দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়ায় কয়লা খনি সম্প্রসারণের খবরে বেশি ক্ষতিপূরণের আশায় কৃষি জমিতে নির্মাণ করা হয়েছে বহুতল ভবন। এর ফলে কয়লা খনির উত্তর পাশের হামিদপুর ইউনিয়নের বাঁশপুকুর ও কাজীপাড়া গ্রামের চিত্র বদলে গেছে।
কয়েক বছর আগেও যেখানে বিস্তীর্ণ কৃষি জমিতে ধান, ভুট্টা ও বিভিন্ন ফসলের আবাদ হতো, সেখানে এখন চোখে পড়ছে একতলা থেকে ছয়তলা পর্যন্ত অসংখ্য বহুতল ভবন।
আশ্চর্যের বিষয়, অধিকাংশ ভবনই জনশূন্য, নেই বিদ্যুৎ সংযোগ, নেই যাতায়াতের উপযুক্ত রাস্তা। অনেক ভবনের মূল ফটকে ঝুলছে তালা।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বিস্তীর্ণ ফসলি জমির মাঝখানে অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠেছে বহুতল ভবন। দূর থেকে দেখলে মনে হতে পারে রাজধানীর কোনো অভিজাত আবাসিক এলাকায় সারিবদ্ধ বহুতল ভবন দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু বাস্তবে সেখানে মানুষের বসবাস নেই, এমনকি গবাদিপশুও রাখা হয় না।
স্থানীয়দের ভাষ্য, সম্ভাব্য ভূমি অধিগ্রহণের সময় বেশি ক্ষতিপূরণ পাওয়ার আশায় কৃষি জমিতে এসব ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। যদিও বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য এখনো পাওয়া যায়নি।
দিনাজপুর জেলা প্রশাসনের ভূমি অধিগ্রহণ (এলএ) শাখা সূত্রে জানা যায়, ২০১৭ সালে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি সম্প্রসারণের জন্য প্রায় ৩০০ একর জমি অধিগ্রহণের প্রাথমিক উদ্যোগ নেওয়া হয়। সম্ভাব্য অধিগ্রহণ এলাকার সীমানা চিহ্নিত হওয়ার পর থেকেই এলাকায় ভবন নির্মাণের প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।
এলাকায় সংবাদকর্মী বা অপরিচিত কেউ ছবি কিংবা ভিডিও ধারণ করতে গেলে নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে ছবি তুলতে নিরুৎসাহিত করারও অভিযোগ রয়েছে।
বহুতল ভবন নির্মাণ হওয়া বাঁশপুকুর গ্রামের যুবক ইলিয়াস আলী বলেন, ‘আগেও আমাদের অনেক জমি অধিগ্রহণ করেছে। যে ক্ষতিপূরণ পেয়েছি, তা দিয়ে অন্যত্র সমপরিমাণ জমি কেনা সম্ভব হয়নি। তাই এবার অনেকেই বেশি ক্ষতিপূরণের আশায় কৃষিজমির ওপর ভবন নির্মাণ করেছেন। অনেকের সামান্য কিছু জমি অধিগ্রহণের বাইরে থাকায় সেই জমিতেও বহুতল ভবন করা হয়েছে।’
কাজীপাড়া গ্রামের মোশারফ হোসেন বলেন, ‘ভূগর্ভে খনির বিস্ফোরণের কারণে আমাদের অনেক বাড়িঘরে ফাটল দেখা দিয়েছে। আমরা সব সময় আতঙ্কে থাকি। অন্যত্র গিয়ে নতুনভাবে বসতি গড়তে অনেক অর্থের প্রয়োজন। তাই অনেকেই ভবিষ্যতের কথা ভেবে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করছেন।’
বাঁশপুকুর গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল হান্নান বলেন, ‘এখন যে ভবনগুলো তৈরি হচ্ছে, তার অধিকাংশেই কেউ থাকে না। শুধু ভবন বানিয়ে রাখা হয়েছে। আমরা চাই সরকার সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রকৃত অবস্থা যাচাই করুক, যাতে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তরা ন্যায্য ক্ষতিপূরণ পান।’
পাশের পাতরাপাড়া গ্রামের বাড়ি রক্ষা কমিটির সভাপতি নূর মোহাম্মদ আব্দুল কালাম আজাদ অভিযোগ করে বলেন, ‘পাতরাপাড়া বা আশেপাশের অন্য গ্রামগুলোতে এভাবে বহুতল ভবন নির্মাণ হয়নি। কিন্তু বাঁশপুকুর ও কাজীপাড়ায় অস্বাভাবিকভাবে ভবন তৈরি হয়েছে। কয়লা খনির কিছু অসাধু ব্যক্তি ও প্রভাবশালী মহলের প্ররোচনায় মানুষ এ কাজে উৎসাহিত হয়েছে। সরকার নিরপেক্ষ তদন্ত করলে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে।’
দিনাজপুর আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমান ভুট্টু বলেন, সম্ভাব্য অধিগ্রহণ এলাকার কৃষি জমিতে অপরিকল্পিতভাবে বহুতল ভবন নির্মাণ একদিকে উর্বর জমি ধ্বংস করছে, অন্যদিকে ভবিষ্যতে ক্ষতিপূরণ নির্ধারণে জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রকৃত মালিক, ভবন নির্মাণের সময়, উদ্দেশ্য এবং আইনি বৈধতা যাচাই করা জরুরি।
এ বিষয়ে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিকভাবে কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সুলতান/হীরা