কানপুর যেন বিসিসিআইয়ের সৎ সন্তান। পুরোনোকে আকড়ে ধরে আছে বলে এখানে নিয়মিত আন্তর্জাতিক ম্যাচ দেওয়া হয় না। এক এক একটি আন্তর্জাতিক ম্যাচ পেতে তিন থেকে চার বছর, ক্ষেত্র বিশেষে আরও বেশি সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। এবার যেমন বাংলাদেশ-ভারত টেস্ট অনুষ্ঠিত হচ্ছে তিন বছরেরও বেশি সময় পর। ভারত-নিউজিল্যান্ডের মাঝে শেষ টেস্ট অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০২১ সালের ২৫ নভেম্বর। এই টেস্ট অনুষ্ঠিত হয়েছিল আবার প্রায় পাঁচ বছর পর ২০১৬ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর। ভারতের প্রতিপক্ষ ছিল সেই নিউজিল্যান্ডই।
কানপুর গ্রিন পার্ক স্টেডিয়াম ১৯৪৫ সালে নির্মিত হয়। ১৯৫২ সালে অনুষ্ঠিত হয়েছিল প্রথম টেস্ট। শুরুর দিকে এত লম্বা বিরতি পড়েনি। সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে ম্যাচ পাওয়ার বিরতিও। বছরে যেখানে কানপুর একটিও আন্তর্জাতিক ম্যাচ পায় না, সেখানে বিসিসিআই যথেস্ট উদারতা দেখিয়েছিল ১৯৭৯ সালে তিন তিনটি টেস্ট ম্যাচের ভেন্যু করে। মোট টেস্ট অনুষ্ঠিত হয়েছে ২৪টি। ওয়ানডে হয়েছে ১৫টি, টি-টোয়েন্টি মাত্র একটি। আইসিসিরি একাধিক ইভেন্টে ভারতে অনুষ্ঠিত হলেও কানপুর ১৯৯৬ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপে ভারত ও জিম্বাবুয়ের একটি মাত্র ম্যাচ পেয়েছিল। এটিই এখন পর্যন্ত প্রথম এবং শেষ।
কানপুরে যেহেতু ম্যাচ কম হয়, তার রেকর্ড বা কীর্তিগাঁথাও কম কিংবা বলার মতো নেই। তারপর এমন একটি কীর্তি এই মাঠে হয়েছে, যা ছিল বিশ্ব রেকর্ড। এখনো অম্লান সেই রেকর্ড। কী সেই রেকর্ড? রেকর্ডটি হলো মোহাম্মদ আজহারউদ্দিনের। অভিষেকে পরপর তিন টেস্টে সেঞ্চুরি করে তিনি যে রেকর্ড গড়েছিলেন, তার তৃতীয়টি ছিল এই কানপুরে। আজহারউদ্দিন করেছিলেন ১২২ রান।
আজহারউদ্দিন বিশ্ব ক্রিকেটের প্রথম ব্যাটার হিসেবে অভিষেকের প্রথম তিন টেস্টেই সেঞ্চুরি করতে পারবেন কি না- এটা নিশ্চিত ছিল না। বিশাল এক শঙ্কা নিয়ে তিনি এসেছিলেন কানপুরে। কানপুরে আসার আগে কলকাতার ইডেন গার্ডেনসে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে পাঁচ টেস্টের সিরিজের তৃতীয় টেস্টে অভিষেক হয় তার। ১৯৮৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর শুরু হওয়া টেস্টে ১১০ রানের ইনিংস খেলে তিনি বিশ্বকে জানান দিয়েছিলেন তার আগমনি বার্তা। তবে এই বার্তা খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। কারণ অভিষেকে এ রকম সেঞ্চুরি তার আগে করেছিলেন আরও ৫১ জন। তাদের অনেকে আবার হারিয়ে গিয়েছিলেন, অনেকে আবার বিশ্ব ক্রিকেটকে শাসন করেছেন। আজহারউদ্দিনের কপালে কি আছে কে জানে?
