হঠাৎ করেই দেশের ৪৯টি ক্রীড়া সংস্থাকে ‘অনতিবিলম্বে নির্বাচন আয়োজনের উদ্যোগ গ্রহণের’ অনুরোধ জানিয়ে চিঠি দিয়েছে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনএসসি)। এ নিয়ে খোদ ক্রীড়া সংস্থাগুলোর কর্মকর্তাদের মধ্যেই মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
গত বছর ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে ধাপে ধাপে বিভিন্ন ক্রীড়া সংস্থার বিদ্যমান কমিটি ভেঙে দিয়ে অ্যাডহক কমিটি গঠন করে এনএসসি। জাতীয় ক্রীড়া ফেডারেশন/সংস্থাগুলোর পাশাপাশি আঞ্চলিক ক্রীড়া সংস্থাগুলোও ভেঙে অ্যাডহক কমিটি করে দেওয়া হয়। জাতীয় ক্রীড়া ফেডারেশন বা অ্যাসোসিয়েশনগুলোর অ্যাডহক কমিটি ঘোষণার সময় তাদের মেয়াদ কত দিন হবে বা কবে নির্বাচন দিতে হবে, এ ধরনের কোনো বার্তা ছিল না। এখন হঠাৎই এনএসসি তাদের চিঠিতে অনতিবিলম্বে নির্বাচন আয়োজনের উদ্যোগ গ্রহণের কথা বলেছে। ক্রীড়া সংগঠকদের বেশির ভাগই বলছেন, জাতীয় ক্রীড়া সংস্থাগুলোর আগে স্থানীয় বা আঞ্চলিক ক্রীড়া সংস্থাগুলোতে নির্বাচন হওয়া জরুরি। না হলে কারা কাউন্সিলর হয়ে আসবেন, সে নিয়ে তৈরি হবে জটিলতা।
দেশের এই মুহূর্তে ক্রীড়া ফেডারেশন বা অ্যাসোসিয়েশনের সংখ্যা ৫২টি। এর মধ্যে বাংলাদেশ ক্রীড়া বোর্ড (বিসিবি) ও বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারাই পরিচালিত হচ্ছে। বাকিগুলোর মধ্যে তায়কোয়ানদো অ্যাসোসিয়েশন বাদে ৪৯টি সংস্থাকেই নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে চিঠি দিয়েছে এনএসসি। এই চিঠি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ভলিবল ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক বিমল ঘোষ ভুলু খবরের কাগজকে বলেন, ‘অ্যাডহক কমিটি হিসেবে নির্বাচন তো আমরা করবই। নির্বাচনের যে প্রক্রিয়া আছে সেটা মেনেই আমরা এগোব। কমিটির সবাই মিলে বসে এ সম্পর্কে কয়েক দিনের মধ্যেই সিদ্ধান্ত নেব।’
কাবাডি ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক এস এম নেওয়াজ সোহাগের কথায়, ‘আমাদের তো সরকারই বসিয়েছে। সরকার যেভাবে চাইবে সেটাই আমাদের করতে হবে। আমরা অবশ্যই এটাকে (নির্বাচনি চিঠি) সাধুবাদ জানাই।’ তবে হকি ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক লে. কর্নেল (অব.) রিয়াজুল হাসান কিছু প্রশ্ন রেখেছেন। তার কথায়, ‘আমরা তো অ্যাডহক কমিটি হিসেবে দায়িত্বে এসেছি। আমাদের নির্বাচন দিতেই হবে। আমি মনে করি নির্বাচন হয়েও যাওয়া উচিত। তবে এনএসসি থেকে পাওয়া চিঠিতে কোনো সময়সীমা উল্লেখ নেই। এটা থাকা দরকার ছিল।’
রিয়াজুল হাসান আরও বলেন, ‘আমি যতটা জানি জেলাগুলোতে এখন অ্যাডহক কমিটি রয়েছে। তো সেখান থেকে কারা কাউন্সিলর হয়ে আসবেন, এটি একটি বিষয়। আমার মনে হয় নির্বাচনটা নিচ থেকে, মানে জেলা ক্রীড়া সংস্থাগুলো থেকে হয়ে আসা উচিত ছিল।’
