দেখতে দেখতে অনেকটা পথ পেরিয়ে গেছেন রোহিত শর্মা এবং বিরাট কোহলি। রোহিতের বয়স ছুঁয়েছে ৩৭, কোহলির ৩৫। দীর্ঘকাল ধরে ক্রিকেটপাগল দেশ ভারতের ব্যাটন তাদের হাতে। মশাল হয়ে আশার আলো ছড়িয়ে যাচ্ছেন তারা। আজও ভক্তদের প্রত্যাশা দুজনকে ঘিরে। আইসিসি টুর্নামেন্টে দীর্ঘ খরা শেষ করতে ভরসা রাখছে রোহিত-কোহলির ওপর। সমর্থকদের স্বপ্নপূরণে আর শিরোপায় চুমু আঁকার লক্ষ্যে আরেকবার জোট হয়ে নামছেন ভারতীয় ক্রিকেটারের দুই কাণ্ডারি।
বৈশ্বিক টুর্নামেন্টে ভারতের সবশেষ সাফল্য ২০১৩ চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি জয়। এরপর আইসিসি ইভেন্টে তিন ফাইনালে হারে ক্রমেই দীর্ঘ হয়েছে তাদের শিরোপা খরা। ২০১৪ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে, ২০১৭ চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে এবং সবশেষ ঘরের মাটিতে ২০২৩ ওয়ানডে বিশ্বকাপে ফাইনাল হেরেছে এশিয়ার পরাশক্তিরা। তিন ব্যর্থতায় ভারতের অপেক্ষা এখন ১১ বছরের। অপেক্ষার ঘড়ি থামাবেন রোহিত-কোহলি- এমনটাই প্রত্যাশা এখন ভারতজুড়ে। দুজনেই ভারতের অতীত বিশ্বকাপ জয়ের গৌরবের অংশ। ২০০৭ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন ভারতের সদস্য ছিলেন রোহিত। ২০১১ ওয়ানডে বিশ্বকাপ জেতার পর তরুণ কোহলি ক্রিকেট আইকন শচীন টেন্ডুলকারকে কাঁধে নিয়ে মাঠ প্রদক্ষিণ করেছিলেন। ওটাই ছিল ভারতীয়দের শেষ বিশ্বকাপ জয়।
রোহিত-কোহলি এক হয়ে বহুবার চেষ্টা করেছে ভারতের গৌরব ফিরিয়ে আনার। কখনো অধিনায়ক হয়ে, কখনো বা স্রেফ ব্যাটারের ভূমিকায়। প্রত্যাশা মেটাতে না পেরে নেতৃত্ব হারানোর মতো ঘটনার মুখোমুখি হতে হয় কোহলি। ২০২১ সালে চাপের মুখে টি-টোয়েন্টি দলের অধিনায়কত্ব ছাড়েন তিনি এবং পরের বছর ওয়ানডে দলের নেতৃত্ব থেকে তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়। আর বুড়ো বয়সেও রোহিতের কাঁধে অধিনায়কত্বের চাপ, যিনি মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সকে পাঁচবার জিতিয়েছেন আইপিএল শিরোপা। কিন্তু অধিনায়ক রোহিতে আজও ট্রফিহীন ভারত। ক্যারিয়ারের শেষ লগ্নে এসে আজন্মের আক্ষেপ ঘুচানোর আরেকটি সুযোগ পাচ্ছেন তিনি। বলা যায়, সেরা সুযোগ। কারণ সদ্য সমাপ্ত আইপিএলে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক কোহলিকে পাচ্ছেন রোহিত। আর তাদের দল ভারতও টুর্নামেন্টে অংশ নেবে আইসিসি টি-টোয়েন্টি র্যাঙ্কিংয়ে শীর্ষে থেকে।
সুসময়ে রোহিতের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা দেখছেন ভারতের সাবেক ক্রিকেটার মোহাম্মদ কাইফ। বলেছেন, ‘গ্রুপ পর্বে ভারতের তেমন প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখছি না। টুর্নামেন্টে তাদের দুটি প্রধান ম্যাচ আছে- সেমিফাইনাল এবং ফাইনাল। আপনি (রোহিত) কি সেই দুই দিনের জন্য প্রস্তুত? এটাই আপনার জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।’ স্টার স্পোর্টসকে কাইফ আরও বলেছেন, ‘রোহিত জানেন যে তিনি আর খুব বেশি সময় খেলতে যাচ্ছেন না। দুই বা তিন বছর বাকি। বিরাট কোহলির ক্ষেত্রেও তাই। তাই রোহিত এবং কোহলির জন্য এটাই শেষ সুযোগ। তারা আহমেদাবাদে বিশ্বকাপের ফাইনালে হেরেছে। তারা এমনভাবে খেলেছিল যেন তাদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। হৃদয় ভেঙে গেছে এবং ভক্তরা বিধ্বস্ত হয়েছে।’ ভাঙা হৃদয় জোড়া লাগানোর মিশন নিয়ে টিম ভারত এখন যুক্তরাষ্ট্রে। মার্কিন মুল্লুকে গ্রুপ পর্বের সবকটি ম্যাচ খেলবেন রোহিত-কোহলিরা।
