লক্ষ্মীপুরে স্থানীয় প্রশাসনকে ম্যানেজ করে বছরের পর বছর অবৈধ ইটভাটার কার্যক্রম চালানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে।
খোদ পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা জানিয়েছেন, অবৈধ ইটভাটা নিয়ন্ত্রণে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো সহযোগিতা করা হয় না। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে অবাধে চলছে ফসলি জমির টপ সয়েল (উর্বর অংশ) কেটে ইট বানানো। এতে একদিকে যেমন জমির ক্ষতি হচ্ছে, অন্যদিকে ভাটার কালো ধোঁয়ায় দূষিত হচ্ছে পরিবেশ।
একাধিক ব্যক্তি ও ব্যবসায়ীর দাবি, জেলা প্রশাসনের এল আর ফান্ডে (স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত তহবিল) ডোনেশন দিয়ে তারা ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। সবাইকে ‘ম্যানেজ’ করেই তাদের চলতে হয়।
যদিও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলা হয়েছে, সব অবৈধ ইটভাটা বন্ধ করে দেওয়া হবে।
পরিবেশ অধিদপ্তর লক্ষ্মীপুর জেলা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, লক্ষ্মীপুরের ১৩৮টি ইটভাটার মধ্যে ৮৪টির কোনো বৈধতা নেই। চলতি মৌসুমে জেলা সদর, রামগতি ও কমলনগর উপজেলায় নতুন করে আরও ১৭টি অবৈধ ইটভাটা চালু হয়েছে। গত মৌসুমে পুরো জেলায় ইটভাটা ছিল ১২১টি, এর মধ্যে অবৈধ ছিল ৬৭টি।
পরিবেশ অধিদপ্তর লক্ষ্মীপুর জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক হারুন অর রশিদ বলেন, ‘পুরো জেলার বিপুলসংখ্যক ইটভাটা বন্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার জন্য একাধিকবার জেলা প্রশাসককে অনুরোধ করেছি। কিন্তু উনি কোনো উদ্যোগ নেননি। ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশ ছাড়া ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা যায় না। কিন্তু জেলা প্রশাসন আমাদের সহযোগিতা করছে না। ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও ইটভাটার বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নিতে পারছি না।’
দুই বছরে ১২ ইটভাটার মালিকের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘ভাটার মালিকরা জামিনে বের হয়ে আবারও ইটভাটা চালিয়ে যাচ্ছেন।’
জেলার একাধিক ইটভাটা পরিদর্শন ও পরিবেশ অধিদপ্তর অফিস থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা গেছে, জেলার বিপুলসংখ্যক ইটভাটা আবাসিক এলাকা ও স্কুলের পাশে গড়ে তোলা হয়েছে। এসব ভাটায় ব্যবহার করা হচ্ছে স্বল্প উচ্চতার চিমনি। পোড়ানো হচ্ছে কাঠ, রাবার, গাড়ির টায়ারসহ নিষিদ্ধ দ্রব্য।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন কমলনগর উপজেলার নেতা তারেক সোলাইমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে পরিবেশ ধ্বংস করার প্রতিযোগিতা চলছে। আমার নিজ এলাকা চর সামছুদ্দিন গ্রামে শামিম ব্রিক ফিল্ড নামে একটি ইটভাটা আছে। ওই ভাটার কারণে আমার ফসলি জমির ক্ষতি হয়েছে। প্রতিকার চেয়ে জেলা প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরে ধরনা দিয়েও কোনো ফল পাইনি।’
তবে এই ক্ষতিকে ‘সামান্য’ আখ্যায়িত করে ওই ইটভাটার মালিক মো. সোহাগ বলেন, ‘আমার ব্রিক ফিল্ডের কারণে এলাকার ২০০ পরিবারের রুটি-রুজির ব্যবস্থা হয়েছে। সরকারকে লাখ লাখ টাকা ট্যাক্স দিচ্ছি। এতে দেশের উপকার হচ্ছে। এত উপকার করতে গেলে সামান্য ক্ষতিতো মেনে নিতেই হবে।’
সদর উপজেলার হাজি ব্রিকসের মালিক মাকছুদুর রহমান বলেন, ‘২০১৮ সাল থেকে আমরা এই ভাটা চালিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু বারবার লাইসেন্সের জন্য আবেদন করেও পাইনি। পাশে প্রাইমারি স্কুল থাকায় লাইসেন্স দেয় না। কিন্তু আমাদের নিয়মিত রাজস্ব দেওয়ার পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি খাতে টাকা দিতে হয়।’
চর আধার মানিক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জামাল উদ্দিন সিহাব খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমার স্কুলের পাশেই তিনটি ইটভাটা রয়েছে। পুরো গ্রামে রয়েছে মোট ১০টি। প্রতিদিন পিকআপ, ট্রাক্টরে করে মাটি, ইট, কাঠ বহন করা হয়। রাস্তার ধুলো আর শব্দ দূষণের কারণে ক্লাস নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকটি অবৈধ ইটভাটার মালিক জানান, ভাটা বৈধ হোক কিংবা অবৈধ, জেলা প্রশাসনের এল আর ফান্ডে তিন থেকে পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দিতে হয়। নিয়মিত ভ্যাটও পরিশোধ করতে হয়। এ ছাড়াও বিভিন্ন ব্যক্তি প্রতিষ্ঠানকে চাঁদা দিয়ে ইট পোড়াতে হয়।
লক্ষ্মীপুর জেলা প্রশাসক সুরাইয়া জাহান বলেন, এরই মধ্যে কয়েকটি অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে অভিযান চালিয়ে সব অবৈধ ইটভাটা বন্ধ করে দেওয়া হবে। এল আর ফান্ডে অবৈধ ইটভাটা থেকে কোনো টাকা নেওয়া হয় না।