মানুষ যখন পানিতে ডুবতে থাকে, তখন খড়কুটো ধরে হলেও বেঁচে থাকার চেষ্টা করে। ভারত সফরে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলও রীতিমতো ডুবছে। কিন্তু নিজেদের রক্ষা করার জন্য খড়কুটোও পাচ্ছে না। ভরসা হিসেবে অতীত সাফল্যে ফিরে যাচ্ছে। কিন্তু তাকে আঁকড়ে ধরেও কোনো কাজ হচ্ছে না। যেমন দিল্লিতে দ্বিতীয় টি-টোয়েন্টি ম্যাচের আগে বারবার সামনে এসেছিল ২০১৯ সালে ভারতকে হারানো ম্যাচটি। কিন্তু এতে কোনো কাজ হয়নি। হেরেছে বাজে ভাবে। সেই সঙ্গে খোয়া যায় সিরিজও।
আজ শনিবার (১২ অক্টোবর) হায়দরাবাদে সিরিজের শেষ ম্যাচ। সামনে টেস্টে সিরিজের মতোই হোয়াইটওয়াশ হওয়ার চোখ রাঙানি। এই চোখ রাঙানি উপেক্ষা করে নিজেদের ফিরে পাওয়ার কোনো মন্ত্রই যে বাংলাদেশের সামনে নেই, যা দেখে অন্তত ২০১৯ সালের দিল্লিকা লাড্ডুর মতো অনুপ্রেরণা পেতে পারে। তবে স্মৃতি হাতড়ে পাওয়া গেছে এক অভূতপূর্ব সাফল্য। ১৯৯৮ সালে এই হায়দরাবাদেই বাংলাদেশ কেনিয়াকে ৬ উইকেটে হারিয়ে ওয়ানডে ক্রিকেটে পেয়েছিল প্রথম জয়। এখন আজকের ম্যাচের আগে এটিই বাংলাদেশের জন্য খড়কুটো। কিন্তু এই খড়কুটো ধরে বাংলাদেশ দল নিজেদের কতটা বাঁচাতে পারবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। আবার এই খড়কুটো ধরার আগেই দুর্বল হয়ে পড়ছে ভেন্যুর কারণে। বাংলাদেশ কেনিয়াকে হারিয়েছিল লাল বাহাদুর শাস্ত্রী স্টেডিয়ামে। কিন্তু আজকের খেলা হবে রাজীব গান্ধী স্টেডিয়ামে।
আসলে এসবই রূপক। প্রতিটি ম্যাচই নতুন করে শুরু হয়। জিততে হলে প্রতিটি ম্যাচেই ভালো করতে হয়। আগের সাফল্য থেকে শুধুই অনুপ্রেরণা পাওয়া যায়। এই অনুপ্রেরণা ম্যাচে নতুন করে বাড়তি উদ্দীপনা তৈরি করে। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তার কোনো কিছুই প্রতিফলন ঘটছে না। দিল্লিতে হয়নি। হায়দরাবাদে হবে বলেও মনে হচ্ছে না। কিছু করতে হলে সেরাটাই দিতে হবে। কিন্তু তার জন্য বাংলাদেশ দল কতটা প্রস্তুত? প্রথম দুই ম্যাচের আলোকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় তা অন্তঃসারশূন্য। ফলাফল পূর্বানুমান করা এ ম্যাচটিই কিন্তু হবে আবার মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের টি-টোয়েন্টি ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচ!
