বিশ্ব রাজনীতি থেকে অর্থনীতি, তথ্য প্রযুক্তি- প্রতিটি ক্ষেত্রে শীর্ষ নাম যুক্তরাষ্ট্র। বিশ্ব রাজনীতিতে দাপুটে দেশটা আয়োজন করেছে খেলাধুলার বড় সব আসর। গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ খ্যাত ফুটবল বিশ্বকাপ থেকে অলিম্পিক- সব বড় ক্রীড়া আসর আয়োজনের অভিজ্ঞতা আছে তাদের ঝুলিতে। তবে ব্যতিক্রম ছিল ক্রিকেটে। এবারই প্রথম ক্রিকেটের কোনো বিশ্ব আসরের আয়োজক তারা। পূর্ণাঙ্গ আয়োজক হিসেবে নয় যৌথভাবে আয়োজন করছে এবারের আসর। তাদের সঙ্গে আয়োজক হিসেবে আছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। বিশ্বকাপের সহ-আয়োজক হওয়ার সুবাদে প্রথমবার ক্রিকেটের কোনো বিশ্ব আসরে মার্কিনিদের দেখা মিলবে। অথচ, ক্রিকেট ইতিহাসে যুক্তরাষ্ট্রের নাম বহু পুরোনো। বিশ্ব আসরে সুবাদে তৈরি হওয়া স্রোতে ক্ষমতাধর দেশটিতে ক্রিকেটের পুনজাগরণ ঘটবে কি না সেটা দেখার অপেক্ষায় পুরো ক্রিকেট দুনিয়া। পুনজাগরণ ঘটুক কিংবা না ঘটুক বিশ্ব ক্রিকেটের যুক্তরাষ্ট্রের নামটা যে বহু পুরোনো, সেটা অবশ্য টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের বদৌলতে সবার জানা হয়ে গেছে।
উত্তর আমেরিকায় ক্রিকেটের প্রসার মূলত ইউরোপিয়ানদের হাত ধরে। ১৪৯২ সালে কলম্বাসের হাত ধরে আবিষ্কারের পর থেকে শুরু হয় ইউরোপিয়ানদের আমেরিকা যাত্রা। সেই সুবাদে ইংল্যান্ড থেকে ক্রিকেটের প্রসার ঘটে মার্কিন মুল্লুকে। ১৭৭৬ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশ উপনিবেশ থাকায় ক্রিকেট বেশ ভালোভাবে ছড়িয়ে যায় আমেরিকাজুড়ে। ক্রিকেট ইতিহাস ঘাটলে বারবার দেখা মেলে যুক্তরাষ্ট্রের নাম। শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়. উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকায় সমানতালে ছড়িয়ে পড়ে ক্রিকেট। দুই মহাদেশের দেশগুলোতে বারবার সফর করে ক্রিকেট খেলতে বারবার আসে ইংল্যান্ড দল। ১৮৭৭ সালে অস্ট্রেলিয়া-ইংল্যান্ড সিরিজের আগে হয় অনেকগুলো আন্তর্জাতিক সফর। যেই সফরগুলোর অনেকগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে আছে উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার অনেক দেশের নাম।
মার্কিন মুলুকে ক্রিকেটের শুরু কিভাবে সেই সম্পর্কে অবশ্য সঠিক কোনো ধারণা পাওয়া যায়নি। ধারণা করা হয় ভার্জিনিয়ার প্রাচীন কৃষি প্রতিষ্ঠান ওয়েস্টোভার প্ল্যান্টেশনের ব্রিটিশ মালিক উইলিয়াম বায়ার্ডের হাত ধরে যুক্তরাষ্ট্রে ক্রিকেটের শুরু। নিজের জীবনীতে তিনি ১৭০৯ সাল উল্লেখ করে জানান, ‘আমি প্রতিদিন সকাল ৬ টায় কর্নেল লুডওয়েল, ন্যাট হ্যারিসন, মিস্টার এডওয়ার্ডসের সঙ্গে ক্রিকেট খেলতাম। সেই ম্যাচগুলোতে অবশ্য মাঝেমধ্যে জিততে পারতাম। তবুও নিয়মিত সকালে ক্রিকেট খেলতাম।’
