দিন কয়েক আগে প্রকাশিত এক ছবি ছুঁয়ে যায় ক্রীড়াপ্রেমীদের মন। ছবিতে দেখা যায় একসঙ্গে বসে আছেন রজার ফেদেরার ও শচীন টেন্ডুলকার। টেনিস ও ক্রিকেট- দুই খেলার দুই মহাতারকার সাক্ষাৎ হয় উইম্বলডনের সৌজন্যে। অল ইংল্যান্ড ক্লাবে উইম্বলডন উপভোগ করতে গিয়ে তাদের দেখা। ভিন্ন খেলার তারকাদের পরস্পরের সঙ্গে হুট করে দেখা হওয়ার ঘটনা বেশ বিরল। চার বছর পরপর হওয়া অলিম্পিকে চলাকালে তারকাদের পরস্পরের সঙ্গে এমন হুটহাট সাক্ষাৎ হয়। অলিম্পিকে ক্রিকেট অন্তর্ভুক্ত না থাকায় সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত ক্রিকেটাররা। গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ খ্যাত অলিম্পিকে ক্রিকেট নেই বলে ক্রিকেটারদের অংশগ্রহণ নেই তা বলার অবকাশ নেই। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলা ছয়জন ক্রিকেটার অলিম্পিকে নিজ দেশকে প্রতিনিধিত্ব করেছেন ভিন্ন পরিচয়ে অন্য ইভেন্টে খেলে। সারা বিশ্বের কাছে দেখান নিজেদের প্রতিভা। এ ছাড়া আরও ৪৮ জন প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটার এভাবে অলিম্পিকে অংশ নিয়েছেন অন্য ইভেন্টে খেলে।
ঊনবিংশ, বিংশ কিংবা একবিংশ- শতাব্দী থেকে শতাব্দী যায় তবে অলিম্পিকে ক্রিকেটারদের অংশগ্রহণ থামে না। আধুনিক অলিম্পিকের পথচলা সেই ১৮৯৬ সাল থেকে। উদ্বোধনী আসরে ক্রিকেট ইভেন্ট থাকলেও অংশগ্রহণকারী না থাকায় খেলা হয়নি। ১৯০০ সালে প্যারিস অলিম্পিকে ক্রিকেট ছিল, তবে সেটা নামকাওয়াস্তে। যার প্রমাণ ক্রিকেট ইভেন্টে ছিল না কোনো পেশাদার ক্রিকেটারের উপস্থিতি। ক্রিকেটে না থাকলেও ওই অলিম্পিকে অংশ নেন এক পেশাদার ক্রিকেটার। প্যারিসে গ্রেট ব্রিটেনের জার্সিতে ফুটবল ইভেন্টে মাঠে নামেন ক্লাউডি বাকেনহ্যাম। ফুটবল ও ক্রিকেট- দুই খেলায় সমান দক্ষ ছিলেন বাকেনহ্যাম। ফুটবল ক্যারিয়ারে খেলতেন আপটন পার্ক এফসির রক্ষণভাগে। কাউন্টিতে এসেক্সের পেস আক্রমণের নেতৃত্বভার ছিল তার কাঁধে। অলিম্পিক স্বর্ণ পদক জয়ের পর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক হয় বাকেনহ্যামের। ১৯১০ সালে ইংলিশদের জার্সিতে দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে অভিষেক হয়। ওই সফরে চার টেস্টে তার শিকার ছিল ২১ উইকেট। পরে ইংলিশদের জার্সিতে খেলা হয়নি তার। ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের চলাকালে যুদ্ধজাহাজ ফোরফারশায়ারে যোগ দিয়ে ইতি টানেন খেলোয়াড়ি জীবনের।
বাকেনহ্যামের পর ক্রিকেটার হিসেবে অলিম্পিকে খেলেন দুই ব্রিটিশ ক্রিকেটার জনি ডগলাস ও জ্যাক ম্যাকব্রায়েন। ১৯০৮ লন্ডন অলিম্পিকে অংশ নিয়ে বক্সিংয়ে মিডল ওয়েট শ্রেণিতে স্বর্ণপদক বাগিয়ে নেন ডগলাস। ১৯২০ অলিম্পিকে ব্রিটিশ হকি দলের হয়ে স্বর্ণ পদক পান ম্যাকব্রায়েন। কাউন্টি ক্রিকেটে এসেক্সের হয়ে খেলা জনি ডগলাস প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে ও পরের সময় মিলিয়ে ইংল্যান্ডের হয়ে মাঠে নামেন ২৯ টেস্টে। যার মধ্যে ১৮ টেস্টে ডগলাসের কাঁধে ছিল ইংলিশদের নেতৃত্বভার। ব্রিটিশদের হয়ে অলিম্পিক স্বর্ণপদক জয়ী জ্যাক ম্যাকব্রায়েনের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার থেমেছে অবশ্য এক টেস্টে। তবে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে সামারসেটের হয়ে তার খেলা ম্যাচ সংখ্যা ২০৬টি!