দুটি ম্যাচেই বাংলাদেশের ব্যাটিং দুর্বলতা প্রকটভাবে ফুটে উঠেছে। প্রথম ম্যাচে আগে ব্যাট করে মাত্র ১২৭ রানে অলআউট হয়েছিল। ভারত সেই রান তাড়া করেছিল মাত্র ১১.৫ ওভারে ৩ উইকেট হারিয়ে। দ্বিতীয় ম্যাচে ভারতের ওভার প্রতি ১১ রানের ওপরে সংগ্রহ করে ৯ উইকেটে ২২১ রান। জবাব দিতে নেমে আরেকবার প্রকটভাবে ফুটে ওঠে বাংলাদেশের ব্যাটিং লাইনের ভঙ্গুর অবস্থা। ৯ উইকেটে করে ১৩৫ রান।
দ্বিতীয় ম্যাচে ভারতে শুরুতে ব্যাটিং বিপর্যয়ে পড়লেও পরে তারা নিজেদের গুছিয়ে নেয়। বিপর্যয়ের মাঝেও তাদের পরের ব্যাটাররা অবলীলায় চার-ছয় মেরেছেন। কিন্তু বাংলাদেশের ব্যাটারদের সীমানা পার করতে ত্রাহী ত্রাহী অবস্থা। ছয় মারা যেন তাদের কাছে বিশ্বের সবচেয়ে কঠিন কাজ। আর এই কঠিন কাজেরই এক অবিশ্বাস্য ব্যাখ্যা দিয়েছেন ফিল্ডিং কোচ নিকি পোথাস। ওজনের কারণেই ছক্কা মারার ক্ষেত্রে দুই দলের ব্যাটারদের মাঝে এ রকম পার্থক্য বলে জানান পোথাস।
তিনি বলেন, ‘একজনের ওজন যদি ৯০ থেকে ১০০ কেজি হয়, আর আরেক জনের ওজন হয় ৬৫ কেজির মতো। তা হলে যার ওজন বেশি তিনি তো বল বেশি দূর পাঠাবেনই। এটাই স্বাভাবিক।’
পরে তিনি আরও বলেন, ‘এখানে টেকনিকের বিষয়ও আছে। টাইমিংয়ের বিষয়ও আছে। আমরা এসব নিয়ে সব সময় কাজ করছি।’
দুটি ম্যাচেই বাংলাদেশের সংগ্রহ দেড়শ রানের নিচে হওয়ার কারণ হিসেবে তিনি প্রতিপক্ষ হিসেবে ভারতকে খুবই শক্তিশালী বলে উল্লেখ করেন।
পোথাস বলেন, ‘আপনাদের আইপিএলের দিকেও নজর দিতে হবে। এটি পৃথিবীর সেরা আসর। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের জন্য খেলোয়াড় তৈরি করে দেয়। আমরা খেলছি এমনই একটি শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে এবং সেটি আবার তাদের মাটিতেই। কাজেই এখানে দুই দলের পার্থক্য স্পষ্ট। তার পরও আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যাটিং করতে পারিনি। আমাদের আরও বেশি রান করা উচিত ছিল। আমরা অবশ্যই ১৭০ থেকে ১৮০ রান করতে পারতাম। ভারত কত রান করল সেটি তাদের বিষয়। ব্যাটিং করার জন্য দারুণ উপযোগী পিচ ছিল। আমাদের বোলাররা ভালো বোলিং করতে না পারলেও ভারতের বোলাররা কিন্তু দারুণ বোলিং করেছে। আবার আমরা অনেক সুযোগও কাজে লাগাতে পারিনি।’
তিনি বলেন, ‘ভারতে অনেক দল এসেই নাকানি-চুবানি খেয়ে যায়। এই সিরিজ থেকে আমাদের অনেক কিছু শেখার আছে।’ ভারত এসে শিখতে পারাকে পোথাস বাংলাদেশ দলের জন্য সৌভাগ্য বলেও উল্লেখ করেন।
দ্বিতীয় ম্যাচে বাংলাদেশ দল একটি পরিবর্তন করেছিল। পেসার শরিফুলের পরিবর্তে তানজিম হাসান সাকিবকে খেলানো হয়েছিল। কিন্তু দুই ম্যাচের পোস্ট মর্টেম করলে দুই-একজন ব্যতীত আগা-গোড়া সবাই ব্যর্থ। ব্যর্থ পারভেজ-লিটনের উদ্বোধনী জুটি। ব্যর্থ অধিনায়ক নাজমুল-তাওহীদ হৃদয়। কিছুটা রান করেছেন প্রথম ম্যাচে মেহেদি হাসান মিরাজ, দ্বিতীয় ম্যাচে মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। জাকের আলী দুই ম্যাচেই নিজেকে মেলে ধরতে পারেননি। লম্বা ব্যাটিং লাইন নিয়েও বাংলাদেশ নিজেদের সংগ্রহ হৃষ্টপুষ্ট করতে পারেনি। আজকের ম্যাচে ব্যাটিং লাইনে পরিবর্তন হলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। একাদশের বাইরে বসে আছেন ওপেনার তানজিদ হাসান তামিম। বল হাতে তিন পেসার মোস্তাফিজ (৩ উইকেট), তাসকিন (২ উইকেট), তানজিম সাকিব (২ উইকেট), লেগ স্পিনার রিশাদ (৩ উইকেট) কিছুটা সফল। এখানে হয়তো পরিবর্তন নাও হতে পারে।