ঢাকা ১৪ আষাঢ় ১৪৩৩, রোববার, ২৮ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
এক ম্যাচে ১৮ কার্ডের রেকর্ড, তিনিই আর্জেন্টিনা-জর্ডান ম্যাচের রেফারি ইতিহাস গড়ার দ্বারপ্রান্তে হ্যারি কেইন পর্তুগাল-কলম্বিয়া ম্যাচ কে জিতবে, জানাল সুপারকম্পিউটার গোল বাতিলের আক্ষেপ, ড্রেসিংরুমে আবেগঘন বার্তা রেখে গেল ইরান সকালে মাঠে নামছে আর্জেন্টিনা, মোবাইলে খেলা দেখবেন যেভাবে উৎসব-দুশ্চিন্তার কেন্দ্রে সালাহ ফিনিক্স সামিট ২০২৬-এর সমাপনী দিনে সাইবার নিরাপত্তা জোরদারে গুরুত্বারোপ সাঁজোয়া যানের দুর্ঘটনায় ৬ বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী আহত, সবাই আশঙ্কামুক্ত ওয়াশিংটনের ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তি প্রত্যাখ্যান করল হিজবুল্লাহ সংসদে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ ও সাইবার নিরাপত্তা আইনের সংশোধনী বিল তৃণমূলের মানুষের কল্যাণেই এ বাজেট, বাস্তবায়নে আত্মবিশ্বাসী সরকার: সমবায় প্রতিমন্ত্রী কুমিল্লায় যুবক হত্যা: ৯৯৯-এ ফোন করা প্রতিবেশী নারী আটক জর্ডানের বিপক্ষে কেমন হতে পারে আর্জেন্টিনা একাদশ টাঙ্গাইলকে সিটি করপোরেশনে উন্নীত করুন: এমপি আবদুস সালাম রোমে একই পরিবারের তিন বাংলাদেশি খুন, পরকীয়ার জেরের দাবি জিআই পণ্য টাঙ্গাইলের তাঁত শিল্প রক্ষায় সহজ শর্তে ঋণের দাবি প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রীর সময় চাহিয়া লজ্জা দিবেন না: স্পিকার ফুলগাজীতে সড়ক দুর্ঘটনা: মা-মেয়েসহ প্রাণ গেল ৩ জনের বরগুনায় জলবায়ু সচেতনতায় তরুণদের ক্যাম্প পাগলা মসজিদের দানবাক্সে নতুন রেকর্ড, ৪৩ বস্তায় মিলল ১৫ কোটি ৯০ লাখ টাকা রাঙামাটিতে প্রথমবারের মতো জেলা প্রশাসক গোল্ড কাপ প্রমীলা ফুটবল টুর্নামেন্ট শুরু ১০ দফা দাবিতে সিলেটে জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের সমাবেশ বিএনপি-জামায়াতকে বাদ দিয়ে তৃতীয় শক্তির নতুন জোটের ইঙ্গিত মান্নার জটিল রোগে আক্রান্ত জুবায়ের, সহায়তার আবেদন পরিবারের তিস্তা প্রকল্প, রোহিঙ্গা সমস্যা ও ব্রিকসে বাংলাদেশকে সহায়তা করবে চীন: পররাষ্ট্রমন্ত্রী গাজীপুরে আবারও পুলিশ-শ্রমিক সংঘর্ষ, আহত ১২ যাকাত টেলিভিশন চালুর দাবি, ইসলামী ব্যাংকের উন্নয়নের ওপর জোর পার্থর প্রতিটি মন্ত্রণালয়কে ‘ডিসেবিলিটি ইনক্লুসিভ’ করা হবে: স্বাস্থ্যপ্রতিমন্ত্রী ‘বাংলাদেশ কি মুসলমানের জন্য স্বাধীন হয়েছে, না সব জাতি-ধর্মের মানুষের জন্য?’ কক্সবাজার সৈকতে গোসলে নেমে পর্যটক নিখোঁজ

বাংলার প্রথম নারী প্রকৌশলী ইলা মজুমদার

প্রকাশ: ১২ জুন ২০২৪, ১১:৪৮ এএম
বাংলার প্রথম নারী প্রকৌশলী ইলা মজুমদার
ইলা মজুমদার

শুধু পুরুষরাই নয়, মেয়েরাও যে সবক্ষেত্রে সমানতালে এগিয়ে যেতে পারেন তিনি তার সর্বশ্রেষ্ঠ উদাহরণ। বলছিলাম, হাজারও বাঙালি মেয়ের স্বপ্নপূরণের পথিকৃৎ বাংলার প্রথম নারী প্রকৌশলী ইলা মজুমদারের কথা। যার জন্ম ১৯৩০ সালের ২৪ জুলাই ফরিদপুর জেলায়। বাবা যতীন্দ্র কুমার মজুমদার। পেশায় তিনি ছিলেন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। মা ছিলেন গৃহিণী। ইলার সব কাজে সমর্থন দিতেন তার বাবা যতীন্দ্র কুমার। মাত্র ১২ বছর বয়সে সাইকেল এবং ১৬ বছর বয়সে জিপ চালানো শিখে ইলা তার পরিবার, বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়স্বজন সবাইকে অবাক করে দেন। বাবার চাকরির সুবাদে ইলা মজুমদার বিভিন্ন জায়গার বিভিন্ন বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। নবম শ্রেণি পর্যন্ত খুলনায় পড়াশোনা করার পর ১৯৪৫ সালে ইলা মজুমদার এবং তার পরিবার ধর্মীয় উত্তেজনার কারণে কলকাতায় চলে যান এবং সেখানেই ১৯৪৬ সালে তিনি সেকেন্ড ডিভিশন পেয়ে মেট্রিক পাস করেন। পরবর্তী সময়ে আশুতোষ কলেজ থেকে ফার্স্ট ডিভিশন পেয়ে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন।