ওই ঘটনার প্রায় ১৩৫ বছর শুরু হয় ক্রিকেটের দ্বিপাক্ষিক সিরিজের। ১৯ শতকের মাঝে ১৮৪৪ সালে। সেই বছর যুক্তরাষ্ট্র সফর করে তাদের প্রতিবেশি দেশ কানাডা। এই সিরিজে দুই দেশের জাতীয় দল অংশ না নেওয়ায় ম্যাচগুলো পায়নি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। তবে ক্রিকেট ইতিহাসে এটাই দুই দেশের মধ্যকার লড়াই হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সেবার নিউইয়র্ক সেন্ট জর্জেস ক্রিকেট ক্লাব গ্রাউন্ডে হয়েছিল ওই সিরিজের ম্যাচগুলো। ক্রিকেট দুনিয়ার ওই প্রথম দ্বিপাক্ষিক সিরিজে জয়ের শেষ হাসি ছিল কানাডার। দুই দেশের ওই দুই ক্লাবের লড়াইয়ের নাম দেওয়া হয়েছিল অটি কাপ। এখন পর্যন্ত ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে পুরোনো দ্বৈরথ এই অটি কাপ। দলের ঐ সফরের পর ১৮৫৯ সালে প্রথমবার উত্তর আমেরিকা ভ্রমণে বের হয় ইংল্যান্ডের পেশাদার ক্রিকেটাররা। সেই সফরে যুক্তরাষ্ট্রে এসে খেলেছিল স্থানীয় ক্রিকেটারদের সঙ্গে। যুক্তরাষ্ট্রে বেসবলের পথিকৃৎ হিসেবে পরিচিত হ্যারি রাইট খেলেন স্থানীয় ক্রিকেটারদের সঙ্গে। এটুকু তথ্যই স্পষ্ট তখন মার্কিন মুল্লুকে কতটা জনপ্রিয় ছিল ক্রিকেট। ওই সফরে স্থানীয় মার্কিন ক্রিকেটারদের সঙ্গে ইংল্যান্ডের পেশাদাররা খেলেছিল পাঁচ ম্যাচ।
ক্রিকেটের ওই জোয়ারের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে শুরু হয় গৃহযুদ্ধের দামামা। ১৮৬১ থেকে ১৮৬৫ সাল পর্যন্ত চলা চার বছরের গৃহযুদ্ধে হারিয়ে যায় ক্রিকেটের তেজ। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটিতে ক্রিকেটকে টপকে জনপ্রিয়তায় এগিয়ে যায় বেসবল। যুক্তরাষ্ট্রের ক্রিকেট ইতিহাস নিয়ে রচিত দ্য টেন্টেড ফিল্ড বইয়ে ইতিহাসবিদ টম মেলভিল জানান কিভাবে ক্রিকেটকে সরিয়ে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে বেসবল। মূলত, গৃহযুদ্ধের কারণে ঠিকঠাকভাবে মাঠ প্রস্তুত করে ক্রিকেট ম্যাচ আয়োজন করা সম্ভব ছিল না। কিন্তু বেসবল খেলতে ক্রিকেটর মতো মাঠ প্রস্তুত করার বিষয়টা গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। সে কারণে যুদ্ধক্ষেত্রে ক্রিকেটের পরিবর্তে বেসবলকে বেছে নেন স্থানীয় অধিবাসীরা। ক্রিকেটের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকায় বেসবলের সঙ্গে মানিয়ে নিতে কোনো অসুবিধাই হয়নি। এভাবেই জনপ্রিয়তায় বেসবলের কাছে হার মানে ক্রিকেট।