টেনিস ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ইশতিয়াক আহমেদ কারেন বলেন, ‘আমরা তো চিঠিটা হঠাৎ করেই পেলাম। নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছে। তবে নির্ধারিত করে উল্লেখ করা হয়নি যে কত দিনের মধ্যে এটা করতে হবে। পুরো বিষয়টা বুঝতে আরও পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন পড়বে। ইসি মিটিংয়ে আমরা এ নিয়ে আলোচনা করব। অন্যান্য ফেডারেশন কি করে, সেটা দেখে আমরা এগোব।’ একটা জায়গায় ইশতিয়াকের বক্তব্য মিলে যাচ্ছে হকির রিয়াজুল হাসানের সঙ্গে।
ইশতিয়াকের কথায়, ‘জেলা ক্রীড়া সংস্থাগুলোতে তো এখন ৭ সদস্যের অ্যাডহক কমিটি। ফেডারেশন নির্বাচনের আগে তো এই কমিটিগুলো পূর্ণাঙ্গ হওয়া জরুরি।’
এনএসসি ফেডারেশনগুলোকে যে চিঠি দিয়েছে, তাতে স্বাক্ষর করেছেন এনএসসির ক্রীড়া পরিচালক (উপসচিব) মোহাম্মদ আমিনুল এহসান। জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা ৪৯টি ক্রীড়া ফেডারেশন বা অ্যাসোসিয়েশনগুলোকে চিঠি দিয়েছি। এটা ঠিক যে প্রতিটি ফেডারেশন বা অ্যাসোসিয়েশনে একরকম অবস্থা নেই। স্ব-স্ব ফেডারেশন বা অ্যাসোসিয়েশনগুলো নিজেদের পরিস্থিতি বিবেচনা করে ব্যবস্থা নেবে। আমরা আসলে নির্বাচনি পরিবেশ তৈরি করার জন্য উদ্যোগ নিতে বলেছি। আমরা চাই নির্বাচন হয়ে যাক।’
আমিনুল এহসানের মতে অ্যাডহক কমিটি দ্বারা ক্রীড়া ফেডারেশন পরিচালনা কোনো স্বাভাবিক বিষয় নয়। তিনি বলেন, ‘অ্যাডহক কমিটি থাকা তো স্বাভাবিক কোনো বিষয় নয়। আমরা চাচ্ছি সেই জায়গা থেকে ক্রীড়া অনুরাগীদের মধ্য থেকে নির্বাচনের মাধ্যমে প্রতিনিধিত্ব চলে আসুক। আশাকরি ধীরে ধীরে পরিস্থিতির উত্তরণ হবে এবং আমরা নির্বাচিত কমিটি পেয়ে যাব।’
এনএসসির এই নির্বাচনি পরিবেশ তৈরির চেষ্টাকে সাধুবাদ জানিয়েছেন দাবা ফেডারেশনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ শাহাবুদ্দিন শামীম। তবে একই সঙ্গে তার মধ্যে হতাশাও আছে। তিনি বলেন, ‘একসঙ্গে সব স্থানীয় ক্রীড়াসংস্থা ভেঙে দেওয়া হয়েছিল। ফেডারেশনগুলোতে কাউন্সিলর তো যায় প্রত্যেক জেলা ক্রীড়া সংস্থার সর্বশেষ সাধারণ পরিষদের সদস্য থেকে। এখন এখানে কীভাবে কী হবে, সেটার কোনো দিকনির্দেশনা কিন্তু নেই। যদি আগে জেলা ক্রীড়া সংস্থাগুলোর নির্বাচন হতো, তাহলে সর্বশেষ সাধারণ পরিষদের সদস্যরাই সেখানে যেতে পারত। এখানে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ কি সিদ্ধান্ত নিয়েছে বা নেবে সেটা আমরা পরিষ্কার না।’
সর্বশেষ বিসিবি নির্বাচনের উদাহরণ দিয়ে দাবার এই সংগঠক আরও বলেন, ‘সর্বশেষ বিসিবি নির্বাচনে আমরা একটু ব্যতিক্রম দেখেছি। সেখানে দেখেছি, অ্যাডহক কমিটির সদস্যরাই বিসিবিতে কাউন্সিলর হিসেবে গিয়েছে। এটা কোনোভাবেই আইন সিদ্ধ কোনো বিষয় নয়।’
অ্যাডহক কমিটি থেকে কাউন্সিলর দেওয়ার সিদ্ধান্ত হলে আরও বেশ কিছু জটিলতা দেখছেন শামীম, ‘আমরা বাংলাদেশের সমস্ত ক্রীড়া সংগঠকরা যেটা জানি, অ্যাডহক কমিটিতে যাদের নেওয়া হয়েছে তাদের বেশির ভাগেরই বয়স কম। অভিজ্ঞতা নেই। অনেকেই খেলার সঙ্গে সেভাবে জড়িতও নন। ২৯ জনের কমিটির জায়গায় ৭ জনের কমিটি দেওয়া হয়েছে। হাতে গোনা কয়েকটি জেলা ক্রীড়া সংস্থা বাদে প্রত্যেকটা জেলা ক্রীড়া সংস্থায় দেখবেন একজন ক্রীড়া সংগঠকও নেই।’ আর এ জন্যই জেলা ক্রীড়া সংস্থাগুলোর নির্বাচন আগে হওয়া উত্তম বলে মন্তব্য করেন শাহাবুদ্দিন শামীম।