বৃষ্টির কারণে বাংলাদেশ-ভারতের দ্বিতীয় টেস্টের টস হতে বিলম্ব হচ্ছে। কখন টস হবে, খেলা শুরু হবে। দুই দলের সেরা একাদশে কি রকম পরিবর্তন আসবে- এ সবই আলোচনায় থাকার কথা। কিন্তু সেখানে আলোচনার বিষয় ছিল সাকিবের অবসর। অনেক ভারতীয় সাংবাদিক জানতে চান সাকিবের দেশে ফেরার ব্যাপারে বিসিবি বা সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি। গত বৃহস্পতিবারই সাকিবের বিষয় নিয়ে বিসিবি সভাপতি ফারুক আহমেদের বক্তব্য জানার পর অনেকেই আফসোস করেন। তারা জানান, সাকিবের তাহলে আর বাংলাদেশে শেষ টেস্ট খেলা হচ্ছে না। পাল্টা প্রশ্ন করে তারা জানান, তাহলে তো কানপুরেই সাকিবের শেষ টেস্ট? দেশে ফেরার ব্যাপারে বিসিবি কোনো দায়িত্ব না নেওয়াতে আগামী মাসে অক্টোবরে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে শেষ টেস্ট খেলে অবসরের যে ঘোষণা দিয়েছিলেন, সেটি আর হচ্ছে না। টি-টোয়েন্টিতে সেন্ট লুসিয়ার পর টেস্টে কানপুর হবে সাকিবের ইতি টানার ম্যাচ।
সাকিব বাংলাদেশের ক্রিকেটের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। ব্যাটে-বলে দ্যুতি ছড়িয়ে বিশ্ব ক্রিকেটে নিজে যেমন আলো ছড়িয়েছেন, তেমনি বাংলাদেশের ঝাণ্ডাকে করেছেন সম্মানিত। ২২ গজে সাকিব সোনা ফলিয়েছেন। কখনো ব্যাট হাতে, কখনো বল হাতে। বলা যায়, ওপরওয়ালা তাকে দুহাত ভরে দিয়েছিলেন। ২২ গজে সাকিব নিজেকে এমন চূড়ায় নিয়ে গিয়েছিলেন, যেখানে তৈরি হয়েছিল তার অগণিত ফ্যান। তার ওপর ভিত্তি করে তার বাজার মূল্যও বেড়ে যায়। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে অ্যাম্বেসেডর হিসেবে পেতে বিশাল অঙ্কের টাকা নিয়ে দুয়ারে গিয়ে দাঁড়ায়। সাকিবও তা লুফে নিয়েছেন।
অতীতে বহুবারের মতো সাকিবেরও এখন বাজে সময় যাচ্ছে। কিন্তু এবারের বাজে সময় অতীতের সবগুলোকে ছাড়িয়ে গেছে। অতীতে বাজে সময়ে সাকিব কখনো মনোবল হারাননি। এবার তাকে বেশ ভেঙে পড়তে দেখা গেছে। আওয়ামী লীগের দলীয় সংসদ সদস্য হওয়াতে ৫ আগস্ট সরকারের পরিবর্তনের প্রভাব পড়ে সাকিবেরও ওপর। সরকারের পতনের সময় দেশের বাইরে থাকার পরও তাকে হত্যা মামলার আসামি করা হয়েছে। এই ঘটনা তার দেশে আসার পথ রুদ্ধ করে দেয়। পাকিস্তানের পর ভারতের বিপক্ষে দুটি সিরিজ তিনি দলের অংশ হয়েছেন দেশে না এসেই। কিন্তু বাংলাদেশের পরের সিরিজ দেশে হওয়াতে সাকিবের তো দেশে না এসে আর কোনো উপায় নেই। কিন্তু তিনি আসবেন কি করে! তার ওপর যে হত্যা মামলা ঝুলছে। ঘরের মাঠে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে শেষ টেস্ট খেলে তিনি সাদা পোশাকের ক্রিকেট থেকে বিদায় জানাতে চেয়েছিলেন।
