চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সাঙ্গু ও ডলু নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করে লোকালয়ে প্রবেশ করায় ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। প্রায় ৫ দিন পর বন্যার এই পানি কমতে শুরু করেছে, তবে পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বন্যার ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির চিত্র ফুটে উঠছে। প্রাথমিক হিসেব অনুযায়ী এ বন্যায় সাতকানিয়ায় প্রায় ১০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।
উপজেলাজুড়ে ভয়াবহ বন্যার ফলে বিভিন্ন ইউনিয়ন ও পৌরসভার সড়ক, কালভার্ট, স্লুইস গেট ও বিভিন্ন গ্রামীণ অবকাঠামোর পাশাপাশি কৃষি ও মৎস্য খাতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বর্তমানে হাজারো পরিবার ঘরবাড়ি পরিষ্কারের পাশাপাশি জীবিকা পুনরুদ্ধারের লড়াইয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন।
সরেজমিনে দেখা গেছে, পৌরসভার উত্তর রামপুর, হাঙর মুখ, গাটিয়াডেঙ্গা ও সামিয়ার পাড়ায় প্রায় ১০০ মিটার সড়ক ভেঙে ডলু নদীর পানি লোকালয়ে প্রবেশ করেছে। এতে ওই সড়কগুলোতে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। এ ছাড়াও নলুয়া-চৌধুরীহাট সড়কের একটি অংশ বিলীন হয়ে গেছে। অপরদিকে সাঙ্গু নদীর বাজালিয়া ইউনিয়নের চৌধুরীপাড়া পয়েন্টে ভাঙন দেখা দিয়েছে এবং ওই অংশের বেশ কয়েকটি ঘরবাড়ি, সড়ক ও মসজিদও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ছদাহা-দস্তিদারহাট সড়কের প্রায় ২০০ মিটার অংশ বিলীন হয়ে গেছে। একই সঙ্গে প্রত্যেকটি ইউনিয়নের কৃষি ও মৎস্য খাতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির চিত্র চোখে পড়েছে।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, আকস্মিক বন্যায় এখন পর্যন্ত ৬০ হেক্টর জমির আমন বীজতলা, ৯৯৫ হেক্টর আউশ, ৭৪০ হেক্টর শাকসবজি, ৮ হেক্টর পান, ১৬ হেক্টর পেঁপে বাগান এবং ৮০ হেক্টর জমির অন্যান্য মিশ্র ফসল দুর্যোগে আক্রান্ত হয়েছে। এতে ২০ হাজারের অধিক কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং প্রায় ৫০ থেকে ৬০ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
বাজালিয়া ইউনিয়নের বুড়ির দোকান সংলগ্ন মাহালিয়া বিলের সবজি চাষি সিরাজ মিয়া বলেন, আমি প্রতিবছর বাণিজ্যিকভাবে বিভিন্ন জাতের শাকসবজি চাষাবাদ করে থাকি। চলতি মৌসুমেও প্রায় দেড়শ শতক জমিতে করলা, লাউ, শসা, ঝিঙে, ঢেঁড়স ও বেগুনের আবাদ করেছি। কিন্তু বন্যার পানিতে কিছুই অবশিষ্ট রইল না, সব ফসল তলিয়ে গেছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান বলেন, প্রাথমিকভাবে এখন পর্যন্ত সর্বমোট ১ হাজার ৮৯৯ হেক্টর জমির বিভিন্ন জাতের ফসল ও শাকসবজি দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের প্রয়োজনীয় সহায়তা বা প্রণোদনার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্রে জানা গেছে, এখন পর্যন্ত ২৬টি সড়কের প্রায় ১৩ কিলোমিটার জায়গা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়াও ৪টি কালভার্ট ও একটি স্লুইস গেট ভেঙে গেছে। এর ফলে প্রায় ১০ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
সাতকানিয়া পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের উত্তর রামপুর এলাকার বাসিন্দা জিসানুল ইসলাম বলেন, আমাদের এলাকার বায়তুশ শরফ অংশ দিয়ে ডলু নদীর পানি লোকালয়ে প্রবেশ করায় গোলারঘাট সড়কের বিশাল একটি অংশ বিলীন হয়ে গেছে। এখনও ওই অংশ দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। পানির স্রোতে নাছির মৌলভী নামে এক অটোরিকশা চালকের বাড়ি ভেঙে গেছে।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) উপজেলা কর্মকর্তা সবুজ কুমার দে বলেন, বিভিন্ন এলাকায় এখনো বন্যার পানি নামেনি। যেসব এলাকায় পানি নেমে গেছে সেখানে প্রায় ১০ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।
উপজেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা গেছে, বিভিন্ন এলাকার ৩ হাজার ৫৫০টি পুকুরের মাছ ভেসে গেছে। এতে ৫৭৫ হেক্টর পুকুর বা দিঘি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব পুকুর বা দিঘির মধ্যে ৮০৬ মেট্রিক টন পিন ফিস ও ১০ লাখ পোনা বন্যার পানিতে ভেসে গেছে। এতে অবকাঠামো, মাছ ও পোনাসহ আনুমানিক ৩৭ কোটি ২৪ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
কেঁওচিয়া ইউনিয়নের মৎস্য চাষি মো. মহসিন বলেন, আমার পুকুর ও প্রজেক্টের অধিকাংশ মাছ বন্যার পানিতে ভেসে গেছে। এ ছাড়াও একটি নৌকা ও বিপুল পরিমাণ মাছের খাবার প্রবল স্রোতে তলিয়ে গেছে। এতে আমার প্রায় ৪০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। তাই দ্রুত সময়ের মধ্যে সরকারি সহযোগিতা না পেলে ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন হয়ে যাবে।
উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) তানবীর আহসান বলেন, এটি মূলত প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ। বন্যার পানি পুরোপুরি নেমে গেলে পুনরায় তথ্য সংগ্রহ করা হবে। তখনই প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ জানা যাবে। এরপর ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করে সরকারি সহায়তার জন্য সুপারিশ করা হবে।
আরিফুল ইসলাম/নাঈম