তবে কী শুধু গৃহযুদ্ধের প্রভাবে হারিয়ে গেছে ক্রিকেট? সম্ভবত এর উত্তর হবে- না। অনেক ইতিহাসবিদের বিশ্বাস, ইংল্যান্ডে উৎপত্তি বলে আমেরিকানদের চরিত্রের সঙ্গে যায় না ক্রিকেট। তাহলে বেসবলের উৎপত্তি কী মার্কিন মুলুকে? সেই কারণেই কী দেশটিতে খেলাটির এতো জনপ্রিয়তা? এর উত্তরও অবশ্য- না। কারও মতে বেসবলের উৎপত্তি ইংল্যান্ডে, আবার কেউ বলে যুক্তরাষ্ট্রে। তবে এটা সত্য বেসবলের আধুনিক নিয়ম কানুনের জন্ম মার্কিন মুল্লুকে। সেই সুবাদে দেশটিতে সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা বেসবল। এমন কী বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় ফুটবলকে টপকে মার্কিনিদের কাছে সব সময়ই আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে বেসবল। আর ক্রিকেট তো তাদের কাছে পুরো অচেনা একটি খেলা।
বেসবলের দাপটের মাঝে শতকের পর শতক ধরে ক্রিকেটকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার ক্লাবগুলোর মাঝে। মার্কিন গৃহযুদ্ধের অবসানের পর থেকে ২০ শতকের মাঝ পর্যন্ত নিজেদের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের ম্যাচ ও টুর্নামেন্ট আয়োজন করে ক্রিকেটের ঐতিহ্য বাচিয়ে রাখার চেষ্টায় ছিল তারা। তবে বেসবলের দাপটে একেবারে কোণঠাসা হয়ে যায় যুক্তরাষ্ট্রের ক্রিকেট। ক্রিকেটের গন্ডি ছোট হতে হতে একেবারে হারিয়ে যাওয়ার দ্বারপ্রান্তে ছিল। আগে যেখানে ক্রিকেট মাঠে ছিল দর্শকের উপচে পড়া ভিড়, সেখানে মাঠে দর্শক পাওয়াটাই হয়ে ওঠে কঠিন। পুরো দেশজুড়ে যখন বেসবলের দাপট, তখন ব্যতিক্রম ছিল যুক্তরাষ্ট্রের দুই শহর- ফিলাডেলফিয়া ও পেনসিলভেনিয়া। সেখানে বেশ আগ্রহ নিয়ে মাঠে উপস্থিত হতেন অসংখ্য দর্শক। তারা অবশ্য কেউ ছিলেন না যুক্তরাষ্ট্রের অধিবাসী। ইংল্যান্ডের নটিংহ্যাম থেকে সমুদ্র পথে আসা ব্রিটিশ জাহাজ শ্রমিকরা ছিলেন ওই ক্রিকেট ম্যাচগুলোর দর্শক। তাদের কল্যাণে ফিলাডেলফিয়া ও পেনসিলভেনিয়ায় বেঁচে ছিল ক্রিকেট।
অ্যা হিস্টোরি অব ক্রিকেট ইন আমেরিকা বইয়ে টম মেলভিল জানান, যুক্তরাষ্ট্রে ক্রিকেটকে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল শুধুমাত্র ব্রিটিশ মূল্যবোধের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার জন্য। সেই সুবাদে ১৮৫০ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে ছিল এক হাজারের বেশি ক্রিকেট ক্লাবের অস্তিত্ব। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বেসবলের আধিপত্য বাড়ায় কমতে থাকে ক্রিকেটের আবেদন। সেটা এক সময় নেমে আসে শূন্যের কোটায়। ফলে ক্রিকেট ক্লাবগুলো হয়ে ওঠে অস্তিত্বহীন। হারিয়ে যাওয়ার দ্বারপান্তে চলে যায় মার্কিন ক্রিকেট। মার্কিন মুল্লুক থেকে ক্রিকেট হারিয়ে যাওয়ার খানিকটা দায় বর্তায় আইসিসির উপরও। ১৯০৯ সালে আইসিসি গঠনের সময় ক্রিকেটের শক্তিমত্তা নয়, সদস্যপদ দেওয়া হয় ক্রিকেটীয় রাজনৈতিক ক্ষমতার উপর ভিত্তি করে। সেই সুবাদে যুক্তরাষ্ট্র নয়, দক্ষিণ আফ্রিকা পায় আইসিসির সদস্য পদ। ওই ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্রের ক্রিকেট নেমে যায় একদম তলানিতে।