ছোটবেলা থেকেই কারিগরি বিদ্যায় প্রবল আগ্রহ ছিল ইলা মজুমদারের। ১৯৪৭ সালে তৎকালীন বাংলার শিক্ষামন্ত্রী নিকুঞ্জ বিহারী মাইতি নারীদের জন্য ইঞ্জিনিয়ারিংসহ শিক্ষার সব ক্ষেত্রে পড়ার দরজা খুলে দেন। ইলা মজুমদার ডাক্তারি এবং ইঞ্জিনিয়ারিং দুটি বিষয়েই পড়ার সুযোগ পেলেও তিনি ইঞ্জিনিয়ারিং বেছে নেন এবং বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ভর্তি হন। সে সময় তার সহপাঠী হিসেবে ছিলেন আরেকজন মেয়ে, অজন্তা গুহ, কিন্তু তিনি এক বছর পরে বাদ পড়ে যান। তখন কলেজে ভারতীয় এবং ইউরোপিয়ান মিলিয়ে আট শতাধিক শিক্ষার্থী ছিল। যাদের মধ্যে ভারতবর্ষের প্রথম মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের একমাত্র ছাত্রী ছিলেন ইলা মজুমদার।

পরবর্তী সময়ে ১৯৫১ খ্রিষ্টাব্দে তিনি স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। স্নাতকের পর স্নাতকোত্তর স্তরে পড়াশোনার জন্য ইলা মজুমদার স্কটল্যান্ডে যান এবং সেখানকার ‘বার অ্যান্ড স্টাইড’ সংস্থা থেকে স্নাতকোত্তর স্তরের শিক্ষা নেন। পরে ভারতে ফেরেন ইলা মজুমদার দেরাদুনের ‘অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরি’-এর ভারী যন্ত্রাংশ তৈরির কারখানায় প্রথম কর্মজীবন শুরু করেন। সেখানে ছয় মাস চাকরি করার পর ১৯৫৫ সালে তিনি দিল্লি পলিটেকনিক কলেজে প্রভাষক হন। এর মধ্যে তিনি ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ওপর দুটি বই ‘অ্যাপ্লায়েড মেকানিক্স থ্রু ওয়ার্কড একজাম্পলস’ এবং ‘হাইড্রলিক্স থ্রু ওয়ার্কড একজাম্পলস’ প্রকাশ করেন।

১৯৫৯ সালে ইলা মজুমদার বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন এবং এরপর তিনি ‘মজুমদার’ পদবীর বদলে ‘ঘোষ’ পদবী গ্রহণ করেন। বিয়ের পরপরই ইলা কলকাতায় চলে আসেন এবং সেখানে ‘ইনস্টিটিউট অব জুট টেকনোলজি’তে লেকচারার পদে যোগ দেন। ১৯৬৩ সালের ২৩ ডিসেম্বর তার উদ্যোগে কলকাতার গড়িয়াহাট রোডে বাংলার প্রথম মহিলা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট (Women’s Polytechnic College, Kolkata) প্রতিষ্ঠা হয়। সেখানে তিনি প্রথম অধ্যক্ষ হিসেবে নিযুক্ত হন। তার বিস্তৃত এই কর্মকাণ্ডে মুগ্ধ হয়ে ১৯৮৫ সালে ইউনেসকোর পক্ষ থেকে তাদের প্রকল্পে ঢাকাতেও একটি মহিলা পলিটেকনিক কলেজ খোলার দায়িত্ব তাকে দেওয়া হয়। পরে ১৯৬৭ খ্রিষ্টাব্দে তিনি যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজে অনুষ্ঠিত নারী প্রকৌশলী এবং বিজ্ঞানীদের দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগদান করেন।

তিনি তার কর্মজীবনে যে লিঙ্গবৈষম্যের মুখোমুখি হয়েছেন, সে প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘আমি অবশ্যই আমার পেশাগত জীবনে সব সময় লিঙ্গবৈষম্যের মুখোমুখি হয়েছি। আমার মনে হয়েছে সমাজের মানসিকতা বদলাতে অনেক সময় লাগবে এবং তা সহ্য করা ছাড়া উপায় নেই।’ ব্যক্তিগত জীবনে ইলা মজুমদারের দুই ছেলে এবং এক মেয়ে হলেও সেই মেয়ের অকালমৃত্যু হয়। এই মহীয়সী নারী ২০১৯ সালের ১১ ডিসেম্বর মারা যান।

জাহ্নবী

নারীর জীবনে ইমপোস্টার সিন্ড্রোমের প্রভাব

প্রকাশ: ২৪ জুন ২০২৬, ০১:৪৯ পিএম
নারীর জীবনে ইমপোস্টার সিন্ড্রোমের প্রভাব

পদোন্নতি পেয়েছেন, গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রকল্প সফলভাবে শেষ করেছেন, সহকর্মীদের প্রশংসাও পেয়েছেন। তবু মনে হচ্ছে, ‘আমি আসলে এতটা যোগ্য নই’, ‘একদিন সবাই বুঝে যাবে আমি এই জায়গার যোগ্য নই।’ এমন অনুভূতি অনেক নারীর কাছেই পরিচিত। অথচ বাস্তবে তাদের দক্ষতা, পরিশ্রম ও অর্জন নিয়ে কোনো প্রশ্নই নেই। এই মানসিক অবস্থাকেই বলা হয় ইমপোস্টার সিন্ড্রোম।

