চট্টগ্রামের বাঁশখালী এবং কক্সবাজার জেলার বিভিন্ন উপজেলায় এবার ভারী বৃষ্টিপাতের সময় স্লুইসগেট বন্ধ থাকার কারণে পানি নামতে পারেনি। এসব স্লুইসগেট খুলে দেওয়ার জন্য কয়েকজন মন্ত্রী এবং স্থানীয় সংসদ সদস্যরাও নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো–এই স্লুইসগেট খুলবে কে? খোলার দায়িত্ব কার? পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে তাদের লোকবল নেই। অন্যদিকে এর ওপর স্থানীয় প্রশাসনেরও কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে যেসব স্লুইসগেট রয়েছে তা নিয়ন্ত্রণ বা পরিচালনার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান নেই।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তথ্যমতে, চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে স্লুইসগেট রয়েছে ৮৫টি। তবে স্থানীয়দের তথ্যমতে, বাঁশখালী বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে আরও প্রায় ১৫০টি স্লুইসগেট নির্মাণ করা হয়েছে। আর কক্সবাজারে রয়েছে প্রায় ২৫০টি স্লুইসগেট। দুই জেলার প্রায় ৫০০ স্লুইসগেট ব্যবহার হয় উপকারভোগীর ইচ্ছামতো। এখানে স্থানীয় প্রশাসনের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। পাউবোও তা নিয়ন্ত্রণ করে না। যে কারণে সাধারণ কৃষক থেকে শুরু করে লবণচাষি, মৎস্যচাষি যে যার সুবিধামতো স্লুইসগেটের পানি ছাড়ে ও বন্ধ করে।
সরেজমিন গিয়ে ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাঁশখালীতে ভয়াবহ বন্যার পর পানি নামতে শুরু করলেও এখনো কিছু এলাকার মানুষ পানিবন্দি। পানি নামতে দেরি করায় সবার নজর পড়ে বন্ধ থাকা স্লুইসগেটগুলোর দিকে। এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়। ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির জন্য এবং বন্যার মাত্রা ও ভয়াবহতা বৃদ্ধির জন্য স্লুইসগেট দখলে থাকা প্রভাবশালীদের দায়ী করছেন এলাকাবাসী। তাদের মতে, যথাসময়ে স্লুইসগেটগুলো খুলে দিলে এই ভয়াবহ অবস্থা হতো না।
স্থানীয়রা জানান, উপজেলার সরল ইউনিয়নের মিনজিরিতলা, সরল, কাথরিয়া ইউনিয়নের বরইতলী, শীলকূপের জালিয়াখালী, মনকিচর, গণ্ডামারা, চাম্বলের ডেপুটিঘোনা, শেখেরখিল, ছনুয়া এবং পুঁইছড়ি ইউনিয়নের বেড়িবাঁধের বিভিন্ন স্লুইসগেট বন্ধ ছিল। এর মধ্যে অনেকগুলো অচল। যেগুলো সচল ছিল তাও সময়মতো খোলা হয়নি। এ জন্য ভুক্তভোগীরা প্রভাবশালী মাছচাষিদের দায়ী করেছেন।
বাঁশখালীর কাথরিয়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান বিএনপি নেতা আলহাজ শাহজাহান চৌধুরী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, নিজেদের স্লুইসগেট এবং অবৈধভাবে নির্মিত গেটগুলোর ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ বা তদারকি নেই পানি উন্নয়ন বোর্ডের। যে কারণে এগুলো বাঁশখালীর মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। তদারকি না থাকা এবং ভারী বৃষ্টির সময় যথাসময়ে এগুলো খুলে না দেওয়ায় পানি আটকে বন্যা পরিস্থিতি মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছে যায়। এ জন্য পাউবোর নিষ্ক্রিয়তার পাশাপাশি স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার-চেয়ারম্যানরাও কম দায়ী নন। তিনি বলেন, স্লুইসগেটগুলো বন্ধ রেখে বাঁশখালীর মানুষকে বন্যা ও পানিবন্দি করে রাখা হয়েছে। পাউবোর লোকজন বাঁশখালীতে কোনো দায়িত্ব পালন করেন না। তারা স্পটে না গিয়ে মাঝেমধ্যে গুনাগারির অফিসে এসে চলে যান।