এরপরেও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্রভাবে চেষ্টা চলেছে মার্কিন ক্রিকেটকে জাগ্রত রাখার। ব্রাইটন থেকে আসা ইংলিশ ক্রিকেটার এডি ফিলিপস মাঝেমধ্যেই আয়োজন করতেন বিভিন্ন প্রদর্শনী ম্যাচের। যদিও আগ্রহ থাকত না, তবুও চলত সেই চেষ্টা। ১৯৬৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ক্রিকেট নিয়ে আলোচনার জন্ম দেন গায়ক ন্যাট কিং কোল। যুক্তরাজ্য থেকে ফেরার সময় সঙ্গে করে এনেছিলেন কিছু ক্রিকেট ব্যাট। এর আগে পরে নানাভাবে পুরোনো ক্রিকেট ক্রেজ জাগিয়ে তোলার কাজ করা হয় যুক্তরাষ্ট্রে। এরই অংশ হিসেবে নিউইয়র্কের সবচেয়ে পুরোনো ক্রিকেট ক্লাব স্টেটেন আইল্যান্ড ক্রিকেট ক্লাব নিয়ে আসে তাবৎ সব তারকা ক্রিকেটারদের। সেই তালিকায় ছিলেন ডন ব্র্যাডম্যান, পেলহাম ওয়ার্নার, এভারটন উইকসের মতো তারকারা। তবে সবচেয়ে বড় জোয়ার তৈরি হয়েছিল শচীন টেন্ডুলকার ও শেন ওয়ার্নের হাত ধরে। ২০১৫ সালে তারা দুজন আয়োজন করেন এক প্রদর্শনী ম্যাচ। যেখানে ছিলেন ব্রায়ান লারা, গ্রেন ম্যাকগ্রা, ওয়াসিম আকরাম, শোয়েব আখতারদের মতো তারকা ক্রিকেটাররা। এরপরেই খানিকটা জেগে ওঠে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রিকেট। গতি বাড়ে মার্কিন ক্রিকেটে। শুরু হয় ক্রিকেটে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেওয়ার প্রক্রিয়া। যেই স্রোতে আবার পেশাদার ক্রিকেটের সূচনা হয় মার্কিন মুল্লুকে।
ক্রিকেটের এই জোয়ার তৈরির আগে অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রে ক্রিকেট ঢিমেতালে চলে উপমহাদেশীয় অভিবাসীদের হাত ধরে। উপমহাদেশ থেকে উত্তর আমেরিকার দেশটিতে পাড়ি জমানো অভিবাসীরা নিজেদের মতো করে আয়োজন করতেন ক্রিকেটের বিভিন্ন ধরনের টুর্নামেন্ট। নিজেদের বিনোদনের জন্য ছুটির দিনে বিভিন্ন ক্লাবে ক্রিকেট খেলেন তারা। এভাবেই ফের জীবন ফিরে পাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রিকেট। এমন কী উপমহাদেশীয় অভিবাসীদের হাত ধরে মার্কিনিরা এবার অংশ নেবে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে। আয়োজক দেশ হয়ে টুর্নামেন্টে অংশ নেওয়া যুক্তরাষ্ট্রে ক্রিকেটের পুরোনো জোয়ার ফিরবে কি না, নাকি ইংরেজদের তৈরি বলে ক্রিকেটকে আবারও একপাশে করে রাখে- সেটার উত্তরও মিলবে এবারের বিশ্বকাপ আসরের পর।