বিশ্বকাপে নেই আইপিএল জয়ী কেউ
আইপিএল খেলে বিশ্বকাপের প্রস্তুতি নিয়েছে ভারতীয় ক্রিকেটাররা। মজার বিষয় হলো শিরোপা জয়ী কলকাতা নাইট রাইডার্সের কোনো ক্রিকেটার নেই ভারতের বিশ্বকাপ দলে! তবে সেরা পারফর্মাররা ঠিকই আছে যুক্তরাষ্ট্রে। সদ্য সমাপ্ত লিগে সর্বোচ্চ ৭৪১ রান ছিল কোহলির। তালিকার পাঁচে থাকা সাঞ্জু স্যামসন (৫৩১ রান) ঠাঁই পেয়েছেন বিশ্বকাপ পরিকল্পনায়। টুর্নামেন্টে দারুণ পারফর্ম করে বিশ্বকাপ খেলতে গেছেন জাসপ্রিত বুমরাহ, আর্শদ্বীপ সিং এবং যুজবেন্দ্র চাহাল। সর্বোচ্চ উইকেট শিকারির তালিকায় তিনজনে রয়েছেন সেরা দশের তালিকায়। বুমরাহ সেরা ছন্দে আছেন। আইপিএলে ১৩ ম্যাচ খেলে শিকার করেছেন ২০ উইকেট। আসরে তৃতীয় সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি ছিলেন তিনি। ১৪ ম্যাচে ১৯ উইকেট নিয়ে আর্শদ্বীপ সাতে এবং চাহাল ১৫ ম্যাচে ১৮ উইকেট নিয়ে দশে থেকে আইপিএল শেষ করেছেন। এবার জাতীয় দলের জার্সিতে বিশ্বকাপ মাতানো পালা তাদের।
ওপেনিংয়ে দেখা যেতে পারে কোহলিকে
আইপিএলের সবশেষ আসরে ওপেনারের ভূমিকায় ছিলেন কোহলি। সফলও হয়েছেন ব্যাট হাতে। তাই গুঞ্জন উঠেছে, বিশ্বকাপেও ওপেনিংয়ে দেখা যেতে পারে তাকে। সাবেক ভারতীয় ব্যাটার অজয় জাদেজা তো ওপেনারের ভূমিকায় দেখছেন কোহলিকে। তার কথায়, ‘আমার মতে, বিশ্বকাপে কোহলি ওপেন করতে চলেছে। সে দারুণ ধারাবাহিক ছন্দে আছে, যা আপনাকে ব্যবহার করতে হবে। ব্যাটিং লাইনআপের শুরুতে সে সেরা এবং পাওয়াপ্লে তাকে উইকেটে থিতু হওয়ার সুযোগ দেয়।’
জাতীয় দলে তিন নম্বর ব্যাটার কোহলি। এই পজিশনে ৮০ ম্যাচ খেলে রান করেছেন ৩ হাজার ৭৬। আছে একটি সেঞ্চুরি। ওপেনিংয়ে নেমেই সেঞ্চুরির দেখা পেয়েছিলেন তিনি। ভারতের জার্সিতে টি-টোয়েন্টিতে মাত্র ৯ ম্যাচে ওপেন করেছেন কোহলি। এক সেঞ্চুরি এবং দুই হাফ সেঞ্চুরিতে করেছেন ৪০০ রান। যুক্তরাষ্ট্র এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজ আয়োজিত টুর্নামেন্টে তাকে কোথায় ব্যবহার করে ভারত- সেটাই এখন দেখার অপেক্ষা।
অভিযান শুরু ৫ জুন
আয়ারল্যান্ড ম্যাচ দিয়ে বিশ্বকাপ শুরু করবে ভারত। নিউইয়র্কের নাসাউ কাউন্টি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে ম্যাচটি গড়াবে আগামী ৫ জুন। ৯ জুন একই ভেন্যুতে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানের মুখোমুখি হবেন রোহিতরা। এই মাঠে তারা তাদের তৃতীয় ম্যাচ খেলবে ১২ জুন, প্রতিপক্ষ সহ-আয়োজক যুক্তরাষ্ট্র। ‘এ’ গ্রুপে ভারতের শেষ ম্যাচ ফ্লোরিডায় কানাডার বিপক্ষে (১৫ জুন)। আসর শুরুর আগে তারা একটি মাত্র প্রস্তুতি ম্যাচ খেলবে বাংলাদেশের বিপক্ষে ১ জুন। ভেন্যু নাসাউ কাউন্টি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়াম।
দল: রোহিত শর্মা (অধিনায়ক), যশস্বী জয়সওয়াল, বিরাট কোহলি, ঋষভ পন্ত, সাঞ্জু স্যামসন, সূর্যকুমার যাদব, হার্দিক পান্ডিয়া, শিভম দুবে, রবীন্দ্র জাদেজা, অক্ষর প্যাটেল, আর্শদ্বীপ সিং, জাসপ্রিত বুমরাহ, যজবেন্দ্র চাহাল, কুলদ্বীপ যাদব এবং মোহাম্মদ সিরাজ।