বিরল রোগ প্রোজেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ১০ বছরেই বৃদ্ধ হয়েছেন চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের নিজামপুরের সেই শাহাদাত হোসেন। গত বছরের অক্টোবরে প্রথমবারের মতো গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর তাকে নিয়ে তুমুল আলোচনা শুরু হয়। সেই সময় তার রাতে ঘুমাতে না পারা, সীমাহীন শারীরিক যন্ত্রণার পাশাপাশি পরিবারের দারিদ্র্যের কথা ওঠে আসে। এরপর অনেকেই এগিয়ে আসেন শাহাদাতের পরিবারের পাশে দাঁড়াতে। বিশেষ করে ঢাকার একজন শিল্পপতি শাহাদাতের চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়েছিলেন। স্থানীয় উপজেলা প্রশাসন ঘোষণা দেয়, তার পরিবারকে জমিসহ নতুন ঘর দেওয়ার।
তাকে নতুন সাইকেল উপহার দেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার। পরে স্কুল থেকে আনা-নেওয়ার জন্য তার জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয় একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা। সেই সঙ্গে তার ঘরে প্রতি সপ্তাহে পুষ্টিকর খাবার পৌঁছে দেওয়ার কথাও জানিয়েছিলেন ইউএনও। কিন্তু বর্তমানে কেমন আছে সেই শাহাদাত ও তার পরিবার? পাঁচ মাস পর তা জানার চেষ্টা করেছে খবরের কাগজ।
গত বৃহস্পতিবার নিজামপুর মাইজগাঁও গ্রামে সড়ক ও জনপথের জায়গায় থাকা শাহাদাতের ঝুঁপড়ি ঘরে গিয়ে দেখা যায়, তার মা ও ছোট বোন গৃহস্থালির কাজ করছেন। শাহাদাত উঠানে হাঁটছেন। কিছুক্ষণ পরপর যানবাহনের প্রচণ্ড শব্দ কানে লাগতেই আঁতকে ওঠছে সে। বাড়ির ছোট্ট উঠানে সাইকেল চালাতেও ভয় হচ্ছিল তার। ততক্ষণে বাবা মো. হানিফও অটোরিকশা চালিয়ে ঘরে ফিরেছেন।
শাহাদাতের মা-বাবার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পাঁচ মাস আগে উপজেলা প্রশাসনের দেওয়া প্রতিশ্রুতির কোনোটিই তারা ঠিকমতো পাচ্ছেন না। প্রথম দুই মাস শাহাদাতের পুষ্টিকর খাবারের জন্য ৫০০ টাকা করে দেওয়া হলেও নির্বাচনের আগে থেকে তা বন্ধ রয়েছে। যে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে তাকে স্কুল থেকে আনা-নেওয়ার কথা ছিল, সেটির দেখা মেলেনি এক দিনও। এ ছাড়া সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরের ব্যাপারে তাদের কিছুই জানানো হয়নি। চাওয়া হয়নি কোনো কাগজপত্রও। বর্তমানে অটোরিকশা চালিয়ে সামান্য আয় দিয়ে কোনোমতে সংসার ও দুই সন্তানের লেখাপড়ার খরচ চালাচ্ছেন মো. হানিফ। প্রায়ই শাহাদাতের বায়না পূরণে ব্যর্থ হয়ে হানিফের চোখে পানি দেখা যায়।
শাহাদাতের মা নাছিমা আক্তার বলেন, ‘ঢাকার একজন শিল্পপতি তার চিকিৎসার জন্য বিদেশে নিতে চান। গেল ডিসেম্বরে তাকে ঢাকার পিজি (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়) হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। সেখানে প্রায় ২৪ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর তারা বাড়িতে ফিরে আসেন।
অনেক ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছে শাহাদাতের। সেসব পরীক্ষার রিপোর্ট ভারতের একজন বিখ্যাত চিকিৎসককে পাঠানো হয়েছে। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে তাকে আমেরিকা পাঠানো হতে পারে।’
তিনি জানান, পুষ্টিকর খাবার কিংবা স্কুলের পরিবহন সুবিধা কোনোটিই পাচ্ছেন না তারা। পুরো এলাকায় রটেছে, তারা নতুন ঘর পেয়েছেন। অথচ সে ব্যাপারে নিজেরাই অবগত নয়। তবে চিকিৎসার দায়িত্ব নেওয়া ঢাকার শিল্পপতি তার বাবাকে একটি অটোরিকশা উপহার দিয়েছেন।
এ বিষয়ে মিরসরাই উপজেলা নির্বাহী অফিসার মাহফুজা জেরিন বলেন, ‘শাহাদাত হোসেন বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশু। তাই তার জন্য পুষ্টিকর খাবার ও স্কুলে আসা-যাওয়ার জন্য সিএনজিচালিত অটোরিকশা ব্যবস্থা করার নির্দেশনা দিয়েছিলাম। তার মায়ের সঙ্গে কয়েক দিন আগেও আমার কথা হয়েছে। তিনি আমাকে এই বিষয়ে কিছুই জানাননি। আমি খবর নিয়ে দ্রুতই ব্যবস্থা নেব। আমি চাই সে ভালো থাকুক। তাকে দেখলে আমার সন্তানের কথা মনে পড়ে।’