আজহারউদ্দিন এই সেঞ্চুরি করে আলোচনায় আসেন। কিন্তু তিনি কতটা সফলতার সঙ্গে দৌড়াতে পারবেন, সেটা বিরাট এক প্রশ্ন হয়ে সামনে চলে আসে। এই প্রশ্নের জবাব তিনি দেন চেন্নাইয়ে নিজের দ্বিতীয় টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসে। প্রথম ইনিংসে ৪৮ রান করার পর দ্বিতীয় ইনিংসে করেছিলেন ১০৫ রান। পরপর দুই টেস্টে সেঞ্চুরি করে তিনি ৫১ জনের তালিকাকে ছোট করে নিয়ে আসেন চারে। তার আগে অভিষেকে পরপর দুই টেস্টে সেঞ্চুরি করেছিলেন- অস্ট্রেলিয়ার উইলিয়াম হারলড পনসফর ও কেভিন ডগলাস ওয়ালটার এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজের আলভিন কালিচরন।
৫১ থেকে ৪, তালিকা ছোট করে নিয়ে আসার পর আজহারউদ্দিনের সামনে সুযোগ চলে আসে এই তালিকাকে একেবারে ছোট করে একান্তই নিজের করে নেওয়ার। যেখানে থাকবে না আর কেউ। এ রকম সুযোগকে সামনে রেখে ভারত-ইংল্যান্ডের তৃতীয় টেস্ট কানপুরে খেলতে আসেন আজহারউদ্দিন। সম্ভাবনা যেমন আছে, তেমনি শঙ্কাও আছে। সব শঙ্কা উড়িয়ে আজহার প্রথম ইনিংসেই ১২২ রান করে নিজেকে চূড়ায় নিয়ে যান। তার সেই সেঞ্চুরি চারটা হতে পারত। সেই সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছিল। দ্বিতীয় ইনিংসে তিনি যখন ৫৪ রানে অপরাজিত, তখন ভারতের দলপতি সুনীল গাভাস্কার ইনিংস ঘোষণা করে দেন। অথচ তার এই ইনিংস ঘোষণায় খেলার ফলাফলের ওপর কোনো প্রভাব ফেলার সম্ভাবনা ছিল না। কারণ ইংল্যান্ডের দ্বিতীয় ইনিংস শেষ হয়েছিল পঞ্চম দিন সকালে। এরপর ভারত দ্বিতীয় ইনিংসে ১ উইকেটে ৯৭ রান করে ইনিংস ঘোষণা করার পর ইংল্যান্ড তাদের দ্বিতীয় ইনিংসে কোনো উইকেট না হারিয়ে করেছিল ৯১ রান। আজহারউদ্দিন যেভাবে খেলছিলেন, তাতে করে গাভাস্কার ইনিংস ঘোষণা না করলে চতর্থ সেঞ্চুরিও পেয়ে যেতে পারতেন।
আজহারউদ্দিনের সেই রেকর্ডের বয়স ৪০ বছর পার হয়েছে। আজও অক্ষত আছে আপন মহিমায়। তার রেকর্ডে ভাগ বসানোর জন্য পরে আরও চারজন চেষ্টা করেছিলেন অভিষেকের পর। যার দুজনই ছিলেন নিজ দেশের। একজন সৌরভ গাঙ্গুলি, আরেকজন বর্তমান অধিনায়ক রোহিত শর্মা। কিন্তু দুজনেই তৃতীয় টেস্টে সেঞ্চুরি করতে পারেননি। অপর দুই জন ছিলেন নিউজিল্যান্ডের জিমি নিশাম ও পাকিস্তানের আবিদ আলী।
কানপুর এখন পর্যন্ত অমুচনীয় রেকর্ড গড়ার পর এই মাঠ আজহারকে দিয়েছে দুহাত ভরে। কখনো হতাশ করেননি। যে কটি টেস্ট খেলেছেন, পেয়েছেন তিন অঙ্কের ম্যাজিক ফিগারের দেখা। দুই বছর পর আজহারউদ্দিন আবার খেলতে আসেন কানপুরে তার ১৬তম টেস্ট। প্রতিপক্ষ ছিল শ্রীলঙ্কা। এবার আগের ইনিংসকে ছাড়িয়ে যান। পৌঁছে গিয়েছিলেন ডাবল সেঞ্চুরির একেবারে কাছাকাছি। মাত্র ১ রান দূরে থাকতে তিনি ১৯৯ রানে আউট হয়ে যান। এই সেঞ্চুরির আগে তিনি আরও ২১টি সেঞ্চুরি করেছিলেন। কিন্তু কানপুরের ১৯৯ রানের ইনিংসই তার ক্যারিয়ারের সেরা হয়ে থাকে।
কানপুরে দ্বিতীয়বার খেলতে আসার আগে মাঝের ১২ টেস্টে তিনি কোনো সেঞ্চুরি করতে পারেননি। হাফ সেঞ্চুরি ছিল তিনটি অপরাজিত ৫৯, ৬৪ ও ৫০। সেঞ্চুরি করতে না পারার খরা কানপুরে কাটানোর পর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। ১০ বছর পর ১৯৯৬ সালে কানপুরে তৃতীয়বারের মতো আসার আগে ৫৮ টেস্ট খেলে তিনি একে একে সেঞ্চুরি করেন ১১টি। কিন্তু কানপুরে তৃতীয়বার খেলতে নেমে প্রথম ইনিংসে ৫ রানে আউট হয়েছিলেন। যে কানপুর আজহারউদ্দিনের জন্য রান প্রসবা, রেকর্ড গড়ার ভেন্যু, সেই কানপুর কি তাকে হতাশ করতে পারে? তাকে হতাশ করেনি। দ্বিতীয় ইনিংসেই পেয়ে যান আবারও সেই তিন অঙ্কের সেই ম্যাজিক ফিগারের দেখা। এবার আর তাকে আউটই করা যায়নি। ১৬৩ রানের ইনিংস খেলে অপরাজিত থাকেন।
এভাবেই আজহারউদ্দিন আর কানপুর দুজন দুজনার হয়ে গিয়েছিল।