এটি কোনো মানসিক রোগ নয়; বরং একটি মনস্তাত্ত্বিক অভিজ্ঞতা, যেখানে ব্যক্তি নিজের সাফল্যকে নিজের যোগ্যতার ফল হিসেবে মেনে নিতে পারেন না। তিনি মনে করেন, হয়তো ভাগ্য, অন্যের সাহায্য বা কাকতালীয় কারণে তিনি সফল হয়েছেন। ফলে নতুন দায়িত্ব, পদোন্নতি কিংবা বড় কোনো সুযোগ এলেই আত্মবিশ্বাসের বদলে ভয় ও উদ্বেগ বাড়তে থাকে।

গবেষণায় দেখা গেছে, নারী-পুরুষ উভয়েই ইমপোস্টার সিন্ড্রোমে ভুগতে পারেন। তবে করপোরেট, প্রযুক্তি, গবেষণা, চিকিৎসা, প্রশাসন কিংবা নেতৃত্বের মতো ক্ষেত্রে কর্মরত অনেক নারী এটি তুলনামূলক বেশি অনুভব করেন। কারণ শুধু ব্যক্তিগত আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দীর্ঘদিনের সামাজিক ধারণা ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতা।

শৈশব থেকেই অনেক মেয়েকে শেখানো হয়–ভুল করা যাবে না, সব সময় নিখুঁত হতে হবে, বিনয়ী থাকতে হবে এবং নিজের সাফল্য নিয়ে বেশি কথা বলা ঠিক নয়। অন্যদিকে ছেলেদের ঝুঁকি নেওয়া, নেতৃত্ব দেওয়া বা নিজের অর্জন তুলে ধরতে উৎসাহ দেওয়া হয়। এই ভিন্ন সামাজিকীকরণ নারীদের মধ্যে এমন একটি মানসিকতা তৈরি করে, যেখানে তারা নিজের সাফল্যকে ছোট করে দেখেন, কিন্তু সামান্য ব্যর্থতাকেও নিজের অযোগ্যতার প্রমাণ মনে করেন।

কর্মক্ষেত্রেও নারীদের জন্য চ্যালেঞ্জ কম নয়। অনেক প্রতিষ্ঠানে এখনো নেতৃত্বের পদে নারীর সংখ্যা তুলনামূলক কম। ফলে একজন নারী যখন গুরুত্বপূর্ণ কোনো দায়িত্ব পান, তখন অনেক সময় তাকে নিজের যোগ্যতার চেয়ে বেশি প্রমাণ দিতে হয়। কখনো সরাসরি, কখনো সূক্ষ্মভাবে তাকে শুনতে হয়–‘তুমি কি পারবে?’ কিংবা ‘এত বড় দায়িত্ব সামলানো সহজ নয়।’ এমন পরিবেশ আত্মবিশ্বাসে প্রভাব ফেলে এবং ইমপোস্টার সিন্ড্রোমকে আরও গভীর করে। 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও এই সমস্যাকে বাড়িয়ে দিতে পারে। অন্যদের পদোন্নতি, পুরস্কার, বিদেশে প্রশিক্ষণ বা নানা সাফল্যের খবর দেখে অনেকেই নিজের যাত্রাকে তুচ্ছ মনে করতে শুরু করেন। অথচ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা সাধারণত মানুষের সাফল্যের দিকটাই দেখি, সংগ্রাম বা ব্যর্থতার গল্প খুব কমই সামনে আসে। এই অসম তুলনা আত্মসন্দেহকে আরও বাড়িয়ে দেয়।

দীর্ঘদিন এই অনুভূতি থাকলে মানসিক চাপ, উদ্বেগ, কর্মক্ষেত্রে ক্লান্তি (বার্নআউট) এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার আত্মবিশ্বাস কমে যেতে পারে। অনেক নারী শুধু আত্মসন্দেহের কারণে পদোন্নতির আবেদন করেন না, নতুন চাকরির জন্য আবেদন করতে ভয় পান কিংবা নেতৃত্বের সুযোগ থেকেও নিজেকে সরিয়ে রাখেন। এতে ব্যক্তিগত ক্যারিয়ারের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানও একজন দক্ষ কর্মীকে তার পূর্ণ সম্ভাবনায় কাজে লাগাতে পারে না।

বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দেন, নিজের অর্জনের একটি তালিকা তৈরি করা, ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া সংরক্ষণ করা, প্রয়োজন হলে মেন্টর বা বিশ্বস্ত সহকর্মীর সঙ্গে অনুভূতি ভাগ করে নেওয়া এবং নিজেকে অন্যের সঙ্গে নয়, নিজের আগের অবস্থানের সঙ্গে তুলনা করা। ভুলকে ব্যর্থতা নয়, শেখার অংশ হিসেবে গ্রহণ করাও আত্মবিশ্বাস বাড়াতে সাহায্য করে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নারীদের এমন একটি কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা, যেখানে তাদের দক্ষতাকে স্বীকৃতি দেওয়া হবে, মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হবে এবং নেতৃত্বের সুযোগ সমানভাবে তৈরি করা হবে। একই সঙ্গে পরিবার ও সমাজেও মেয়েদের ছোটবেলা থেকেই শুধু নিখুঁত হওয়ার নয়, সাহসী হওয়ার, সিদ্ধান্ত নেওয়ার এবং নিজের সাফল্যকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করার শিক্ষা দিতে হবে।

