বিশ্বকাপ, এশিয়া কাপ কিংবা দ্বিপক্ষীয় সিরিজ- টুর্নামেন্ট যেটাই হোক, বাংলাদেশ-ভারত লড়াইয়ে সমর্থকদের মাঝে থাকে বাড়তি উন্মাদনা। অন্তত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দুই দলের সমর্থকদের কথার লড়াই থাকে বেশ জমজমাট। এবার অবশ্য খানিকটা ব্যতিক্রমী চিত্র দেখা গেছে। দুই দল মাঠে খেলছে অথচ নেই কথার লড়াই। এর পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ বাংলাদেশের রাজনীতির পালাবদল। কারণ রাজনীতির পালাবদল নিয়ে বেশি আলোচনা হওয়ায় খেলা নিয়ে কথার লড়াই একদম হয়নি বললেই চলে। এমন সময়ে ভারতের কাছে তাদের মাটিতে টি-টোয়েন্টি সিরিজে হোয়াইটওয়াশ হয়েছে বাংলাদেশ। অথচ ভারত সফরের আগে পাকিস্তানকে তাদের মাটিতে হোয়াইটওয়াশ করে বাংলাদেশ দল জোগাড় করেছিল বাড়তি আত্মবিশ্বাস। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ওই আত্মবিশ্বাস কাজে লাগিয়ে সিরিজে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়তে পারেনি নাজমুল হোসেন শান্তর দল। এবার সেই দুঃস্মৃতি ভুলে স্বাগতিকদের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি সিরিজে মাঠে নামবে বাংলাদেশ। আজ গোয়ালিয়রের শ্রীমন্ত মাধবরাও সিন্ধিয়া স্টেডিয়ামে ম্যাচ শুরু হবে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায়।
টি-টোয়েন্টি সংস্করণে ম্যাচ মানেই বাংলাদেশের খেলার ধরন নিয়ে হবে সমালোচনা। এবার সেই ধারা থেকে বেরিয়ে আসতে চান অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত। খোলনলচে বদলে ফেলার মিশন যে ভারতের বিপক্ষে নিতে চান অধিনায়ক, তাদের বিপক্ষে বাংলাদেশের রেকর্ড খুব একটা ভালো নয়। টি-টোয়েন্টিতে আগের ১৪ দেখায় বাংলাদেশ জয় পেয়েছে মাত্র একবার। সেই জয় আবার এসেছে ভারতের মাটিতে ২০১৯ সালে। ওই জয়ের পর ভারতের বিপক্ষে এই সংস্করণে ন্যূনতম প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়তে পারেনি বাংলাদেশ। বিশ্বকাপে দুই দলের সর্বশেষ দেখায় বাংলাদেশ হেরেছে ৫০ রানের বড় ব্যবধানে।
পরিসংখ্যানের দিকে না তাকিয়ে সিরিজ শুরুর আগে বাংলাদেশ অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তর স্পষ্ট ঘোষণা ছিল খেলার ধরন বদলে ফেলতে চান। শুধু বদলে ফেলার ঘোষণাতেই সীমাবদ্ধ থাকেননি। আগামী ২০২৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের জন্য প্রস্তুতি শুরু করতে চেয়েছেন ভারতের বিপক্ষে সিরিজ দিয়ে। মূলত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের পরের আসরের আয়োজক ভারত ও শ্রীলঙ্কা। সে কারণে এই সিরিজ দিয়ে ভারতের মাঠ সম্পর্কে ধারণা স্পষ্ট করার সুযোগ পাচ্ছে বাংলাদেশ।
খোলনলচে নিজেদের বদলে ফেলে বিশ্বকাপের প্রস্তুতি শুরুর সিরিজে বাংলাদেশ স্কোয়াডে নেই বড় কোনো পরিবর্তন। এই দিকটাই এগিয়ে থাকবে স্বাগতিক ভারত। রোহিত শর্মা-বিরাট কোহলি ইতোমধ্যে ছেড়ে দিয়েছেন টি-টোয়েন্টি সংস্করণ। পাশাপাশি শুভমান গিল-ঋষভ পন্তের মতো নিয়মিত মুখদের বাংলাদেশ সিরিজের স্কোয়াডে রাখেনি ভারত। তাদের বদলি হিসেবে অন্য তরুণদের সুযোগ করে দিয়েছে। অন্যদিকে সর্বশেষ বিশ্বকাপের স্কোয়াড থেকে মাত্র তিন পরিবর্তন নিয়ে ভারতের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি