কৃষকের উৎপাদিত পণ্য সরাসরি ভোক্তার কাছে ন্যায্যমূল্যে পৌঁছে দিতে ১৭ বছর আগে রংপুরে গ্রোয়ার্স মার্কেটের যাত্রা শুরু হয়। উদ্দেশ্য ছিল মধ্যস্বত্বভোগীদের এড়িয়ে কৃষকদের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তায় পরিণত করা। এ ছাড়া ভোক্তাদের কাছে তুলনামূলক কম মূল্যে কৃষিপণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা। কিন্তু দুই দশকের কাছাকাছি সময়ে এসেও এসব মার্কেটের বেশির ভাগই অকার্যকর অবস্থায় পড়ে রয়েছে। অধিকাংশ মার্কেট এখন প্রভাবশালীদের দখলে। যাদের কথা ভেবে গ্রোয়ার্স মার্কেটগুলো নির্মাণ করা হয়েছিল সেই কৃষকরাই এর সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের পরিচালনায় ২০০৭-২০০৮ অর্থবছরে শস্য বহুমুখীকরণ (এনসিডিপি) প্রকল্পের আওতায় রংপুর জেলায় ছয়টি গ্রোয়ার্স মার্কেট নির্মাণ করা হয়। মার্কেটগুলো নির্মাণের কাজ বাস্তবায়ন করে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। অর্থায়ন করে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিপি)। প্যাকিং হাউস, লোডিং-আনলোডিং, ওয়াশিং ইউনিট সুবিধাসহ কৃষকদের জন্য এসব মার্কেট তৈরি করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে রংপুর নতুন ট্রাক টার্মিনালে একটি (সিটি করপোরেশনের দখলকৃত), মাহিগঞ্জ বাজারে একটি (সিটি করপোরেশনের দখলকৃত) ও বদরগঞ্জ বাজার, তারাগঞ্জের ইকোরচালী বাজার, রূপসী রানিপুকুর হাট ও মাদারহাট পীরগঞ্জে একটি করে।
মার্কেটগুলোতে গিয়ে দেখা যায়, কোনোটিতেই নিয়ম মানা হচ্ছে না। অধিকাংশই প্রভাবশালীদের দখলে। এমনকি মার্কেটের পাশের খালি জায়গাও প্রভাবশালীরা দখলে নিয়ে ভাড়া দিয়েছেন। ওই ভাড়ার একটি অংশ কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের দেওয়া হয় বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
তাদের অভিযোগের সত্যতা মেলে বদরগঞ্জের মাছের আড়তদার মেনহাজুল ইসলামের কথায়। ভাড়া দেওয়া-নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে নিয়ে তিনি বলেন, ‘গ্রোয়ার্স মার্কেটটি আগে থেকেই পড়ে ছিল। তাই আমরা কয়েকজন মিলে এটি ভাড়া নিয়েছি। কৃষি বিপণনের অফিসার এসে ভাড়া নিয়ে যান। আমার ভাইকে নিয়ে একটি গোডাউন করেছি। আমরা ছাড়াও আরও কয়েকজন এখানে মালামাল রাখেন। তারাও ভাড়া দেন।’
প্রকল্পের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল নারীর ক্ষমতায়ন ও উদ্যোক্তা তৈরি করা। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। বেশির ভাগ বাজারে নারীদের জন্য নির্ধারিত কর্নারগুলো দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ। জেলার পীরগঞ্জের মাদার হাটের মইনুল হক বলেন, ‘এই মার্কেটগুলোর যে পরিস্থিতি, সেখানে ক্ষমতাসীনদের এত বেশি দাপট যে, কোনো পুরুষের পক্ষেও ওখানে দোকান নিয়ে থাকাটা মুশকিল। নারীর দোকান করা তো বহু দূরের কথা।’