সাফল্যের পথে আত্মসন্দেহ আসতেই পারে। কিন্তু সেই সন্দেহ যেন নিজের সামর্থ্যকে আটকে না রাখে। একজন নারীর যোগ্যতা কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়; তা গড়ে ওঠে তার জ্ঞান, পরিশ্রম, অভিজ্ঞতা এবং নিরন্তর প্রচেষ্টায়। তাই নিজের অর্জনকে স্বীকৃতি দেওয়া, আত্মবিশ্বাসকে লালন করা এবং ‘আমি পারি’–এই বিশ্বাসকে শক্তিশালী করাই ইমপোস্টার সিন্ড্রোম থেকে বেরিয়ে আসার সবচেয়ে কার্যকর পথ।

/এসএল

‘না’ বলার শক্তি: সীমা নির্ধারণেই মানসিক স্বাধীনতার শুরু

প্রকাশ: ২৪ জুন ২০২৬, ০১:৩৯ পিএম
‘না’ বলার শক্তি: সীমা নির্ধারণেই মানসিক স্বাধীনতার শুরু

সমাজে নারীদের ছোটবেলা থেকেই একটি বিষয় খুব সূক্ষ্মভাবে শেখানো হয়–ভদ্র হতে হবে, সবাইকে খুশি রাখতে হবে, কাউকে কষ্ট দেওয়া যাবে না। ফলে অনেক নারী নিজের ইচ্ছা, স্বাচ্ছন্দ্য কিংবা মানসিক সুস্থতার চেয়ে অন্যের প্রত্যাশাকে বেশি গুরুত্ব দিতে শিখে যান। অথচ প্রতিটি মানুষের মতো একজন নারীরও নিজের সীমা নির্ধারণ করার অধিকার আছে। প্রয়োজন হলে দৃঢ়ভাবে ‘না’ বলার অধিকারও আছে। কারণ ‘না’ বলা অভদ্রতা নয়; বরং এটি আত্মসম্মান, আত্মরক্ষা এবং মানসিক স্বাধীনতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ।

কেন নারীদের জন্য ‘না’ বলা এত কঠিন?

অনেক নারী জানেন যে, কোনো অনুরোধ গ্রহণ করলে তিনি কষ্ট পাবেন, তবু না বলতে পারেন না। কারণ এর পেছনে রয়েছে সামাজিক ও মানসিক নানা কারণ। প্রথমত, আমাদের সংস্কৃতিতে নারীদের ত্যাগী ও সহনশীল হওয়ার গুণকে অতিরিক্ত মূল্য দেওয়া হয়। একজন ভালো মেয়ে, ভালো স্ত্রী কিংবা ভালো মা হওয়ার সঙ্গে যেন সবসময় অন্যের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করার ধারণা জড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয়ত, অনেক নারী মনে করেন ‘না’ বললে মানুষ হয়তো তাকে স্বার্থপর, অহংকারী বা অভদ্র ভাববে। এই ভয় থেকেই তারা নিজের প্রয়োজনকে উপেক্ষা করেন। তৃতীয়ত, শৈশবের পারিবারিক পরিবেশও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যেসব পরিবারে সন্তানদের নিজের মতপ্রকাশের সুযোগ কম থাকে, সেখানে বড় হয়ে নিজের সীমা নির্ধারণ করাও কঠিন হয়ে পড়ে।

‘হ্যাঁ’ বলতে বলতে যখন নিজের অস্তিত্ব হারিয়ে যায় 

ধরুন, অফিসে একজন সহকর্মী প্রায়ই নিজের কাজ আপনার ওপর চাপিয়ে দেন। আপনি ব্যস্ত থাকলেও প্রত্যাখ্যান করতে পারেন না। পরিবারে সবাই ধরে নেয়, ঘরের সব দায়িত্ব আপনাকেই পালন করতে হবে। বন্ধুরা যেকোনো সময় সাহায্য চাইলে নিজের প্রয়োজন বাদ দিয়েই ছুটে যান। এভাবে প্রতিটি পরিস্থিতিতে ‘হ্যাঁ’ বলতে বলতে এক সময় মানুষ মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। নিজের জন্য সময় থাকে না, ইচ্ছাগুলো হারিয়ে যায়, সম্পর্কগুলোও ভারসাম্য হারাতে শুরু করে। অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি উদ্বেগ, হতাশা, আত্মসম্মানবোধের ঘাটতি, এমনকি বার্নআউট পর্যন্ত দেখা দিতে পারে।

সীমা নির্ধারণ মানে সম্পর্ক ভাঙা নয়

অনেকের ধারণা, সীমা নির্ধারণ করলে সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যায়। বাস্তবতা ঠিক উল্টো। সুস্থ সম্পর্কের অন্যতম ভিত্তিই হলো পারস্পরিক সম্মান এবং ব্যক্তিগত সীমার প্রতি শ্রদ্ধা।
যখন একজন নারী স্পষ্টভাবে বলেন, ‘এই মুহূর্তে আমি পারছি না’, ‘এভাবে কথা বললে আমি অস্বস্তি বোধ করি’, অথবা ‘এই সিদ্ধান্তটি আমি নিজেই নিতে চাই’, তখন তিনি সম্পর্ক শেষ করছেন না; বরং সম্পর্কের মধ্যে সম্মানজনক একটি কাঠামো তৈরি করছেন। যে সম্পর্ক শুধু একজনের ত্যাগের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, সেটি দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ থাকতে পারে না।