জানতে চাইলে বাঁশখালী আসনের সংসদ সদস্য মাওলানা জহিরুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, বাঁশখালীতে বন্যার কারণে ছয় হাজারের বেশি বাড়িঘর বিধ্বস্ত হয়েছে। এই দুর্যোগের জন্য অনেকগুলো কারণ দায়ী। ভারী বৃষ্টিপাতের সঙ্গে উজানের পানি যোগ হয়েছে। জলকদর খাল উঁচু হয়ে গেছে। বাঁশখালীর ৫০ শতাংশ স্লুইসগেট অকেজো। আবার অনেক স্লুইসগেট বন্ধ করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়েছে। বাস্তবতা হলো, স্লুইসগেটগুলো পরিচালনা এবং নিয়ন্ত্রণ করার কেউ নেই। যে কারণে আশপাশের জমির মালিকরা তাদের সুবিধামতো সেটি ব্যবহার করেন। কিন্তু এই গেট নিয়ন্ত্রণের জন্য লোকবল দরকার। ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার-চেয়ারম্যানদের দায়িত্ব দিলে তারাও মাস্টাররোলে লোক নিয়োগ দিয়ে সেটি পরিচালনা করতে পারেন। সদিচ্ছা থাকলে পানি ব্যবস্থাপনা করা কোনো ব্যাপার না।
বিষয়টি নিয়ে তিনি ভাবছেন উল্লেখ করে বলেন, নিয়ন্ত্রণের জন্য পাউবো কিংবা স্থানীয় সরকারের পক্ষ থেকে কেউ না থাকলে বিশৃঙ্খলা হবেই। যার পরিণতি জনদুর্ভোগ। এর থেকে বের হওয়ার উপায় খোঁজা হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, নতুন করে বড় তিনটি স্লুইসগেইট নির্মাণ এবং জলকদর খাল খননের উদ্যোগ তিনি নিয়েছেন।
এদিকে বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ রুহুল আমিন ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানদের চিঠি দিয়ে স্লুইসগেট দখলদারদের তালিকা দিতে বলেছেন। কী কারণে স্লুইসগেটগুলো যথাসময়ে খোলেনি তার ব্যাখ্যাও তিনি চেয়েছেন। খবরের কাগজকে তিনি জানান, বাঁশখালীর বন্যা পরিস্থিতির সঙ্গে স্লুইসগেট, বেড়িবাঁধ এবং জলকদর খালের বিষয়টি উঠে এসেছে। এ বিষয়ে এমন পদক্ষেপ নেওয়া হবে, যাতে আগামীতে কেউ আর এই অপতৎপরতার সুযোগ না পায়।
জানতে চাইলে চট্টগ্রামে পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী ড. তানজির সাইফ আহমেদ খবরের কাগজকে বলেন, বাঁশখালীতে ৮৫টি স্লুইসগেট রয়েছে। তার মধ্যে ৭৫টি সচল। ১০টি মেরামত করতে হবে। জলকদর খাল দখল এবং ভরাট হয়ে গেছে। বাঁশখালীর মানুষ এত বিপুল পরিমাণ বৃষ্টিপাত অতীতে কখনো দেখেনি। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ভবিষ্যতে এ ধরনের আকস্মিক ভারী বৃষ্টিপাতের হার আরও বাড়বে। তাই স্লুইসগেট আরও বাড়াতে হবে। বর্তমানে যেগুলো আছে তা আরও বড় করতে হবে। এগুলো কে নিয়ন্ত্রণ করে–এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, রক্ষণাবেক্ষণ করে পাউবো। নিয়ন্ত্রণ করেন স্থানীয় উপকারভোগীরা। তাদের কাছে চাবি থাকে। তারাই প্রয়োজনে খুলে দেয়। যখন প্রয়োজন হয় বন্ধ করে। এসব নিয়ন্ত্রণের জন্য পাউবোর কোনো লোকবল নেই। স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে স্লুইসগেট নিয়ন্ত্রণ করা যায় কি না–এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, তাদেরও লোকবল নেই। তা ছাড়া বিষয়টি পাউবোর।
অন্যদিকে কক্সবাজারের চকরিয়া, পেকুয়াসহ বিভিন্ন উপজেলায় প্রায় ২৫০টি স্লুইসগেট রয়েছে। এর মধ্যে অনেকগুলো অচল। যেসব সচল আছে তাও লবণ ও মৎস্যচাষিদের দখলে। মূলত যার জমির পাশে পড়েছে তিনি সেটি নিয়ন্ত্রণ করেন। নিজের মাছ রক্ষায় প্রভাবশালীরা নিজ নিজ এলাকার স্লুইসগেট বন্ধ রাখেন। পাউবোর কোনো মাঠপর্যায়ের তদারকি বা স্থায়ী গেট অপারেটর না থাকায় পুরো অঞ্চলের লাখো মানুষ জিম্মি হয়ে পড়েন।