মিঠাপুকুরের রানীপুকুর বাজারের তুহিন সিড স্টোরের মালিক তুহিন মিয়া বলেন, ‘আমি একটা ঘরে মালামাল রাখছি। এ জন্য প্রতি মাসে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ইস্পাহানকে ভাড়া দিতে হয়।’ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই বাজারের এক মুরগি ব্যবসায়ী বলেন, ‘কিছু রাখতে চাইলেই আমার কাছে টাকা চাওয়া হয়। ইস্পাহানের ক্ষমতা আছে বলেই নিজের মতো করে ব্যবহার করেন। এখান থেকে কোনো কৃষক সুবিধা নিতে পারেন না।’
এদিকে মাহিগঞ্জ কৃষি বাজার ও ট্রাক টার্মিনাল কৃষি বাজার দুটি এখন রংপুর সিটি করপোরেশনের (রসিক) দখলে। মাহিগঞ্জ কৃষি বাজার নিয়ন্ত্রণ করেন ওই এলাকার প্রভাবশালী দেলোয়ার হোসেন। সিটি করপোরেশনকে মাসিক ভাড়া হিসেবে তিনি ১৮ হাজার ১০০ টাকা দেন। এ ছাড়া ট্রাক টার্মিনালের বাজারে প্রতিদিন ১০ থেকে ১২টি গরু জবাই হয়। যার ভাড়া খাস হিসেবে সিটি করপোরেশনকে দেন রংপুর জেলা যুবদলের সহসভাপতি বিপ্লব হোসেন। বিপ্লব বলেন, ‘রসিক আগেই ইজারা দিয়েছিল। এক বছর ধরে ইজারা না দিয়ে খাস হিসেবে রসিককে ভাড়া দিই। প্রতি মাসে ৩০-৩৫ হাজার টাকা ভাড়া দিয়ে থাকি।’
তবে রসিকের বাজার শাখার প্রধান জাকির হোসেন বলেন, ‘মাহিগঞ্জ কৃষি বাজার থেকে আমরা ভাড়া তুলি। কিন্তু ট্রাক টার্মিনাল থেকে কোনো ভাড়া নেওয়া হয় না।’
এদিকে গ্রোয়ার্স মার্কেট নির্মাণের দায়িত্ব ছিল এলজিইডির। তবে তাদের পর্যাপ্ত তদারকি না থাকায় সেগুলো চলে গেছে প্রভাবশালীদের দখলে। ফলে প্রকল্পের উদ্দেশ্য শুধু সাইনবোর্ডেই সীমাবদ্ধ থাকছে। এ ছাড়া কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্তদের বিরুদ্ধের রয়েছে অবহেলার অভিযোগ। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দাবি, নির্দিষ্ট একটি গোষ্ঠীর কাছে এই প্রকল্প জিম্মি হয়ে আছে। এ ছাড়া মাঠ ও বাজার পরিদর্শক রসিদ ছাড়াই ভাড়া আদায় করেন।
রংপুর কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের মাঠ ও বাজার পরিদর্শক শাহজালাল ইসলাম এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘এগুলো সত্য নয়। ভাড়া নিলে সেগুলো ব্যাংকে জমা করা হয়। প্রভাবশালীরা কত নেয় জানা নেই। দলীয় ক্ষমতার কাছে আমরা অসহায়।’
রংপুর কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের সিনিয়র কৃষি বিপণন কর্মকর্তা শাকিল আকতার বলেন, ‘জায়গাগুলো সিটি করপোরেশন ও স্থানীয় সরকারের হওয়ায় আমাদের নিয়ন্ত্রণ নেই।’ ভাড়া তোলার নিয়ম আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা যেহেতু ব্যবসায়ী পাচ্ছি না, যতটুকু রাজস্ব সরকারকে দেওয়া সম্ভব সেই চেষ্টা করছি। প্রভাবশালীদের দখলে চলে যাওয়ায় বিষয়টি চ্যালেঞ্জ হয়ে গেছে।’