অনেক সময় নারীরা মনে করেন, সবাইকে সন্তুষ্ট রাখাই ভালো মানুষ হওয়ার প্রমাণ। কিন্তু বাস্তবে কেউই সবসময় সবাইকে খুশি রাখতে পারেন না। নিজের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা, বিশ্রাম, ব্যক্তিগত সময় কিংবা ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের মূল্য দেওয়া কোনো স্বার্থপরতা নয়। বরং একজন সুস্থ মানুষই পরিবার, কর্মক্ষেত্র ও সমাজে সবচেয়ে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারেন। যখন একজন নারী নিজের সীমাকে সম্মান করতে শেখেন, তখন অন্যেরাও ধীরে ধীরে সেই সীমাকে সম্মান করতে শেখে।

কীভাবে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ‘না’ বলা যায়?

‘না’ বলা একটি দক্ষতা, যা অনুশীলনের মাধ্যমে গড়ে ওঠে। প্রথমেই নিজের অনুভূতিকে গুরুত্ব দিতে হবে। কোনো বিষয়ে অস্বস্তি লাগলে সেই অনুভূতিকে অবহেলা করা যাবে না। দ্বিতীয়ত, দীর্ঘ ব্যাখ্যা দেওয়ার প্রয়োজন নেই। একটি সংক্ষিপ্ত ও ভদ্র বাক্যই যথেষ্ট–‘দুঃখিত, আমি এটা করতে পারছি না’, ‘এটি আমার জন্য সুবিধাজনক নয়’, অথবা ‘আমি এই সিদ্ধান্তে স্বচ্ছন্দ নই।’ তৃতীয়ত, অপরাধবোধ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। প্রত্যেক মানুষেরই নিজের সময়, শক্তি এবং মানসিক স্বাস্থ্যের সুরক্ষা দেওয়ার অধিকার রয়েছে।

সবশেষে মনে রাখতে হবে, শুরুতে অনেকেই আপনার নতুন সীমাকে মেনে নিতে অস্বস্তি বোধ করতে পারেন। কারণ তারা আপনার সবসময় ‘হ্যাঁ’ বলার অভ্যাসে অভ্যস্ত ছিলেন। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সুস্থ সম্পর্কগুলো নতুন ভারসাম্য খুঁজে নেয়।

‘না’ বলা মানে সম্পর্ক ছিন্ন করা নয়, দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া নয় কিংবা অহংকার দেখানোও নয়। এটি নিজের মর্যাদা, নিরাপত্তা এবং মানসিক সুস্থতাকে গুরুত্ব দেওয়ার একটি সাহসী সিদ্ধান্ত।

একজন নারী যখন নিজের সীমা নিজেই নির্ধারণ করেন, তখন তিনি শুধু একটি শব্দ উচ্চারণ করেন না; তিনি জানিয়ে দেন যে তার সময়, অনুভূতি, স্বপ্ন এবং ব্যক্তিত্বেরও মূল্য আছে। আর এই উপলব্ধিই একজন মানুষকে প্রকৃত অর্থে মানসিকভাবে স্বাধীন করে তোলে। কারণ একজন নারীর শক্তি শুধু সহ্য করার মধ্যে নয়; প্রয়োজনের মুহূর্তে সম্মান বজায় রেখে দৃঢ়ভাবে ‘না’ বলতে পারার মধ্যেও নিহিত।

/এসএল

ব্রিটিশ ভারতের পথিকৃৎ নারী চিকিৎসক ডা. যামিনী সেন

প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৬, ১২:৫২ পিএম
ব্রিটিশ ভারতের পথিকৃৎ নারী চিকিৎসক ডা. যামিনী সেন

বাংলার নারী জাগরণের ইতিহাসে কিছু নাম আজও যথাযথভাবে আলোচিত হয় না, অথচ তাদের অবদান যুগান্তকারী। তেমনই একজন অগ্রদূত ছিলেন ডা. যামিনী সেন। ব্রিটিশ শাসনামলে যখন নারীদের উচ্চশিক্ষা, বিশেষ করে চিকিৎসাবিজ্ঞানে অংশগ্রহণ ছিল নানা সামাজিক কুসংস্কার ও প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্যের বেড়াজালে আবদ্ধ, তখন তিনি নিজের মেধা, অধ্যবসায় ও সাহস দিয়ে সেই দেয়াল ভেঙে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিলেন।

ডা. যামিনী সেনের জন্ম উনিশ শতকের শেষভাগে এমন এক সময়ে, যখন মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ ছিল সীমিত। সমাজের প্রচলিত ধারণা ছিল, নারীর স্থান ঘরেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু তিনি সেই ধারণাকে অস্বীকার করে চিকিৎসাবিদ্যা অধ্যয়নের পথ বেছে নেন। তার পরিবারের শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ ও নিজের অদম্য ইচ্ছাশক্তি তাকে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করে।

