এশিয়া কাপে হয়ে গেল দুই মহারণ। দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী- ভারত এবং পাকিস্তানের মুখোমুখি লড়াইয়ে আলোচিত ঘটনায় নেই ছক্কা, বাউন্ডারি বা উইকেট; বরং ম্যাচ শেষে খেলোয়াড়রা একে অপরের সঙ্গে করমর্দন না করাই হয়ে দাঁড়ায় মূল আলোচনার বিষয়।
কোটি কোটি ভক্তের কাছে ক্রিকেট আজও আবেগ ও গর্বের উৎস। কিন্তু ভারত এবং পাকিস্তান সরকারও রাজনীতিবিদদের কাছে এটি কঠোরতার প্রদর্শনের মঞ্চ হয়ে উঠেছে। বিগত সময়ে এই প্রতীকী জায়গাটি তীব্রভাবে ক্ষয় হয়েছে। দুই দেশের মধ্যকার রাজনৈতিক টানাপোড়েন ক্রিকেটের সঙ্গেও জড়িয়ে গেছে। ২০২১ সালের অক্টোবর মাসে পাকিস্তান টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারতকে হারানোর পর পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ রশিদ সেটিকে ‘ইসলামের জয়’ আখ্যা দেন।
চলতি এশিয়া কাপের গ্রুপ পর্বে ভারতের অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদব পাকিস্তানের বিপক্ষে ৭ উইকেটের জয়ের পর সেই রাজনৈতিক সুরটিই স্পষ্ট করেন। তিনি জয়টি উৎসর্গ করেন ‘পাহেলগামে হামলায় নিহতদের’ এবং ‘ভারতীয় সেনাদের’। পাকিস্তানের অধিনায়কের সঙ্গে করমর্দন না করার সিদ্ধান্তে তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয় জীবনে কিছু বিষয় খেলোয়াড়সুলভ মানসিকতারও ঊর্ধ্বে।’ গ্রুপ পর্বেও তারা হাত মেলাননি সালমান আলি আঘাদের সঙ্গে।
ছোট ছোট ইঙ্গিতগুলোই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ক্রিকেটের প্রতীকী গুরুত্ব অনেক বেশি। একটি করমর্দন না হওয়ার ঘটনা স্টেডিয়ামের বাইরে বহুদূর পর্যন্ত প্রতিধ্বনি তোলে। দুঃখজনক হলো, যে ক্রিকেট একসময় মানুষে মানুষে সংযোগ তৈরি করত, রাজনৈতিক বিভাজন কিছুটা হলেও গলাত, এখন সেটিই দুই দেশের তিক্ত সম্পর্কের প্রতিফলন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এশিয়া কাপে করমর্দনের অনুপস্থিতি কোনো ভুলচুক নয়; এটি দেখিয়েছে, কীভাবে জাতীয়তাবাদ আর রাজনৈতিক অহংকার সবচেয়ে সহজ ইঙ্গিতকেও প্রায় অসম্ভব করে তুলতে পারে।
দুই মহারণে ৪ বিতর্ক

নো হ্যান্ডশেক
গ্রুপ পর্বের মতো সুপার ফোরের ম্যাচেও ভারত ‘নো হ্যান্ডশেক’ নীতি কঠোরভাবে মেনে চলে। অধিনায়ক সূর্যকুমার ও তার সতীর্থরা প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়দের সঙ্গে করমর্দন করতে অস্বীকার করেন, পাহেলগাম হামলার প্রতিবাদ হিসেবে। রবিবারের মহারণে ‘নো হ্যান্ডশেক’ পর্বে এক মজার মন্তব্য করেন ভারতের প্রধান কোচ গৌতম গম্ভীর। খেলোয়াড়রা কারও সঙ্গে হাত না মিলিয়ে যখন ড্রেসিংরুমে ফিরছিলেন, তখন গম্ভীর তাদের মাঠে ফিরিয়ে এনে ম্যাচ অফিশিয়ালদের (আম্পায়ারদের) সঙ্গে করমর্দন করতে বলেন। গম্ভীর মজার ছলে বলেন, ‘আম্পায়ারের সঙ্গে তো হাত মিলাও।’ এ যাত্রায় হাত না মেলানো নিয়ে কোনো আপত্তি তুলেনি পাকিস্তান। এমনকি ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনেও বর্জন করেনি। এই আনুষ্ঠানিকতায় সংবাদকর্মীদের মুখোমুখি হন পাকিস্তান অধিনায়ক সালমান আলি আঘা। তিনি সব প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন।