সাকিব গতকাল দুপুরে কানপুরে যখন তার অবসরের কথা জানান, তারপর বিকেলে ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয় বিসিবির বোর্ডসভা। বোর্ডসভা শেষে সাংবাদিকদের বিসিবি সভাপতি ফারুক আহমেদ যে কথা জানান, তার পরিপ্রেক্ষিতে সাকিবের দেশে আর ফেরা হচ্ছে না। সাকিব বলেছিলেন, ‘যদি দেশে গিয়ে খেলতে পারি, তাহলে মিরপুর টেস্ট হবে লাস্ট। সেটা সবাই জানে। তারা চেষ্টা করছে যে এটা কীভাবে সুন্দরভাবে অ্যারেঞ্জ করা যায়, যাতে করে আমি খেলতে পারি এবং নিরাপদ ফিল করি। পাশাপাশি যখন দেশের বাইরে আসার দরকার হবে, তখন দেশের বাইরে বের হতেও আমার যেন কোনো সমস্যা না হয়।’ সভা শেষে বিসিবি সভাপতি ফারুক আহমেদ স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ‘আমি তো আসলে কোনো এজেন্সি না, কিংবা পুলিশ বা র্যাব। এটা আসলে আমার বা বিসিবির হাতে নেই। সরকার পর্যায় থেকে আসতে হবে নিরাপত্তাটা। নিরাপত্তা দুই রকমের। একটা হলো, সে হয়তো পরিষ্কার করেছে, বলেছে (সরকারি), আরেকটা হলো আমাদের দর্শকরাও আছে। তো এই ব্যাপারটা তার সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আমরা আসলে এটাতে তেমন একটা অংশ হতে পারব না। এই মুহূর্তে আমরা কিছু বলতে পারব না বোর্ড থেকে কি করতে পারি। ব্যক্তি পর্যায়ে একজন মানুষকে নিরাপত্তা দেওয়ার সামর্থ্য আমাদের নেই।’ এতেই স্পস্ট হয়ে যায় সাকিবের আর ঘরের মাটিতে খেলে অবসর নেওয়া হচ্ছে না। কানপুরের টেস্টই তার শেষ টেস্ট। প্রবাদ আছে- মানুষ যা চায় তা সব সময় পায় না। সাকিবের ক্ষেত্রে তা নির্মমভাবে সত্য হয়ে ফিরে এসেছে।
সাকিবের মতো লিজেন্ডারি ক্রিকেটারের টি-টোয়েন্টির পর টেস্ট ক্রিকেটও দেশের বাইরে খেলে অবসর নেওয়াটাকে ভালো দেখায় না বলে জানান জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক খালেদ মাসুদ পাইলট। বর্তমানে তিনি লন্ডনে অবস্থান করছেন। হোয়াটসঅ্যাপে তিনি বলেন, ‘সাকিবের মতো একজন ক্রিকেটার, যে বাংলাদেশের ক্রিকেটে অনেক কিছু দিয়েছে, তার বিদায়টা সুন্দরভাবে হলে ভালো হতো। কারণ আমরা বাঙালি তো, আবেগপ্রবণ। আমি এখানে সাকিবের রাজনৈতিক বিষয়টা দেখব না। এটা অন্য বিষয়। আইনের দৃষ্টিতে যেটা হওয়ার হবে। কিন্তু তার খেলোয়াড়ি জীবনের অবদানের কথা বিবেচনা করে তার সুন্দর বিদায়টা হলে ভালোই হতো। যেহেতু সে চেয়েছে দেশের মাটিতে খেলে বিদায় নেবে। এখন যা করার বিসিবিকেই করতে হবে। এ রকম একজন খেলোয়াড় যদি দেশের বাইরে শেষ টেস্ট খেলে বিদায় নেয়, সেটা ভালো দেখাবে না।’
জাতীয় দলের সাবেক ওপেনার শাহরিয়ার হোসেন বিদ্যুৎয়ের খুবই মন খারাপ সাকিবের এভাবে বিদায় নেওয়াতে। তিনি বলেন, ‘সাকিব মানেই সাকিব। আরেকটা সাকিব বাংলাদেশে হবে না। একটা খেলোয়াড় যদি দেশের মাটি থেকে অবসর নিতে পারে তাহলে ভালো হয়। বিদেশের মাটিতে নিলে কেমন দেখায়। কিন্তু তার বিষয়টা ক্রিটিকাল, রাজনৈতিক। সাকিবের কথা শুনে আমারও মনটা খারাপ হয়ে গেছে।’
জাতীয় দলের সাবেক ব্যাটার তুষার ইমরান সাকিবের বিদায়টা মিছ করবেন বলে জানান। তিনি বলেন, ‘আমরা সাকিবকে মিস করব। ঘরের মাঠে হলে আমরাও থাকতে পারতাম। বড় আয়োজন হতে পারত। কিন্তু এখানে করার কিছু নেই। বিষয়টি শুধু বিসিবির হাতে নেই। সরকারের হাতে। আমরা এক সঙ্গে খেলেছিও।’