কলকাতা মেডিকেল কলেজে নারীদের প্রবেশাধিকার নিয়ে তখনো নানা জটিলতা ছিল। তবু যামিনী সেন চিকিৎসাশিক্ষায় নিজের দক্ষতার প্রমাণ দেন এবং পরবর্তী সময়ে উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য ইংল্যান্ডে যান। সে সময় একজন ভারতীয় নারী হিসেবে ব্রিটিশ চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা ছিল অত্যন্ত কঠিন। জাতিগত বৈষম্য, ঔপনিবেশিক মানসিকতা এবং নারী হওয়ার কারণে অতিরিক্ত প্রতিবন্ধকতা–সবকিছুর মুখোমুখি হয়েও তিনি পিছিয়ে যাননি।

ইংল্যান্ডে তিনি চিকিৎসাবিজ্ঞানের উচ্চতর ডিগ্রি ও প্রশিক্ষণ অর্জন করেন এবং ব্রিটিশ চিকিৎসাব্যবস্থার কঠোর মানদণ্ডে নিজেকে যোগ্য হিসেবে প্রমাণ করেন। 

দেশে ফিরে তিনি নারীর স্বাস্থ্যসেবা ও চিকিৎসাশিক্ষার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। সে সময় অনেক নারী পুরুষ চিকিৎসকের কাছে যেতে সংকোচবোধ করতেন। ফলে তাদের চিকিৎসা প্রায়ই অবহেলিত হতো। ডা. যামিনী সেন সেই সংকট দূর করতে আন্তরিকভাবে কাজ করেন। নারী রোগীদের প্রতি তার সহমর্মিতা, দক্ষতা এবং মানবিক আচরণ তাকে দ্রুত জনপ্রিয় করে তোলে।

তিনি বিভিন্ন হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করেন এবং প্রশাসনিক ক্ষেত্রেও নিজের যোগ্যতার পরিচয় দেন। চিকিৎসা পেশায় নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা তিনি বারবার তুলে ধরতেন। তার বিশ্বাস ছিল, সমাজের অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে উন্নয়নের বাইরে রেখে কোনো জাতি এগিয়ে যেতে পারে না। তাই তিনি শুধু রোগ নিরাময়েই সীমাবদ্ধ থাকেননি; নারীদের শিক্ষা, পেশাগত দক্ষতা ও আত্মনির্ভরতার গুরুত্বও তুলে ধরেছেন।

ডা. যামিনী সেনের জীবনের সবচেয়ে অনুপ্রেরণাদায়ক দিক হলো তার আত্মবিশ্বাস। ব্রিটিশ শাসকদের আধিপত্যপূর্ণ পরিবেশে একজন ভারতীয় নারী হিসেবে স্বীকৃতি অর্জন করা ছিল প্রায় অসম্ভবের মতো। কিন্তু তিনি প্রমাণ করেছেন, যোগ্যতা ও অধ্যবসায়ের সামনে বর্ণ, লিঙ্গ কিংবা ঔপনিবেশিক পরিচয় কোনো স্থায়ী বাধা হতে পারে না। তার সাফল্য পরবর্তী প্রজন্মের অসংখ্য নারীকে চিকিৎসাবিদ্যা ও অন্যান্য পেশায় এগিয়ে যেতে উৎসাহিত করেছে।

ব্রিটিশদের প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসাবিজ্ঞানের দুর্গে নিজের মেধার পতাকা উড়িয়ে তিনি প্রমাণ করেছিলেন–একজন বাঙালি নারীও বিশ্বমানের চিকিৎসক হতে পারেন, নেতৃত্ব দিতে পারেন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নতুন পথ তৈরি করতে পারেন।

/এসএল

নারীর সফল ক্যারিয়ারের ৬ টিপস

প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৬, ১২:৪৪ পিএম
নারীর সফল ক্যারিয়ারের ৬ টিপস

বর্তমান বিশ্বে নারীরা শিক্ষা, প্রযুক্তি, ব্যবসা, চিকিৎসা, প্রশাসন কিংবা সৃজনশীল শিল্প–প্রতিটি ক্ষেত্রেই নিজেদের যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখছেন। তবে একটি সফল ক্যারিয়ার গড়ে তোলা শুধু মেধার ওপর নির্ভর করে না; এর জন্য প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা, ধারাবাহিক শেখা এবং মানসিক দৃঢ়তা। কর্মজীবনের প্রতিটি ধাপে কিছু গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বা ‘লেসন’ একজন নারীকে আরও আত্মবিশ্বাসী ও সফল হতে সাহায্য করতে পারে।

নিজের লক্ষ্য স্পষ্ট করুন

ক্যারিয়ার কোথায় নিয়ে যেতে চান, তা আগে নিজেকেই জানতে হবে। পাঁচ বা দশ বছর পর নিজেকে কোন অবস্থানে দেখতে চান, সেই লক্ষ্য নির্ধারণ করুন। স্পষ্ট লক্ষ্য থাকলে সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয় এবং কাজের প্রতি মনোযোগও বাড়ে।

শেখার অভ্যাস কখনো বন্ধ করবেন না

ডিগ্রি অর্জনের পরও শেখার প্রয়োজন শেষ হয় না। নতুন প্রযুক্তি, সফট স্কিল, ভাষা কিংবা পেশাগত দক্ষতা নিয়মিত শিখতে হবে। বর্তমান কর্মক্ষেত্রে যারা দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারেন, তারাই দীর্ঘমেয়াদে এগিয়ে থাকেন।