গান শট
গত এপ্রিলে পাহেলগামে সন্ত্রাসীদের হামলায় ২৬ ভারতীয় নিহত হন। সেই ঘটনায় পাকিস্তানে ‘অপারেশন সিঁদুর’ চালায় ভারতীয় সেনাবাহিনী। পাল্টা জবাব দেয় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীও। চার দিন চলে দুই দেশের সামরিক যুদ্ধ। কয়েক মাসের আগের সেই ঘটনা নতুন করে জাগিয়ে তুলেছে এশিয়া কাপের মঞ্চে। এরই মধ্যে গান শট উদযাপনে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করেছেন শাহিবজাদা ফারহান। গ্রুপ পর্বের মহারণে ৪৫ বলে ৫৮ রান করেন ফারহান। তিনি হাফ সেঞ্চুরির কোটা স্পর্শের পর ব্যাট দিয়ে গুলি করার স্টাইলে উদযাপন করেন। এ প্রসঙ্গে ফারহান বলেন, ‘সাধারণত আমি হাফ সেঞ্চুরি উদযাপন করি না। তবে হঠাৎ মাথায় এল, আজ (রবিবার) একটা সেলিব্রেশন করি। তাই করলাম। মানুষ এটা কীভাবে নেবে, আমি জানি না। তবে আমি এ ব্যাপারে চিন্তাও করি না।’ এদিকে গুঞ্জন রয়েছে, পাকিস্তানি ব্যাটারের এই উদযাপন ভালোভাবে নেয়নি আইসিসি।

বিতর্কিত আউট
ফখর জামানের আউট নিয়ে বির্তক তৈরি হয়েছে। তার ক্যাচ ধরেছিলেন কিপার সাঞ্জু স্যামসন। কয়েকবার রিভিউ দেখে আউট দেন থার্ড আম্পায়ার। সেই ক্লোজ কল নিয়ে পাকিস্তানের অভিযোগ- কিপারের গ্লাভসে বল যাওয়ার আগে মাটিতে পড়েছে। ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে পাকিস্তান অধিনায়ক সালমান বলেন, ‘আমি সিদ্ধান্ত সম্পর্কে জানি না। এটা আসলে আম্পায়ারের কাজ। আম্পায়ার ভুল করতেই পারেন। এতে আমার কোনো সমস্যা নেই। তবে মনে হয়েছে বলটি কিপারের কাছে যাওয়ার আগেই মাটিতে বাউন্স করেছে। তবে আমি ভুলও হতে পারি। জানি না। যেভাবে ফখর ব্যাটিং করছিল, যদি পাওয়ারপ্লে জুড়ে সে ক্রিজে থাকত, আমরা সম্ভবত ১৯০ রান তুলতে পারতাম। আমি আবারও বলছি, এটা আম্পায়ারের সিদ্ধান্ত। তারা ভুল করতেই পারেন। তবে আমার কাছে এটিকে আউট মনে হয়নি।’
৬-০
রবিবার দুর্দান্ত ফর্মে থাকা ভারতের ওপেনার অভিষেক শর্মার সঙ্গে পাকিস্তানের বোলার হারিস রউফের উত্তপ্ত বাগবিতণ্ডা হয়। যদিও শর্মা তখন নন-স্ট্রাইকার প্রান্তে ছিলেন, শুভমান গিল রউফকে বাউন্ডারি মারার পর দুজনের মধ্যে বিতর্ক শুরু হয়। পরিস্থিতি কিছুটা উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে এবং মাঠের আম্পায়ারকে এগিয়ে এসে খেলোয়াড়দের আলাদা করতে হয়। রউফ আবারও বিতর্কের কেন্দ্রে চলে আসেন ম্যাচ চলাকালীন, যখন তিনি বাউন্ডারির কাছে ফিল্ডিং করছিলেন। এ সময় ভারতীয় সমর্থকরা বিরাট কোহলির নাম ধরে স্লোগান দিচ্ছিলেন, তাকে মনে করিয়ে দিচ্ছিলেন ২০২২ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে কোহলির টানা ছক্কার কথা। এর জবাবে রউফ হাত দিয়ে একটি বিমান ভূপাতিত হওয়ার ভঙ্গি করেন। এখানেই থেমে থাকেননি তিনি, ভারতীয় সমর্থকদের উদ্দেশে ‘৬-০’ ইশারাও করেন, যা ছিল পাকিস্তানের সাম্প্রতিক সামরিক সংঘর্ষে ভারতের যুদ্ধবিমান নামানোর দাবির দিকে ইঙ্গিত করে ভারতীয়দের কটাক্ষ।