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের পাশাপাশি অলিম্পিকে খেলা চতুর্থ ক্রিকেটার ব্রায়ান বুথ। অলিম্পিকে অংশ নেওয়া ক্রিকেটারদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি টেস্ট খেলেছেন এই অজি। ১৯৫৬ মেলবোর্ন অলিম্পিকে অস্ট্রেলিয়া হকি দলের সদস্য অজিদের হয়ে খেলেন ২৯ টেস্ট। তবে তিন পূর্বসূরির মতো পদক জিততে পারেননি বুথ। অলিম্পিকে ব্যর্থ হয়ে বুথ মনোযোগী হন ক্রিকেটে ক্যারিয়ারে। ১৯৬৬ সালে থামে তার আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ক্যারিয়ার। দুই টেস্টে অজিদের নেতৃত্ব দেওয়া বুথকে ওই সময়ের পর আর জাতীয় দলের জন্য বিবেচনা না করা ভুল সিদ্ধান্ত ছিল। এমনটা মনে করতেন সে সময়ের অস্ট্রেলিয়া দলের নির্বাচক স্যার ডন ব্রডম্যান। তাসমান পাড়ের আরেক দেশ নিউজিল্যান্ডের হয়ে ক্রিকেট খেলা কেইথ থমসন অলিম্পিকে অংশ নেন ১৯৬৮ সালে। অলিম্পিকে হকিতে নামার আগে কিউইদের হয়ে ভারত সফরে তার অভিষেক হয়। ওই সিরিজে দুই টেস্টের পর জাতীয় দলে আর ডাক মেলেনি। বুথের মতো অলিম্পিক থেকে তাকে ফিরতে হয় খালি হাতে।
চার পুরুষ ক্রিকেটারের পাশাপাশি অলিম্পিকে খেলার অভিজ্ঞতা আছে দুই নারী ক্রিকেটারের। একজন দক্ষিণ আফ্রিকার সুনেত্তে ভিজোয়েন। প্রোটিয়াদের হয়ে ১ টেস্ট ও ১৭ ওয়ানডে খেলে ক্রিকেট ছেড়ে মনোযোগী হন অ্যাথলেটিকসে। ২০০৪ থেকে ২০১৬ টানা চার অলিম্পিকে দক্ষিণ আফ্রিকাকে প্রতিনিধিত্ব করেন। ভিজোয়েন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলা একমাত্র ক্রিকেটার যিনি একাধিক অলিম্পিকে অংশ নিয়েছেন। প্রথম তিন আসরে কোনো পদক না পাওয়া ভিজোয়েনের ভাগ্যের শিকে ছিঁড়ে ২০১৬ রিও ডি জেনেরিও অলিম্পিকে। সেবার জ্যাভেলিন থ্রোতে (বর্ষা নিক্ষেপ) রৌপ্য পদক জেতেন ভিজোয়েন। দ্বিতীয় নারী ক্রিকেটার হিসেবে অলিম্পিক খেলার কৃতিত্ব হোয়াইট ফ্রেন্স তারকা সুজি বেটসের। বলে রাখা ভালো- নিউজিল্যান্ড নারী দলের ডাক নাম হোয়াইট ফ্রেন্স। স্বদেশি কেইথ থমসনের মতো তারও পাওয়া হয়নি কোনো অলিম্পিক পদক। ২০০৮ বেইজিং অলিম্পিক নিউজিল্যান্ড বাস্কেটবল দলের সদস্য ছিলেন বেটস। ক্রিকেটের পাশাপাশি বাস্কেটবল খেলা বেটস এখন মনোযোগী ব্যাট-বলের লড়াইয়ে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার হয়েও অলিম্পিকে খেলা ছয়জনের মধ্যে সবচেয়ে বেশিবার জাতীয় দলকে প্রতিনিধিত্ব করেছেন সুজি বেটস। ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি দুই সংস্করণে নিজ দেশকে প্রতিনিধিত্ব করেছেন ১০০-এর বেশি ম্যাচে।
অলিম্পিকে ক্লাউডি বাকেনহ্যামের তৈরি ক্লাব অবশ্য এত ছোট নয়। এখন পর্যন্ত ৫৪ জন ক্রিকেটার অংশ নিয়েছেন গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ খ্যাত অলিম্পিকে। যারা অন্তত একটি প্রথম শ্রেণির ম্যাচ খেলেছেন।