আত্মবিশ্বাসই সবচেয়ে বড় শক্তি

অনেক নারী নিজের যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও দ্বিধা বা সংকোচে পিছিয়ে যান। নিজের দক্ষতার ওপর বিশ্বাস রাখুন এবং প্রয়োজন হলে নিজের সাফল্য তুলে ধরতেও সংকোচ করবেন না। আত্মবিশ্বাস আপনাকে নতুন দায়িত্বগ্রহণ এবং নেতৃত্ব দেওয়ার সাহস জোগাবে।

সময় ব্যবস্থাপনায় দক্ষ হন

কাজ, পরিবার, ব্যক্তিগত জীবন–সবকিছুর ভারসাম্য বজায় রাখতে সময় ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিনের কাজের অগ্রাধিকার ঠিক করুন, অপ্রয়োজনীয় কাজে সময় নষ্ট কমান এবং প্রয়োজনে ‘না’ বলতে শিখুন।

যোগাযোগ দক্ষতা উন্নত করুন

ভালোভাবে কথা বলা, মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং নিজের মতামত পরিষ্কারভাবে প্রকাশ করতে পারা কর্মজীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা। ই-মেইল লেখা থেকে শুরু করে মিটিংয়ে বক্তব্য দেওয়া–সব ক্ষেত্রেই কার্যকর যোগাযোগ আপনাকে আলাদা পরিচিতি এনে দেবে।

নেটওয়ার্ক তৈরি করুন

শুধু নিজের প্রতিষ্ঠানের ভেতর নয়, পেশাজীবী বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে পরিচিতি গড়ে তুলুন। সেমিনার, কর্মশালা, পেশাগত অনুষ্ঠান কিংবা অনলাইন প্ল্যাটফর্মে অংশ নেওয়ার মাধ্যমে নতুন সুযোগ ও অভিজ্ঞতার দরজা খুলে যেতে পারে।

সফল ক্যারিয়ার মানেই শুধু বড় পদ বা উচ্চ বেতন নয়। বরং এমন একটি পেশাজীবন, যেখানে নিজের দক্ষতা বিকাশের সুযোগ থাকে, কাজের প্রতি সন্তুষ্টি থাকে এবং ব্যক্তিগত মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় থাকে। প্রতিটি নারীর পথ আলাদা। তাই অন্যের সঙ্গে তুলনা না করে নিজের অগ্রগতির দিকে নজর দেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

পরিশেষে বলা যায়, সফল ক্যারিয়ার একদিনে গড়ে ওঠে না। ছোট ছোট অভ্যাস, সঠিক সিদ্ধান্ত, অবিরাম শেখার মানসিকতা এবং প্রতিকূলতার মধ্যেও এগিয়ে যাওয়ার সাহস–এই চারটি ভিত্তির ওপরই দাঁড়িয়ে থাকে দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য। নিজের স্বপ্নকে গুরুত্ব দিন, দক্ষতা বাড়ান এবং প্রতিটি অভিজ্ঞতাকে শেখার সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করুন। তবেই কর্মজীবনের প্রতিটি ধাপে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে।

/এসএল

সংবাদ উপস্থাপক থেকে জনপ্রতিনিধি: শামীমা তন্বীর অসাধারণ অভিযাত্রা

প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৬, ০১:০৫ পিএম
সংবাদ উপস্থাপক থেকে জনপ্রতিনিধি: শামীমা তন্বীর অসাধারণ অভিযাত্রা

একজন নারী যখন নিজের স্বপ্নকে শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার বানান, তখন তার গল্প অনুপ্রেরণার হয়ে ওঠে হাজারও মানুষের জন্য। যুক্তরাজ্যের লন্ডন বরোর লিটল ইলফোর্ড ওয়ার্ড থেকে কাউন্সিলর নির্বাচিত বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত শামীমা নাসরিন তন্বীর পথচলা ঠিক তেমনই এক অনন্য উদাহরণ।

সংবাদ উপস্থাপক, মেডিকেল সেক্রেটারি, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব–এসব পরিচয়ের পাশাপাশি এখন তিনি একজন জনপ্রতিনিধি। আর এই অর্জন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা বাংলাদেশি নারীদের সম্ভাবনারও প্রতীক।

টাঙ্গাইলে জন্ম নেওয়া শামীমা নাসরিন তন্বী ছোটবেলা থেকেই মানুষের জন্য কিছু করার স্বপ্ন দেখতেন। তবে রাজনীতিতে আসার পরিকল্পনা আগে থেকে ছিল না। তার ভাষায়, মানুষের সেবা করার ইচ্ছাই ধীরে ধীরে তাকে এই পথে নিয়ে এসেছে। দীর্ঘদিন কমিউনিটির নানা সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থেকে তিনি উপলব্ধি করেন, সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় থাকলে আরও কার্যকরভাবে মানুষের পাশে দাঁড়ানো সম্ভব। সেই উপলব্ধিই তাকে রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার সাহস জুগিয়েছে।

লন্ডনের স্থানীয় নির্বাচনে তিনি ‘নিউহ্যাম ইন্ডিপেন্ডেন্টস’ পার্টির প্রার্থী হিসেবে জয়ী হয়েছেন। নতুন একটি রাজনৈতিক দলের প্রার্থী হয়েও মানুষের আস্থা অর্জন করতে পারা তার কাছে বড় প্রাপ্তি। তন্বীর মতে, এই বিজয় কেবল একজন প্রার্থীর নয়, বরং স্থানীয় মানুষের পরিবর্তনের প্রত্যাশার প্রতিফলন। মানুষ নতুন নেতৃত্ব ও বাস্তবসম্মত সমাধানে বিশ্বাস রেখেই তাকে নির্বাচিত করেছে।

