টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশ তখন শিশু। ২০০০ সালে টেস্ট মর্যাদা পাওয়ার পর খেলেছে ২৪টি টেস্ট। একটি বাদে সবগুলোতেই হার। এ রকম পরিস্থিতে আসে মুলতান টেস্ট। যে টেস্টে বাংলাদেশের তৈরি করেছিল জয়ের আবহ। টেস্টের চিত্র এমন হয়ে উঠেছিল যে, বাংলাদেশের টেস্ট জয় শুধু সময়ের ব্যাপার। বাংলাদেশ দুই ইনিংসে করেছিল ২৮১ ও ১৫৪ রান। পাকিস্তান প্রথম ইনিংসে করেছিল ১৭৫। জয়ের জন্য তাদের প্রয়োজন ছিল ২৬১ রানের। জয়ের লক্ষ্যে ব্যাট করতে নেমে তৃতীয় দিন শেষে পাকিস্তানের রান ৮ উইকেটে মাত্র ১৪৮। ক্রিজে তখন প্রতিষ্ঠিত ব্যাটার বলতে শুধু ইনজামাম-উল হক ৫৩ রানে অপরাজিত। বাকি সবাই বোলার। জয়ের জন্য তাদের প্রয়োজন আরও ১১৩ রান। যা যেকোনো বিচারেই কঠিন। সে তুলনায় বাংলাদেশের প্রয়োজন মাত্র ২ উইকেট। ইনজামামকে আউট করা সম্ভব না হলেও অপরপ্রান্তে থাকা বোলার নামক ব্যাটারদের তো আউট করা সম্ভব। তারা আর কতক্ষণই টিকে থাকবেন?
সবাই জয়ের অপেক্ষায়। বাংলাদেশের মিডিয়া থেকে শুরু করে বিশ্বের বিভিন্ন গণমাধ্যমেই বাংলাদেশের জয়ের সম্ভাবনার কথা লিখে শিরোনাম করে। ২৫তম টেস্টে এসেই বাংলাদেশ পেতে যাচ্ছে প্রথম টেস্ট জয়। তাও আবার পাকিস্তানের মতো দলের বিপক্ষে। শিহরণ আর উত্তেজনায় অনেকেই রাতে ঘুমাতে পারেননি। ক্রিকেটারদের মাঝে শিহরণ ছিল আরও বেশি। কিন্তু তিন কাঠির খেলা ক্রিকেট, গৌরবময় অনিশ্চয়তার খেলা ক্রিকেট তার সমস্ত শিহরণ নিয়ে হাজির হয় মুলতানে। তৃতীয় দিন সকালেই ইনজামামের সঙ্গী আগের দিনের অপর অপরাজিত ব্যাটার সাকলায়েন মুশতাককে আউট করেন অধিনায়ক খালেদ মাহমুদ। এরপর সাব্বির আহমেদ ১৩ রান করলেও ইনজামামকে দারুণ সময় দিয়ে জুটিতে এনে দেন ৪১ রান। সাব্বিরকে এলবিডব্লিউর ফাঁদে ফেলেন মোহাম্মদ রফিক। সাব্বির যখন আউট হন, তখনো পাকিস্তান জয় থেকে অনেক দূরে। তাদের রান ছিল ৮ উইকেটে ২০৫। জয়ের জন্য প্রয়োজন ৪৬ রানের। উইকেটে আসেন ওমর গুল। কিন্তু ইনজামাম ওমর গুলকে বল খেলতে না দিয়ে নিজেই কাঁধে তুলে নেন দায়িত্ব। জুটিতে রান আসে ৫২। ৫০ বল খেলে ওমর গুলের রান ছিল মাত্র ৫। তিনি যখন আউট হন, তখন পাকিস্তান জয়ের কাছাকাছি। তাদের রান ৯ উইকেটে ২৫৭। সেই রান করতে ইয়াসির আলীকে নিয়ে ইনজামামের কোনো সমস্যাই হয়নি। আর এভাবেই হাতছাড়া হয়ে যায় টেস্ট ক্রিকেটের শিশু বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট জয়ের লগন। নিশ্চিত জয় হাতছাড়া হওয়াতে চোখের জলে মাঠ ছেড়েছিলেন অধিনায়ক খালেদ মাহমুদের নেতৃত্বে বাংলাদেশ দল।
শুধু ইনজামামই অতি মানবীয় ইনিংস খেলে বাংলাদেশের জয় কেড়ে নিয়েছিলেন তা কিন্তু নয়; মুলতান টেস্টের কথা এলে চোখের সামনে ভেসে ওঠে রশিদ লতিফের প্রতারণার সেই দৃশ্যও। ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয় উইকেটরক্ষক রশিদ লতিফের ওই প্রতারণা। টিভি রিপ্লেতে স্পষ্ট দেখা যায় অলক কাপালির ব্যাটে লেগে বল উইকেটের পেছনে গেলেও ক্যাচ ধরতে ব্যর্থ হন রশিদ লতিফ। মাটিতে পড়া বল হাতে নিয়ে আউটের আবেদন করেন। সেই আবেদনে সাড়া দিয়ে কাপালিকে আউট ঘোষণা করেন লঙ্কান আম্পায়ার অশোকা। এমন ভুল সিদ্ধান্তে বাংলাদেশের ইনিংস থামে ১৫৪ রানে।
শুধু কী তাই? মোহাম্মদ রফিক সুযোগ পেয়েও ওমর গুলকে রান আউট করেননি। রান আউট করলে এটি হতো ‘মানকাট। এই আউট ক্রিকেটের স্পিরিটের সঙ্গে যায় না।’ রফিক সেই রান আউট করলে ম্যাচের চিত্র বদলেও যেতে পারত।
মুলতানের ওই অপেক্ষার অবসান ঘটল দীর্ঘ ২১ বছর পর রাওয়ালপিন্ডিতে। মুলতান থেকে ৫২৭ কিলোমিটার দূরের শহরে। তাতে মুলতানের কান্না রাওয়ালপিন্ডিতে পরিণত হয়েছে খুশিতে।