সূর্যের গণনায় নেই সালমানরা
মহারণে এ নিয়ে টানা সাতবার পাকিস্তানকে হারাল ভারত, ওয়ানডে এবং টি-টোয়েন্টি মিলিয়ে। ফল যেহেতু একপেশে, তাই সূর্যের গণনায় নেই সালমানরা। সর্বশেষ পাকিস্তানকে ৬ উইকেটে হারানোর পর ভারতীয় অধিনায়ক বলেন, ‘আমি মনে করি, আমাদের এখন (ভারত-পাকিস্তান) প্রতিদ্বন্দ্বিতা নিয়ে প্রশ্ন করা বন্ধ করা উচিত। যদি দুই দল ১৫-২০ ম্যাচ খেলে এবং ফলাফল হয় ৭-৭ বা একজন ৮-৭ এগিয়ে থাকে, তখন সেটা প্রতিদ্বন্দ্বিতা। কিন্তু ১৩-০, ১০-১... আমি জানি না পরিসংখ্যান কী, তবে এটা আর প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়।’
ম্যাচের আগে সংবাদ সম্মেলনেও সূর্যকুমার একই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেছিলেন, আসল প্রতিদ্বন্দ্বিতা মাঠে নয়, স্টেডিয়ামে দর্শকের ভিড়েই বেশি বোঝা যায়, ‘আমরা যদি প্রতিদ্বন্দ্বিতা নিয়ে কথা বলি, আমি জানি না আপনি কোন প্রতিদ্বন্দ্বিতার কথা বলছেন। মাঠে নামার পর আমার মনে হয় স্টেডিয়াম ভরা। আর স্টেডিয়াম ভরা মানেই আমি আমার দলকে বলি- এখন বিনোদনের সময়।’
সুপার ফোর ম্যাচ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি পরিষ্কারভাবে জানালেন, কোথায় ভারত এগিয়ে ছিল, ‘আমার মনে হয়, আমরা ওদের চেয়ে ভালো ক্রিকেট খেলেছি ৭ থেকে ১৫ ওভারের মধ্যে এবং বোলিংয়ের ক্ষেত্রেও।’ তিনি যোগ বলেন, ‘১৪ সেপ্টেম্বর আমরা শেষবার খেলেছিলাম। তার পর থেকে উইকেট আরও ভালো হয়েছে। আজ ব্যাটিংয়ের জন্য কিছুটা ভালো ছিল, তবে একটু কঠিনও ছিল। আমার মতে, যে দল ৭-১৫ ওভারে ভালো খেলবে, সবসময় তারাই এগিয়ে থাকবে।’
তবে ভারতের দিনটা নিখুঁত ছিল না। চারটি ক্যাচ ছেড়েছিল তারা। সর্বশেষ এত ক্যাচ মিস করেছিল তারা ২০২২ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে এমসিজিতে পাকিস্তানের বিপক্ষেই। তবে সূর্যকুমার বলেন, দুবাইয়ের ‘রিং অফ ফায়ার’ ফ্লাডলাইট কোনো অজুহাত হতে পারে না, কারণ ভারত সেখানে অনেক ম্যাচ ও অনুশীলন করেছে। মজার ছলে তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয় ফিল্ডিং কোচ ইতোমধ্যেই যাদের হাতে একটু মাখন লেগেছিল, তাদের কাছে ইমেইল পাঠিয়ে দিয়েছে- আগামীকাল অথবা পরশু অফিসে আসতে হবে। এটা পুরোপুরিই খেলার অংশ, আমি এতে ঠিক আছি। ভালো হয়েছে প্রথম ম্যাচেই এমন হয়েছে, কারণ সামনে আরও গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ আছে। সমস্যা নেই, এটা খেলারই অংশ।’
অনিক/নিলয়/