জানতে চাইলে পেকুয়া উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন খবরের কাগজকে জানান, এলাকার অধিকাংশ স্লুইসগেট প্রায় ৭০ বছর আগে নির্মিত। দীর্ঘদিনের পুরোনো হওয়ায় সেগুলো এখন আগের মতো কার্যকরভাবে পানি নিষ্কাশন করতে পারছে না। অন্যদিকে পাহাড়ি ঢলের পানির চাপও অনেক বেড়েছে। যার চাপ সামাল দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। প্রয়োজনীয় স্থানে দুটি বা তিনটি করে নতুন স্লুইসগেট নির্মাণ এবং এগুলোর নিয়ন্ত্রণ উপজেলা প্রশাসন বা সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের অধীনে আনা হলে পানি ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর হবে এবং অনিয়ন্ত্রিতভাবে গেট পরিচালনার সুযোগ থাকবে না।
আরেক স্থানীয় বিএনপি নেতা আব্দুর রশিদ বিএ বলেন, অধিকাংশ স্লুইসগেট অকেজো। তাই নতুন স্লুইসগেট নির্মাণ করে উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ করা হলে ভবিষ্যতে এ ধরনের বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সহজ হবে।
জানতে চাইলে পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘অভিযোগ পাওয়ার পর থেকেই আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছি। পুলিশ সদস্যরা স্লুইসগেট এলাকায় সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছেন। গতকাল পরিচালিত অভিযানে একটি অবৈধ জাল জব্দ করা হয়েছে। কেউ গোপনে স্লুইসগেটে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি বা পানি চলাচলে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ বিষয়ে আমরা গোয়েন্দা নজরদারিও জোরদার করেছি, যাতে কেউ গোপনে এমন কর্মকাণ্ড চালাতে না পারে।’
চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহিন দেলোয়ার বলেন, বন্যা শুরুর প্রথম দিন থেকেই স্লুইসগেট বন্ধ রাখার অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই চকরিয়া ও মাতামুহুরী এলাকার বদরখালী, ডেমুশিয়াসহ বিভিন্ন স্থানে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। অভিযানের পর সংশ্লিষ্টদের আইনের আওতায় আনা হয়। পাশাপাশি প্রতিটি সুইসগেটে দিন-রাত পাহারার জন্য গ্রাম পুলিশ মোতায়েন করা হয়। এরপর আর কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি। ভবিষ্যতে কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে সুইসগেট বন্ধ করে পানি চলাচলে বাধা সৃষ্টি করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জানতে চাইলে কক্সবাজার পাউবোর উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মোহাম্মদ আবু রায়হান খবরের কাগজকে বলেন, স্লুইসগেট মেরামত করে পাউবো। কিন্তু কখন খুলবে, আর কখন বন্ধ করবে তা উপকারভোগীরা করেন। পাউবোর পক্ষ থেকে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে কমিটি গঠন করা হয়। কিছু এলাকায় কমিটি আছে। আবার অনেক এলাকায় নেই। যেখানে কমিটি কার্যকর না সেখানে সমস্যা নেই। যেখানে কমিটি কার্যকর এবং স্বার্থ জড়িত, সেখানে সমস্যা হচ্ছে।
প্রতিবেদন তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন চট্টগ্রামের বাঁশখালী প্রতিনিধি শফকত চাটগামী এবং কক্সবাজারের পেকুয়া প্রতিনিধি রকিবুল হাসান।