সিরিজে খেলবে বাংলাদেশ। এর মধ্যে সাকিব আল হাসান টি-টোয়েন্টি থেকে অবসর নেওয়ায় অবধারিতভাবে বাদ পড়েছেন। অন্যদিকে সৌম্য সরকার নেই পারফর্ম করতে না পারায়। ইনজুরির কারণে জায়গা হয়নি স্পিনার তানভীর ইসলামের। তবে আছেন ৩৯ ছুঁইছুঁই বয়সের মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। পরের আসরের প্রস্তুতি শুরুর সিরিজে তার থাকাটা একটু বিস্ময়ের। সেই বিস্ময় খানিকটা কাটিয়ে দিয়েছেন অধিনায়ক শান্ত। সিরিজপূর্ব সংবাদ সম্মেলনে তিনি যা বলেছেন তাতে স্পষ্ট, ভারত সিরিজ রিয়াদের জন্য হতে যাচ্ছে অ্যাসিড টেস্ট। ভালো না করতে পারলে পরের বিশ্বকাপের জন্য বিবেচনায় থাকবেন না। পরের বিশ্বকাপের সময় রিয়াদের বয়স দাঁড়াবে ৪১-এ। ওই বয়সে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের জন্য তিনি যে বিবেচনায় থাকবেন না, সেটাও অনেকটা চোখ বন্ধ করেই বলে দেওয়া যায়।
এদিকে টি-টোয়েন্টি সংস্করণ থেকে সাকিব অবসর নেওয়ায় বাংলাদেশের জন্য একাদশ সাজানো হতে পারে একটু চ্যালেঞ্জিং। গোয়ালিয়রে টাইগার ম্যানেজমেন্ট কীভাবে একাদশ সাজাবে, সেটাও একটা বড় পরীক্ষা। কারণ সাকিব থাকলে ব্যাটিং-বোলিংয়ে বাড়তি একটি সুবিধা পায় বাংলাদেশ। সেই সুবিধা অবশ্য এখন আর পাওয়া যাবে না। তবে সাকিবের অনুপস্থিতিতে স্পিন আক্রমণ শক্তিশালী করতে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে তরুণ রাকিবুল হাসানকে। এ ছাড়া স্কোয়াডে আছেন ডানহাতি অলরাউন্ডার মেহেদি হাসান মিরাজ। ব্যাটে-বলে সাকিবের অভাব তিনি কতটা পুষিয়ে দিতে পারেন, সেটাই দেখার সিরিজ হবে এটা।
নিজেদের স্কোয়াড ঠিক করার পাশাপাশি বাংলাদেশ প্রতিপক্ষের চ্যালেঞ্জ কেমন সামলায় সেটাও দেখার সিরিজ এটা। কারণ নামে তরুণ দল হলেও ভারতীয় স্কোয়াডে থাকা বেশির ভাগ ক্রিকেটার নিজেদের প্রমাণ করেছেন আইপিএলে। বিশ্বের অন্যতম সেরা ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে প্রমাণ করা ক্রিকেটাররা যে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ভালো করতে খুব বেশি সময় নেবেন না, সেটা বলাই যায়। ভারতের তারুণ্যনির্ভর দলে অভিষেকের অপেক্ষায় আছেন মায়াঙ্ক যাদব, নিতীশ কুমার ও হারশিত রানা। এ ছাড়া অভিষেক শর্মা-স্যাঞ্জু স্যামসনের মতো হার্ডহিটাররা আছেন ভারতীয় দলে। স্কোয়াডে থাকা সবাই আইপিএলে নিজেদের প্রমাণ করায় খানিকটা সাবলীল থাকবেন তারা। এ ছাড়া সর্বশেষ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন দলে থাকা হার্দিক পান্ডিয়া, সুর্যকুমার যাদব, আর্শদ্বীপ সিং ও শিভম দুবেরা নিজেদের দিনে কতটা ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারেন, সেটা সবাই জানে। তারুণ্য ও অভিজ্ঞতার মিশ্রণে তৈরি এই স্কোয়াড বাংলাদেশকে দিয়ে রাখবে বাড়তি হুমকি।
ক্রিকেটারদের এই পারফরম্যান্সের পাশাপাশি বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ দর্শক। ১৪ বছর পর গোয়ালিয়রে ক্রিকেট ফেরায় শ্রীমন্ত মাধবরাও সিন্ধিয়া স্টেডিয়ামের ৩০ হাজার দর্শকদের কাছ থেকে যে সামান্য সমর্থনও পাবে না বাংলাদেশ, সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। ফলে দর্শকদের এই চাপ কীভাবে সামলে বাংলাদেশ পারফর্ম করে, সেটাই দেখার অপেক্ষা।