তার এই যাত্রার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো বহুমাত্রিক পরিচয়ের সফল সমন্বয়। একদিকে তিনি যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসে (NHS) মেডিকেল সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, অন্যদিকে জনপ্রতিনিধি হিসেবেও মানুষের সেবা করছেন। তিনি মনে করেন, দুটি ক্ষেত্রের মূল উদ্দেশ্য একই–মানুষের কল্যাণ। হাসপাতালের কাজের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের বাস্তব সমস্যাগুলো কাছ থেকে দেখার সুযোগ পান, যা কাউন্সিলর হিসেবে সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাকে আরও সংবেদনশীল ও কার্যকর করে তোলে।

সংবাদ পাঠক ও উপস্থাপক হিসেবে সফল ক্যারিয়ার থাকা সত্ত্বেও রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার কারণ জানতে চাইলে তন্বী বলেন–সংবাদ উপস্থাপনা তাকে মানুষের গল্প বলার সুযোগ দিয়েছে, কিন্তু রাজনীতি তাকে সেই গল্পের বাস্তব সমাধানে কাজ করার সুযোগ এনে দিয়েছে। তিনি শুধু সমস্যার বর্ণনাকারী হতে চাননি; পরিবর্তনের অংশীদার হতে চেয়েছেন।

তিনি আরও বলেন, নারী হিসেবে পথচলায় চ্যালেঞ্জও কম ছিল না। নেতৃত্বের জায়গায় এখনো নারীদের সক্ষমতা নিয়ে নানা প্রচলিত ধারণা রয়েছে। অনেক সময় নিজেকে বারবার প্রমাণ করতে হয়েছে। তবে তিনি বিশ্বাস করেন, আত্মবিশ্বাস, কঠোর পরিশ্রম ও সততা থাকলে কোনো বাধাই দীর্ঘস্থায়ী হয় না। তার এই বিশ্বাসই তাকে প্রতিটি ধাপে এগিয়ে যেতে সাহস দিয়েছে।

রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে তন্বীর বার্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি মনে করেন, রাজনীতি কোনোভাবেই শুধু পুরুষদের ক্ষেত্র নয়। সমাজের উন্নয়ন ও নীতিনির্ধারণে নারীদের দৃষ্টিভঙ্গি ও নেতৃত্ব সমানভাবে প্রয়োজন। তাই নারীদের নিজেদের সক্ষমতার ওপর আস্থা রেখে ভয় না পেয়ে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।

এই সাফল্যের পেছনে পরিবারের ভূমিকার কথাও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন তন্বী। ব্যস্ত কর্মজীবনের মাঝেও পরিবারের সমর্থন তাকে মানসিক শক্তি ও অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। তিনি মনে করেন, পরিবারের আস্থা ছাড়া এমন বহুমাত্রিক দায়িত্ব সামলানো সম্ভব হতো না।

লন্ডনের নির্বাচনে তার বিজয়ের খবর ছড়িয়ে পড়তেই বাংলাদেশ, বিশেষ করে টাঙ্গাইল এলাকায় আনন্দের ঢেউ ওঠে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসংখ্য মানুষ তাকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। একজন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নারী আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নেতৃত্বের জায়গা তৈরি করায় অনেকেই এটিকে নিজেদের গর্ব হিসেবে দেখছেন। তন্বী নিজেও এই ভালোবাসায় অভিভূত।

বিদেশে প্রতিষ্ঠিত হলেও বাংলাদেশকে তিনি নিজের শিকড় বলে মনে করেন। ভবিষ্যতে শিক্ষা, নারী নেতৃত্ব, যুব উন্নয়ন ও কমিউনিটি উন্নয়ন নিয়ে বাংলাদেশে কাজ করার ইচ্ছা রয়েছে তার। যুক্তরাজ্যে কাজের অভিজ্ঞতাকে দেশের মানুষের কল্যাণে কাজে লাগাতে চান তিনি। তার বিশ্বাস, প্রবাসে অর্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা দেশের উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হতে পারে।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তন্বী বলেন, প্রথম দায়িত্ব মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করা। তিনি চান, তার কাজের মাধ্যমে মানুষের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন আসুক। দীর্ঘমেয়াদে আরও বৃহত্তর পরিসরে জনসেবামূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ার স্বপ্ন দেখেন। সবচেয়ে বড় আকাঙ্ক্ষা, এমন একটি দৃষ্টান্ত রেখে যাওয়া যাতে আগামী প্রজন্মের মেয়েরা বিশ্বাস করতে পারে—পরিশ্রম, সততা ও আত্মবিশ্বাস থাকলে কোনো স্বপ্নই অসম্ভব নয়।

শামীমা নাসরিন তন্বী; যিনি নিজের পেশাগত পরিচয়, ব্যক্তিগত স্বপ্ন এবং সামাজিক দায়বদ্ধতাকে এক সুতোয় গেঁথে প্রমাণ করেছেন–নেতৃত্বের জন্য লিঙ্গ নয়, প্রয়োজন যোগ্যতা, নিষ্ঠা ও মানুষের প্রতি আন্তরিক ভালোবাসা।

/এসএল