো চাপই চাপ না। অনূর্ধ্ব ১৯ দলের এই রকম হয়তো চাপ ছিল না, তবুও কিছুটা ছিল। খেলোয়াড়ি জীবনেও চাপ সামলাতে হয়েছে। চাপ ছোটবেলা থেকে সামলাতে হয়েছে। তাই চাপকে আর চাপ মনে করি না।
পুরোনো নির্বাচক রাজ্জাক ও প্রধান নির্বাচক গাজী আশরাফ হোসেন লিপুর সঙ্গে বোঝাপড়াটা কেমন হবে?
হান্নান সরকার- রাজের সঙ্গে অনেকদিন ঘরোয়া ক্রিকেটে একই দলে খেলেছি। রাজ-আমি সমবয়সী। রাজ আমার বন্ধু। তাতে অবশ্যই বোঝাপড়াটা ভালো হবে। পেশাদার জায়গায় এই পরিচয়টা রাখতে চাই না। পেশাদার জায়গায় পেশাদার পরিচয়টা রাখব। বন্ধুত্ব বন্ধুত্বের জায়গায়। যেহেতু আমরা সমবয়সী তাই বোঝাপড়ার ক্ষেত্রে অনেক কিছু মিলে যায়। আর লিপু ভাই আমাকে ছোটবেলা থেকে চেনেন। খুব কাছ থেকে দেখেছেন। লিপু ভাই আমাকে ব্যক্তিগতভাবে পছন্দ করেন। তাতে আমার মনে হয়, আমাদের মধ্যে বোঝাপড়াটা ভালো হবে।
শান্ত অধিনায়কত্ব কেমন করবে বলে মনে হয়?
হান্নান সরকার- আমি সিলেক্টর হিসেবে শান্তর অধিনায়কত্ব দেখিনি। বঙ্গবন্ধু টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্টে মিনিস্টার রাজশাহী দলের ম্যানেজার হিসেবে ছিলাম আমি। ওই দলে অনেকে অধিনায়ক হওয়ার মতো ছিল। তবে সবাইকে বাদ দিয়ে শান্তকে অধিনায়কত্ব দেওয়া হয়েছিল। শান্তর মধ্যে অধিনায়ক হওয়ার সব যোগ্যতা আছে। ওর যে ব্যক্তিত্ব ও যোগাযোগ- সব সময় আমার কাছে মনে হয় স্মার্ট। শান্ত অধিনায়ক হিসেবে খুব ভালো হবে। আমি কাছ থেকে দেখেছি- সিনিয়রদেরকেও খুব ভালোভাবে হ্যান্ডেল করতে পারে। আমার কাছে মনে হয় শান্ত খুব ভালো করবে।
সিনিয়র ক্রিকেটারদের নিয়ে নির্বাচক হিসেবে আপনার ভাবনা কী?
হান্নান সরকার- তাদেরকে আমি বয়স দিয়ে বিচার করব না। আমার ব্যক্তিগত মত হলো- আমি বয়সে যেতে চাই না। তাদের পারফরম্যান্স দেখতে চাই। দলের জন্য যদি সে ভালো হয়, বয়স যা-ই হোক তাদেরকে নেওয়া হবে। পারফর্ম করে এবং ফিটনেস দিয়ে যদি টিকে থাকতে পারে তাহলে অবশ্যই থাকবে। পাশাপাশি তাদের সঙ্গে তুলনা করে বিকল্প কেমন আছে সেটাও দেখব আমরা। আমি কখনই মনে করি না কারও শেষ সময় বা তারা আর পারবে না। তাদেরকে নিয়ে পরিকল্পনা করব। বয়স ৫০ হলেও যদি পারফরম্যান্স থাকে তাদেরকে অবশ্যই দলে নেওয়া হবে।
সাবেক নির্বাচকদের কাছ থেকে কী ধরনের সহযোগিতা চান?
হান্নান সরকার- নান্নু ভাই-সুমন ভাইরা বাংলাদেশের কিংবদন্তি ক্রিকেটার। তারা এতদিন দল নির্বাচন করে গেছেন তাদের পারফরম্যান্স দিয়ে। এত বছর দল নির্বাচন করা সহজ ব্যাপার না। এই চ্যালেঞ্জ তারা উতরে গেছেন। এই জায়গায় চ্যালেঞ্জ থাকবে, অনেক কিছু থাকবে। আমি যদি ঠিক থাকি তাহলে আমিও পারব। সবচেয়ে বড় বিষয় যেদিন আমি অনুভব করব, আমার কিছু দেওয়ার নাই সেদিন আমি সরে যাব। ওনারা যতদিন ফিল করেছেন কাজ করতে পারবেন, তারা করেছেন। এটা অনেক বড় অনুপ্রেরণা। পাশাপাশি ওনাদের কাছ থেকে যত সম্ভব পরামর্শ নেওয়ার চেষ্টা করব। নান্নু ভাই-বাশার ভাইদের সঙ্গে কথা বলে ইতিবাচক বিষয়গুলো নেওয়ার চেষ্টা সব সময় থাকবে।